ঢাকা, বুধবার 1 August 2018, ১৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মানুষ গড়ার আঙিনায় দানবীয় আক্রমণ

মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান : প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ আজ কোন্ জায়গায় দাঁড়িয়ে বিশ্ব মানচিত্রে তার অবস্থান জানান দিচ্ছে তা বোধের অগম্য। জীবন এখানে কেমন- প্রশ্নের জবাব পাবার আগে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীর সংবাদ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্য চরিত্র এবং নৈতিকতার ব্যারেমিটারে আমাদের মান নির্ধারণের রিপোর্ট প্রদান করে। ‘সিএনজি এক জাহান্নাম, থানায় আর এক জাহান্নাম...’ বিবেকহীন প্রাণীর মতো প্রশ্ন করার পর সেই ছাত্রী যখন জবাব দেয় ‘পোশাক খুলে পাশবিক নির্যাতনের প্রমাণ উপস্থিত করতে হবে কিনা?’ এরপরও কি বলবো আমরা মানুষ আছি? দ্বিপদী হিংস্র সাপদেরা এখানে যখন নিজেদের মানুষ বলে পরিচয় দেয়- মানবীয় বৈশিষ্ট্যের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণের প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। দানবীয় হামলায় বিধ্বস্ত ব-দ্বীপ এ জনপদের সবুজ জমিন। এখানকার উদার আকাশে কালো শকুনের ওড়াওড়ি। পৈশাচিক আক্রমণে ভূলুণ্ঠিত মান-সম্মান, ইজ্জত-আব্রু আর মর্যাদা। মানুষ গড়ার আঙিনায় হায়েনার অট্টহাসি। শিক্ষায়তনের দরোজায় হিংস্র ড্রাকুলার রক্ত চোষার গোঙানি। জীবন এখানে এখন এক অব্যক্ত বেদনার নাম। কষ্টের নোনা জলে আমরা শান্তির জন্য সাঁতার কাটি। গরীব পিতার মেধাবী সন্তান একটি চাকুরীর জন্য হয়তো আন্দোলনের সারিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলো। সতীর্থদের আক্রমণে আহত হবার পর তাকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে- চিকিৎসা পাবার মৌলিক অধিকার তার জন্য সংকুচিত। তুমি এখনি হাসপাতাল হতে বিদায় নাও- এটা উপরের নির্দেশ। শিক্ষা- চিকিৎসা ও কর্মের স্বাধীনতা নামক মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মতো স্বাভাবিক দাবীগুলো এখানে বড়োই অপাঙতেয়। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সম অধিকারের লড়াইয়ে যে বিজয় অর্জিত হয়েছিলো তাতে তোমার অধিকার এখনো নিশ্চিত হয়নি। রাত বারোটা না কি তিনটা সেটা মূখ্য বিষয় নয়, এখনি হাসপাতাল হতে পালাও। নুরু পালিয়েছে। সে এখন পালিয়েই চিকিৎসা নিচ্ছে। নুরুর বড়ো অপরাধ সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তার দরিদ্র পিতার অপরাধ সন্তানকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে পাঠিয়েছে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড... ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়... মানুষ গড়ার আঙিনা... ভাবতে বড়ো কষ্ট লাগে...। বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কবি কি এ জন্য লিখেছিলেন ‘ওটা ডাকাতদের গ্রাম-ওখানে যেওনা..।’ কবি এখনো বেঁচে আছেন। হে প্রিয় কবি আপনি কি আর একটি কবিতা লিখবেন। আমাদের ক্যাম্পাসে শুধু ডাকাত নয় এখানে এখন অনেক বিষধর কালফনির বসবাস.... এখানে হিং¯্র হায়েনারা দাত কেলিয়ে হামলে পড়ে যখন-তখন। উত্তর জনপদের আর এক বিশ্ববিদ্যালয়ে  হাতুড়ি বাহিনীর আক্রমণে কোমড় এবং পায়ের হাড্ডি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে এক ছাত্রের। পত্রিকায় তার এক্সরে রিপোর্ট  ক্ষত বিক্ষত বাংলাদেশের চিত্রই যেন তুলে ধরছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ ছাত্রের উপর আক্রমণে তার পায়ের মূল হাড্ডি টুকড়ো টুকড়ো করে হামলাকারীরা  তাকে পঙ্গু করেনি বরং বাংলাদেশকেই পঙ্গু করে দিয়েছে।
হামলা এবং নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট। যার কারণে এতো বড়ো অপরাধ করার পরেও তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। পুলিশের সামনেই তারা কোটা সংস্কারের দাবীতে চলমান আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর আক্রমণ করেছে। হামলাকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় এখানে মূখ্য ভূমিকা পালন করছে। এ পরিচয়ের কারণে তারা যে কোনো অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে অনায়াসে। বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও সাধারণ মানবিকতার জায়গাগুলোতে ন্যুনতম সহমর্মীতা, সৌজন্যবোধ, অপরের মতকে সহ্য করার মতো ধৈর্য বিলুপ্ত প্রায়। রাষ্ট্র এবং রাজনীতির যে একদলীয় মেরুকরণ তাতে পরমত সহ্য করার মতো কোনো স্পেস ফাকা রাখা হয়নি। এর প্রভাব সর্বত্র। ভিন্ন মতের কারো কোথাও জায়গা নেই। এমনকি সরকারী চাকুরীর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো রাজনৈতিক পরিচয় আর কোটা পদ্ধতির বেড়াজালে মেধাবীদের পরিবর্তে অন্যদের দখলে চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে সরকারী নিয়োগে কোটা পদ্ধতি এক আজব ব্যবস্থা। পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশেও কোটাদ্ধতি চালু আছে- পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, দেশের জন্য বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিবর্গের সন্তানদের জন্য কোটা পদ্ধতি চালু থাকলেও বাংলাদেশের মতো এমন আজব সিস্টেম পৃথিবীর আর কোনো দেশে পাওয়া যাবে না। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ