ঢাকা, শুক্রবার 3 August 2018, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ২০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মেস মেম্বার

মাখরাজ খান : বেঙ্গি হাতেম কন্ট্রাক্টরের বাড়ি থেকে ফিরে ঘাড় নিচু করে বসে রইলো। খসরুর বউ মাইকে বিদ্যুতের ট্যানেসফার্মায় আগুন লাগার কথা শুনে গ্যাসের চুলা বন্ধ করে দিয়েছে। বিদ্যুতের মেইন সুইচও অফ। বেঙ্গিকে এই সময় কিছু বলা ঠিক হবে কিনা ভাবছে। 

-নাসরিন। অন্য সময় বেঙ্গি বলে ডাকলেও এখন বেঙ্গির মন ভাল করার জন্য তাকে নাসরিন বলছে।

বেঙ্গি জবাব দিলো- বল।

-সব আমাদের ভাগ্য, পার্লারে গেলাম। তোমার জন্য দোয়া-দরুদ পড়লাম, যাতে এবার বিয়েটা হয়। ফস্কে গেলো।

-ভাগ্যের দোষ দিয়ে লাভ নেই, দোষ আমাদের বুদ্ধির। কনে দেখতে এলে কেউ কি ওভাবে দেখায়।

-দুলাভাই তো তোমার সঙ্গে ছিল, ওনি তো বেশ অভিজ্ঞ মানুষ।

-একটা পাগল, ফুলের তোড়া, ম্যাডাম রেডি এইসব আবোল-তাবোল বলতে বলতেই সময় শেষ করে দিল। তারপর তো...

-হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। একটা সুযোগ নষ্ট হয়ে গেল।

-একটা না, দুইটা। এর আগেও তো মিজান সাহেব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে আমাকে দেখতে গিয়েছিল।

-তখনকার কথা আলাদা। তখন তো তুমি আর খালা মিলে এক নাটক করেছিলেন, এবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলো।

-আমার নিজের ভুলের জন্য এসব হচ্ছে ভাবী, ভাগ্যের দোষ দিয়ে লাভ নেই। দুলাভাইয়ের অতি চালাকির কথা শোনেও কোনো ফায়দা নেই।

-তোমাকে তো আমি আগেই বলেছিলাম, মেসের উকিল সাহেব আর মিজানকে এখানে ডেকে আনো, আমি কথা বলি। তোমরা শালী-দুলাভাই মিলে আমার কথার পাত্তাই দিলে না। আমার কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

-বেঙ্গি ভাবীর দিকে ঠা-া নজরে তাকিয়ে রইলো, এসব বিষয়ে তার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। খসরু মিয়ার বউ শ্যামলীকে কি সে কম চিনে?

মেসের উকিলের সাথে গতকাল সন্ধ্যায়ও তো কথা বলেছে শ্যামলী।

বেঙ্গি বললো, ভাবী আমার কিন্তু মোটেও খারাপ লাগছে না। এসব ব্যাপারে মন খারাপ করলে কনে পক্ষের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। তোমার কান্না পাচ্ছে কেন?

এবার শ্যামলী মুখ কাচুমাচু করে ফেললো- উকিলের সঙ্গে সে গত সন্ধ্যায় যেসব কথা বলেছে, সেগুলো কোনটাই বেঙ্গির পক্ষে নয়, বরং মিজান যেন বেঙ্গি থেকে দূরে থাকে এটা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়ার জন্যই উকিলকে ডেকে এনেছিল। 

বেঙ্গির কথা শেষ হওয়ার আগেই শ্যামলীর মুখ আরো মলিন হয়ে গেল। সে মনে করলো হয়তো বেঙ্গি এরপর আসল কথাটাই বলে দিবে। অবশ্য বেঙ্গি যে কথাই বলুক শ্যামলীর কাটিয়ে নিতে কোনো অসুবিধা হবে না। রাতে যে ঘর থেকে বেরিয়ে মেসের টয়লেটে বসে থাকে তার কথার কি দাম আছে।

ভাবী।

-বল।

-শুক্কুর ভাই আমাকে নিয়ে এই তামাশা করলো কেন?

-তামাশা নয়, শালীর সাথে দুলাভাইয়ের রসিকতা বলতে পার।

-তাই বলে পাত্র ডেকে এনে তার সামনে এই ধরনের নোংরা রসিকতা।

-কেন তোমাকে বকাঝকা করেছে নাকি?

বেঙ্গি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো রসিকতা, তামাশা, বকাঝকা, সবই তো এখন অপমান বলে মনে হচ্ছে।

-নাসরিন! শোন, তোমার কিন্তু এসব মনে রাখা উচিত নয়। বিয়ের পান-চিনি, কনে দেখা, পাকা কথা- এগুলো ছাড়া তো বিয়ে হয় না।

শুক্কুর ভাই, তার নিজস্ব কৌশলে তোমার বিয়ের কথাবার্তা বলছেন, নিজস্ব স্টাইলে এর সমাপ্তি করবেন।

বেঙ্গি মুচকি হাসলো, বললো-

আগে জানতাম না, এখন নিজস্ব স্টাইল এমন কৌশলে কনে দেখাদেখি হয়!

-তুমি ভেবো না।

মিজান সাহেব এই দেখাদেখিকে সিরিয়াসভাবে নেননি।

-কি করে বুঝলে?

-একটু আগেই তো জানালা দিয়ে দেখলাম বেশ সেজেগোঁজে উকিল সাহেব আর মিজান সাহেব বেরিয়ে গেলেন।

-সেজেগোঁজে বেরিয়ে গেলেন। হয়তো আবার কোনো ম্যাডামের পাল্লায় পড়েছে।

-না হয়তো সিনেমায় গেছে। মেয়ে দেখতে গেলে কেউ বিকেলে বের হয় না। বিকেলের দেখায় বিয়ে হয় না বিলা হয়ে যায়।

-আমার তো সকালেই বিলা হয়ে গেলো ভাবী। বেঙ্গির কণ্ঠস্বর আর্দ্র হয়ে এলো।

-বাচ্চা মেয়ের মত কথা বলো না। তোমার বিয়ে তো ঠিকও হয়নি ভেঙ্গেও যায়নি। যেখানে বিয়ের কথাবার্তাই হয়নি, সেখানে বিলা হবে কি করে?

-ভা-ভা-বী।

বেঞ্জু এসে প্রবেশ করলো।

খসরু মিয়ার ছোট ভাই বেঞ্জু। কেরোসিন তেলের ড্রামের মত তার দেহ, এই বয়সেই মাথায় টাক পড়েছে। 

-তোতলাতে তোতলাতে সে বললো, স-স-সকালে....

শ্যামলী বললো, হ্যাঁ সকালে নাসরিন আর শুক্কুর ভাই বেড়াতে গিয়েছিল।

-কোথায়?

শ্যামলী কোনো উত্তর দিল না।

বেঞ্জুর সব কথার জবাব দিয়ে কোনো লাভ নেই। বরং জবাব না দিলে এক সময় নিজেই এর মনগড়া জবাব দিবে আর জবাব দিতে দিতে থেমে যাবে।

বেঙ্গির অসহ্য লাগছে? এরপর খসরু মিয়া আসবে সে এসে বেঞ্জুর মত একের পর এক প্রশ্ন করবে, শ্যামলী সত্য মিথ্যা মিশিয়ে জবাব দিবে, তারপর বেঙ্গির পালা।

না আজই সে খালার বাসায় চলে যাবে। মিজান যাকে হস্তিনী ডাকে।

তার আগে মিজানের সাথে দেখা করা প্রয়োজন ছিল। বোরখা খোঁজার জন্য পাশের রুমে চলে গেল বেঙ্গি। বেঞ্জু হা করে তাকিয়ে রইলো। শ্যামলী বেঞ্জুকে খোঁচা মেরে বললো, সকালে ম্যাডামের বর দেখা হয়নি, এ জন্য মেজাজ খারাপ। 

 

॥ দুই ॥

 

হস্তিনী খালা?

বাসা লক্ষ্মীবাজার। আগে ছিল রামপুরা। টেলিভিশন সেন্টারের কাছে। বেঙ্গি রামপুরার বাসায় বহুবার গেছে। লক্ষ্মীবাজার বাসায় এই প্রথম।

বহু খোঁজাখুঁজির পর বাসা পাওয়া গেল। কলিংবেল টিপতেই বাড়িওয়ালা বেরিয়ে এলেন।

মধ্যবয়সী ভদ্রলোক দেখে মনে হয় পুলিশ বা আর্মিতে ছিলেন। ফ্রান্সকাট দাড়ি রেখেছেন। কথা বলেন চিবিয়ে চিবিয়ে।

তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, হ্যাঁ মোটামত এক মহিলা আর একজন ভাড়াটিয়ার সাথে এক রুম সাবলেট নিয়েছিলেন। ঐ ভাড়াটিয়াকে তিনি ঠিকঠাক মত ভাড়া দেন না বলে, গতকালই তাকে বের করে দিয়েছে।

বেঙ্গি জানতে চাইলো, কোথায় গেছেন জানেন কি?

-যে মহিলা সাবলেট নিয়ে থাকে আর যার লেনদেন ঠিকমত করে না, তার খবর রেখে লাভ কি?

-তাহলে কোথায় যাব?

-ঐ ভাড়াটিয়ার সাথে কথা বলে দেখতে পারেন।

বেঙ্গি একটু আশার আলো দেখলো। হয়তো খালার সন্ধান ভাড়াটিয়া ভদ্রলোক দিতে পারবেন।

বেঙ্গি ভাড়াটিয়া ভদ্রলোককে পেয়ে গেল পাঁচ মিনিট পর। ভদ্রলোক এই মাত্র বাইরে থেকে ঘরে ফিরলেন। চোখে চশমা কাঁচাপাকা চুল হাফহাতা শার্ট ইন করা।

হস্তিনী খালার কথা জানতে চাইলে ভদ্রলোক জানালেন, খালা গতকালই চলে গেছেন।

-তাকে কি বের করে দেয়া হয়েছে?

ভদ্রলোক জিভ কেটে বললেন, ছি: ছি: তাকে বের করে দিব কেন?

-না বাড়ির মালিক বললেন, খালা নাকি ভাড়া নিয়ে গ-গোল করতো।

-ওসব কিছু না, লেনদেনের ব্যাপারে তার কোন ত্রুটি ছিল না। বিধবা মানুষ স্বামীর পেনশনের টাকা মাসে মাসে ব্যাংক থেকে তোলে এনেই, ঘরভাড়া দিয়ে দিতেন। আমার কাছেই তো তার টাকা পয়সা জমা থাকতো।

-কোথায় গেলেন তিনি-

- আজমীর শরীফ, ফিরতে মাসখানেক লাগবে। বেঙ্গির মুখ কালো হয়ে গেল, সে এখানে এসেছিল কিছুদিন থাকার জন্য হলো না।

ভাড়াটিয়া ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, আপনি কি এখানে থাকবেন? 

-না। বেঙ্গির সংক্ষিপ্ত জবাব।

এর মধ্যে ভদ্রলোকের স্ত্রী আর দুই মেয়ে এসে গেছে।

-কি গো দর্জার সামনে কার সাথে কথা বলছ? ভদ্র মহিলা বললেন?

-হামিদা বেগমের কাছে এসেছে। ভিতরে নিয়ে আস।

-বেঙ্গি ভিতরে গেল।

ভদ্রলোকের নাম মনাই খান। তিনি নয়াবাজারে কাগজের ব্যবসা করেন। তার বাড়ি টাঙ্গাইলের সাফতা গ্রামে।

বেঙ্গি মনাই খানের কথাই সচকিত হলো। মিজানের বাড়ি পাইকপাড়া-সাফর্তা আর পাইকপাড়া কাছাকাছি এটা মিজানের কাছেই শুনেছে।

-বেঙ্গি জিজ্ঞেস করলো, আপনার গ্রামের পাশেই পাইকপাড়া গ্রাম আছে চিনেন?

-কেন? কি হয়েছে তার? সে তো আমার খালাতো ভাই। 

মিজান মনাই খানের খালাতো ভাই শোনে মনে মনে শঙ্কিত হলো। যেভাবে মার্ডারের কথা বলে মিজানকে নাজেহাল করা হয়েছে। মনাই খানের কানে অবশ্যই সেসব কথা এসে গেছে।

মনাই খানের স্ত্রী মিজানের সাথে বেঙ্গির চেনাজানা আছে ধরে নিয়ে বললো, 

-ম্যাডাম কি মিজান ভাইরে চেনেন?

কি উত্তর দিবে বেঙ্গি? মিথ্যা কথা বললে ধরা খেতে হবে, সত্য কথাই ভাল।

-চিনি না তবে দু’একবার কথা হয়েছে। আমাদের বাড়ির পাশের মেসেই উনি থাকেন।

-মুইও হে কথাই ভাবছিলাম। না অইলে হেরে তো চেনার কথা না। বড় লাজুক পোলা কারো সাথে ম্যাসে না।

বেঙ্গি আর কথা না বাড়িয়ে বললো, আমি এখন যাই, রাত বোধ হয় দশটা বাজে। বেশি রাত হলে রিকশা পাব না। 

মনাই খানের স্ত্রী আঙ্গুরী বেগম উঠে বেঙ্গির কাছে এলো তারপর নরম সুরে বললো, হেয়া কি অয়। খালায় নাই বইলা। কি মুরা নাই। আইজ রাইত থাকেন কতাবার্তা কই। 

বেঙ্গি বলবো, বাসায় বলে আসিনি, যেতে হবে। বলেই সে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতে লাগলো। লক্ষ্মীবাজার থেকে বেরিয়ে হেঁটেই বাহাদুর শাহ্্ পার্কের সামনে এসে দাঁড়ালো।

রিকসা নেই। রাস্তাও ফাঁকা। দুটো লোক আসছে হেলেদুলে বেঙ্গির ভয় ভয় করছে। বেঙ্গির বোরখা পরা বলে লোক দুটো বেঙ্গিকে চিনতে পারলো না, বেঙ্গি চিনল মিজান আর উকিল।

এত রাতে এরা কোথায় গিয়েছিল? যাক পরে জানা যাবে, এদের পেয়ে ভালই হলো। এখন আর ভয়ের কোনো কারণ নেই নির্বিঘেœ বাড়ি পাওয়া যাবে।

বেঙ্গি বোরখার নেকাব সরিয়ে ডাকলো-

-মিজান সাহেব।

উকিল বললো, এ্যারামভাবে পেছন থেকে ডাক দিল ক্যারা?

-পরিচিত গলা মনে হচ্ছে।

-রাখ তোর পরিচিত গলা। রাতে-বিরেতে মাইয়া মানুষের ডাকে কাছে গিয়া কি বিপদে পড়–ম।

-দেখি না।

-দ্যাখ দেইখা বিপদ ডাইকা আন। 

-বিপদ ডাকুম কেন?

-এহন রাইত এগারটা। এই সময় ভাল মাইয়া মানুষ তোমারে ডাকপো মনে কর।

-নাম ধরে ডাকলো যে-

-তাই তো?

উকিল এবং মিজান দু’জনই ভাবনায় পড়লো বাহাদুর শাহ পার্কের পশ্চিম পাশে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। মুখ যদিও খোলা বুঝা যাচ্ছে না। 

সিপাহী বিদ্রোহের সময় এখানে অনেক সিপাইকে গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। সিনিয়রের মেয়ের বিয়ে খেতে এসে উকিল কি ভুতের কবলে পড়লো?

মিজান বললো, চল দেখে আসি।

-এ্যারাম জাগায় দেখার কি আছে, যুদি মানুষ না হয়।

-কি বলছিস, রাস্তায় আলো জ্বলছে, আকাশ অবশ্য মেঘাচ্ছন্ন, বৃষ্টি নামতে পারে। তার চেয়ে মহিলাকে ডাকি-বৃষ্টি নামলে কার্নিশের নিচে দাঁড়াতে পারবো। উকিল কোনো কথা বললো না।

বেঙ্গি রাস্তা পার হয়ে ওদের কাছে যাওয়ার জন্য অগ্রসর হলো।

 

॥ তিন ॥

তারা তিনজন যখন পীর পাগলা গলিতে এসে পৌঁছান তখন রাত সাড়ে বারটা। রাস্তায় পুলিশ টহল চলছে। বেঙ্গি টিনের গেটে ধাক্কা দিতেই বেঞ্জু গেট খোলে দিলো।

এত রাতে কে এলো জিজ্ঞেস করার কোনো আগ্রহ খসরা মিয়ার নেই। তার বউয়েরও নেই। কানে কানে শ্যামলী বেগম খসরা মিয়াকে জানিয়ে দিল, কথা না বলা ভাল।

-কেন?

-তোমার বোলপাড়া মাথায় করবে, এখন কি বিলাপ শুরু করতে পারে।

কথাটা অবশ্য ভুল বলেনি শ্যামলী বেগম। বেঙ্গির এ অভ্যাস আছে।

বেঞ্জু ঘ-ঘ-রে খাবার আছে খেয়ে নাও। 

-নারে ভাই আমার এখন খাবার ইচ্ছা নাই।

-কেন?

এত রাতে খেলে আমার পেট ফাঁপে।

বেঞ্জু চলে গেল। আসলে বেঙ্গি ঐ কথা বলে বেঞ্জুকে ভাগিয়ে দিল।

বেঙ্গি রান্না ঘরে ঢুকে চুপচাপ খেয়ে নিল। খসরু মিয়ার শোবার ঘর রান্না ঘরের পাশে। 

টিনশেড বিল্ডিংয়ে সামান্য আওয়াজ হলেই খসরু মিয়ার বউ বিড়াল এসেছে বলে চিৎকার করে উঠবে। আসলে খসরু মিয়াকে বলে দেখ, তোমার বোন রাত দুপুরে কোথা থেকে এলো। একটু আগে যে খসরু মিয়াকে কথা বলতে মানা করেছিল, সেটা তার মনে থাকবে না।

বিছানায় এসে আকাশ-পাতাল ভাবনা হলো বেঙ্গির। 

বেঙ্গির বিয়ে প্রায় ঠিকঠাক হয়ে গেলে কেন এমন হয় সে বুঝতে পারে না। খুব ছোট বেলায় বেঙ্গির বিয়ে হয়েছিল, ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়। মাত্র দু’মাস শ্বশুর বাড়ি থাকার পর সে বাপের বাড়ি এলো আর জামাইয়ের খোঁজ নেই। তার শ্বশুর বাড়িও যাওয়া হয়নি। 

দেয়াল ঘড়িতে দুইটা বাজে, চোখে ঘুম নেই। পাশের বাসার কে যেন কাঁদছে। 

বেঙ্গি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করছে উত্তর দিচ্ছে নিজেই। এক বেঙ্গি প্রশ্ন করে আরেক বেঙ্গি উত্তর দেয়।

-কেমন আছ বেঙ্গি বেগম?

-ভালো।

-শুধু ভাল।

-ভালোর আবার রকমফের আছে নাকি?

-আমি কেমন আছি জিজ্ঞেস করলে না তো?

-হ্যাঁ ভুল হয়ে গেছে।

-তোমার সব কাজেই ভুল হয়, তোমার জীবনটাই একটা ভুলের পাহাড়।

-হ্যাঁ তা যা বলেছ।

-ভুলের পাহাড় সিঙ্গাতে হবে।

-আমার কি এখন আর অত শক্তি সাহস আছে।

-তোমার একটা মন আছে তো?

-মনে হয় আছে না হলে দুঃখ পাই কেন?

-তাহলে তোমার সাহস শক্তি দুটোই আছে।

মানুষের মনের মধ্যেই সাহস আর শক্তি লুকিয়ে থাকে। তাকে ধীরে ধীরে আদর করে বাইরে আনতে হয়।

বেঙ্গির হাসতে ইচ্ছে হলো। ছোট বেলা থেকে শুনে এসেছে, দেহে শক্তি থাকলে সাহস বাড়ে আর এখন শুনছে সাহস শক্তি দুটোই মনে থাকে, আবার আদর করে বাইরে আনতে হয়।

-কি ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?

-হ্যাঁ ঘুম আসছে।

-ঘুমাও ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। আরেকদিন তোমার সাথে আলাপ করবো।

-বেঙ্গি ঘুমিয়ে পড়ে।

পরদিন ঘুম ভাঙে বেলা দশটায়।

গত রাতের কথা সব ভুলে গেছে। মাথা এখনো ভারী বোধ হচ্ছে।

জানালা খোলে একবার মেসের দিকে তাকালো বেঙ্গি। মিজান বোধ হয় আজ অফিসে যায়নি। সে মেসের কলে গোসল করছে। বেঙ্গি টিনের গেট পার হয়ে মাঠে এসে দাঁড়ালো। পাশের বাড়ির এয়ার হোস্টেজের কাজের মেয়ে ছাদে কাপড় মেলছে। 

হাতেম আলি কন্ট্রাক্টরের বাড়ির গেটের সামনে জটলা হচ্ছে।

মিজানের গোছল শেষ হয়ে গেলো, সে মেসের ভিতর যাচ্ছে। বেঙ্গিও বাড়ির ভিতর চলে এলো।

পীর পাগলা গলিতে মাঝে মাঝে জটলা, ধাক্কা-ধাক্কি হয় কিন্তু কোনো সময়ই মারামারির পর্যায়ে যায় না। হাতেম আলি কন্ট্রাক্টরের বাড়ির সামনে যে জটলা হচ্ছে, সেটা বোধহয় সংঘর্ষের রূপ নিবে। টাকা-পয়সা লেনদেনের মামলা।

মিজান, উকিল দু’জনই বেরিয়ে এলো। হাতেম আলির ভাই বিদেশে লোক পাঠানোর কথা বলে যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে তারাই চিল্লাচিল্লি করছে। 

উকিল মিজানকে বললো-

-হাতেম আলির বাড়িতে এরাম হয় আগেই জানতাম।

-তাহলে আমাকে বলিসনি কেন?

-তোকে বোললে কি হতো? মেয়ে দেখা বন্ধ করতি।

-মিজান হাতেম আলির বাড়িতে ম্যান্ডামকে দেখতে গিয়ে যেভাবে ফিরে এসেছিস, বিদেশে চাকরি প্রার্থিরা কি সেভাবেই ফিরে যাবে?

উকিল মিজানকে পিছন থেকে ধাক্কা মেরে বললো,

-চল এখানে থাকি দরকার নাই। তিন আমিরজান ঘরের বার হবে?

দিনের বেলায় চক্কের উপর লাইট মারবে। উকিল কথায় মিজান মুচকি হেসে বললো,

-পিছনে চেয়ে দ্যাখ, সামনে তিন আবিরজান পিছনে ম্যাডাম।

উকিল পিছনে তাকালো বেঙ্গি বেগম দাঁড়িয়ে আছে মেসের পাশে। উকিল দিকসিক না ভেবে সোজাসোজি বললো-

-কাল রাতে কোনো অসুবিধা হয় নাই।

-কাল রাতে কোনো অসুবিধা হয় নাই তো ম্যাডাম।

-না অসুবিধা কি হবে, আপনারা না থাকলে সম্ভাবনা ছিলো।

-এ জন্যই ঢাকা শহরে এই সিজনে ছাতা নিয়ে বের হতে হয়।

বেঙ্গি মুচকি হেসে বললো, হ্যাঁ মাথার উপর ছাতা থাকলে আর কোনো ডরভয় থাকে না।

উকিল কি উত্তর দিবে চিন্তা করছে। এমন সময় শুক্কুর আলি কোথা থেকে যেন উদয় হয়ে বললো-

-নারীর সবচেয়ে বড় ছাতা হলো তার স্বামী।

উকিল বললো, আর পুরুষের ছাতা?

-টাকা।

মিজান উকিলের পাশ থেকে মেসের ভিতর চলে গেলো। শুক্কুর আলিকে সে সহ্য করতে পারে না। লোকটা শুধু অসামাজিকই নয়, বোকাও। কিন্তু এমন ভাব দেখায় যে তার মত চতুর লোক এ মহল্লায় নেই।

বেঙ্গিও শুক্কুর আলি কথার কোনো জবাব দিল না। এতক্ষণ বেঙ্গি উকিলের সাথে কথা বললেও মিজানের সাথে তার চোখে চোখে কথা হচ্ছিল শুক্কুর আলি এসে সরব-নীরব সব কথাই বন্ধ করে দিল। 

বেঙ্গির খুব খারাপ লাগছে।

মিজানেরও খারাপ লাগছে, কাল রাতে সদরঘাট থেকে আসার সময় বেঙ্গির সাথে কথাবার্তা বলার সুযোগ ছিল কিন্তু উকিল বাম হাত দিবে বলে কথা বলেনি।

বেঙ্গি বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়লো। গান বাজছে খসরু মিয়ার বাড়িতে বোধহয় সাউন্ড বক্স লাগিয়েছে বেঞ্জু। মাঝে মাঝে এ ধরনের গান বাজে ঐ বাড়িতে দু’একদিন মিজান শুনেছে কিন্তু কান দেয়নি। 

আজ কান পেতে শুনছে কী গান? বিরহের গান। মিজানের চোখে পানি এসে গেছে-

না, গান শুনে চোখে পানি আসা মোটেই ভাল লক্ষণ নয়।

ভাগ্য ভাল উকিল দেখতে পাইনি।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ