ঢাকা, মঙ্গলবার 31 July 2018, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সোনা ও কয়লা কেলেঙ্কারির বিচার হবে কি?

প্রতারণা, দুর্নীতি, দুঃশাসন, নির্যাতন দেশ ও জাতির সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে বলে মনে হয়। আজ সোমবার যখন এই নিবন্ধ লিখতে বসেছি তখন সিলেট, রাজশাহী ও বরিশালে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন চলছে। এর মধ্যে খবর বেরিয়েছে যে, সিটি কর্পোরেশনগুলোতে বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের নির্বাচনী এজেন্ট ও পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও পুলিশ আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধভাবে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের সাথে মারামারিতে লিপ্ত হয়েছে। বিরোধীদলীয় প্রার্থীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যে কারচুপি হচ্ছে তা খুলনা ও গাজীপুরের কারচুপিকে ছাড়িয়ে যাবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের চেহারা কেমন হবে নিঃসন্দেহে সরকার দেশবাসীকে সিটি নির্বাচন দিয়েই বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছেন বলে মনে হয়। এই অবস্থায় দেশবাসী আগামী ডিসেম্বরে এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে কিনা তা ভাবনার বিষয়।
নির্বাচন থাক, এখন অন্য প্রসঙ্গে আসি। গত ১৭ জুলাই দৈনিক প্রথম আলো ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে ভূতুড়ে কা-’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা রাখা ৯৬৩ কেজি সোনা যাচাই করে যে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতি পাওয়া গেছে তা নিয়েই এই রিপোর্টটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে এতে বলা হয় যে, খোদ্্ বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত সোনা মাটি হয়ে গেছে। এতে জমা রাখা হয়েছিল প্রতিটি তিন কেজি ওজনের সোনার চাকতি ও আংটি। তা হয়ে গেছে মিশ্র বা শংকর ধাতু এবং ২২ ক্যারেট সোনা হয়ে গেছে ১৮ ক্যারেট। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর গত জানুয়ারিতে সংস্থাটির মহাপরিচালক বরাবর প্রতিবেদন জমা দেয়। ২৫ জানুয়ারি প্রতিবেদনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর প্রেরণ করা হয়। রিপোর্টে পরিদর্শন দল ভল্টে রাখা সোনা যাচাই বাছাই শেষে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। এতে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট কাস্টমস্ হাউজের গুদাম কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ গোলাকার কালো প্রলেপযুক্ত একটি সোনার চাকতি এবং একটি কালো প্রলেপযুক্ত সোনার রিং বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এই চাকতি এবং আংটি যথাযথ ব্যক্তি দিয়ে পরীক্ষা করে ৮০ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনা হিসেবে গ্রহণ করে প্রত্যয়নপত্র দেয়। কিন্তু দু’বছর পর পরিদর্শন দল ঐ চাকতি ও আংটি পরীক্ষা করে ৪৬.৬৬ শতাংশ সোনা পায়, আংটিতে পায় ১৫.১২ শতাংশ সোনা। ধারণা করা হচ্ছে ভল্টে রাখার পর এগুলো পাল্টে ফেলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভল্টে থাকা সোনার চাকতি এবং আংটি পরীক্ষার পর দেখা যায় যে, এগুলো সোনার নয়, অন্য ধাতুর মিশ্রণে তৈরি। এতে সরকারের ১ কোটি ১১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সারা দেশে এই রিপোর্টটি নিয়ে তোলপাড় চলছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মা’ল আবদুল মুহিতসহ শীর্ষস্থানীয় সরকারি মন্ত্রীরা রিপোর্টটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন যে, সোনা ঠিকই আছে তবে হিসাবের ক্ষেত্রে কিছু Clarical mistake আছে। সরকার অভিযুক্ত কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অদ্যাবধি কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত একটি সরকারের পক্ষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আশা একটি দূরাশামাত্র। আবার সেই সরকার যদি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার হয়!
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে এর আগেও কেলেঙ্কারি হয়েছিল। অভিনব কায়দায় তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ ভল্ট থেকে বৈদেশিক মুদ্রা চুরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এর কোনও তদন্ত হয়নি, বিচার হবেই বা কেমন করে? যারা চুরি করেছেন তারা হয় সরকারের লোক অথবা পাহারা দিয়ে সরকারকে টিকিয়ে রাখছেন। আবার সোনা কেলেঙ্কারি তো এই সরকারের জন্য প্রথম নয়। তারা ক্ষমতায় এসে বিদেশে তাদের কিছু সমর্থক সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে ভূমিকা’ রাখার নামে বেশ কিছু ব্যক্তি ও সংগঠনকে সোনার পদকে ভূষিত করেছিল। কিন্তু পরে দেখা গেল যে, সোনার মেডেলগুলো আসলে সোনার তৈরি নয়, ব্রঞ্জের। এর সাথে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের জাদরেল কর্মকর্তারাসহ সরকারের অনেক রথি-মহারথিও জড়িত ছিল। এই কেলেঙ্কারির কোনও তদন্ত হয়নি, বিচার হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আওয়ামী লীগের কাছে এই ব্যাংকটি সোনার ডিম পাড়া একটি হাঁসের মত। স্বাধীনতার সূচনালগ্নে এর পূর্বসূরী স্টেট ব্যাংক অফ পাকিস্তান লুট হয়েছিল। ঢাকায় এর সদর দফতর এবং বিভাগীয় দফতরসমূহ থেকে লুট করা হাজার হাজার কোটি টাকা যারা লুট করেছিলেন সেই অভিযুক্ত আওয়ামী নেতারা স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ঐ টাকা বাংলাদেশ সরকারের তহবিলে জমা দেননি, আত্মসাৎ করে বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছেন। তাদের অনেকেই সেই স্বাদ এখনো ভুলে যাননি। তারা এখন ক্ষমতায় এসে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টই শুধু নয় সরকারি বেসরকারি সকল তফসীলি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং অর্থ প্রতিষ্ঠানই এখন তাদের হাতে লুটপাটের কেন্দ্রস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। নামে বেনামে লক্ষাধিক কোটি খেলাপী ঋণ এবং সাড়ে ছয় লক্ষ কোটি টাকার তহবিল বিদেশে পাচার এখন আমাদের ব্যাংকিং খাতের বেশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ থেকে অব্যাহতি পেতে হলে লুটেরাদের অপসারণ এবং জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা প্রত্যর্পণ ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই।
[দুই]
গত সপ্তাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর ছিল বড় পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বন্ধ ঘোষণা। ২২ জুলাই কেন্দ্রটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কয়লার অভাবে কেন্দ্রটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট রয়েছে এবং এর প্রতিটি ইউনিটই বড় পুকুরিয়া কয়লা খনির কয়লা দিয়ে চলে। এর প্রথম ইউনিটটি কয়লার অভাবে এই মাসের শুরুতে এবং একই কারণে দ্বিতীয়টি এই মাসের মাঝামাঝি বন্ধ হয়ে যায়। তৃতীয় ইউনিটটিও বন্ধ হবার ফলে সমগ্র তাপ বিদ্যুৎ উৎপাদনই বন্ধ হয়ে গেল। বড় পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ৫২৫ মেগাওয়াট হলেও সাম্প্রতিককালে এই ক্ষমতা ৩৮০ মেঘা ওয়াটে নেমে এসেছে। খনিতে উত্তোলিত কয়লার পরিমাণ হ্রাস পাওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বলাবাহুল্য, অভিযোগ অনুযায়ী কয়লা খনির মওজতু থেকে ১.৪৫ লক্ষ টন কয়লা গায়েব হবার ফলে এই সংকট দেখা দিয়েছে। এই দুর্নীতির বিষয়টি জানাজানি হবার পর সরকারের তরফ থেকে অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনার যে উদ্যোগ দরকার ছিল তা লক্ষ্য করা যায় নি। জ্বালানি মন্ত্রী বলেছেন যে এতে সমস্যা হবে না। তারা বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু করবেন। প্রশ্ন এখানেই। বড় পুকুরিয়া কয়লা খনিতে করলা থাকা সত্ত্বেও কেন কয়লা আমদানি করতে হবে? গায়েব হওয়া দেড় লাখ টন কয়লার হদিস এখনো পাওয়া যায়নি। সরকারের তরফ থেকে সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা ও ৪ জনের বিদেশ যাত্রার উপর দুদক নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও দেখা গেছে যে সরকার হজ্বের অজুহাতে একজনের অনুকূলে Go ইস্যু করেছেন। পরস্পর বিরোধী এই আদেশ কি অর্থ বহন করে? গায়েব হওয়া কয়লা উদ্ধার এবং খনির উৎপাদন শুরু ও বৃদ্ধি না করে বিদেশ থেকে আমদানির উৎসাহ পরিস্কার।
বড় পুকুরিয়ার কয়লা উত্তোলন শুরু থেকেই দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের কবলে পড়েছিল। এই খনির কয়লার মান এই মহাদেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, আমাদের প্রতিবেশী দেশটি এই কয়লা উত্তোলনের পক্ষে ছিল না। তথাপিও খনিটি চালু হয়েছে এবং বিভিন্নভাবে বিভিন্ন মহল থেকে এর কাজ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। তাদের কয়লা রফতানি হ্রাস পেয়েছে, আমাদের আমদানিও হ্রাস পেয়েছে। আমাদের দেশে সরকারের অনেকেই আমদানির পক্ষে কেন না এতে পার্সেন্টেজ পাওয়া যায়। বড় পুকুরিয়ায় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারলে বিশেষ মহলের সুবিধা হয়, কয়লা খনির এলাকার স্থাপিত কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কয়লার অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। যত দূর খবর পাওয়া গেছে, ২০০৬ সালের পর থেকে বড় পুকুরিয়া কয়লা খনিতে কোনও Stock taking হয়নি। অথচ যে কোনও শিল্প-কারখানায় বা খনিতে প্রতি বছর বছর সমাপনিতে Stock taking অপরিহার্য, বার্ষিক সমাপণী মওজুত নির্ণয় না করে বড় পুকুরিয়ায় ১.৪৫ লক্ষ টন কয়লা গায়েব হয়েছে না ১৪৫ লক্ষ টন গায়েব হয়েছে তা বলা মুশকিল, কেননা তাদের ভিত্তি উপাত্তই নেই। এই আত্মসাৎ আরো বড় হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। এই অবস্থায় বৃহত্তর তদন্তের ব্যবস্থা করার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। সাথে সাথে সরকারি ব্যবস্থাপনা ও মালিকানায় যত শিল্প কারখানা আছে সবগুলোর কাঁচামাল ও পণ্য মওজুত যাচাই করা দরকার বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। কেননা এই সরকারের হাতে কোন কিছুই নিরাপদ নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ