ঢাকা, বুধবার 1 August 2018, ১৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস : সকল প্রকার সিগারেটের ওপর সরকারের ভ্যাট আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রজ্ঞাপণের আদেশ লংঘন করে গত ৫৫ দিনে সিগারেটের পরিবেশকরা রংপুরে সরকারি রাজস্বের প্রায় ২০ কোটির বেশি টাকা অতিরিক্ত আদায়ের মাধ্যমে আত্মসাৎ এর চাঞ্চ্যল্যকর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ব্রিটিশ-আমেরিকান টোবাকো কোম্পানি বিটিসির রংপুরের পরিবেশক “শাইরিন এন্টারপ্রাইজ” এবং আবুল খায়ের টোবাকোর পরিবেশক “মের্সাস নুরুল ইসলাম এ- সন্স” এর বিরুদ্ধে রংপুর অঞ্চলের ১২ হাজার ক্ষুদ্র খিলিপান ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
প্রাপ্ত অভিযোগে জানা গেছে, সরকার চলতি অর্থ বছরে “বেনসন, গোল্ডলিফ, ডারবি, ষ্টার, মেরিজসহ  সকল ব্রা-ের সিগারেটের খুচরা মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে সকল ক্ষেত্রে উৎপাদন এবং পরিবেশন কারীগণকে সংশোধিত মূল্য অনুযায়ী ৭ জুন’১৮ থেকে  মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শূল্ক নির্ধারণ করে সিগারেটের প্যাকেটে সীল দ্বারা নতুন খুচরা মূল্য মূদ্রণ করে বিক্রির আদেশ প্রদান করা হয়। এর প্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গত ৭ জুন ২০১৮ তারিখ জারিকৃত এক প্রঞ্জাপনের মাধ্যমে সাধারণ আদেশ নম্বর -০৭/মূসক/২০১৮ এর ২ নম্বর ধারায় “খ” নম্বর উপ আদেশের মাধ্যমে বলা হয় “৭ জুন’২০১৮ তারিখ বা তার পরে সরবরাহ করা সকল প্রকার তামাক যুক্ত সিগারেটের ক্ষেত্রে (পূর্বে উৎপাদিত ও মজুদ সহ) নতুন মুল্যস্তর অনুযায়ী শুল্ক কর আদায় নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য ৭ ই জুন’২০১৮ তারিখের পূর্বে  উৎপাদিত সিগারেটের প্যাকেটে সীল দ্বারা নতুন খুচরা মূল্য মূদ্রণ করে তা বাজারজাত করতে হবে।” এছাড়া একই ধারায় “চ” নম্বর উপ আদেশের  মাধ্যমে বলা হয়েছে, “সিগারেটের নতুন মূল্যস্তর ও সম্পূরক শূল্ক হার কার্যকর হওয়ায় তা যথাযথ পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে প্রত্যেক মূসক কমিশনারেটের কমিশনারগণকে এ ব্যাপারে বর্ণিত পদ্ধতির বাস্তবায়ন বিষয়ে নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশ জারি ও তত্ত্বাবধান করতে বলা হয়েছে। একই সাথে ৬ জুন পর্যন্ত সকল সিগারেটেরে মজুদ ও সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে”। অর্থাৎ এ বছর ৭ জুন থেকে বাজারজাতকৃত সকল সিগারেটের পণ্যে বর্ধিত মূল্য বাধ্যতা মূলকভাবে সংযোজন করতে হবে।
 প্রাপ্ত অভিযোগে জানা গেছে, বিটিসি এবং আবুল খায়ের টোবাকোর রংপুরের পরিবেশক জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর এই আদেশকে গত প্রায় ২ মাস ধরে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রর্দশন করে সরকারি রাজস্ব বেপরোয়া ভাবে ফাঁকি দিয়ে চলেছেন। তাঁরা  রংপুর অঞ্চলের কাষ্টমস, এক্সাইজ  এন্ড ভ্যাট এর মূসক কমিশনারেটের কমিশনার এর নাকের ডগায় রহস্যজনক ভাবে সিগারেটের প্যাকেটে সীল দ্বারা নতুন খুচরা মূল্য মূদ্রণ না করে এবং সরকারের নিকট নতুন কর পরিশোধ না করেই পূর্বের রেটে রংপুর অঞ্চলের ক্ষুদ্র খিলিপান ব্যবসায়ীদের জিম্মি বানিয়ে তাঁদের নিকট থেকে সকল ব্রান্ডের সিগারেটে প্রতি প্যাকেটে গত ৩০ জুন  এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত অতিরিক্ত ৮ টাকা করে আদায় করছেন।  এ ভাবে “শাইরিন এন্টারপ্রাইজ ও মের্সাস নুরুল ইসলাম এ- সন্স” রংপুর অঞ্চলে তাঁদের প্রায় ১২ হাজার ক্ষুদ্র খিলিপান ব্যবসায়ীদের নিকট সকল ব্রান্ডের প্রতি প্যাকেট সিগারেটের জন্য অতিরিক্ত ৮ টাকা হারে আদায় করে গত ৫৫ দিন  ধরে অনৈতিক ভাবে সে সব নির্বিঘ্নে মহা আনন্দে বাজারজাত করছেন। এতে প্রত্যেক ক্ষুদ্র খিলিপান ব্যবসায়ীদের নিকট প্রতিদিন বিক্রিত প্রতি প্যাকেট সিগারেটের বিপরীতে অতিরিক্ত ৮ টাকা হারে গড়ে নূন্যতম ৩০০ টাকা করে অতিরিক্ত আদায় করছেন। এতে তাঁদের প্রতিদিন গড়ে নূন্যতম ৩৬ লাখের বেশি টাকা অতিরিক্ত আদায় হয় বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। রংপুরের কাষ্টমস, এক্সাইজ  এন্ড ভ্যাট এর মূসক কমিশনারেটের কমিশনার কার্যালয়ের রহস্য জনক নিরবতার সুযোগে তাঁরা এই পরিমাণ টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে  বাঁধাহনি ভাবে আতœসাৎ করছেন। এ ভাবে গত ৫৫ দিনে সিগারেটের পরিবেশকগণ রংপুর অঞ্চলে ২০ কোটিরও বেশী টাকা সরকারী রাজস্বের অর্থ ফাঁকি দিয়ে সে অর্থ তাঁরা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে ক্ষুদ্র খিলিপান ব্যবসায়ীদের উপর জুলুম করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে তা আতœসাৎ করার প্রতিবাদে রংপুর জেলা ক্ষুদ্র খিলিপান ব্যবসায়ী সমিতি এবং ক্ষুদ্র খিলিপান ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে পৃথক ভাবে পরিবেশকগণের বিরুদ্ধে রংপুরের জেলা প্রশাসক এবং ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের উপ পরিচালকের নিকট  লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। 
এ ব্যাপারে রংপুর জেলা ক্ষুদ্র খিলিপান ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম-আহবায়ক আহসান হাবিব ও আক্কাছ আলী  সাংবাদিকদের নিকট দুঃখ করে জানান, ১৯৮২ সাল থেকে ৩২ টাকা মূল্যের প্রতি প্যাকেট সিগারেটে মুনাফা করতাম ৮ টাকা। এখন ১৪৮ টাকা মূল্যের প্রতি প্যাকেট সিগারেটেও ঐ ৮ টাকা মুনাফা দেয়া হয়। এর পরও কোম্পানীর পরিবেশক সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকা আতœসাৎ করায় আমরা এর প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ করেছি।
এ ব্যাপারে রংপুরের কাষ্টমস, এক্সাইজ  এন্ড ভ্যাট এর মূসক কমিশনারেটের কমিশনার আহসানুল হক এর দপ্তরে যোগাযোগ করলে তিনি ছুটিতে দেশের বাইরে রয়েছেন বলে জানানো হয়। তবে একই দপ্তরের  অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল মান্নান সর্দার এর কাছে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কমিশনারের অর্বতমানে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ ব্যাপারে রংপুর অঞ্চলের কমিশনার এর অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা রাজশাহী অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাষ্টমস, এক্সাইজ এন্ড ভ্যাট এর মূসক কমিশনারেটের কমিশনার মোয়াজ্জেম হোসেনের এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টি দৃস্টি আকর্ষণ করার জন্য ধন্যবাদ  জানিয়ে বলেন, “ডিপার্টমেন্টে আমার সুনাম রয়েছে। আমি প্রশ্রয় দেয়ার লোক না। বিষয়টি আমি দেখবো”।
এ ব্যাপারে  শাইরিন এন্টারপ্রাইজ রংপুর অঞ্চলের পরিবেশক নাদিম  এর সাথে যোগাযোগ করে তাকে না পেয়ে ঐ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার শোয়েবের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, “সরকারি আদেশ সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না”। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয় তাহ'লে ৭ই জুন থেকে ক্ষুদ্র খিলিপান ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে প্রতি প্যাকেট সিগারেটে অতিরিক্ত ৮ টাকা করে কেন আদায় করছেন এর কোনো সন্তোষজনক জবাব তিনি দিতে পারেননি। এ ব্যাপারে “মের্সাস নুরুল ইসলাম এ- সন্স” এর পরিবেশকের মুঠো ফোন বন্দ পেয়ে একজন টিএসওর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, আমরা এসব ব্যাপারে কিছু জানিনা। সব হেড অফিস জানে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ