ঢাকা, বৃহস্পতিবার 2 August 2018, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারের কূটকৌশলই বিজয়ী হয়েছে

সদ্য সমাপ্ত সিলেট সিটি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় ভোটের নামে লুটপাট ও তান্ডব চালানো হয়েছে। তাদের এই তান্ডবলীলার মহোৎসবে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মেয়র প্রার্থী এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, প্রধান এজেন্ট ও নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ। তারা বলেন, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে সিলেট সিটিতে সরকারের কূটকৌশলই বিজয়ী হয়েছে। এই নির্বাচনে ভোটারদের জনমতের প্রতিফলন না ঘটিয়ে সরকারের কৌশলের প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে। নির্বাচন চলাকালে আমাদের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে অনিয়মের লিখিত অভিযোগ পেশ ও জাতির জাগ্রত বিবেক সাংবাদিক বন্ধুদের সকল অনিয়ম ও তান্ডবের চিত্র তুলে ধরেছিলাম।
গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে মেয়র প্রার্থী এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হাফিজ আব্দুল হাই হারুন, নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক প্রফেসর ড. আব্দুল আহাদ ও সদস্য সচিব মো: ফখরুল ইসলাম বলেন, ৩০ জুলাই সিলেটে প্রকৃতপক্ষে কোন ভোট হয়নি। ভোটের নামে লুটপাটের উৎসব চালিয়ে মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। অনিয়ম, লুটপাট, কেন্দ্র দখল, এজেন্টদের বের করে দেয়া ও সন্ত্রাসী হামলার অকাট্য প্রমাণ দাখিল করে অভিযোগ করা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন কোন উদ্যোগ না নিয়ে সরকারের কর্তাব্যক্তিদের নির্দেশিত প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সিলেটবাসীকে নিজেদের তৈরী করা ফলাফল পাঠ করে শুনিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন সিটিতে লুটপাট ও তান্ডবের পরও দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানীখ্যাত পূণ্যভুমি সিলেটবাসী মনে করেছিল অন্তত সিলেটে শান্তিপুর্ণ ভোট হবে। কিন্তু সিলেটবাসীর সেই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে সিলেটের দীর্ঘদিনের চলমান রাজনৈতিক সম্প্রীতির ইতিহাসে কলংকের কালিমা লেপন করা হয়েছে। সিলেটবাসী তাদেরকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, ৩০ জুলাই ( সোমবার) নির্বাচন চলাকালীন নগরীর ১৩৪টি কেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশী কেন্দ্রে সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা নগ্ন হামলা চালিয়ে টেবিল ঘড়ি প্রতীকের এজেন্টদের বের করে দেয়। তারা কেন্দ্র দখল করে সীল মারার মহোৎসব চালায়। ভোট গণনার সময়ও ঐসব কেন্দ্রে টেবিল ঘড়ির এজেন্টরা উপস্থিত থাকতে পারেননি। কেন্দ্র দখলকালে কিছু স্থানে স্থানীয় জনতা প্রতিরোধ গড়লে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলী চালায়, এতে কয়েকজন গুলীবিদ্ধ হয়। ছাত্রনেতা ফাহাদ গুলীবিদ্ধ হয়ে এখনো আশংকাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
তারা বলেন, ভোট শুরুর পর থেকেই প্রতিটি কেন্দ্রে সরকারদলীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মারমুখী আচরণ, কেন্দ্র দখল ও টেবিল কাষ্ট ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। যাতে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যেতে না পারে। সকাল সাড়ে ৮টায় সরকার দলীয় একজন কাউন্সিলারের নেতৃত্বে ২০নং ওয়ার্ডের এমসি কলেজ কেন্দ্র দখল ও টেবিল ঘড়ির এজেন্টকে বের করে দিয়ে নৌকার টেবিল কাষ্ট ভোট গ্রহণের যে তান্ডব শুরু হয়েছিল তা সারাদিন অব্যাহত ছিল। ঐ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পর্যায়ক্রমে ২১, ২২, ২৪ ও ১৯নং ওয়ার্ডের প্রতিটি কেন্দ্রে টেবিল ঘড়ির এজেন্টদের বের করে দিয়ে কেন্দ্র দখল ও সরকারদলীয় মেয়র ও কাউন্সিলার প্রার্থীদের ব্যালট ছিনতাই করে টেবিল কাষ্ট করে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এসব কেন্দ্র দখল ও তান্ডবে সরকারদলীয় সাবেক ও বর্তমান এমপিরাও নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৮নং ওয়ার্ডে জাতীয় পার্টির একজন এমপির নেতৃত্বে ককটেল হামলা সহ কেন্দ্র দখল করা হয়। ২৪নং ওয়ার্ডের সাবেক এক এমপির নেতৃত্বে কেন্দ্র দখল ও তান্ডব চালানো হয়। দক্ষিণ সুরমার ৩টি ওয়ার্ডের সরকার দলীয় একজন এমপির নেতৃত্বে কেন্দ্র দখল ও তান্ডব চালানো হয়। জালালাবাদ ও কোতোয়ালী থানায় সরকারদলীয় কয়েক শীর্ষ নেতার মাধ্যমে কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটের মহোৎসব চালানো হয়। এছাড়া কেন্দ্র দখল, টেবিল ঘড়ির এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয়া, নৌকার প্রতীকের ভোট টেবিল কাষ্ট করায় শীর্ষ নেতাদের সাথে সরকার দলের ছাত্র, যুব ও স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন নেতারা সরাসরি অংশ নেন। ভোটের আগের দিন রাতে ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত বিভিন্ন কেন্দ্রে নির্বাচন কাজে নিয়োজিত প্রিসাইডিং অফিসারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ব্যালট বই ছিনিয়ে নিয়ে তা টেবিল কাষ্ট করে বাক্সে ভরে দেয়া হয়। পরদিন ঐসব কেন্দ্রে মেয়র প্রার্থীর ব্যালট শেষ হয়ে গেছে বলে ভোটারদের ভোট না নিয়েই বিদায় করা হয়।
তারা বলেন, নির্বাচনে তান্ডব চলাকালে সরকারে বিভিন্ন বাহিনী কোন বাধা না দিয়ে সরকারদলীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, কেন্দ্র দখল ও সীল মারার মহোৎসব চালানোর পরও সরকার দলীয় মেয়র প্রার্থী মাত্র ৮৫ হাজার ভোট পেয়েছেন। অথচ বিগত নির্বাচনে তিনি ৮০ হাজারের বেশী ভোট পেয়েছিলেন। এব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায়, সিলেটে তাদের ভোট কত? আর দখল ভোটের সীলমারা উৎসবের ভোটগুলো গেল কোথায়? এছাড়া এত তান্ডবের পরও টেবিল ঘড়ির উল্লেখযোগ্য ভোট কাউন্টিংয়ে নিয়ে আসা হয়নি। সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদের তান্ডবের কারণে নগরীর এক তৃতীয়াংশেরও বেশী কেন্দ্রে ভোট গণনার পুর্বেই টেবিল ঘড়ির এজেন্টদের জোরপুর্বক বের করে দেয়া। যেসব কেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত এজেন্ট ছিল সেই এজেন্টের স্লিপের হিসাব ও রিটার্নিং অফিসার ঘোষিত ভোটের হিসাবে ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। একদিকে সকাল থেকে ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি, কেন্দ্র দখল, টেবিল কাষ্ট তারপর এজেন্টদের বের করে দেয়া ও গণনার সময় ঘড়ির এজেন্টদের উপস্থিত থাকতে না দিয়ে টেবিল ঘড়ির প্রাপ্ত ভোটকে কাউন্টিংয়ে না নিয়ে এসে ইচ্ছেমত সংখ্যা বসিয়ে দিয়ে ভোটের সংখ্যা ঘোষণা দেয়া সবই সরকারের নীল-নকশা ও কূট-কৌশলের অংশ। ঘোষিত এই ফলাফলে সিলেটবাসীকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান তারা।
তারা আরো বলেন, অবৈধ সরকার গণতন্ত্রের সব স্তম্ভগুলোকে একে একে ধ্বংস করে দিয়েছে। সর্বশেষ স্তম্ভ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থাকে ছিনিয়ে নিয়েছে। এর মাধ্যমে সততা ও যোগ্যতার মাপকাঠির পরিবর্তে সরকারের মত ও কৌশলের প্রতিফলন ঘটানো হচ্ছে। সিসিক নির্বাচনের পুরোপুরি প্রক্রিয়া অবৈধ সরকারের কতিপয় উচ্চ পদস্ত কর্তাব্যক্তিদের সমন্বয়ে পরিচালনা করা হয়েছে। মেয়র প্রার্থী এডভোকেট জুবায়ের ও নেতৃবৃন্দ বলেন- জাতীয় রাজনীতিতে অনাস্থা, সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টির মাধ্যমে জোট ভিত্তিক রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এই পন্থা অনুসরণ করা হয়েছে। ২০ দলীয় জোটকে ভেঙ্গে খালি মাঠে গোল দিয়ে পুনরায় গদি দখল করতে সরকার যে সুগভীর ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে সিসিক নির্বাচন হলো তাদের প্রথম টেস্ট কেইস। আমরা অত্যন্ত বলিষ্টতার সহিত বলতে পারি যে- সিসিক নির্বাচনে ভোটারদের জনমতের পরাজয় ঘটিয়ে সরকারের কূট-কৌশলকে বিজয়ী করা হয়েছে। সিলেট তথা দেশবাসীকে এই ফলাফলে বিভ্রান্ত না হয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন ও মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান তারা।
 নেতৃবৃন্দ বলেন- মেয়র প্রার্থী এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের নির্বাচনী কাজে যারা জড়িত থেকে, ভোট দিয়ে, কেন্দ্র দখল প্রতিরোধ করতে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এছাড়া ভোট চলাকালে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে যারা আহত হয়েছেন তাদের আশু সুস্থতা কামনা করেন এবং যারা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন তাদের মুক্তির দাবী জানান। ৩০ জুলাইয়ের প্রহসনের পাতানো নির্বাচনের প্রধান স্বাক্ষী সিলেটের সাংবাদিক বন্ধুদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তাদের সাহসী লেখনিতে সিলেটের ভোট উৎসবের নামে লুটোৎসবের প্রকৃত চেহারা ফুটিয়ে তুলেছেন। সিলেটবাসীকে এই সরকারের কূট-কৌশলের পাতানো নির্বাচনের ফলাফলে বিভ্রান্ত না হয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন ও  মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাপিঁয়ে পড়ার আহ্বান জানান তারা। নেতৃবৃন্দ এই পাতানো নির্বাচনকে বাতিল করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জোর দাবী জানান। বিজ্ঞপ্তি

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ