ঢাকা, শুক্রবার 3 August 2018, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ২০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আসামের পর এবার  টার্গেট কি পশ্চিমবঙ্গ?

২ আগস্ট, বিবিসি, টাইমস অব ইন্ডিয়া : ভারতের আসামে জাতীয নাগরিক তালিকা বা এনআরসি প্রকাশ নিয়ে তুলকালামের মধ্যেই বিজেপি দাবি তুলেছে পশ্চিমবঙ্গেও অবৈধ বিদেশিদের শনাক্ত করতে একই পথ নিতে হবে।

এই প্রস্তাব নিয়ে আলাপ-আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন খোদ বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ্, আর তারপরই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কেন্দ্রকে চরম হুশিয়ারি দিয়েছেন। দিল্লীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে দেখা করে তিনি বলে এসেছেন, পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করার চেষ্টা হলে তার ফল ভালো হবে না। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের মতোই সিপিএমও এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করছে। কিন্তু কেন আসামের পর পশ্চিমবঙ্গেও এই দাবি উঠছে, আর ওই রাজ্যে তার বাস্তবায়নের সম্ভাবনাই বা কতটুকু? আসলে পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ বিদেশিদের চিহ্নিত করা হোক, বিজেপির এই দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু আসামে এনআরসি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই তাদের পশ্চিমবঙ্গ শাখা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে, বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এলে সে রাজ্যেও জাতীয় নাগরিক তালিকা তৈরি করা হবে।

দিল্লীতে বিজেপি প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ পর্যন্ত বলেছেন, আসামের প্রক্রিয়া মিটলে সবার সঙ্গে আলোচনাক্রমে পশ্চিমবঙ্গেও একই জিনিস করার কথা ভাবা যেতে পারে। আর পশ্চিমবঙ্গে দলের মহিলা শাখার নেত্রী লকেট চ্যাটার্জি মনে করেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি যে নীতি নিয়ে চলছেন তাতে ওই রাজ্যেও এনআরসি ছাড়া গতি নেই। তিনি বলছিলেন, আমরা পশ্চিমবঙ্গে ভীষণভাবে এনআরসি চাই অবৈধ বিদেশির সংখ্যা আমাদের রাজ্যে আসামের চেয়েও অনেক বেশিÑ সম্ভবত দেড় কি দু’কোটি হবে। অবৈধ বিদেশি তো আমাদের চারিদিকে, তার ওপর আবার রোহিঙ্গাদের ঢুকিয়েছেসবচেয়ে বড় কথা, রাজ্যকে সুরক্ষিত রাখবেন ভেবে পশ্চিমবঙ্গবাসী যে মুখ্যমন্ত্রীকে ক্ষমতায় বসিয়েছে - তিনি সেই সুরক্ষার কথা না-ভেবে ভোটের জন্য আগুন জ্বালিযে দিচ্ছেনআসলে আগুনটা যে তার ভোটবাক্সে লেগেছে, সেটা পরিষ্কার। আসামে অবৈধ বিদেশিদের বিদায়ঘণ্টা বাজছে দেখে তার আসলে অস্বস্তি শুরু হযে গেছে যে পশ্চিমবঙ্গেও এ জিনিস হলে তার ভোটব্যাঙ্কের তো বারোটা বেজে যাবে, বলছিলেন চ্যাটার্জি।

বিজেপি এরকম একটা দাবি তুলছে, এদিকে দিল্লীতে এ কথা জানার পরই প্রতিবাদে ফেটে পডনে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংযরে সঙ্গে বৈঠক সেরে বেরিযে তিনি পরিষ্কার ঘোষণা করেন, পশ্চিমবঙ্গে কী হবে সেটা ঠিক করার কোনও এক্তিযার বিজেপির নেই। তিনি জানিয়ে দেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার কিছুতেই এনআরসি-র মতো তার ভাষায অশালীন ও বিশৃঙ্খলা তৈরির জিনিস রাজ্যে হতে দেবে না। আর কে ভারতীয় আর কে ভারতীয় নন, সেটা ঠিক করার অধিকারই বা বিজেপিকে কে দিল? এদিকে কেন পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি দরকার, তা ব্যাখ্যা করে বিজেপির রাজ্যসভা এমপি রূপা গাঙ্গুলিও পার্লামেন্টে এদিন বলেন, পশ্চিমবঙ্গে দেশের এমন এক রাজ্য যেখানে কোটি কোটি ভুযাে রেশন কার্ড পাওযা গেছে।এখানে ছাত্রদের কোটি কোটি জাল পরিচয়পত্র ইস্যু করা হযেেছ, যাতে স্কুলে দুপুরের খাবারের নামে টাকা চুরি করা যায। ভুয়ো রেশন কার্ডে খাবার তুলে তা বাইরে কালোবাজারিতে বিক্রি হচ্ছে।

চৌত্রিশ বছর পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা সিপিএমের বিরুদ্ধেও এক সময অভিযোগ উঠেছিল, তারা ঢালাওভাবে অবৈধ বিদেশিদের পশ্চিমবঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। রাজ্য বিধানসভায় এখন তাদের দলনেতা সুজন চক্রবর্তীও প্রশ্ন তুলছেন, কোন সাহসে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চায়? চক্রবর্তী বলছিলেন, এত বড় যোগ্যতা হয়ে গেল বিজেপির যে বলছে আমরা রাজ্যে জিতলে এনআরসি করব? এত আস্পর্ধা কোথায পায তারা?আসলে সাত মণ তেলও পুডবে না, রাধাও নাচবে না - বিজেপিকেও পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কোনোদিন বেছে নেবে না। কিন্তু যারা বলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ঘাডধাক্কা দিযে বের করে দেব, তারা আসলে অসভ্য ও বর্বর একটা দলআসলে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বাস্তবতা যে আলাদা - এবং পশ্চিমবঙ্গে এরআরসি তৈরি করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে, এই একই মতের শরিক শিক্ষাবিদ ও সমাজ-বিশ্লেষক মহুযা সরকার। ড. সরকার বলছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে এই অর্থে আলাদা যে তারা সব সময় বাইরের লোকজনকে ঠাই দেওযার চেষ্টা করেছে। সীমান্তবর্তী রাজ্য এটা - এবং সাতচল্লিশেই বলুন বা একাত্তরে, পশ্চিমবঙ্গ সব সময়ই তাদের প্রতি অ্যাকোমোডেটিভ ছিল। এমন কী এ রাজ্যে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারাও বাইরের লোকজনের প্রতি সহƒদয়তা দেখিয়েছে সব সময়ই। এটাকে ভোটের রাজনীতি দিয়ে ব্যাখ্যা করাও ঠিক হবে নাÑ কারণ পশ্চিমবঙ্গের একটা অসাম্প্রদায়িক চেহারা আছে, সহনশীল মুখ আছে এটাও আমাদের বুঝতে হবে আসাম চুক্তি সই হওয়ার পর সে রাজ্যে এনআরসি-র চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশেই লেগে গেছে দীর্ঘ তেত্রিশ বছর। আর পশ্চিমবঙ্গে এটা এখনও শুধু দাবি বা প্রস্তাবের স্তরেই।কিন্তু তারপরও তা নিয়ে যে পরিমাণ রাজনৈতিক তর্কবিতর্ক শুরু হযেেছ, তাতে পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি চালু করার দাবি হয়তো সহজে থিতোবে না।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, আসামের খসড়া নাগরিক তালিকা (এনআরসি) বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করবে। কারণ বাংলাদেশিদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে।তৃণমূল নেত্রী বলেন, এনআরসিতে স্থান না পাওয়া ৪০ লাখ মানুষের মধ্যে হয়ত মাত্র এক শতাংশ সীমান্তের ওপার থেকে আসা অনুপ্রবেশকারী হতে পারে। এই ৪০ লাখ মানুষ কয়েক প্রজন্ম আগে এখানে এসেছেন, ঐতিহাসিক কারণে এখানে আসা মানুষগুলোকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। এটা বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতি অবমাননা। তারা আমাদের প্রতিবেশী। তাদের সঙ্গে আমাদের ভালো বন্ধন রয়েছে। আমরা একই ভাষায় কথা বলি। প্রতিবেশী হিসেবে আমরা তাদের ভালোবাসি। বাংলাদেশ কোনও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র নয়। আমি বুঝতে পারছি না কেন সরকার (কেন্দ্র) এটা করছে।মমতা বলেন, বিজেপিকেই অনুপ্রবেশকারী বরা উচিত। কারণ তারাই নাগরিকদের জীবনে অনুপ্রবেশ করছে। তারাই বলছে কী খেতে হবে, কী পরতে হবে, কী করতে হবে এবং সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা করছে।মমতা জানান, তৃণমূল কংগ্রেসের ছয় সাংসদ ও দুই নেতার একটি প্রতিনিধি দল আসাম সফর করে সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরি করবে। তারা বাদ পড়াদের পরিচয় তুলে আনবে। মুর্শিদাবাদের হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের বাদ পড়া কয়েকজনের তালিকা দেখিয়ে তিনি বলেন, আসামে আমাদের রাজ্যের ৮৩৩ জনকে কারাগারে রাখা হয়েছে। তাদের ২৮ জন নারী ও শিশু। তারা কোথায় যাবে।

তৃণমূল নেত্রী অভিযোগ করেন বিজেপি বিক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। এনআরসি তৈরি করে বিজেপি গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে। আমরা শান্তি ও সম্প্রীতি চাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ