ঢাকা, বুধবার 1 August 2018, ১৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

তামাশা ও ভোট ডাকাতির নির্বাচন ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান

গতকাল মঙ্গলবার নয়াপল্টন বিএনপি কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

# দুই সিটিতে পুনরায় ভোট দাবি ॥ বৃহস্পতিবার সারাদেশে বিক্ষোভ
স্টাফ রিপোর্টার: ভোটের দিন বিকেলে তিন সিটির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলেও একদিন পর গতকাল মঙ্গলবার শুধুমাত্র রাজশাহী ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। এই দুই সিটিতে ভোট ডাকাতির প্রতিবাদে আগামী বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী প্রতিবাদ বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, জনগণ তিন সিটি নির্বাচনে সরকারি দলের সীমাহীন ভোট কারচুপি ও জবরদখল দেখেছে। এই সরকার এবং নির্বাচন কমশিন আবারও প্রমাণ করেছে, তাদের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না।
সাংবাদিক সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আহমদ আজম খান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, আমান উল্লাহ আমান, আবদুল হাই, সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, বিএনপি নেতা নাজিম উদ্দিন আলম প্রমুখ।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা রাজশাহী ও বরিশালের ভোটের ফলাফল ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। কারণ, এটা কোনো নির্বাচনই হয়নি। ভোট চুরি নয়, ডাকাতি প্রতিফলিত হয়েছে। সেখানে পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি। ভোট কারচুপির প্রতিবাদে আগামী বৃহস্পতিবার সারাদেশের জেলা ও মহানগরে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করা হবে। এ সময় তিনি দাবি করেন, সিলেটেও ব্যাপক ভোট কারচুপি হয়েছে। তা নাহলে আরিফুল হক লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হতেন।
উল্লেখ্য, গতকাল সোমবার বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ করা হয়। ভোট শুরুর কয়েক ঘণ্টা পরই বরিশালে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরওয়ার ভোট বর্জন করেন। পরে দিন শেষে এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ১ লাখ ৯ হাজার ৮০১ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। সরওয়ার পেয়েছেন ১৩ হাজার ৪১ ভোট। অন্যদিকে রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৯৪ ভোট পেয়ে মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছেন। এখানে বিএনপির প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল পেয়েছেন ৭৮ হাজার ৪৯২ ভোট।
তবে সিলেটে বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক এগিয়ে ছিলেন। সংঘাতের কারণে দুটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছে। তবে ১৩২ কেন্দ্রের ভোটে বিএনপির আরিফুল হক পেয়েছেন ৯০ হাজার ৪৯৬ ভোট। বিপরীতে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের বদরউদ্দিন আহমদ কামরান পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৮৭০ ভোট। অর্থাৎ ৪ হাজার ৬২৬ ভোটে এগিয়ে আছেন আরিফুল হক। আর স্থগিত হওয়া দুটি কেন্দ্রের ভোটের সংখ্যা ৪ হাজার ৭৮৭ ভোট। যদিও গতকাল ভোট চলাকালে সিলেটে ধানের শীষের প্রার্থী আরিফুল হক ভোট কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেন। একইসাথে তিনি বলেছেন, ফলাফল যাই হোক না কেন তিনি  নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করবেন। এছাড়া গতকাল বিকেলে নির্বাচন শেষে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, তিন সিটির কোনটিতেই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। সিলেটে ৯৫ শতাংশ কেন্দ্রই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দখলে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। দলের পক্ষ থেকে তিনি তিন সিটির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেন। এই ঘোষণার কয়েকঘন্টা পরে বিএনপি ও মেয়র প্রার্থী আরিফুল নিজেই ইউটার্ণ নিয়েছেন। দল বলেছে, সিলেটে সমস্যা হয়েছে সামাণ্য। সেখানে নাকি দলের নেতাকর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। অথচ কোথাও বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেখা যায়নি।
সিলেট সিটি নির্বাচন বিষয়ে বিএনপির মতামত জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সিলেটের ফলাফল ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে বিএনপির নেতা-কর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছিলেন বলেই আওয়ামী লীগ জয় ছিনিয়ে নিতে পারেনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, তিন সিটির নির্বাচনে আমাদের কথাই সত্য প্রমাণিত হলো-শেখ হাসিনার অবৈধ সরকারের অধীনে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু ও অবাধ হতে পারে না। প্রমাণিত হলো এই অযোগ্য নির্বাচন কমিশিনের পরিচালনায় কোন নির্বাচনেই জনগণের রায়ের প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব নয়। গাজীপুর ও খুলনার মতো এই তিনটি সিটি কর্পোরেশনে ভোট চুরি বা কারচুপি নয়, ভোট ডাকাতির মহোৎসব অনুষ্ঠিত হলো। বিরোধী দলগুলোর প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ নয়, প্রতিপক্ষ এই অবৈধ সরকারের প্রশাসন এবং অযোগ্য নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচন কমিশন পুলিশের মতোই আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের জয়ী করার জন্য নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে। শুধু নির্বাচনের দিনে নয়, সিডিউল ঘোষণার দিন থেকেই পুলিশের বিশেষ স্কোয়াড মাঠে নেমেছে। মিথ্যা মামলা, গ্রেফতার, হয়রানি, হুমকি ও ভয় দেখিয়ে বিরোধী দলের কর্মীদের নির্বাচনী প্রচারণা থেকে দূরে রাখা, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব আইন ভঙ্গ, শত শত অভিযোগে কোনও কর্ণপাত না করে আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন গোটা নির্বাচন ব্যবস্থাকে আবারও ধ্বংস করলো। এই নির্বাচন কমিশন গঠনের পর থেকেই আমরা বলে এসেছি-এই কমিশন আওয়ামী লীগের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট এবং অযোগ্য। তারা আচরণ বিধি ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশের নির্যাতন বন্ধ করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশ মানতে পুলিশকে বাধ্য করতে পারেনি। বরিশালে কয়েকদিন আগে থেকেই বাইরে থেকে হাজার হাজার আওয়ামী কর্মী জড়ো করা হয়েছিল- কেন্দ্রগুলো থেকে বিএনপি‘র এজেন্টদেরকে বের করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার অবৈধ সরকার গণতন্ত্রকে সম্পূণরূপে ধ্বংস করছে। জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করছে। লক্ষ্য একটি-একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ভিন্নরূপে প্রতিষ্ঠা করে চিরদিন ক্ষমতায় থাকা। আওয়ামী লীগ এখন একটি গণবিচ্ছিন্ন দলে পরিণত হয়েছে। সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনে তারা জয়ী হতে পারবে না বলেই রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ভোট ডাকাতি করে তারা জাতীয় সংসদের নির্বাাচন করতে চায়। ২০১৪ সালের মতোই একতরফা নির্বাচন করার নীল নক্শা করছে। জনগণ তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দিবে না। দেশে নির্বাচনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই গণতন্ত্রের মাতা আপোষহীন নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ বিরোধী দলীয় সকল বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারকে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ সরকার গঠন  করতে হবে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে প–র্ণস্বাধীন করতে হবে। বর্তমান জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে। সরকারকে আহবান জানাবো কালবিলম্ব না করে অবিলম্বে উপরোক্ত দাবিগুলো মেনে নিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।  এই তামাশা ও ভোট ডাকাতির নির্বাচনকে আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি এবং অবিলম্বে এই ফলাফল বাতিল করে নতুন নির্বাচন প্রদানের আহ্বান জানাচ্ছি।
রাজশাহীর নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, রাজশাহীর আশপাশের উপজেলাগুলো থেকে ক্ষশতাসীন দলের হাজার হাজার লোক আনা হয়েছে। যারা নির্বাচনের দিন ভোট ডাকাতিতে অংশ নেয়। রাজশাহীতে ২৮ জুলাই মধ্যরাত থেকে সকল প্রকার যানবাহন বন্ধ। কিন্তু বিএনপি নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার, বাড়িতে বাড়িতে হানা ও হুমকি বন্ধ হয়নি। পুরুষদের না পেলে মেয়েদের থানায় নিয়ে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং ধানের শীষের ২৪ জন এজেন্ট নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধানের শীষের প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল অভিযোগ করেছেন। ভোটের দিন ওসি কামাল বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মিজানুর রহমান মিনুকে ধাক্কাধাক্কি করে পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়। মিজানুর রহমান মিনুকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া হয়। রাজশাহী জেলা বিএনপি’র সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপু এবং মহানগর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিলনকেও ওসি কামাল ধাক্কা মেরে কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে। ভোটারদেরকে সিল স্বাক্ষরহীন ব্যালট পেপার দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ কেন্দ্রেই পুরুষ ও মহিলা পোলিং এজেন্টদের বেব করে দিয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ভোট কেন্দ্র থেকে ধানের শীষের এজেন্টদের বের করে দিয়েছে।
সিলেট
বিএনপি মহাসচিব বলেন, সিলেটে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কেন্দ্রে ধানের শীষের প্রার্থীর এজেন্টদের কমবেশী বের করে দেয়া হয়েছে। ধানের শীষের প্রার্থীর এজেন্টরা অভিযোগ উত্থাপন করলেও প্রিজাইডিং অফিসার’রা তা কানে তোলেননি। ভোট কেন্দ্র দখল করে গোলাগুলি করেছে আওয়ামী ক্যাডার বাহিনী। এতে ধানের শীষের দু’জন সমর্থক গুরুতর আহত হয়েছে। অন্য দুই সিটি কর্পোরেশনের মতো এখানেও ধানের শীষের এজেন্টদেরকে মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। কেন্দ্র দখল করে নৌকা মার্কায় একচেটিয়া সিল মারার উৎসবও চালিয়েছে আওয়ামী ক্যাডার’রা।  সিলেটে ১৭ নং ওয়ার্ডের আম্বরখানা দরগা গেট প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন কর্মী জালভোট দেওয়ার সময় হযরত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের প্রথম আলো’র প্রতিনিধি মিজবাহ ছবি তুলেছিলেন, এসময় ছাত্রলীগের কর্মীরা তার মোবাইল কেড়ে নেয় এবং পরে পুলিশ এসে তাকে বেধড়ক মারধর করে। ছাত্রলীগও এই হামলায় অংশ নেয়। হামলায় মিজবাহ’র পিঠ ও ডান হাতের কিছু অংশ কেটে যায়। ছাত্রলীগের কর্মীরা মোবাইল থেকে জালভোট দেয়ার ভিডিও মুছে দেয়। হামলায় আরও আহত হন ডেইলী স্টারের ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি মাসুদ হৃদয়। সিলেট সিটিতে ভোটের বদলে কয়েকটি কেন্দ্রে স্থান করে নিয়েছিল দখল, বোমা বিস্ফোরণ ও গুলি।
 সেই সিলেটে কীভাবে ভোট ডাকাতি হয়েছে তা আপনারা নিজেরাই দেখেছেন। সিলেটে ১২টি কেন্দ্রে ১০০% ভোট কাস্ট হওয়ার পরও শতাধিক ভোটার লাইনে দাঁড়িয়েছিল। ব্যালেট পেপার না থাকায় তাদের ফিরে যেতে হয়। এই যে বিষয়গুলো- এটা তামাশা। নির্বাচন ব্যবস্থাকে তারা তামাশায় পরিণত করেছে।
তিনি বলেন, বরিশালে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থীর হাতপাখার প্রতীক ব্যালট পেপারে ছিল না। তাহলে বোঝেন, সেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার কিনা বলেন, তিনি সন্তুষ্ট, তিন সিটিতে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ