ঢাকা, বুধবার 1 August 2018, ১৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দ্য গার্ডিয়ানকে ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা জানালেন তামিমি

৩১ জুলাই দ্য গার্ডিয়ান : সদ্য কারামুক্ত ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতীকী ব্যক্তিত্ব আহেদ তামিমি জানিয়েছেন, কারাবন্দী থাকা অবস্থায় অপরাপর ফিলিস্তিনী নারীকে সঙ্গে নিয়ে জেলখানাকে বিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, নির্জন কারাকক্ষে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ক বইপত্র পড়েছেন তারা। ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে তামিমি জানিয়েছেন, একজন যোগ্য আইনজীবী হতে চান তিনি। ইসরায়েলী দখলদারিত্বের কারণে সৃষ্ট ফিলিস্তিনীদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরতে চান আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ইসরায়েলী দখলদারিত্বের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সেনাদের গালে থাপ্পড় মেরে ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ আন্দোলনের জীবন্ত প্রতীকে পরিণত হন তামিমি। তাকে গ্রেফতারের পর ইসরায়েলের কারাগারে নেওয়া হয়। মার্চে সামরিক আদালতে তার বিরুদ্ধে ঘোষিত হয় জরিমানাসহ আট মাসের কারাদ-। সে হিসেবে ১৯ ডিসেম্বর থেকে কারাগারে থাকা তামিমির মুক্তি পাওয়ার কথা ১৯ আগস্ট। তবে বিশেষ মূল্যায়নে ইসরাইলী কারা কর্তৃপক্ষ কারও কারা মেয়াদ কমিয়ে আনতে পারেন। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গতকাল ২৯ জুলাই রবিবার তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

মুক্তির একদিন পর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তামিমি জানিয়েছেন, জেলে বন্দী অবস্থায় কাটানো ৮ মাস তিনি আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে পড়ার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। তামিমির আশা, একদিন তিনি আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মামলা লড়তে পারবেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ইনশা আল্লাহ, আমি আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করবো।  দখলীকৃত পশ্চিম তীরের নবী সালেহ গ্রামে বসে গার্ডিয়ানের সংবাদকর্মী অলিভার হোলমস ও সুফিয়ান তাহাকে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আমি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিষয়টি উপস্থাপন করবো। ইসরায়েলের বিচার ও আমার দেশের অধিকার ফিরে পেতে আমি নামকরা আইনজীবী হবো।’

স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে ইসরায়েলী কারাগারে তিন শতাধিক ফিলিস্তিনী শিশু রয়েছে। কিন্তু আহেদ তামিমির মামলাটি বেশি আলোচিত হয়েছে। আহেদ বলেন, এর আগে তিনি পেশাদার ফুটবলার জন্য প্রশিক্ষণ নিতেন। কিন্তু জেলখানায় তার অভিজ্ঞতা তাকে আন্তর্জাতিক আইনজীবী হওয়ার আকাক্সক্ষা তৈরিতে সাহায্য করেছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে তামিমি তার জিজ্ঞাসাবাদের সময় ইসরায়েলি বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত সহিংসতার কথা বলেন। জানান, পড়াশোনা করেই তিনি জানতে পেরেছেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এরইমধ্যে তামিমির পরিবার জানিয়েছে, তাদের মেয়ে বিদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য স্কলারশিপের প্রস্তাব পেয়েছে। প্রস্তাবটি বিবেচনায় রেখেছে তামিমি।

উল্লেখ্য, ফিলিস্তিনি সরকার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অভিযোগ দাখিল করছে। এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সরকারের একটি ব্যবস্থা জাতিবিদ্বেষের শামিল। ইসরায়েল এসব অভিযোগ কঠোরভাবে নাকচ করে আসছে।

আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা

নিজেকে ইসরায়েলী দখলদারিত্বের নির্মম শিকার হিসেবে দেখতে চান না সদ্য ইসরায়েলী কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনী বীরকন্যা আহেদ তামিমি। তিনি মনে করেন, ইসরায়েলী দখলদারিত্বের নির্মম শিকার সেখানকার ইহুদি শিশু-কিশোররা; যারা ভুল-ঠিকের পার্থক্য ভুলে বন্দুক আর ঘৃণা নিয়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে লড়ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলী বঞ্চনার বিরুদ্ধে নিজের লড়াইকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ আখ্যা দিয়েছেন তামিমি। বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধারা ভুক্তভোগী হতে পারে না।

মুক্তির একদিন পর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তামিমি বলেন, ‘ইসরায়েলি দখলদারিত্ব আমাকে ভুক্তভোগী বানাতে পারেনি। এই দখলদারিত্ব ভুক্তভোগী বানিয়েছে ইহুদি শিশুদেরকে, যারা ১৫ বছর বয়সেই অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করতে বাধ্য হয়। আমার কথা বললে, আমিতো ঠিক-ভুলের পার্থক্য করতে পারি। তারা পারে না। তাদের চিন্তা ধোয়াচ্ছন্ন। তাদের হৃদয় ফিলিস্তিনের প্রতি ঘৃণা আর অবজ্ঞায় পরিপূর্ণ। তারা ভুক্তভোগী, আমি নই। আমি সব সময় বলি, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার ভুক্তভোগী হওয়ার কিছু নেই।’

নবী সালেহ গ্রামটি তামিমির জ্ঞাতি-গোষ্ঠীতেই ভরা। ঐতিহ্যগতভাবেই ইসরায়েলী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সরব এই গ্রাম। তামিমির ১৭ বছরের জীবনেও ইসরায়েলবিরোধী প্রতিরোধের বহু নজির রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই কখনও ইসরায়েলী সেনাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি বা অপমান করার বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও এখন সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে। আহেদ বলেন, গ্রেফতার হওয়ার অভিজ্ঞতা খুবই কঠিন। আমি যতই চেষ্টা করি এটা বর্ণনা করতে পারব না। তবে তিনি বলেন, এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনকে মূল্যবান করেছে। হতে পারে এটা আমাকে আরও পরিণত করেছে। আরও সচেতন করেছে। ইসরায়েলী আদালতে রুদ্ধদ্বার বিচার হয়েছে তামিমির। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ইসরায়েলী পুরুষ তদন্তকারী ১৬ বছর বয়সী তামিমিকে হুমকি দিচ্ছে। তার শরীর ও চোখ নিয়ে মন্তব্য করছে। এরপরই আটক অবস্থায় তার প্রতি ইসরায়েলের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। আহেদ বলেন, তার সঙ্গে করা আচরণ অস্বাভাবিক ছিল না। তিনি বলেন, এটা প্রথম ঘটনা নয়, আর এটা কাকতালীয়ও নয়। এটাই তাদের জিজ্ঞাসাবাদের রীতি।

এখন আহেদ তামিমি কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতে চান। এছাড়া তার পরবর্তী করণীয় সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত নিতে তার সময় প্রয়োজন। মুক্তির আনন্দের কথা বলতে গিয়ে তামিমি বলেন, ‘অবশেষে আমি মুক্ত আকাশ  পেয়েছি। রাস্তায় হাঁটতে পারছি হাতকড়া ছাড়াই। চাঁদ দেখছি, তারা দেখছি। অনেকদিন এসব দেখা হয়নি।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ