ঢাকা, বুধবার 1 August 2018, ১৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ভোট ডাকাতির পুনরাবৃত্তি

সিলেট, বরিশাল ও রাজশাহী- এই তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন মাত্র এক মাস আগে গাজীপুর ও খুলনায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনকেও ছাড়িয়ে গেছে। ভালো কোনো নজীর স্থাপনের মধ্য দিয়ে নয়, ছাড়িয়ে গেছে অনিয়ম, জালিয়াতি, দুর্নীতি ও ভোট ডাকাতির মতো বিভিন্ন অপকর্মের কারণে। দৈনিক সংগ্রামসহ সকল গণমাধ্যমেই এ বিষয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও একই ধরনের তথ্য জানা গেছে।
এসব খবর ও তথ্যের মূল সুর প্রমাণ করেছে, তিন সিটি করপোরেশনের কোনো একটিতেও ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার সুযোগ পাননি। আইন-শৃংখলা বাহিনীর সামনেই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা ব্যাপক সংখ্যায় জাল ভোট দিয়েছে। তারও আগে প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্ট ও নেতা-কর্মীদের বের করে দিয়ে অঘোষিতভাবে ভোটকেন্দ্র দখল করে নিয়েছিল তারা। প্রায় কোনো ভোটকেন্দ্রেই বিএনপির কোনো পোলিং এজেন্টকে থাকতে দেয়া হয়নি। সিলেটে অনেকাংশে একই অবস্থায় পড়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর পোলিং এজেন্ট ও নেতা-কর্মীরা। জামায়াতকে দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেয়া হলেও দলটির নেতা অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ‘ঘড়ি’ প্রতীক নিয়ে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর দিনগুলোতে তাকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। ভয়-ভীতি দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের দিন ক্ষমতাসীন দলের গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা সকল সীমা অতিক্রম করেছিল। অ্যাডভোকেট জুবায়েরের পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রের ধারেকাছেই ঘেঁষতে দেয়া হয়নি।
অন্যদিকে প্রিসাইডিং অফিসার ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা সবই দেখেছেন কিন্তু থেকেছেন চোখ বুঁজে! এমন চমৎকার অবস্থার সুযোগ নিয়েই গণহারে জাল ভোট দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী ও গু-া-সন্ত্রাসীরা। কিন্তু এসব অনিয়ম ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্যও বিএনপি ও জামায়াতসহ কোনো দলের কোনো নেতা-কর্মীকে পাওয়া যায়নি। তাদের আসলে ভোটকেন্দ্রের ধারে-কাছে থাকতেই দেয়া হয়নি। থাকতে পারলেও তারা যে অভিযোগ জানানোর এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করানোর সুযোগ পেতেন না সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে বরিশালে। সেখানে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলÑ বাসদের মনোনীত মেয়র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন  ডাক্তার মনীষা চক্রবর্তী। বিজয়ের কোনো সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও নতুন প্রজন্মের নারী প্রার্থী বলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিলেন তিনি।
নির্বাচনের দিন সকাল নয়টায় মেয়েদের একটি স্কুলে স্থাপিত ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ডাক্তার মনীষা দেখেছেন, ব্যালট পেপারের মুড়ি বইয়ের প্রতিটি পাতায় নৌকা প্রতীকে সিল মারা রয়েছে। সেগুলো দেখিয়ে কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তাদের কাছে ডা. মনীষা জানতে চেয়েছেন, কোনো ভোটার না আসা সত্ত্বেও সকাল নয়টার মধ্যে সবগুলো পাতায় নৌকা প্রতীকে সীল মারা কি করে সম্ভব হয়েছে? কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ‘ছি’ বলে ধিক্কারও দিয়েছিলেন তিনি। এসব কথা আর ধিক্কারের ‘ফল’ তাকে পেতে হয়েছিল তাৎক্ষণিকভাবেই। ছাত্রলীগের গুন্ডা-সন্ত্রাসীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাদের আঘাতে বাসদ প্রার্থী মনীষার বাম হাত ভেঙে গেছে এবং চিকিৎসা নেয়ার পর ব্যান্ডেজ বাঁধা হাত গলায় ঝুলিয়ে তাকে দিনের বাকি সময়টুকু পার করতে হয়েছে। পরে অন্য তিন মেয়র প্রার্থীর সঙ্গে নির্বাচন বর্জন করেছেন তিনি। বরিশালে মেয়র পদে ‘নির্বাচিত’ হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সেরনিয়াবত সাদিক আবদুল্লাহ। একই ধরনের উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে সিলেট ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নির্বাচনেও। কোথাও কোথাও ডাক্তার মনীষার চাইতেও মারাত্মক অবস্থায় পড়েছেন বিরোধী দলের প্রার্থী এবং এজেন্টসহ তাদের লোকজন। তা সত্ত্বেও জেলা রিটার্নিং অফিসারসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশের কথা শুনিয়েছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীসহ দলের নেতা-কর্মীরা। তারা সেই সাথে বিএনপির নালিশ জানানোর পুরনো অভ্যাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, হেরে গেছে বলেই নাকি বিএনপি জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছে! অন্য দলগুলো সম্পর্কেও একই মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।
অন্যদিকে দেশের কোনো গণমাধ্যমের রিপোর্টেই কিন্তু নির্বাচনী কর্মকর্তা, প্রশাসন এবং আওয়ামী লীগের বক্তব্য সমর্থন পায়নি। প্রায় সব গণমাধ্যমের রিপোর্টে বরং তিন সিটির নির্বাচনকে ‘ভোট ডাকাতির নির্বাচন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কোনো দৈনিক ব্যঙ্গাত্মকভাবে শিরোনাম করেছে, ‘সুষ্ঠু’ ও ‘অনিয়মের’ ভোট। প্রতিরোধ ও প্রতিপক্ষহীন ‘সুষ্ঠু ভোট’ বলেও রিপোর্ট করেছে একাধিক দৈনিক। ওদিকে শুধু বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী নয়, সকল বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের অঘোষিত সন্ত্রাস ও ভোট জালিয়াতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। দলগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, এই অভিযোগ আরো একবার সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে যে, বর্তমান সরকার এবং তার আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। ভোট কেন্দ্র থেকে বিএনপিসহ বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া, গ্রেফতারসহ নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালানো এবং নির্বাচনী এলাকার আশপাশে তাদের থাকতে না দেয়ার সুনির্দিষ্ট অনেক ঘটনার উল্লেখ করে নেতারা বলেছেন, নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে নীরবতা পালনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে, এই কমিশন আসলেও সরকারের আজ্ঞাবহ। সে কারণেই এ কমিশনের অধীনে কোনো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা যায় না।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সরকার এবং নির্বাচন কমিশন যে ফলাফলের কথাই বলুক না কেন, সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ যেমন হয়নি, তেমনি এর ফলাফলও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। বাস্তবে জনগণ বরং ফলাফল প্রত্যাখ্যানই করেছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত রাজনৈতিক দলগুলোও একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।
তিন সিটি করপোরেশনের এই নির্বাচন বিশেষ একটি কারণেও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। পুলিশ ও আইন-শৃংখলা বাহিনীকে ব্যবহার করে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও তার নেতা-কর্মীদের ধাওয়ার মুখে রেখে মাসখানেক আগে খুলনায় ও গাজীপুরে এবং ৩০ জুলাই সিলেট, রাজশাহী ও বরিশালে ভোট ডাকাতির মহড়া করা হয়েছে সে নীতি-কৌশলকেই যদি জাতীয় নির্বাচনেও ভিত্তি করার পরিকল্পনা ক্ষমতাসীনদের থেকে থাকে তাহলে নির্বাচন শুধু নয়, দেশ থেকে গণতন্ত্রও চিরদিনের জন্য বিতাড়িত হবে। আমরা আশা করতে চাই, ক্ষমতাসীনরা অমন ভয়ংকর কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চিন্তা এখনই পরিত্যাগ করবেন। নির্বাচন কমিশনকেও তার সেবাদাসের ভূমিকা পালন করা থেকে সরে আসতে হবে। গণতন্ত্রসহ বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে এগোনো দরকার বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ