ঢাকা, বৃহস্পতিবার 2 August 2018, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৯ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মানুষ গড়ার আঙিনায় দানবীয় আক্রমণ

মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান : [দুই]
আমাদের পার্শবর্তী দেশ ভারতেও কোটা পদ্ধতি চালু আছে। ভারতে একবার যাকে কোনো পর্যায়ে কোটার সূযোগ দেয়া হয়, তিনি জীবনে আর এ বিষয়ে কোটার সূযোগ পাবেন না। কিন্তু আমাদের দেশে কোটা সিস্টেমকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে সরকারী নিয়োগের সিংহভাগ কোটায় পূরণ হওয়ার পর খুব সামান্য সংখ্যক পদই মেধাবীদের জন্য উম্মুক্ত থাকে। মেধাবীদের জন্য উম্মুক্ত এ পদগুলো আবার মামা-খালু এবং তথাকথিত তদবির বাণিজ্যের জন্য তাও আবার মেধাবীদের কপালে জোটা খূব মুশকিল হয়ে যায়। কোটা পদ্ধতির সংষ্কারের দাবী দীর্ঘ দিনের। এ বিষয়ে মাঝে মাঝে বাদ-প্রতিবাদ এবং পত্র-পত্রিকায় লেখা হলেও প্রকাশ্য আন্দোলন শুরু হয় ২০০৬সালে তবে কোট সংষ্কার নিয়ে এবারের আন্দোলনে ভিন্নমাত্রা দেখা গেছে। গোটা দেশের ছাত্ররা একযোগে যেভাবে রাজপথে নেমে এসেছে এভাবে আর কখনো হয়নি। ছাত্রদের তীব্র আন্দোলনের মূখে প্রধানমন্ত্রীর তরফে যখন বলা হলো কোটা পদ্ধতিই থাকবে না। আন্দোলনকারী ছাত্ররা এ কথায় বিশ্বাস করে পড়ার টেবিলে ফিরে গিয়েছিলো কিন্তু দেখা গেলো প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য মৌখিক ঘোষণা ব্যতীত আর কিছুই না। কিছুদিন যাবৎ তারা আবার আন্দোলনের ময়দানে। এ দফায় নতুন করে কোটা বিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সারাদেশেই তাদের উপর বিভিন্নভাবে আক্রমণ এবং হামলা হয়েছে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের উপর এই ন্যাক্কারজনক আক্রমণের সংবাদ প্রায় সকল জাতীয় দৈনিক এবং টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে। আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের উপর নির্যাতনের বেশ কিছু চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে। ঢাবি ক্যাম্পাসে একজন ছাত্রীর উপর অন্য কয়েকজন ছাত্র নামধারীর আক্রমণ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্রকে ২০/২৫ জন লাঠিয়ালও হাতুড়িওয়ালা নির্মমভাবে পেটাচ্ছে-এ দৃশ্য সচেতন প্রায় সকলেরই চোখে পড়েছে। এই লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কি না জানি না। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র। তাকে যারা এভাবে নির্মমভাবে মেরেছে তারা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের পরিচয়েই এই নির্দয় নির্মম কান্ড ঘটিয়েছে বলেই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও ছাত্রলীগ তা অস্বীকার করেছে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের উপর এ দানবীয় আক্রমণ শুধু ঢাবি এবং রাবিতেই নয়, দেশের প্রায় সব ক’টি বিশ্ববিদ্যালয় ও বড়ো বড়ো কলেজ ক্যাম্পাসেই হয়েছে।  কোটা বিরোধী আন্দোলনের সমর্থক সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা আক্রমণ এবং হামলার শিকার হলেও বেশীর ভাগ যায়গায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে নিস্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। আক্রান্ত ছাত্রদের রক্ষায় এগিয়ে না আসা এবং আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ব্যবস্থা না নেয়ায় বোঝাই যায় যে আক্রমণকারী কারা ? অবশ্য ছাত্রলীগের সভাপতি সোহাগ বলেছে, যারা কোটাবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের উপর আক্রমণ করেছে তারা কেউই ছাত্রলীগের নয়। এমন কি সে আরো একটু আগ বাড়িয়ে বলেছে, তাদের চোখে নাকি কোটাবিরোধী আন্দোলন ধরা পড়েনি। ছাত্রলীগ সভাপতির এমন বক্তব্যের পর সহজ স্বাভাবিক ভাষায় বলা যায়, ওরা বুঝকানা-জ্ঞানকানা। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, ছাত্রলীগের দ্বারা কখনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট হয়নি। ছাত্রলীগের দ্বারা কি হয়েছে আর কি হয়নি, সে বিষয়ে লিখতে গেলে কয়েক হাজার পৃষ্ঠা লেখার পরেও শেষ করা সম্ভব নয়। ছাত্রলীগ এবং তাদের মুরুব্বীদের বক্তব্য অনুযায়ী যারা সাধারণ ছাত্রদের উপর আক্রমণ করেছে তারা কেউই ছাত্রলীগ করে না। তবে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হাতুড়ি বাহিনীর যে পরিচয় পাওয়া গেছে তাতে তার নাম পরিচয় ঠিকানা কিন্তু মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন দুটি ধারা বহমান। একদিকে ছাত্রলীগ অপরদিকে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা। এরপরেও তাঁদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ধরে নিলাম তারা ছাত্রলীগের কেউ নয়। তবে এ হামলাকারীরা কারা? নিষ্ঠুর নির্দয় এ দানবীয় পিশাচদের পরিচয় কী? তবে হামলাকারীরা ছাত্রলীগের না হলেও তারা যে সরকারী দলের কাছের লোক এতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা সাধারণ ছাত্রদের উপর আক্রমণ করেছে তারা পুলিশের সামনেই এ কাজ করেছে। পুলিশ বাধা দেয়ার সাহস করেনি অথবা প্রয়োজন মনে করেনি। ছাত্রলীগ সভাপতির বক্তব্য অনুযায়ী আক্রমণকরীরা যদি ছাত্রলীগের কেউ না হয়ে থাকে বেশ ভালো কথা। কি তাদের পরিচয় ? এ নরপিশাচ এবং হিংস্র হায়েনার পরিচয় জাতি জানতে চায় ?  দেশে কোনো কিছু হলেই সরকারের অতি সস্তা শ্লোগান ‘যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য এ সব করা হচ্ছে’ ছাত্রদের চলমান আন্দোলন নিয়ে সরকারী মহল শুরু থেকেই একটি অপপ্রচার শুরু করেছে ‘জামায়াত-শিবির এতে বাতাস দিচ্ছে’। সবখানেই তো ছাত্রলীগ, শিবিরকে দেশের কোনো ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে কোনো তৎপরতা চালাতে দেয়া হয় না। জামায়াত-শিবিরের লোকদেরকে ঘুম থেকে তুলে এনে নাশকতার ষড়যন্ত্র করার অপরাধে মামলা দেয়া হয়। সেখানে শিবিরের বাতাস দেয়ার সূযোগ কোথায় ? প্রকাশ্যতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগের দানবীয় কার্যক্রমের কারণে অন্য কোনো ছাত্র সংগঠনের তৎপরতা অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ হয়ে আছে। বিশ^বিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রলীগের একক আধপত্য বিরাজমান। সেখানে কারো পক্ষে ছাত্রলীগের বিপক্ষে গিয়ে হলে অবস্থান করে লেখা-পড়া করা সম্ভব নয়। হলে থাকতে হলে ছাত্রলীগের সভা-সমাবেশে উপস্থিতি তাদের জন্য বাধ্যতামূলক। এর যেন কোনো প্রতিকার নেই। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ মাধ্যম জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে ছাত্রলীগকে চাঁদা দিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলে থেকে লেখাপড়া করার জন্য ছাত্রলীগকে চাঁদা দিতে হয়। ছাত্রলীগ সভাপতি এবং তাদের মুুরুব্বী আওয়ামীলীগ নেতারা যতোই সাফাই গাক না কেন যে ছাত্রলীগ এ হামলার সাথে জড়িত নয়। কিন্তু বাস্তবতা কি বলে? পুরান ঢাকায় চাপাতি দিয়ে বিশ্বজিতকে কুপিয়ে হত্যা করা, বরিশাল পলিটেকনিক নিজ দলের কর্মীদের নির্মমভাবে কোপানো, সিলেট এম সি কলেজে, তান্ডব, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিপক্ষের পা কেটে নেয়া, পদ্মা সেতু নির্মাণের নামে চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে নিজ দলের কর্মী হত্যা থেকে শুরু করে হাজারো ঘটনার সাক্ষী দেশের জনগণ। এমন কোনো দিন নেই যে দিন কোনো না কোনো অপকর্মের সংবাদ শোনা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যারা নারকীয় বিভৎসতার জন্ম দিয়েছে তাঁদের বিচারের আওতায় এনে তাদেরকে ক্যাম্পাসে নিসিদ্ধ করা একটি যৌক্তিক দাবী। সাধারণ ছাত্রদের যৌক্তিক দাবী কোটা পদ্ধতির সংস্কার সাধন করতে হবে অতি দ্রুত। সরকার যে কমিটি করেছে, কমিটি যেন শুধু বৈঠক আর গবেষণা করে সময় ক্ষেপণ না করে সে দিকে নজর দিতে সংশ্লিষ্ট সকলকে। একজন জাতীয় অধ্যাপক বলেছেন, এভাবে হাতুড়ি দিয়ে পেটানোর দৃশ্য তিনি আর কখনো দেখেন নি। হ্যা সাধারণ ছাত্রদের উপর এ ধরনের হামলা এই প্রথম। তবে সরকারী দলের ছাত্র সংগঠন কর্তৃক বিরোধী পক্ষের ছাত্রদের উপর ছাত্রলীগের এ ধরনের টর্চার নতুন কিছু নয়। অধিকাংশ মিডিয়া সরকারের অনুগত হওয়ার কারণে অনেক সংবাদই তারা প্রকাশ করে না। এই সুবাদে অন্তত সরকারী দলের ছাত্র সংগঠনের চরিত্রের ভয়াবহতার সামান্য দিক প্রকাশিত হয়েছে এবং সরকার মিডিয়াও তা প্রকাশ না করে পারেনি। মানুষের কথা বলার অধিকার, মত প্রকাশের অধিকার, সভা-সমাবেশ করার মতো সংবিধান স্বীকৃত অধিকারগুলো রহিত করে একদলীয় স্বৈরতন্ত্র জারি রাখার কারণেই এ সকল দানবীয় কর্মকান্ডের সৃষ্টি। জনগণের সংবিধান স্বীকৃত অধিকারগুলো উম্মুক্ত করে দেয়া সময় এবং বাস্তবতার দাবী। একদলীয় জুলুমতন্ত্রের ছায়ায় প্রশাসনের নাকের ডঁগায় যারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করছে, তাদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। জনগণের জন্য জনগণের শাসনের পথকে প্রশস্ত করতে হবে। নচেৎ আজ যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের উপর পৈশাচিক আক্রমণ করেছে তারা একদিন ফ্রাঙ্কেইনস্টেইন দানবের মতো তাদের আশ্রয়দাতাদের উপর চড়াও হতে দ্বিধা করবে না।  [সমাপ্ত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ