ঢাকা, মঙ্গলবার 31 July 2018, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রবাসে বাংলাদেশীদের সামাজিক অবস্থা

আখতার হামিদ খান : [চার]
নিভুপ্রায় আশার বাতি : বাংলাদেশের বাইরে আরো দুটো মিনি বাংলাদেশ আছে। একটি লন্ডনে, অপরটি নিউইয়র্কে। এই দুই মহানগরীতে বাংলাদেশী সম্প্রদায় নিজেদের অস্তিত্ব, পরিচিতি এবং সংষ্কৃতির দীর্ঘ শেকড় বিস্তৃত করেছে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পূর্ব লন্ডনের ২২.৬% অধিবাসীই ছিলেন বাংলাদেশী। একদশকে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে কতো দাঁড়িয়েছে তা জানা যাবে চলতি বছরের আদমশুমারি সম্পন্ন হবার পর। গত বছরের প্রথমদিকে পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের শিক্ষা বিভাগের এক জরিপে বলা হয়, আগামী ২০০২ সালে এ অঞ্চলের প্রাইমারী স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের প্রায় ৫৭% হবে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত। ‘বৃটেনের বাংলাদেশ’ বলে পরিচিত পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের বর্তমান জনসংখ্যার প্রায় ৪০% বাংলাদেশী। অর্থাৎ ৫০ হাজার বাংলাদেশী এখানে বসবাস করেন। নিউইয়র্কে মিনি বাংলাদেশে রয়েছে একটি বিশাল বাংলাদেশী জনগোষ্ঠী। এদের সংখ্যা এখন এক লাখের কোঠায়। গত একদশকে ওপি এবং ডিভি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচুর বাংলাদেশী আমেরিকায় এসেছেন। এদের অধিকাংশই নিউইয়র্কে গড়ে তুলেছেন স্থায়ী ঠিকানা। প্রতিটি সচেতন বাংলাদেশী অভিভাবক মনেপ্রাণে প্রত্যাশা করেন, ‘এখানে আমরা যেভাবে থাকি না কেন, সন্তানদের মনেপ্রাণে বাংলাদেশী হিসেবে গড়ে তুলবো। দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি তারা যেন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ থেকে বিচ্যুত না হয়। মিশ্র ও অবাধ সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে আমাদের সন্তানরা যেন মূলধারা থেকে সব সরে না যায়।’
এ ধরনের মানসিক ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশীরা লন্ডন ও নিউইয়র্কে শত শত বাংলা শিক্ষা স্কুল, মসজিদ, কম্যুনিটি সেন্টার স্থাপন করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মূল ¯্রােতমুখী করার জন্য ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় দীক্ষার নিরন্তন প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সেখানকার মসজিদগুলোতে ইসলামী তাহজীব, তামদ্দুন ও নামাজ শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানকার মসজিদগুলো শুধুমাত্র নামাজ আদায়ের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়। নামাজ শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী কায়দা-কানুন, ঐতিহ্য, রীতিনীতি, বৈশিষ্ট্য, মূল্যবোধ, দর্শন, ভাবধারা নিয়েও নিয়মিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আপন সংস্কৃতি বৈশিষ্ট্যে ও দেশমুখী ভাবনা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। লন্ডনে ও নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শহীদ মিনার। বাংলা ভাষায় সেখানে একাধিক নিয়মিত সংবাদপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। কম্যুনিটির খবর ছাড়াও দেশের সার্বিক অবস্থা, সাহিত্য-সংস্কৃতির সংবাদ, ধর্মীয় ঐতিহ্য-চেতনা নিয়ে তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে সেখানে। চালু করা হয়েছে বাংলা ভাষায় নিজস্ব রেডিও স্টেশন, টিভি চ্যানেল। ঘটা করে পালিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখ, নাট্যোৎসব। কবিতা পাঠের আসর বসছে নিয়মিত। সাহিত্য চর্চা চলছে। গানের অনুষ্ঠান, ফ্যাশন শো হচ্ছে। প্রায় প্রতিমাসেই লন্ডন ও নিউইয়র্কে বাংলাদেশী শিল্পীরা দলবেঁধে গিয়ে মাতিয়ে আসছেন প্রবাসীদের। সিনেমা-টিভির পারফরমাররা ছুটছেন। হুমায়ূন-মিলনদের মতো জনপ্রিয় লেখকদের মাঝে মাঝে কাছে টেনে নিচ্ছেন। ঢাকার টিভিতে যে কোনো ভালো ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রচার হবার মাত্র দু’দিন পর ক্যাসেট পাওয়া যাচ্ছে লন্ডন-নিউইয়র্কের ভিডিও বাজারে। অডিও দোকানে সাঈদীর ওয়াজের ক্যাসেটের পাশাপাশি জেমস, বাচ্চু কিংবা বেবীর গানও পাওয়া যায় হাত বাড়ালে। আছে পান-সুপারি থেকে শুরু করে দেশ থেকে আনা কচুর লতি, পুঁইশাক, কাঁচকি, পুটি, রুই-কী নেই দোকানে। দেশের বাজারে দেখা সব ধরনের শাকসবজি, মাছ ওখানকার বাজারে বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক সত্তা এবং জাতিগত বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য উত্তরসূরিদের মাঝে প্রবাহিত রাখার কোনো ধরনের কার্পণ্য নেই সচেতন প্রবাসীদের। এতসব করেও কুল রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পশ্চিমা সংস্কৃতির দোর্দ- প্রতাপে সব আয়োজন যেন ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। উদার সমাজ ব্যবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত স্বপ্নভঙ্গের হতাশায় আক্রান্ত হচ্ছেন অসংখ্য প্রবাসী। ‘সব পাবার’ দেশে বাস করেও অনেক অভিভাবকের মুখ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে সন্তানদের পরিণতি দেখে। বাংলাদেশী তরুণ সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। এক তথ্যে দেখা গেছে, লন্ডনে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের প্রায় অর্ধেকের বেশি অংশের বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছর। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ বয়সীদের একটি বিরাট অংশ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। এরা অভ্যস্ত হয়ে উঠছে ছিনতাই, ডাকাতি, রাহাঁভনি, গ্যাং ফাইটে। সঙ্গে আছে ড্রাগের নেশা। লেখাপড়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এসব প্রবাসী তরুণরা দলবেঁধে মারাত্মক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এদের কানে থাকে দুল, অদ্ভূত চুলের কাটিং, গলায় চেন, হাতে ব্রেসলেট। হেলেদুলে হাঁটে। কথা বলে সাংকেতিক ভাষায়। বিকৃত ও অপসংস্কৃতির ধারক হয়ে এরা বেড়ে উঠছে। অভিভাবকরা নিরূপায়। ফেরানোর ক্ষমতা তাদের নেই। এসব তরুণদের প্রায় সবাই ড্রাগে আসক্ত। নেশার অর্থ যোগানের জন্য তারা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানিতে লিপ্ত হচ্ছে। জড়িয়ে পড়ছে নারী ঘটিত অপরাধেও। পুলিশের ওয়ান্টেড লিস্টে উঠে আছে অনেক বাংলাদেশী তরুণের নাম-ঠিকানা, ছবি। অনেক সময় এরা মারাত্মক অপরাধের দায় মাথায় নিয়ে কৌশলে পালিয়ে আসছে দেশে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘সুরমা’ পত্রিকার এক রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশী অনুষ্ঠিত পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে ড্রাগের জন্য চিকিৎসা গ্রহণকারী শতকরা ৬৯ জন বাংলাদেশী। এদের বয়স ২৫ বছরের নিচে। ড্রাগ গ্রহণের দায়ে আটকদের শতকরা ৮৩ জনই বাংলাদেশী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, এখানে ড্রাগের জন্য চিকিৎসা গ্রহণকারী শতকরা ১৯ জনই বাংলাদেশী মেয়ে।
শুধুই আঁধার নয় : প্রবাসী অথবা প্রবাসজীবনের সবটুকুই আতংক-হতাশার নয়। ইতিবাচক ক্ষেত্রটি আরো অনেক বড়। গুরুত্বও অপরিমেয়। এ দেশের অসংখ্য মেধাবী ও কৃতী সন্তান এখন মিনি বাংলাদেশের অধিবাসী। এদের অনেকেই পশ্চিমা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ পদ ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। দেশের কল্যাণ ভাবনায় তারা তাড়িত হন। অধিকাংশ প্রবাসীই কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্থোপার্জন এবং সুস্থ জীবনধারা অব্যাহত রেখেছেন। ধরে রেখেছেন আপন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। তার চাইতেও বড় কথা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি গতিশীল করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে প্রবাসীদের। নীরবে-নিভৃতে দেশের চেহারাও বদলে দিয়েছেন তারা। এখন দেশে এমন কোনো গ্রাম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যে গ্রামের দু’চারজন বিদেশে নেই। এদের বাড়িঘর, আচার-আচরণের চাকচিক্য দেখে খুব সহজে চেনা যায়। এখনো বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের সবচেয়ে বড় খাতটি হচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিটেন্স। জাতীয় বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রতি মুহূর্তের অর্থপ্রবাহ গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে এই রেমিটেন্স একটি শক্তিশালী বন্ধনী হিসেবে কাজ করছে। গত পঁচিশ বছরে প্রবাসীরা বৈধপথে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়েছেন।
এই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হলে এতদিনে দেশের চেহারা হতো অন্যরকম। বহুবিধ কারণে তা হয়নি। প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই এর অন্যতম কারণ। দাতা ও সাহায্য সংস্থা এবং এনজিওগুলো সর্বক্ষেত্রে যেভাবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে দেশটিকে ঋণ-নির্ভর করে তুলছে, প্রবাসীদের ক্ষেত্রে তার সিকিভাগ পরিমাণ পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে আগামী প্রজন্মের জন্য ঋণ বোঝার আগাম অভিশাপ খুব সহজে এড়ানো যেত। কিছুদিন আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বৈদেশিক সাহায্য, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ, রেমিটেন্স ও প্রবাসী বাংলাদেশী শীর্ষক এক কর্মশালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ আশরাফ আলী এ মন্তব্য করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সরকারি জটিলতার কারণে শুধুমাত্র গত অর্থবছরে হুন্ডির মাধ্যমে সাড়ে চারশ কোটি টাকার রেমিটেন্স দেশে এসেছে। এই অংক বৈধপথে পাঠানো অর্থের এক-চতুর্থাংশ। জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান এবং অসুখের চিত্র এর চাইতে স্পষ্ট আর কী-ই বা হতে পারে? [সমাপ্ত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ