ঢাকা, শুক্রবার 3 August 2018, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ২০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কবি আল মাহমুদকে যেমন দেখেছি

মুহম্মদ মতিউর রহমান : (গত সংখ্যার পর) তাঁর সাথে দু’সপ্তাহের নিকট-সান্নিধ্য আমার জীবনের এক আনন্দময় স্মৃতি। তিনি বলতেন, ‘এ অভিজ্ঞতার কথা আমি কখনো ভুলবো না, আমার লেখায় আমি এ আনন্দস্মৃতি ধরে রাখবো এবং বাংলাদেশে গিয়ে আমার প্রকাশিতব্য একটি গ্রন্থ আপনার নামে আমি উৎসর্গ করবো।’

আমি তাঁর সরল-সহজ অভিব্যক্তি শুনে মুগ্ধ হতাম। তাঁর প্রতি আমার অনুরাগ এতে আরো বৃদ্ধি পায়। অবশ্য বাহুল্য হলেও এটা উল্লেখ করা চলে যে, তিনি তাঁর কথা মত তাঁর কোন বই-ই আজ পর্যন্ত আমার নামে উৎসর্গ করেন নি। এজন্য আমার তেমন কোন আফসোস নেই। তিনি যে আমার নামে তাঁর কোন বই উৎসর্গ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন, এতটুকুতেই আমি পরিতৃপ্ত।

দুবাইতে অনুষ্ঠিত বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসাবে যোগদান শেষে আল মাহমুদ ঢাকা প্রত্যাবর্তনের পর আমাকে একটি চিঠি লেখেন। নিচে সেটা হুবহু তুলে দিলাম :

‘‘মোহাম্মদ মতিউর রহমান

প্রিয়বরেষু,

আমার সালাম জানবেন। আল্লাহর অনুগ্রহে আমি দুবাই থেকে ফিরে আবার আমার প্রতিদিনের জীবনে প্রবেশ করেছি। তবুও রয়ে গেছে প্রবাসের উষ্ণ হৃদ্যতার সৌরভ আমার গায়ে। বড় আনন্দ ও উত্তেজনার মধ্যে আপনার সান্নিধ্যে কয়েকটা দিন ছিলাম। এ স্মৃতি সম্ভবত সহজে ভোলা যাবে না। প্রবাসে তো কত জায়গাতেই প্রবাসী বাংলাদেশীরা আছেন, কই সেখানে তো সাহিত্য সম্মেলন হয় না। কেবল আপনার ও বন্ধুবর নূরুল আলম রইসীর সম্মিলন এবং বন্ধুত্বের ফলেই এতবড় একটা কাজ সম্ভব হল। আর সম্ভব হল রুকনুদ্দিন, মিসবাহুল ইসলাম চৌধুরী, হাজী মফিজ এদের গভীর আন্তরিকতায়। এখন বুঝতে পারছি এদের সহযোগিতায় আপনি প্রবাসেও অনেক বড় কাজ করার ক্ষমতা রাখেন। আপনার সাথে এদের বন্ধুত্ব অটুট ও অক্ষুণœ থাকুক এ দোয়াই করি। রুকন সাহেবের এক শহর থেকে আরেক শহরে ঝড়ের বেগে আমাদের পৌঁছে দেওয়া, মফিজ সাহেবের নিরহংকার বিনয়, আর মিসবাহ সাহেবের দূরে থেকে আতরের গন্ধ বিলানোÑএই সবকিছুকেই আমি সাহিত্যের বিষয় করে তুলতে আগ্রহী। আল্লাহ যদি তৌফিক দেন তবে অচিরেই আমিরাত ভ্রমণের ওপর একটি প্রতিবেদন ধারাবাহিক ভাবে সংগ্রামে শুরু করবো। আমি এখানে পৌঁছেই সংবাদপত্রে রইসী সাহেবের লিখিত সংবাদ ও ছবি পৌঁছে দিয়েছি। ইনকিলাব ও ইত্তেফাক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা সচিত্র সংবাদটি প্রকাশ করবে। আর ইতিমধ্যে সংগ্রাম সংবাদটি প্রকাশ করেছে। সোনার বাংলাও ছাপবে।

আপনার প্রেরিত টুপী ও জায়নামাজ আমি শাহ আবদুল হান্নান, আসাদ ভাই এবং তালিব ভাইকে যথারীতি পৌঁছে দিয়েছি। দুবাই সাহিত্য সম্মেলন সম্পর্কে আপনার কাছ থেকে জেনে এরা সকলেই আনন্দিত। এরা সকলেই আপনার সাফল্যের জন্য গর্ববোধ করছেন।...

আপনাকে দুবাইয়ে আমি বড় নিঃসঙ্গ দেখে এসেছি। এ অবস্থায় আপনি আমার জন্যে যা করেছেন তা আমি ভুলবোনা। শফিকের প্রতিও আমার গভীর কৃতজ্ঞতা রইল। আবিদ ও আবিদের আম্মা যদি ঢাকা আসেন তবে যেন একবার আমাদের বাসায় টেলিফোনে একটু যোগাযোগ করেন। আপনি চিঠিতে আবিদের আম্মাকে তা জানিয়ে দেবেন।

বিদেশে আমার ছেলে আরিফের কোনো প্রকৃত মুরুব্বী বা আত্মীয় বলতে কেউ ছিল না। এখন আশা করছি, আপনি তার প্রতি একটু নজর রাখবেন। 

ঢাকায় সাহিত্য সম্মেলন নিয়ে খুব আলোড়ন হয়েছে। আমার বিরোধী গ্রুপ এবং দুবাইস্থ আপনার বিরোধী গ্রুপ সম্ভবত আপনার কৃতিত্বকে চ্যালেঞ্জ করে অন্য একটি সম্মেলন করার কথা চিন্তা করছে। করুক, তাতে কি? আমরাই জিতে গেলাম। ইতি। আল মাহমুদ’’

পরবর্তী বছর অর্থ্যাৎ ১৯৯১ সনে ছুটিতে ঢাকায় এসে আমি যথারীতি সস্ত্রীক আল মাহমুদের বাসায় গিয়ে দেখা করেছি এবং দীর্ঘ সময় ধরে কথাবার্তা বলেছি ও ভাবীর হাতে তৈরি চা-নাস্তা খেয়েছি। ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সভা-সমিতিতেও তাঁর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। ১৯৯২ সনে আমি ছুটিতে ঢাকায় এলে বাংলা সাহিত্য পরিষদ আমার জন্য এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব ও প্রধান অতিথি হিসাবে অংশগ্রহণ করেন যথাক্রমে বিশিষ্ট কথাশিল্পী অধ্যাপক শাহেদ আলী ও জাতীয় অধ্যাপক বিশিষ্ট দার্শনিক মনীষী দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। 

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি আল মাহমুদ, কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ, ‘দৈনিক সংগ্রাম’ সম্পাদক আবুল আসাদ, বিশিষ্ট লেখক, সংগঠক ও টিভি ব্যক্তিত্ব মাহবুবুল হক, বিশিষ্ট গবেষক, প্রাবন্ধিক ও ব্যাংকার মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ও আশির দশকের বিশিষ্ট কবি আসাদ বিন হাফিজ। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ পাঠ করেন অধ্যাপক নূরুল আলম রইসী। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আশির দশকের আর এক বিশিষ্ট কবি হাসান আলীম। আল মানার অডিও ভিজ্যুয়াল অনুষ্ঠানটির ধারা বিবরণী রেকর্ড করে। উক্ত অনুষ্ঠানে আল মাহমুদ যে ভাষণ প্রদান করেন,  ধারণকৃত  টেপ রেকর্ড থেকে তা লিপিবদ্ধ করেন অধ্যাপক নূরুল মোস্তফা রইসী। এখানে আল মাহমুদের ভাষণটি হুবহু মুদ্রিত হলো:

‘‘ আমি ‘বাংলা সাহিত্য পরিষদ’-এর কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে, আজকে তারা এমন একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, এটি আমাদের সাহিত্য আন্দোলনে খুবই ফলপ্রসু একটি অনুষ্ঠান। কারণ এমন একজন মানুষকে সংবর্ধিত করা হচ্ছে, যাঁকে আমি একজন সক্রিয় লেখক হিসাবে দেখেছি। তিনি সংগঠক তো বটেই তিনি আমাকে আমিরাতে নেমন্ত্রণ করে নিয়ে যান। সংগঠিত করেন সবাইকে-সেখানে দু’তিনটি শহরে বিপুল ও অসামান্য জনসমাগমের ব্যবস্থা করেন। অবিশ্বাস্য জনসমাগম। ধরুন, আবুধাবিতে কেরালা ইনিস্টিটিউটে আট শ’ শ্রোতা উপস্থিত ছিল। আমি যখন কবিতা পড়ি-এক ঘন্টা পিন ড্রপ সাইলেন্স। এতো অতুলনীয়, এই গৌরব যিনি আমার জন্য দিয়েছেন, তিনি হলেন মতি ভাই- মতিউর রহমান সাহেব। 

‘‘এছাড়াও বিদেশে তাঁর প্রভাব আমি লক্ষ্য করেছি। সেখানকার শ্রেষ্ঠ একটি দৈনিক পত্রিকার ম্যাগাজিন এডিটর আমার একটি ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন। সেই ম্যাগাজিনে আমার পুরা ইন্টারভিউ এবং একটা বিশাল ছবি ছাপা হয়েছিল। এটাতে আমার মনে হয়, মতি ভাই মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর প্রভাবের ফলেই সম্ভব হয়েছিল। আরো একটা //ওসঢ়ড়ৎঃধহঃ// ব্যাপার, প্রবাসে থেকে যারা একটু বিদ্যাচর্চা করেন, তাঁরা একটু সাহিত্য চর্চাও করেন এবং তাঁদের মধ্য থেকে বড় লেখকও বেরিয়ে গেছেন। বাঙালি মুসলমানদের প্রবাসে সাহিত্য চর্চার কোন সুযোগ ছিল না। কখনও দেখিনি। এটির ব্যবস্থা মতিউর রহমান করেছেন। সেখানে অসংখ্য তরুণ-তরুণী লিখছেন। কমবেশি ভাল লেখক বা মন্দ লেখক, তারা বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। ঢাকায় আসলে মতিভাই কাঁধ ভর্তি করে বই নিয়ে যাচ্ছেন। সাহিত্যে আত্মগত প্রাণ না হলে, এটা হতে পারেনা। সেখানকার কূটনৈতিক অফিসে আমি গিয়েছি, তাঁরা আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছেন, এটাও মতি ভাইয়ের কল্যাণে। আমি খুবই পরিতৃপ্তি নিয়ে এসেছি।

‘‘যেহেতু মতিভাই আন্তর্জাতিক ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত সেহেতু সেখানে তাঁর বির“দ্ধ-শক্তিও আছে এবং তারা যখন মতি ভাইয়ের একক কৃতিত্বে ঈর্ষান্বিত হয়ে আমাকে তাঁর কাছ থেকে নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য একটি অনুষ্ঠান করতে চাইল, আমি অবাক হয়ে দেখলাম, মতি ভাই তাতে আপত্তি করলেন না। তিনি আমাকে সেখানে উদারভাবে যেতে দিয়েছেন-আন্তর্জাতিক একটা হোটেলে। সে বেশ বড় একটা অনুষ্ঠান এবং শ্রোতাও প্রচুর, একদম ভর্তি হল। 

‘‘তিনি লাজুক লোক। আমি যখন ঢাকায় আসি, তিনি তখন ছাত্র ছিলেন, তখনই তাঁর সাথে পরিচয় ছিল। তিনি সেটা বিদেশে সাগরের তীরে বসে আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। আমি খুব প্রীতিবোধ করেছি। দুবাই মর“ভূমির শহর। কিন্তু সেখানে দুপুর বেলায় চমৎকার ঘুঘুর ডাক শুনেছি। মতি ভাইর ঘরে বসে অলস মধ্যাহ্নে দুবাইতে ঘুঘুর ডাক শুনেছি। সে এক অবাক হওয়ার মত অবস্থা। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ