ঢাকা, বুধবার 1 August 2018, ১৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজস্থানের মরুদ্যান

আখতার হামিদ খান : মরুদ্যানের জন্য ভারতের রাজস্থানে রাজ্যের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। পাশাপাশি পাহাড়ী আকাশকেন্দ্র মাউন্ট আবু বা আবু পর্বতের জন্যও এটি সমান পরিচিত। সমতল ভূমি থেকে এক হাজার দু’শো উনিশ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই মাউন্ট আবু আরাবল্লি পর্বতমালার অংশ। স্থানটি প্রচুর গাছপালা, লতাপাতা, পুষ্পগুল্ম ও প্রাণীবৈচিত্রে ভরপুর
প্রাচীন নাম অর-বুধ এর সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে আবু। হিন্দু ধর্মশাস্ত্র বেদ ও পুরাণ এবং গ্রিক ও রোমান লোককথায়ও এর উল্লেখ রয়েছে। গ্রিক প-িত টলেমির মতে, অর অর্থ পর্বত এবং বুধ অর্থ বৃদ্ধ ও জ্ঞানী। তাই অর বুধকে একসঙ্গে বলা হয় জ্ঞানবৃদ্ধ পর্বত। সাধারণের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে আছে যে, মাউন্ট আবু হচ্ছে চার অগ্নিকুলা রাজপুত এর জন্মস্থান। তারা বলেন পরমারা (পাওয়ার), চৌহান, পরিহার (প্রতিহার) এবং সোলাংকি (চালুক্য)। এই পার্বত্য অবকাশ কেন্দ্রে হিন্দু দেব-দেবীদের অসংখ্য মন্দির রয়েছে। লোকে বিশ্বাস করে অনেক হিন্দু দেব-দেবী মাউন্ট আবুতে আগমন করেছেন। ভগবান শিব এখানে অখিলেশ্বর মহাদেব নামে পরিচিত। মধ্যযুগ থেকেই এই নামে আবুতে একটি মন্দির রয়েছে। রাজস্থানে শিবকে সাধারণত মহাদেব নামেই সম্বোধন করা হয়। মহাদেবকে যদি আবু-র শাসক দেবতা ধরা হয়, তাহলে আধার এখানকার প্রধান্য দেব্।ী পর্বত শিখরে আধার দেবীর মন্দির অবস্থিত। সেখানে পৌছতে হলে কয়েকশো সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হবে। পর্বত শিখরের আরেকটি স্থানের নাম গুরু শিখর। গুরু শিখরএ শিব এবং দত্তরেয় মন্দিরে রয়েছে অসংখ্য গুহা ও সুড়ঙ্গপথ। এসব গুহায় পুণ্যর্থীদের দেখা মিলবে, যারা ডিগ্রি প্রিয় দেব-দেবীদের উদ্দেশে প্রার্থনা ও অর্ঘ্য নিবেদনে রত। পার্শ্ববর্তী হ্রদটিতে যেন বিরাজ করছে এক স্বর্গীয় পরিবেশ। কথিত আছে, ভগবান ইন্দ্র তার নখ দিয়ে এই হ্রদটি তৈরি করেছেন। তাই এটিকে বলা হয় নখি তালাও বা নখ হ্রদ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যম-িত হ্রদটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান। হৃদে নৌবিহারের ব্যবস্থা রয়েছে। নখি হৃদের ওপারে শ্রীরঘুনাথজি মন্দিরটি চোখে পড়বে। বিখ্যাত হিন্দু ধর্ম প্রচারকে সন্ত রামানন্দ চতুর্দশ শতকে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
 জৈন সম্প্রদায়ের উপাসনালয় দিলাওয়ারা মন্দিরসমূহে চোখধাঁধানো পাথরের কারুকাজ ও অলংকরণ আবু-র স্বর্গীয় ভাগগাম্ভীর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই মন্দিরগুলো ইউনেস্কোর ঐতিহ্য সূক্ষ্ম ও রুচিশীল ফুলেল নকশা, পাথরের জানালায় অনিন্দ্যসুন্দর কারুকাজ, পাথরের মূর্তির গায়ে বিলাসবহুল নিখুঁত অলংকরণ শুধু সেকালের শিল্পীদের নিপুণ দক্ষতাই নয়, তাদের প্রখর কল্পনাশক্তিরও পরিচয় বহন করে। গোটা ভবনে এই ইঞ্চি জায়গাও ফাঁকা বা কারুকাজবিহীন নেই। দেখলে মনে হয়, সবকিছু যেন এক স্বর্গীয় হাতের ছোঁয়ায় তৈরি। দুই মন্ত্রী এবং একাদশ শতকে চালুক্য শাসনামলের সওদাগর বাস্তপাল এবং তেজপাল এই মন্দিরগুলো নির্মাণ করেন। দিলাওয়ারার নির্মাণশৈলী এবং পাথরের গায়ে শৈল্পিক কারুকাজ দেখলে সৌন্দর্যপিপাসুমাত্রই মুগ্ধ হবেন। পর্বতপ্রমাণ দিলাওয়ারার নির্মাণশীল এবং পাথরের গায়ে শৈল্পিক কারুকাজ দেখলে সৌন্দর্য পিপাসুমাত্রই মুগ্ধ হবেন। পর্বতপ্রমাণ অচলগড় দুর্গের গাঁথুনি এবং নির্মাণকৌশল দেখলেও আক্কেল গুড়ুম হবার যোগাড় হবে মেবারের রানা কুম্ভ এই দুর্গ নির্মাণ করেন। ত্রয়োদশ শতকে পরমারা পাথরের দুর্গ তৈরি করেন। আবুর উচ্চতা এবং ভৌগোলিক অবস্থান এই দুর্গটিকে যুদ্ধের সময় একটি কৌশলগত আদর্শ আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত করে। তীর ধনুক চালনা ও যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী ভিল  গোত্র বা উপজাতি আবু আরেকটি আকর্ষণ। এই উপজাতির লোকেরা রঙিন এবং চাকচিক্যময় বেশভূষা পরিধান করতে পছন্দ করে। সাহসিকতা, বীরত্বগাথা এবং গোত্রপতির প্রতি আনুগত্যের কারণে লোকগাথায় তারা অমর হয়ে আছে।
মাউন্ট আবু রাজভবনে একটি জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে প্রাচীন চন্দ্রবত আমলের ভাস্কর্য, পিতলের জৈন মূর্তি, পোশাক-আশাক, সামরিক সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। ঊনিশ শতকে ব্রিটিশরা তাদের সৈন্যদের স্বাস্থ্যনিবাস বানানোর জন্য সিরোহি দরবার থেকে আবু-র একাংশ ইজারা নেয়। তারাই আবু-র সঙ্গে ‘মাউন্ট’ শব্দটি যোগ করে। গ্রীষ্মকালে বিশেষ করে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তারা এই স্থানটিকে আজমির মাওয়ার অঞ্চলের শাসনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। রাজপুত থেকে পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত গভর্নর জেনারেলের প্রতিনিধি আবুতে একটি শ্যালে ধরনের বাংলোতে থাকতেন। জনসাধারণ সেই বাসভবনকে ‘ঈগলের বাসা’ নামে অভিহিত করত। পর্বত শিখরে অবস্থিত বাসভবনটির নাম যথার্থ বলেই মনে হয়। গ্রীষ্মকালীন অবকাশকেন্দ্র এবং প্রশাসনিক কেন্দ্রের মর্যাদা লাভ ছাড়াও মাউন্ট আবু আরও কিছু ভিন্নমাত্রার স্থাপত্যকর্মের জন্য আজ বহুল পরিচিত। ব্রিটিশরা রাজপুত এবং গুজরাটের যুবরাজের আবুতে স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলার অনুরোধ জানায়। তারই ফল হিসেবে স্থানটি আরও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়ে ওঠে। পূর্ব এবং পশ্চিমের স্থাপত্যকলার সংমিশ্রণে অপূর্ব সৌন্দর্যখচিত মার্বেল পাথরে গড়ে তোলা হয় রাজকীয় হাভেলি, প্রাসাদ এবং বাড়ি। এসবের মধ্যে যোধপুর হাউস, জয়পুর হাউস, বিকানের হাউস, নিমবাদি প্রাসাদ এবং সিরোহি প্রাসাদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
অবকাশ কেন্দ্র হিসেবে মাউন্ট আবু-কে আরও সমৃদ্ধ করেছে এখানকার চিরসবুজ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং পশুপাখির বিচরণ উপভোগ করার ব্যবস্থা সংবলিত স্থান ‘ট্রিভর ট্যাংক। ব্রিটিশ আমলে পোলো খেলা এবং নাচের অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত জায়গাটির নাম ‘ট্রিভর ওভাল’ নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপলক্ষে রাজপুত ক্লাবে সমবেত হতেন ইংরেজ ও রাজপুত্র যুবরাজরা। সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের অনুপম সৌন্দর্য উপভোগের জন্য এখানকার ‘সানসেট পয়েন্ট’ একটি আদর্শ স্থান। পাহাড় বেয়ে টোডস রক, নানস রক এবং হানিমুন পয়েন্টে চড়াও বেশ আনন্দদায়ক এবং পর্যটকদের কাছে এসব অত্যন্ত জনপ্রিয়। ব্রিটিশ আমলে মাউন্ট আবুতে শিক্ষার আলো পড়ে। ইস্ট ইন্ডয়া কোম্পানির সেনাপতি স্যার হেনরি লরেন্স (যিনি ১৮৫৭ সালে গণআন্দোলনের সময় লক্ষেèৗ রেসিডেন্সকে কব্জায় রাখতে সক্ষম হন) ভারতে ইংরেজ এবং ইউরেশিয়ান সৈনিকদের এতিম ও গরীব সন্তানদের জন্য মাউন্ট আবুতে ‘লরেন্স স্কুল’ নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। আইরিশ যাজকরা গড়ে তোলেন সেন্ট মেরি স্কুল। বিখ্যাত স্কুলগুলোর মধ্যে লরেটো কনভেন্ট অন্যতম। এভাবেই, এমনকি ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার পরও মাউন্ট আবু পাহাড়ি অবকাশ কেন্দ্রের পাশাপাশি শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে তার সুনাম অক্ষুণ্ন রাখে। আজকের দিনে ব্রহ্মকুমারী নামে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী এখানে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছে।
গড়ে তুলেছে একটি হাসপাতাল যাদের হোটেলে থাকা খাওয়ার সামর্থ নেই, তাদের এখানে থাকা-খাওয়ার সুবিধা দেয়া হয়। এখানে গড়ে তোলা হয়েছে একটি মনোরম ঝর্ণাধারাসমৃদ্ধ সবুজ পার্ক, মেডিটেশন সেন্টার এবং বিশ্রামাগার। প্রকৃত অর্থেই এটিকে ‘শান্তি উদ্যান’ নামে অভিহিত করা চলে। জল, স্থল এবং আকাশ পথে মাউন্ট আবুতে সহজে যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ