ঢাকা, রোববার 18 November 2018, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

অভিযুক্ত তিন চালকের বাস চালানোর লাইসেন্স নেই

অভিযুক্ত তিন বাসচালক ( বামে যুবায়ের, মাঝে মূল ঘাতক মাসুম বিল্লাহ ও ডানে সোহাগ)

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের র‌্যাডিসন হোটেলের উল্টোপাশে দুই শিক্ষার্থীকে চাপা দেওয়া সেই বাসচালক মাসুম বিল্লাহর বড় গাড়ি চালানোর লাইসেন্স ছিল না। হালকা যান প্রাইভেটকার ও ছোট মাইক্রোবাস চালনার জন্য লাইসেন্স নিয়ে তিনি বাস চালিয়ে আসছিলেন। র‌্যাবের হাতে আটক হওয়ার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব কথা স্বীকার করেছেন মাসুম বিল্লাহ। মাসুম বিল্লাহ জানিয়েছেন,যাত্রী ওঠানোর জন্য প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে বাসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের চাপা দিয়েছিলেন।

এদিকে, হালকা যানের লাইসেন্স থাকার পরও বড় বাস চালানোর জন্য চালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কারণে এই বাস কোম্পানির চেয়ারম্যান জাকির হোসেনসহ পরিচালকরাও অভিযুক্ত হতে পারেন। তারা জেনে-শুনেই প্রাইভেটকারচালকের হাতে বড় বাস তুলে দিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বলেন,‘দুর্ঘটনার পরপরই আমরা গোপন সংবাদ ও তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় মাসুম বিল্লাহর অবস্থান জানার চেষ্টা করি। ঘটনার রাতে প্রথমে অপর দুই বাসের চালক সোহাগ ও জুবায়ের এবং তাদের এক সহযোগীকে আটক করা হয়। সোমবার বরগুনা থেকে মাসুম বিল্লাহকে আটক করা হয়। তাকে ঢাকায় আনা হয়েছে। তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।’

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান,জিজ্ঞাসাবাদে মাসুম বিল্লাহ জানিয়েছে, সে আগে জাবালে নূর পরিবহনের চালকের সহযোগী হিসেবে কাজ করতো। গত তিন চার বছর আগে সে হালকা যানের একটি লাইসেন্স সংগ্রহ করে। এই ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে তার প্রাইভেটকার ও সর্বোচ্চ ১২ সিটের মাইক্রোবাস চালানোর অনুমতি ছিল। কিন্তু মাসুম বিল্লাহ হালকা যান চালানোর লাইসেন্স হাতে পেয়েই বাস চালানো শুরু করে।

র‌্যাব সূত্র জানায়, দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় যে তিনটি বাসের প্রতিযোগিতা করেছিল সেই অপর দুটি বাসের চালক সোহাগ ও জুবায়েরের লাইসেন্সও হালকা যানের। এই লাইসেন্স দিয়ে তাদের বাস চালানোর কথা ছিল না। সোহাগ ও জুবায়েরও আগে বাসের চালকের সহযোগী ছিল। পর্যায়ক্রমে তারাও হালকা যানের লাইসেন্স হাতে পেয়ে বাস চালানো শুরু করে।

র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা জানান, তিনটি বাসের মধ্যে মিরপুরের কালশী থেকে প্রথমে ঢাকা মেট্রো ব-১১-৭৬৫৭ নম্বরের বাসটি নিয়ে ফ্লাইওভার পার হয়ে আসে চালক জুবায়ের। ফ্লাইওভার শেষ মাথাতেই সে বাসটিকে কিছুটা আড়াআড়ি করে রেখে যাত্রী তুলছিল। তার পেছনে পেছনেই বাস নিয়ে আসছিল মাসুম বিল্লাহ ও সোহাগ। সোহাগের ঢাকা মেট্রো ব-১১-৭৫৮০ বাসটির আগে যাবার জন্য মাসুম তার ঢাকা মেট্রো ব-১১-৯২৯৭ বাসটি নিয়ে জুবায়েরের বাসের আগে যাওয়ার চেষ্টা করে। এতেই সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শিক্ষার্থীদের চাপা দেয়।

র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা জানান, তিনটি বাসেরই চালকদের বড় বাস চালানোর লাইসেন্স ছিল না। তারা প্রাইভেটকার বা হালকা যান চালানোর লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাতো।

অভিযুক্ত দুই বাসচালকের দুই সহকারী রিপন ও এনায়েত

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা জানান, হালকা যানের লাইসেন্স দিয়ে যাত্রীবাহী বড় বাস চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে তার লাইসেন্স নাই বলেই গণ্য করা হবে। এক্ষেত্রে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটলে আইন অনুযায়ী যেরকম শাস্তি হওয়া উচিত তাই হওয়ার কথা।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন,দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় যে মামলা দায়ের করা হয়েছে সেখানে বেপরোয়া যান চালিয়ে মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগ এনে দণ্ডবিধির ২৭৯ এবং ৩০৪ (খ) ধারার সংযুক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো গণ্য করা হলে তার শাস্তির পরিমাণ পড়বে। একই সঙ্গে লাইসেন্সবিহীন থাকার পরও গাড়িচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কারণে তার নিয়োগকর্তাও অভিযুক্ত হবেন।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাপা দেওয়া বাসচালক মাসুম বিল্লাহর বাবার নাম আব্দুল বারেক। তাদের গ্রামের বাড়ি বরগুনা জেলার কলাপাড়া থানাধীন উত্তর কানাইয়া এলাকায়। ঢাকার মিরপুরে সে পরিবার নিয়ে থাকতো।

চার জন কারাগারে, রিমান্ড শুনানি ৬ আগস্ট

এদিকে সোমবার দুই বাসচালক সোহাগ ও জুবায়ের এবং তাদের দুই সহযোগী এনায়েত ও রিপনকে পুলিশে সোপর্দ করার পর তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ক্যান্টনমেন্ট থানার এসআই  রিয়াদ আহমেদ মুখ্য মহানগর আদালতের হাকিম এইচ এম তোহার আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। কিন্তু আদালত শুনানির জন্য আগামী ৬ আগস্ট তারিখ নির্ধারণ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

গত রবিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিমানবন্দর সড়কের র‌্যাডিসন হোটেলের বিপরীতে কালশী থেকে বিমানবন্দরগামী জাবালে নূর পরিবহনের একাধিক বাস প্রতিযোগিতা করে যাত্রী তুলতে গিয়ে পথচারী ও শিক্ষার্থীদের চাপা দেয়। এতে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল করিম রাজীব নিহত হয়। এছাড়া আরও অন্তত ১২ শিক্ষার্থী আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এঘটনায় সেদিন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা শতাধিক গাড়ি ভাঙচুর করে। এরপর সোম ও মঙ্গলবার শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় ঢাকা উত্তরে। এ ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় নিহত মিমের বাবা জাহাঙ্গীর ফকির বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন।

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ