ঢাকা, বৃহস্পতিবার 2 August 2018, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে দিনভর অচল রাজধানী ॥ সংঘর্ষ ভাংচুর

বাস চাপায় শিক্ষার্থী নিহতের প্রতিবাদে এবং ৯ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে অবরোধ করে এভাবেই বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ছবিটি শাহবাগ এলাকা থেকে তোলা -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মত রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। ক্লাস বন্ধ রেখে ব্যাগ কাঁধে ইউনিফর্ম পরে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সারাদিন কার্যত অচল থাকে রাজধানীর রাজপথ। ক্রমশ জটিল আকার নিতে থাকা এই আন্দোলনের মধ্যে গতকাল বুধবারও বিভিন্ন স্থানে গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, সিলেটসহ বিভিন্ন শহরে।
ঢাকায় আন্দোলনরত ছাত্ররা পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে গাড়ি থামিয়ে চালকদের লাইসেন্স দেখতে চেয়েছে পুলিশের সামনেই। লাইসেন্স দেখাতে না পারলে গাড়ির চাবি আটকে রাখে তারা। ধানমন্ডিতে শিক্ষার্থীদের লাইসেন্স দেখাতে না পারায় পুলিশের একটি গাড়িকে দীর্ঘসময় আটকে থাকতে হয়। একই ধরনের সমস্যায় পড়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বেশ কয়েকটি গাড়ি।
বাংলামোটরে উল্টো পথ দিয়ে যাওয়ার সময় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের গাড়ি শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়ে। মন্ত্রীর সামনেই শিক্ষার্থীরা শ্লোগান দেয়-‘আইন সবার জন্য সমান’।
শনির আখড়ায় শিক্ষার্থীদের এড়াতে উল্টোপথ দিয়ে দ্রুত গতিতে যাওয়া একটি পিকআপ এক আন্দোলনকারীকে ধাক্কা দিয়ে যায়। পায়ে আঘাত নিয়ে ওই কলেজছাত্র এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এদিকে শিক্ষার্থীদের পাল্টায় নারায়ণগঞ্জে পরিবহন শ্রমিকরাও সকাল থেকে ছয় ঘণ্টা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আটকে রেখে বিক্ষোভ করে। সেখানে রাস্তায় স্কুলছাত্রদের মারধর করার ঘটনাও ঘটে।
সকাল ১০টার পর থেকে নগরীর উত্তরাংশের উত্তরা থেকে দক্ষিণ প্রান্তের শনির আখড়া পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলে। এক পর্যায়ে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যোগ দেয় তাদের সঙ্গে। তারা শ্লোগান দেয়- ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’। শিক্ষার্থীদের হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা দেখা যায়- ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘নিরাপদ সড়ক চাই’, ‘বিবেক তুমি কবে ফিরবে’।
বিক্ষোভ থেকে সন্তানকে বাসায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় থাকা এক মা বলেন, “সরকার কেন এটাকে এখনও সমাধান দিচ্ছে না? সরকার দাবিগুলো মেনে নিক, যাতে আমাদের সন্তানরা দ্রুত বাড়িতে ফিরে যেতে পারে।”
ঢাকার রাস্তায় গণ পরিবহন গত দুদিন ধরেই কম ছিল। এর মধ্যে সকালে রাস্তায় রাস্তায় বিক্ষোভ শুরু হলে বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়া যানবাহনের জট দেখা গেলেও দুপুরের পর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা অ্যাম্বুলেন্স ও হজযাত্রীদের গাড়িকে ছাড় দিলেও চলতি পথে যানবাহন না পেয়ে সাধারণ মানুষকে পড়তে হয় ভোগান্তিতে।
সৌভাগ্যবান কেউ কেউ রিকশা বা ভ্যান পেলেও বহু মানুষকে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হয়। আর ঢাকা থেকে বের হওয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ পথ উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীর রাস্তা বন্ধ থাকায় দূরপাল্লার যাত্রীরা পড়েন অনিশ্চয়তায়।
এর মধ্যেই সচিবালয়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। পরে তিনি সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
মন্ত্রীর আহ্বানে কাজ না হলেও বিকাল ৪টার পর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের বাসায় পাঠানোর কাজটি করে দেয় বৃষ্টি। আজ বৃহস্পতিবার সকালে আবার রাস্তায় নামার ঘোষণা দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রাস্তা ছাড়ে আন্দোলনকারীরা।
রোববার জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর থেকে প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ চালিয়ে আসছে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স’ নামের একটি ফেইসবুক গ্রুপ থেকে। তিন বছর আগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত ভ্যাট বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় ওই গ্রুপ তৈরি হয়।
আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো হল- বেপোরোয়া চালককে ফাঁসি দিতে হবে এবং এই শাস্তি সংবিধানে সংযোজন করতে হবে। নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএস ফুটওভার ব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রত্যেক সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড ব্রেকার দিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্র-ছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে। শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের গাড়ি চালনা বন্ধ করতে হবে। বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না।
মিরপুরে পুলিশের ভ্যান উল্টে দিলো শিক্ষার্থীরা : মিরপুর-১০ নম্বরে পুলিশের পিকআপ ভ্যান উল্টে দিলো আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। গতকাল বুধবার বিকেল ৩টার দিকে মিরপুরে আন্দোলনরত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এ ঘটনা ঘটায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মিরপুর-১৪ নম্বর থেকে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান ১০ নম্বরের দিকে আসলে আন্দোলকারীরা ইট-পাথর ছুড়তে থাকে। এসময় পিকআপ ভ্যান রেখে পুলিশ সদস্যরা চলে গেছে শিক্ষার্থীরা ভ্যানটি ভাঙচুর ও উল্টে দেয়।প রে আন্দোলনকারীরা মিরপুর-১৩ নম্বরে অবস্থিত বাংলাদেশ রোড ট্রাসপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) কার্যা য়ের সামনে অবস্থান নেন। এসময় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ-মিছিল দিয়ে বিআরটিএ কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকতে গেলে গেট বন্ধ করে দেন আনসার সদস্যরা। পরে শিক্ষার্থীরা বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান দিয়ে শ্লোগান দিতে থাকেন।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ-মিছিল করছে শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর সাইন্সল্যাব মোড়, মিরপুর ১০, বনানী-কাকলী মোড়, মৎস্য ভবন, বিমানবন্দর চত্বর, উত্তরা জসীমউদ্দিন, কাকরাইলসহ বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছে তারা।
এসব পয়েন্টে রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী আন্দোলনে অংশ নেয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মিরপুর ১০ নম্বরে পাঁচ থেকে সাতটি এবং সাইন্সল্যাব মোড়ে একটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে বলে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জে স্কুলছাত্রকে পিটিয়ে পুলিশে দিল শ্রমিকরা : নারায়ণগঞ্জে এক স্কুলছাত্রসহ চার কিশোরকে মারধর করে পুলিশে দিয়েছে পরিবহন শ্রমিকরা। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একদল পরিবহন শ্রমিক সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক এলাকায় কয়েকজন কিশোরের ওপর চড়াও হয়ে মারধর করে। পরে চারজনকে তারা পুলিশে দেয়।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি আবদুস সাত্তার বলেন, “পরিবহন শ্রমিকরা চার কিশোরকে থানায় দিয়েছে। তাদের মধ্যে একজন রায়েরবাগ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। দুইজন হকার। অন্যজনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।” কেন তাদের মারধর ও আটক করা হয়েছে তা জানাতে পারেননি ওসি। তিনি বলেছেন, চারজনকেই তারা ছেড়ে দেবেন।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি মুক্তার হোসেন বলেন, “মারধরের বিষয়টি আমি শুনিনি। তবে যারা এই কাজটি করেছে তারা ঠিক করেননি।”
স্থানীয়রা বলছেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গাড়ি ভাংচুরের প্রতিবাদে সিদ্ধিরগঞ্জ-মৌচাক এলাকার পরিবহন শ্রমিকরা সকাল থেকে অবরোধ করে আছে। তারা স্কুলব্যাগ ও ইউনিফর্ম পরা ছেলেদের দেখলে হয়রানি করছে।
নারায়ণগঞ্জে ৬ ঘণ্টা পর যান চলাচল শুরু : ভাংচুরের প্রতিবাদে ও নিরাপত্তার দাবিতে পরিবহন শ্রমিকরা নারায়ণগঞ্জে সড়ক অবরোধ করে রাখার ছয় ঘণ্টা পর প্রত্যাহার করেছে।গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করে পরিবহন শ্রমিকরা। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে বেলা আড়াইটার দিকে তারা গাড়ি চালাতে শুরু করে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম বলেন, “পরিবহন শ্রমিকরা তাদের জান-মালের নিরাপত্তার দাবিতে অবরোধ করেন। তারা নিশ্চয়তা চান।”পরে কোনো আলোচনা-সমঝোতা ছাড়াই শ্রমিকরা গাড়ি চালাতে শুরু করেন।
নারায়ণগঞ্জ বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি মুক্তার হোসেন বলেন, “সকালে শিক্ষার্থীরা শনির আখড়া ও চাষাঢ়ায় সড়ক অবরোধ করে। এরপর সাইনবোর্ড এলাকায় কিছু উৎসাহী পরিবহন শ্রমিক পাল্টা অবরোধ করে। আমরা কোনো ধর্মঘট ডাকিনি।”
স্থানীয়রা বলছেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শ্রমিকরা অপরিকল্পিতভাবে গাড়ি চালানো বন্ধ করে সড়কে অবরোধ সৃষ্টি করেন। পরে তারা হঠাৎ করেই গাড়ি চালানো শুরু করেন।
সাভারে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ভাঙচুর : ঢাকায় বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের প্রতিবাদে ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে সাভারে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ দেখিয়েছে। গতকাল বুধবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে সাভার বাসস্ট্যান্ডে নিউ মার্কেটের সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায় তারা। কয়েকজন ঢাকামুখী কয়েকটি যানবাহনে ইটপাটকেল ছুড়ে ও লাঠি দিয়ে ভাংচুর করে। তবে ঘটনাস্থলে পুলিশ জড়ো হওয়ায় তারা অল্পতেই দমে যায়।
ঢাকা (উত্তর) গোয়েন্দা পুলিশের ওসি এএফএম সায়েদ বলেন, “তারা ভাংচুরের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পুলিশের উপস্থিতির কারণে পারেনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।”পরে ঢাকার (উত্তর) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইদুর রহমান শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে তারা মিছিল করতে করতে সিঅ্যান্ডবির দিকে চলে যায়।
এদিকে রাজধানীর প্রবেশদ্বার আমিনবাজারে মিরপুর মফিদ-ই-আম স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আারিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। বিক্ষোভ চলার সময় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট দেখা দেয়। বিকালের দিকে জট কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
ময়মনসিংহে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ : ঢাকায় বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে ময়মনসিংহে বিক্ষোভ দেখিয়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে জেলা শহরের নতুর বাজার, গাঙ্গিনাপাড় ও পাটগুদাম ব্রিজ মোড় এলাকায় বিক্ষোভ দেখায় তারা। বিক্ষোভ চলার সময় তারা কয়েকটি অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের কাচ ভাংচুর করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
কোতোয়ালি থানার ওসি মাহমুদুল ইসলাম বলেন, “বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বিক্ষোভ দেখায়। এ সময় তারা ‘কয়েকটি’ অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারে ইট নিক্ষেপ করলে কাচ ভেঙে যায়। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।” বিক্ষোভ চলার সময় শহরের বেশির ভাগ দোকানপাট বন্ধ ছিল। বেলা ২টার দিকে আবার দোকানপাট খোলা হয়।
শাবি শিক্ষার্থীদের সংহতি : বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীর স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল বুধবার দুপুরে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সমানে সমাবেশ এবং বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে মানববন্ধন করে তারা।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সমাবেশে অংশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টে সদস্য তৌহিদুজ্জামান জুয়েল বলেন, “প্রশাসন শিগগির আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে না নিলে আমরাও তাদের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।“আমরা নিহত দুই শিক্ষার্থীর সহপাঠীদের নামা আন্দোলনে একাত্মতা পোষণ করছি।”
সমাবেশে সাস্ট সাহিত্য সংসদের সভাপতি শুভম ঘোষ বলেন, “অদক্ষ চালক এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারণে প্রায়ই মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। তাই এগুলোকে দুর্ঘটনা না বলে আমরা হত্যাকা- বলব। “ঢাকায় বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী মারা গেল। প্রতিবাদ করতে গেলে পুলিশ স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাল। আমরা এ ধরনের হামলার নিন্দা জানাই।”
সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাস্ট সায়েন্স অ্যারেনার সাবেক সভাপতি রিফাত হায়দার, সাস্ট ডিবেটিং সোসাইটির সাবেক সভাপতি আমির হামজা, শিক্ষার্থী খৈরম কামেশ্বর, বনি সরকার, প্রণয় কান্তি বিশ্বাস প্রমুখ। পরে বিকাল ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে মানববন্ধন করে শিক্ষার্থীরা।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী খৈরম কামেশ্বর বলেন, “আমরা বৃহস্পতিবারের কর্মসূচির ব্যাপারে রাতে সিদ্ধান্ত নিব। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।”
বরিশালে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, অসদাচরণে এসআই প্রত্যাহার : রাজধানীতে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় নয় দফা দাবিতে বরিশালে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বরিশাল নগরের চৌমাথা এলাকার ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে তারা এ বিক্ষোভ করে।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের ফলে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে দুপুর সোয়া ২ টার দিকে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীরা।
এদিকে, কর্মসূচি শুরুর দিকে কোতোয়ালি থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) হাবিব শিক্ষার্থীদের গালাগাল ও তাদের সঙ্গে অসদাচরণের কারণে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অপরদিকে, অবরোধের ফলে মহাসড়কের দু’পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ যাত্রীরা বিপাকে পড়ে যায়।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানায়, নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে বেলা ১২টার দিকে বরিশালের সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ, অমৃত লাল দে কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি মডেল কলেজ, ইনফ্রা পলিটেকনিক কলেজসহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েকশ’ শিক্ষার্থী নগরের চৌমাথা এলাকায় আসেন।
এসময় তারা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই নয় দফা দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করে।
কিছু সময় পরে তারা একটি মিছিল বের করতে চাইলে এসআই হাবিবসহ পুলিশ সদস্যরা তাদের বাধা দেন। পরে পুলিশের এসআই হাবিব শিক্ষার্থীদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও তাদের মারতে উদ্যত হন। এতে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্দ হয়ে দুপুর ১টার দিকে মহাসড়ক অবরোধ করে।
শিক্ষার্থীরা জানায়, ঘটনাস্থলে মেট্রোপলিটন পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার শাহানাজ পারভীন ও কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল ইসলাম উপস্থিত হয়ে আমাদের (শিক্ষার্থীদের) সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করেন এবং পুলিশের দেওয়া আশ্বাসে বেলা সোয়া ২টার দিকে মহাসড়কের অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
তবে তারা সহপাঠীদের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত চালক ও হেলপারের উপযুক্ত শাস্তিসহ নিরাপদ সড়কের জন্য সুনির্দিষ্ট আশ্বাস চেয়েছেন। একইসঙ্গে বরিশালের সড়কে চলাচলরত যানবাহনের চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স ও দক্ষতার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া ও নগরের বিভিন্নস্থানে যত্রতত্রভাবে গড়ে উঠা অটোরিকশা ও থ্রি-হুইলার স্ট্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়।
বরিশাল সরকারী সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের শিক্ষার্থী সুহাদ বলেন, সহপাঠী নিহত হওয়ার ঘটনায় দোষী চালকদের বিরুদ্ধে ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে বৃহস্পতিবার (০২ আগস্ট) সকাল ১১টায় পুনরায় চৌমাথা এলাকায় কর্মসূচি পালন করা হবে।
বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানার সেকেন্ড অফিসার সত্য রঞ্জন খাসকেল বলেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পুলিশের এক কর্মকর্তা গালাগাল করেছেন বলে অভিযোগ উঠে। পরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এসআই হাবিব নামের ওই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করেছেন। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
যানচলাচল স্বাভাবিক হলো ঢাকার সড়কে : সারা দিন স্থবির হয়ে থাকার পর বুধবার (১ আগস্ট) বিকাল থেকে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচির ইতি টেনেছে। এরপরই রাজধানীতে রিকশা ও মোটরযানের চলাচল ফিরে পায় চেনা চিত্র।
শাহবাগে বৃষ্টি নামার পরে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শিক্ষার্থীরা চলে যায়। এরপর স্বাভাবিক হয় সেখানকার যানচলাচল। এর আগে দিনভর বিভিন্ন দাবি নিয়ে অবস্থান করেছে তারা। এছাড়া শিশুপার্কের উল্টো দিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স না পাওয়া গাড়িগুলো ঘুরিয়ে দিয়েছে এই কিশোর-কিশোরীরা।
বাংলামোটরে বিকাল ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা সরে যাওয়ার পর গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। সেখানে সকাল ১০টা থেকে তারা অবস্থান নেয়। ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা মেয়াদ নেই এমন মোটরযানগুলো ধরে পুলিশে দিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
বিমানবন্দর থেকে বনানী সড়কে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের সামনে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে আবারও অবরোধ হবে। তাদের দেওয়া সাত দফা দাবি না মানা পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে, রাজপথ ছাড়া হবে না।
যাত্রাবাড়ীতে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। এর আগে সেখানে যথাযথ কাগজপত্রবিহীন গাড়ি আটকে পুলিশকে দিয়ে মামলা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা।
গতকাল বুধবার বিকাল ৪টায় সায়েন্স ল্যাবরেটরি ছেড়েছে শিক্ষার্থীরা। এরপর সেখানে যানচলাচল শুরু হয়। তারা নিজেরাই ব্যারিকেড নিরাপদে সরিয়ে দিয়ে গেছে।
বুধবার সকাল থেকে উত্তরা, মিরপুর, ফার্মগেট, কাওরানবাজার, শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, শনির আখড়া, মাতুয়াইল, মেরাদিয়া, বনশ্রী, রামপুরাসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে যানচলাচল ছিল খুবই কম। রাস্তায় গাড়ি কম থাকায় সাধারণ মানুষ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে গেছে। তবে এ নিয়ে বিরক্তি দেখায়নি কেউ।
শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোকে যৌক্তিক মনে করছেন সাধারণ মানুষ। এরমধ্যে রয়েছে দুই শিক্ষার্থীকে বাসচাপায় ‘হত্যার’ সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণ ও নৌপরিবহনমন্ত্রীর অনৈতিক বক্তব্যের প্রতিবাদসহ ৯ দফা দাবি।
মারমুখী ছিল না পুলিশ : নিরাপদ সড়ক ও দুই শিক্ষার্থীকে বাসচাপায় ‘হত্যার’ বিচারের দাবিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গতকাল বুধবার চতুর্থ দিনের মতো সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। তাদের সড়ক অবরোধের কারণে রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেশিরভাগ এলাকায় বিকাল চারটা পর্যন্ত তারা সড়ক অবরোধ করে রাখলেও কোথাও মারমুখী ভূমিকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নামতে দেখা যায়নি।
রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে যানবাহন না থাকায় আগের তিনদিনের মতো এদিনও সাধারণ যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। সকাল থেকে উত্তরা, মিরপুর, ফার্মগেট, কাওরানবাজার, শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, শনির আখড়া, মাতুয়াইল, মেরাদিয়া, বনশ্রী, রামপুরাসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে যানচলাচল ছিল খুবই কম। রাস্তায় গাড়ি কম থাকায় সাধারণ মানুষ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছে। তবে এ নিয়ে বিরক্তি দেখায়নি কেউ। জরুরি কাজ থাকায় অনেক যাত্রীকে বাধ্য হয়ে উত্তরা থেকে ফার্মগেট, গুলিস্তান, মতিঝিল, পান্থপথসহ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে হেঁটে যেতে ও আসতে দেখা গেছে। তবে নিজেরা দুর্ভোগের শিকার হলেও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি তাদের ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন।
সতীর্থদের হারানোর বেদনা নিয়ে শিক্ষার্থীরা মাঠে নেমে একদিকে যেমন নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্লোগান দেয়, পাশাপাশি দিয়া খানম ও আব্দুল করিম সজীবের হত্যাকারীদের বিচার চেয়ে তাদের কণ্ঠে ছিল এক সুরÍ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।
এদিকে, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে রাজধানীর কোথাও মারমুখী ভূমিকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নামতে দেখা যায়নি। সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের সামান্য উপস্থিতি দেখা দিলেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে কোথাও তাদের বাধা দেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্পটে আন্দোলনের সময় ‘পুলিশের সঙ্গে বিরোধ নাই’, ‘পুলিশের সন্তানও স্কুলে পড়ে’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে ও প্ল্যাকার্ড লিখে নজর কাড়ে।
রাজধানীর র‌্যাডিসন হোটেলের সামনে কালশী ফ্লাইওভারের নিচে লিটন নামে আন্দোলনরত এক স্কুলশিক্ষার্থী জানান, ‘ আমরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে এবং আমাদের দুই শিক্ষার্থীকে বাসাচাপা দিয়ে হত্যার বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছি। আমাদের সঙ্গে পুলিশের কোনও বিরোধ নাই। পুলিশের সন্তানও স্কুলে পড়ে। তাই আমাদের দাবিগুলো তাদেরও ভেবে দেখতে হবে।’
আজ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আরেকটি অভিনব বিষয় ছিল উল্টোপথে আসা গাড়ি থামিয়ে দেওয়া। সাধারণ যাত্রীদের গাড়ি তো বটেই, শাহবাগ এলাকায় উল্টোপথ দিয়ে আসা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের গাড়িও থামিয়ে দিয়েছে তারা। বাণিজ্যমন্ত্রী তাদের কাছে পথ ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানালে তারা সাফ জানিয়ে দেয়, ‘আইন সবার জন্য সমান।’ একই এলাকায় উল্টোপথে আসা পুলিশের একটি গাড়ি থামিয়ে একই কথা বলে সে গাড়িও ফিরিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, আমরা ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।
সূত্র জানায়, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের ওপর যেকোনও ধরনের উগ্র আচরণ থেকে বিরত থাকার জন্য এবং ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশদের নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে পুলিশের কোনও আচরণে নতুন করে কোনও ইস্যু তৈরি না হয়। এ কারণেই রাজধানীর কোথাও পুলিশের মারমুখী আচরণ দেখা যায়নি।
হেঁটেই ঘরে ফিরছেন রাজধানীবাসী : কলেজ শিক্ষার্থী চাপা দেওয়ার ঘটনায় চলমান আন্দোলনে রাজধানীর সড়কগুলোতে তেমন কোনো পরিবহন নামেনি। ফলে কর্মস্থলে আসতে যেমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, তেমনি দুর্ভোগের সীমা ছিলো না ঘরমুখো মানুষগুলোর। একে তো সড়কে যানবাহন অপ্রতুল, তার ওপর গতকাল বুধবার বিকেল থেকেই বৃষ্টি। ফলে নিরুপায় রাজধানীবাসী পায়ে হেঁটেই ঘরে ফিরছেন।
ফার্মগেট থেকে বিমানবন্দর সড়কে ঘুরে দেখা গেছে, অনেকেই মতিঝিল থেকে হাঁটতে হাঁটতে বনানী পর্যন্ত চলে এসেছেন। এতে ক্লান্তির সঙ্গে যোগ হয়েছে পা ব্যাথা। ফলে অনেকেই আর হাঁটতে না পেরে বৃষ্টিতেই ভিজছেন।
সড়কে যে ক’টা গাড়ির দেখা মিলছে, তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন গাড়ির ধারণক্ষমতায় বেশি মানুষ। কিন্তু প্রতিটি গাড়ি আগে থেকেই যাত্রীতে ঠাসা থাকায় ‘ভাগ্য খুলছে’ কেবল হাতেগোনা ক’জনার। এই অবস্থায় বৃদ্ধ, শিশু, নারীদের ভোগান্তির কোনো সীমা নেই। অনেকেই তাই মোটরসাইকেল থামিয়ে একটু এগিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করছেন, এমন চিত্রও দেখা গেছে। বাইকাররাও তাদের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছেন সহানুভূতির হাত।
সোহেল রানা নামে উত্তরার এক বাসিন্দার সঙ্গে বনানী সিগন্যালে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ভাই আর পারছি না। মতিঝিল থেকে হেঁটে এ পর্যন্ত চলে এসেছি। গাড়ি নেই। যে দু’একটা আসছে তাতে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না।
মাহবুব হোসেনের সঙ্গে কথা হয় রেডিসন হোটেলের সামনে। তিনি বলেন, দেশে কোনো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেই। থাকলে এমন দুর্ঘটনাও হয় না। আন্দোলনও হয় না।
আন্দোলনের চারদিনের প্রায় প্রতিদিনই হেঁটে ঘরে ফিরতে হচ্ছে কর্মজীবীদের। ফলে অনেকেই কর্মস্থল থেকে ছুটিও নিয়ে নিচ্ছেন। এভাবে আর পারা যায় না-মন্তব্য করলেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা মোফাখখারুল ইসলাম।
ভোগান্তির এই পর্যায়ে এসে ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই আন্দোলন এখন থামানো উচিত। এটা করেই বা কি লাভ হবে। দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন কয়েকদিন হয়ে গেলো। মন্ত্রী তো পদত্যাগ করলেন না। তার কোনো শাস্তিও হলো না।
আলমগীর হান্নান নামের এক ব্যক্তি বলেন, আন্দোলন করে তো কোনো লাভ নেই। এভাবে শুধু মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। তাই এটা থামানো উচিত। সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিয়ে লাভ কি?
চট্টগ্রাম ব্যুরো : নিরাপদ সড়কের দাবিতে গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম মহানগরীতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করেছে। এ সময় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে জামালখানে কয়েকঘন্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। দুপুরের পর তারা পুলিশের অনুরোধে সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
জানা গেছে, গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম মহানগরীর কাজীর দেউড়ি মোড়ে সমবেত হয়ে মিছিল নিয়ে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে এসে জড়ো হয়। সেখানে শুরুতে সড়কের মাঝখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তারা। পরে পুলিশের অনুরোধে তারা সড়কের পাশে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করে। সমবেত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিএএফ শাহীন স্কুল এন্ড কলেজ, দেওয়ানহাট সিটি কর্পোরেশন কলেজ, বেপজা কলেজ, হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজ ও সরকারি সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা ছিলেন। মিছিল থেকে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেন।
শিক্ষার্থীরা বলেন, পড়তে এসেছি, মরতে নয়’, যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ/ যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি আমরা খুনি চালকদের বিচার চাই। আর তাদের মদতদাতা নৌমন্ত্রীর অপসারণ চাই। আমাদের একটাই দাবি- আমরা নিরাপদ সড়ক চাই। সড়কে আর কোনো মৃত্যু চাই না। শিক্ষার্থীরা বলেন, শুধু ঢাকায় নয়, চট্টগ্রামসহ দেশের সব এলাকায় পরিবহনে নৈরাজ্য বেড়েই চলছে। এ নৈরাজ্য থামানো না গেলে বাস চালকেরা ‘দানব’ হয়ে উঠবেন। সড়কে অকালেই ঝরবে তাজা প্রাণ। এ কারণে পরিবহন নৈরাজ্য থামানো জরুরি।
গাজীপুর সংবাদদাতা : বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে এবার গাজীপুরেও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বুধবার কয়েক দফা মহাসড়ক-সড়কে নেমে বিক্ষোভ ও অবরোধ করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের চান্দনা চৌরাস্তা মোড়ে আশেপাশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বুধবার সকালে মিছিল নিয়ে চৌরঙ্গী মোড়ে জড়ো হতে থাকে। এক পর্যায়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সহ্রাধিক বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কসহ ও ঢাকা-জয়দেবপুর সড়কের উপর অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এসময় শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবীতে বিক্ষোভ করতে থাকে। এতে ওই মহাসড়ক ও সড়কগুলোতে যানবাহন আটকা পড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে জেলা পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিলে দুপুর দেড়টার দিকে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। এ ঘটনার পর বিকেলে আবোরো বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠাণের শিক্ষার্থীরা একই এলাকায় মহাসড়ক-সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এ ছাড়াও কোনাবাড়ি ও টঙ্গী এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় মহাসড়ক-সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছে। এতে দীর্ঘসময় আটকে থাকা যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানায়, নিরাপদ সড়ক ছাড়াও ৯ দফা দাবিতে নৌমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি নৌ-মন্ত্রীকে শুধু ক্ষমা চাইলেই হবে না। তাকে নৌ মন্ত্রণালয়সহ সড়ক পরিবহনের নেতৃত্ব ছাড়তে হবে।
এদিকে একই দাবীতে একইদিন দুপুরে ও বিকেলে জেলা শহর জয়দেবপুরে বিক্ষোভ মিছিলসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠাণের শিক্ষার্থীরা কয়েকদফা বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেছে।
অপরদিকে জেলায় বিভিন্নস্থানে সড়ক-মহাসড়কে অবরোধের কারণে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তুলনা মুলক কমসংখ্যক যানবাহন চলাচল করেছে বলে হাইওয়ে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
সিলেট ব্যুরো : নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত, বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনার বিচার দাবিতে এবং ঢাকায় আন্দোলনরত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে শাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে শিক্ষার্থীরা।
গতকাল বুধবার দুপুরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত এ মানববন্ধনে ঢাকায় অন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির প্রতি একাত্মতা পোষণ করে বিভিন্ন বিভাগের প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। পরবর্তীতে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় একই স্থানে এসে সমাবেশে মিলিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘এটা কোন দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকান্ড। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেনা সরকার। আবার প্রতিবাদ করলে জনগণের বেতনভোগী পুলিশ সদস্যরা স্কুল-কলেজে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছে। এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হলেও তাতে দায়িত্বশীলদের কোন কর্ণপাত নেই।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ