ঢাকা, বুধবার 1 August 2018, ১৭ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৮ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

হারিয়ে যাচ্ছে ভাওয়ালের সৌন্দর্য

হামিদ খান : ভাওয়াল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম কেন্দ্র। বিশাল শালবন, স্থানীয় রাজাদের প্রকৃতির প্রতি ভালবাসা একাকার হয়ে এক সময় পুরো অঞ্চল ছিল সৌন্দর্যের লীলাভূমি। কালের টানে এই সৌন্দর্য আজ হুমকির মুখে। এই বিশাল বনাঞ্চলের প্রাণবৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির প্রান্তসীমায় এসে দাঁড়িয়েছে- হারিয়ে যাচ্ছে ভাওয়ালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
গাজীপুর ভাওয়ালে এক সময় প্রচুর বন, ফুল ও প্রাণী ছিল। সেগুলো আজ যতেœর অভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অথবা বিলুপ্তির পথে। সেসব নয়নাভিরাম মনোমুগ্ধকর পরিবেশ কেবল স্মৃতির বিষয় হয়ে আছে। এর মাঝে কিছু আজও বিদ্যমান।
বৃক্ষ
বর্তমানে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শাল অরণ্য ভাওয়াল। তবে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে এই অরণ্য। যা গাজীপুর জেলার কালিয়া কৈরের সদরের উত্তরাংশ কাপাসিয়া ও শ্রীপুর থানা বেষ্টিত। ময়মনসিংহ জেলার প্রাচীন ভাওয়াল গফরগাঁও ও ভালুকা থানার অংশ বিশেষ বিস্তৃত শালবন। এই বনের অংশগুলো চন্দ্রাবন, রাজেন্দ্রপুরবন, ন্যাশনাল পার্ক ইত্যাদি। এখানে সর্বাধিক, শাল বা গজারি বন থাকায় স্থানীয়ভাবে গজারিবন নামেই পরিচিত। এ বনাঞ্চলে ন্যাশনাল পার্ক ছাড়াও অনেকগুলো আধুনিক পিকনিক স্পট বিদ্যমান। এই বনের নিকটে লোকালয়ে ডালিম, ধুতুরা, অশ্বথ, গামার শিমুল, লেবু, বাতাবী লেবু, তাল, পেপে, কৃষ্ণচূড়া, চাল কুমড়া, নিম, আম, জাম, কাঁঠাল, নারিকেল, সুপারি, আনারস, ঘৃতকুমারী ইত্যাদি জন্মে। বৃক্ষ শিকারির কবলে পড়ে সেসবও আজ বিলুপ্ত প্রায়।
ফল ও ফুল
ভাওয়াল অরণ্য এক সময়ে ফুলে ফুলে সুশোভিত ছিল। আজ সেসব প্রজাতি ফুলের অনেকগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। মোঘলরাই ছিল ভারতে আধুনিক উদ্যানের প্রবর্তক। মধ্য এশিয়া থেকে তারা লিলি টিউলিপ বৃক্ষ আনেন। ১৫২৬ সালে সম্রাট বাবর বসরা বন্দর দিয়ে এ দেশে প্রথম গোলাপ আমদানি করেন। ভাওয়ালের ভারতীয় উপমহাদেশীয় ফুলের উৎসের মধ্যে ভাওয়াল ছিল বেশ সমৃদ্ধ। কনকচাঁপা, হিজল, জারুল, শিমুল, শেফালী, শিরিষ, মান্দার, কামিনী, অতসী, কাঞ্চন, বেলী, কদম, রঙগন ইত্যাদি এখনো বিদ্যমান। বিদেশী ফুলের মধ্যে বাগান বিলাস (ব্রাজিল), চন্দ্র মল্লিকা (চীন), সূর্যমুখী (উত্তর আমেরিকা), কলাবতী (আমেরিকা), নয়ন তাঁরা (ওয়েস্ট ইন্ডিজ), গন্ধরাজ (চীন-জাপান), নীল জবা (সিলিয়া) ইত্যাদি আরও অনেক ফুল আছে যা সবার পরিচিত কিন্তু তাদের আবির্ভাবের ইতিহাস অনেকের অজানা। ভাওয়াল রাজবাড়ীর ভেতরে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে রয়েছে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত প্রায় বিরল প্রজাতির বৃক্ষ নাগলিঙ্গম।
এর বয়স আনুমানিক প্রায় ২০০ বছর। ভাওয়ালের অনেক উদ্ভিদের আদি নিবাস উত্তর আফ্রিকা, মেক্সিকো, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, আরব, চীন, বার্মা, ইংল্যান্ড আরও অনেক দেশে। বহু বছর পূর্বে আর্যরা উত্তর, পশ্চিম ভারতে আগমনের সময় নিয়ে আসেন যা পরবর্তীতে ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৬৫ সালে জামাইকা থেকে আনীত মেহগিনির চারা ভারতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে প্রথম লাগানো হয়। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে মেহগিনির বীজ এনে বপনের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করা হয়। ইংরেজি সৈনিকদের স্কার্ভি রোগ নিরাময়ের জন্য আমেরিকা থেকে ইউরোপ হয়ে ভারতে ১৭৯০ সালে প্রথম ফনিমনসা নিয়ে আসে। সেখান থেকে ভাওয়ালে চলে আসে। চীন ও মালয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে লিচু, চীন থেকে চীনা বাদাম, আমেরিকা থেকে আলু, অস্ট্রেলিয়া থেকে ঝাউগাছ, পর্তুগিজরা নিয়ে আসে আদা। যতেœর অভাবে সেসবও আজ হারিয়ে যাচ্ছে।
প্রাণী
ভাওয়ালে দুর্লভ শ্রেণীর প্রাণীর আবির্ভাব ঘটে নানা সময়ে। ১৯৪০ সালে ভাওয়াল-মধুপুর বনাঞ্চলে বুনো মহিষ দেখা যেত। ভাওয়াল উত্তরাংশে ময়মনসিংহের দক্ষিণাংশের শালবনে এদের বিচরণ ছিল। ১৯৫০ সালেও মধুপুর ভাওয়াল বনে ‘গাউর ইন্ডিয়ান বাইসন’ দেখা যেত। এরা হিমালয় বা এ সকল অঞ্চল থেকে মাঝে মাঝে এসে বেড়িয়ে যেত।
১৯৬৫ সালে এ অঞ্চলে চিতাবাঘ বা গেছো চিতা দেখা গেছে। ১৯৯০ সালে কাপাসিয়ায় চিতাবাঘের সাবক ধরা পড়ে।
শালবনে তিন প্রজাতির ভাল্লুক ছিল। ৩০ বছর আগে শ্রীপুরে বরমী বাজারের আশপাশে হনুমান ছিল। তবে এই এলাকায় এখনও কিছু বানর দেখা যায়। বিশ বছর আগে দুই প্রজাতির কাঠ বিড়ালী শালবনে ছিল। ভাওয়াল গড়ে ভাল্লুকের অবাধ বিচরণ ছিল। গজারি বনের ঝোপ-ঝাড়ে খুরওয়ালী খরগোশ পাওয়া যেত। ১৯৪৭ সালের পূর্বে ভাওয়ালের আশপাশে বাঘের সন্ধান পাওয়া যেত এজন্য গাজীপুর জেলার সদর থানায় একটি গ্রামের নাম হয় ‘বাঘলপুর’। বাঘের অত্যাচারে কিছু কিছু গ্রামের জনগণ ভয়ে গ্রামের বিশেষ বিশেষ জায়গায় বের হত না। ভাওয়াল বাজার মামলার রায়ের বছর বনে আগুন ধরিয়ে দিলে বাঘ চিরবিদায় নেয়। এক জরিপে দেখা যায়, ভাওয়াল অঞ্চল ভারতবর্ষের সর্বাপেক্ষা বাঘ শিকারের স্থল অঞ্চলের রাজারা প্রায়ই বাঘ ও হাতি শিকারে বের হতেন। হাতির আক্রমণে এ অঞ্চলের কৃষকরা ভীত সন্ত্রস্ত থাকত। কয়েক বছর আগে ভাদুন গ্রাম থেকে দেশের বৃহত্তম অজগর সাপটি ধরা পড়ে। যার মৃত দেহ এখন যাদুঘরে সংরক্ষিত। বিভিন্ন ধরনের বিষধর সাপও এখানে পাওয়া যেত যাদের অস্তিত্ব এখন তেমন নেই। বিভিন্ন ধরনের হরিণ,ভাল্লুকও দেখা যেত। এখন আর তাদের অস্তিত্বও চোখে পড়ে না। এ জেলার পৌরসভার দক্ষিণে অনেক ধরনের পাখির আবাসস্থল ছিল। তারা মনের আনন্দে গজারি বনে উড়ে বেড়াত। একটি টিলা সদৃশ্য গাছপালা পরিপূর্ণ পাড়ার নামই হয় ‘পাখির টেক’। সেই পাখির টেকেই ১৯৭১ সালের আগে শকুন, ঘুঘু, বক, বড় সাদা বক, শালিক, কবুতর, বাবুই, ময়না, ঈগল, পানকৌড়ি, টুনটুনি ইত্যাদি নাম জানা-অজানা কত রঙ-বেরঙের পাখি দেখা যেত যাদের অনেকেই আজও আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। ময়ূর পাওয়া যেত ভাওয়ালের সর্বত্র। এটি একটি হারানো ইতিহাস। শেষ ময়ূরটি দেখা যায়, রাথুরার জঙ্গলে। বিভিন্ন ধরনের পাখি বেড়াতে আসত শালবনে, গজারি বনে, এখন আর তাদের দেখা যায় না।
এক ধরনের শিকারির বিলাসিতার কারণে আজে ভাওয়ালের মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৌন্দর্য হারিয়ে যাচ্ছে। বৃক্ষ নিধন কিংবা প্রাণী শিকার আজও বিলাসিতাই থেকে যাচ্ছে। এদের যতটুকু আজ বিদ্যমান তার সবটুকু সৌন্দর্য ধরে রাখা সংশ্লিষ্ট সকলের নৈতিক দায়িত্ব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ