ঢাকা, বৃহস্পতিবার 2 August 2018, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কিশোর-কিশোরীদের সাহসী আন্দোলন

রাজধানীর কুর্মিটোলা এলাকায় একজন ছাত্র ও একজন ছাত্রীকে বাস চাপা দিয়ে হত্যা এবং প্রায় ১৫ জন ছাত্রছাত্রীকে আহত করার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো রাজনৈতিক দল বা কোনো দলের নেতা-নেত্রীদের মুখের দিকে ন্যায়বিচারের আশায় তাকিয়ে থেকে অপেক্ষায় সময় নষ্ট করেনি স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। কুর্মিটোলা ও উত্তরা এলাকায় শুরু হওয়া আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিয়েছে পুরো রাজধানীর ছাত্রছাত্রী তথা কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা।
রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা দূরে থাকুন, বিশেষ কোনো স্কুল বা কলেজের ছাত্রছাত্রীদেরকেও ডাক দিতে বা আহ্বান জানাতে হয়নি। সবাই এসেছে নিজেদের মনের তাগিদে। টঙ্গী ও উত্তরা থেকে শুরু করে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পল্লবী, গুলশান, বনানী, বসুন্ধরা, ফার্মগেট, আসাদগেট, গ্রিন রোড, মালিবাগ, মগবাজার, শান্তিনগর, মতিঝিল এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশসহ পুরনো ঢাকার প্রতিটি এলাকা পর্যন্ত সর্বাত্মক আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে। রাজধানীর নিকটবর্তী গাজীপুরে তো বটেই, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহসহ এমন কোনো জেলা বা বিভাগীয় শহরের কথা বলা যাবে না, যেখানে কিশোর- কিশোরীদের দুর্দান্ত সাহসী এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েনি। দিন দিন ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ যেমন অবিশ্বাস্য হারে বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে আন্দোলনের গতিবেগও।
ছাত্রছাত্রীরা শুধু সড়ক অবরোধ করেই থেমে পড়ছে না, তারা আজকাল বাস ড্রাইভারদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করছে। বাসের রুট পারমিট এবং ফিটনেস সার্টিফিকেট আছে কি না সে সবও পরীক্ষা করে দেখছে তারা। অথচ এগুলো পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। শুধু তা-ই নয়, ছাত্রছাত্রীরা সড়কের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতেও শুরু করছে। ট্রাফিক পুলিশকে তারা ধারেকাছে আসতে দিচ্ছে না। ছাত্রছাত্রীদের এ ধরনের কার্যক্রমে কৌতূহলোদ্দীপক এবং অস্বাভাবিক অনেক ঘটনাও ঘটছে।
গতকাল বুধবার এরকম সর্বশেষ এক ঘটনায় শাহবাগ এলাকায় ‘রং সাইড’ তথা উল্টো দিক দিয়ে যাওয়ার কারণে ছাত্রছাত্রীরা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের গাড়ি আটক করেছে। বলেছে, “আইন সবার জন্য সমান। সুতরাং আপনার গাড়ি ‘রং সাইড’ দিয়ে যেতে পারবে না।” ধমক ও হুমকি দেয়া এবং পুলিশকে দিয়ে ভয় দেখানোর পাশাপাশি অনেক তোষামোদ করেও কোনো লাভ হয়নি। মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে তার গাড়ি নিয়ে উল্টো দিক থেকে পেছনে ফিরে যেতে হয়েছে। তার আগে ছাত্রছাত্রীরা মন্ত্রীকে তার গাড়ি থেকে নেমে আসতে বাধ্য করেছে। বাংলামোটরের কাছাকাছি এক স্থানে রাজপথে দাঁড়িয়ে তাকে বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যথেষ্ট নমনীয় সুরে ও ভাষায় কথা বলতে হয়েছে। অর্থাৎ তোফায়েল আহমেদের মতো পাকিস্তান আমলের একজন তুখোড় ছাত্রনেতা এবং প্রভাবশালী মন্ত্রীও ছাত্রছাত্রীদের কাছে নতি স্বীকার না করে পারেননি। প্রায় বিশ মিনিটের এ দৃশ্যটি অনেকেই মোবাইলে রেকর্ড করেছে এবং সেটা ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গতকাল বুধবার বিকেলের মধ্যেই ‘ভাইরাল’ হয়েছে।
এদিকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আন্দোলন সর্বতোভাবে কিশোর- কিশোরীদের হলেও এর সঙ্গে ক্রমাগত জড়িয়ে পড়ছেন বিশেষ করে পিতামাতা ও অভিবাবকসহ ছাত্রছাত্রীদের স্বজনেরাও। হাঁটি হাঁটি পা পা করে রাজনৈতিক দলগুলোও এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। অনতিবিলম্বে অবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন না ঘটলে কিশোর-কিশোরীদের এই আন্দোলন আরও বড় আন্দোলনের পরিণত হতে পারে বলে অনুমান করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
অথচ এমনটি হওয়ার কিন্তু কথা বা কারণ ছিল না। বাস্তবে নিজের অবস্থানকে যৌক্তিক দেখাতে গিয়ে পরিস্থিতিকে বিষময় করে তুলেছেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান। দুই দুটি তরতাজা প্রাণের কিশোর-কিশোরীকে হত্যা এবং আরো কয়েকজনের ওপর দিয়ে বাস চালিয়ে দেয়ার মতো শোকাবহ ঘটনার পরও এই মন্ত্রী মহোদয় হেসেছিলেন এবং সাংবাদিকদের বলেছিলেন, প্রতিবেশি ভারতের রাজ্য মহারাষ্ট্রে তো গতকালও এক সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে। মন্ত্রী শাজাহান খান সেই সাথে প্রশ্ন করেছিলেন, কই ভারতে তো এই মৃত্যু নিয়ে কোনো হইচই হয়নি। তাহলে বাংলাদেশে কেন মাত্র দুটি মৃত্যুর জন্য এত হইচই হবে? হইচই কেন হচ্ছে তারও কারণ জানতে চেয়েছিলেন মন্ত্রী হাসতে হাসতেই। তার চেহারা এবং প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছিল যেন কলেজের দু’জন ছাত্রছাত্রীর ওই অপমৃত্যু গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ই নয়!
বলা দরকার, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ আরো কয়েকজন ‘মর্মাহত’ হয়েছেন বলে খবর রটিয়ে দেয়া  হলেও শাজাহান খান কিন্তু এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ পর্যন্ত প্রকাশ করেননি। মাফ তো চানই নি। আপত্তি ও প্রতিবাদের কারণ হলো, সরকারের নীতি-মনোভাব ও কর্মকান্ড বরং শাজাহান খানের অবস্থানকেই শক্তি যুগিয়ে চলেছে। সরকার পুলিশকে দিয়ে শিশু-কিশোরদের ওপর নিষ্ঠুর দমন-নির্যাতন চালাচ্ছে। লাঠি ও বুটের আঘাতে রক্তাক্ত করছে। তাদের গ্রেফতার করে  নিয়ে যাচ্ছে। কিশোরী মেয়েদের পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে না পুলিশ। তাদেরকেও রাজপথে ফেলে লাথি মারা ও লাঠি পেটা করা হচ্ছে।
আমরা তরুণ-তরুণী এবং কিশোর-কিশোরীদের ওপর চালানো এই যথেচ্ছ নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। সরকারের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর উচিত অনতিবিলম্বে বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয়া এবং দমন-নির্যাতনের ভয়ংকর পথ থেকে সরে এসে ছাত্রছাত্রীদের দাবির প্রতি সম্মান দেখানো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ