ঢাকা, বৃহস্পতিবার 2 August 2018, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রূপসায় কর্মজীবী শিশুদের ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

খুলনা অফিস : শিক্ষা বঞ্চিত কর্মজীবী শিশু ও ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে খুলনার রূপসায় চালু হয়েছে অনুশীলন মজার স্কুল। চিত্ত বিনোদনসহ নানা কৌশলে শিশুদের লেখা-পড়ায় আগ্রহী করে তোলা হচ্ছে ব্যতিক্রধর্মী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ব্যক্তি প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এ স্কুলে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে পাঠদান করাচ্ছেন ১০ জন শিক্ষক। তবে, গত তিন বছর ধরে এর কার্যক্রম চললেও নেই নিজস্ব কোন জমি। নেই মান সম্মত শ্রেণী কক্ষ। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মূল লক্ষ্যে পৌঁছাতে অনেকটা হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। উপজেলার ইলাইপুর গ্রামের বাসিন্দা অলোক দাস ২০১৫ সালে ১৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে তার নিজ এলাকায় গড়ে তোলেন অনুশীলন মজার স্কুল। স্কুল করার নিজস্ব জায়গা না থাকায় ৫ বছর মেয়াদে জমি লিজ নিয়ে সেখানে ৪টি শ্রেণী কক্ষে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম। সরকারি কোন অনুদান বা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আর্থিক অনুদান না নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে যাচ্ছেন। তার এ কাজে উৎসাহী হয়ে এগিয়ে এসেছেন আরো নয় জন শিক্ষিত যুবক। স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে তারাও শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন। পাঠ্য-পুস্তকসহ যাবতীয় শিক্ষা উপকরণ এবং বছরে দু’বার নতুন পোষাক প্রদান করা হয় শিক্ষার্থীদের। বিদ্যালয়ের এসব ব্যয় বিভিন্ন ব্যক্তিদের স্ব-ইচ্ছায় প্রদানকৃত অর্থে চালানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। চিত্ত বিনোদনসহ নানা কৌশলে এ স্কুলে শিক্ষার্থীদের লেখা-পড়ায় আগ্রহী করে গড়ে তুলে বছরের প্রথম দিকে ভর্তি করে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্বল্প পরিসরে অনুশীলন মজার স্কুলের যাত্রা শুরু হলেও এখন তা বৃহৎ রূপ ধারণ করেছে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে পূর্ব রূপসায় আরো একটি শাখা চালু হয়েছে। গত তিন বছরে ৮০ জন শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়মুখী করা হয়েছে। দু’টি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শিক্ষার্থী রয়েছে ৭০ জন। পর্যবেক্ষনে রয়েছে আরো ২০জন। এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেয়ার পরও অনুশীলন মজার স্কুলের কার্যক্রম থেমে থাকে না। এ স্কুল থেকে ভর্তি করা অন্যান্য শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শিক্ষা উপকরণ এবং ফ্রি-টিউশন দেয়া হয়। দেয়া হয় স্বাস্থ্যসেবা। এমনকি যেসব শিশুদের জন্ম নিবন্ধন নেই, তাদের জন্ম নিবন্ধন করানো হয় এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

বিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত কর্মজীবী শিশু মো. শুকুর আলী (৮) জানায়, আগে মায়ের সাথে চিংড়ির মাথা-খোসা ছিলতাম। এখন আমি স্কুলে যাই। পড়তে আমার ভালো লাগে। মো. আপন শেখ (১১) জানায়, আগে মাছের আড়তে ঝুড়ি ও পানি টানতাম। এখন আর কাজ করিনা। লেখা-পড়া শিখে তারপর কাজ করবো। মিলন শেখ (১০) জানায়, আগে মাছের ঘেরে কাজ করে জীবন চলতো। অনুশীলন মজার স্কুলে পড়ার পর এখন ইলাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ি। লেখা-পড়া ছাড়া এখন আর কিছু ভালো লাগেনা।

স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অলোক দাস বলেন, আমি নিজে একজন কর্মজীবী শিক্ষার্থী ছিলাম। এসএসসি পরীক্ষার সময় কাঠ মিস্ত্রির কাজ করতাম। এইসএসসি’র সময় কোম্পানীতে গ্রেটারের কাজ করতাম। এভাবে কাজের ভিতর থেকে মাস্টার্স করেছি। তাই কর্মজীবী শিশুদের কষ্টটা আমি বুঝি। একারণে এসব শিশুদের শিক্ষার মুল ধারায় ফিরিয়ে আনতে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুরু করি। তিনি বলেন, এসব শিশুদের সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা এবং সেবা-যত্নের মাধ্যমে আমরা বিদ্যালয়মূখী করে তুলি। অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা খুবই নিম্ন পেশায় কাজ করতো। কেউ কেউ ভিক্ষাবৃত্তিও করতো। তাদেরকে সে অবস্থা থেকে ফিরিয়ে এনেছি। ঈদে এসব শিক্ষার্থীদের নতুন পোষাকের পাশাপাশি সেমাই-চিনি এবং কুরবানির ঈদে গোশত প্রদান করি। এলাকার বেশ কিছু সমাজসেবী আমাকে এসব ব্যাপারে সাপোর্ট দেন। তিনি আরো বলেন, এসব শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে যাতে কাজের জন্য ভোগান্তির শিকার হতে না হয় সে জন্য ভবিষ্যতে লার্নিং ও আর্নিং প্রজেক্ট চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি অর্থ বছরে উপজেলা পরিষদ থেকে তিন বান্ডিল টিন এবং দু’দফায় ৫৩ হাজার টাকা পেয়েছি। যা স্কুলের উন্নয়নে ব্যায় হয়েছে। তবে, প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে এগিয়ে নেয়ার জন্য জমি দরকার। দরকার মান সম্মত শ্রেণীকক্ষ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ