ঢাকা, শুক্রবার 3 August 2018, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ২০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দ্রুত শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিন

কুর্মিটোলায় দু’জন ছাত্রছাত্রীকে বাস চাপা দিয়ে হত্যার প্রতিবাদে এবং ঘাতক চালকের বিচারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অবসানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গতকাল বৃহস্পতিবারও রাজধানীসহ সারাদেশেই শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে। বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি এবং সড়কে সড়কে প্রাইভেট কার, মোটর সাইকেলসহ যানবাহনের এবং ড্রাইভারদের লাইসেন্স পরীক্ষার মতো কার্যক্রমের কারণে রাজধানী প্রকৃতপক্ষে অচল হয়ে পড়েছিল। শিক্ষার্থীরা যানবাহনের চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করেছেÑ যেটা করার দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের। মানুষের সাময়িক অসুবিধা হলেও শিক্ষার্থীদের কার্যক্রমে সকল সড়কেই শৃংখলা দেখা গেছে। পিতামাতা ও অভিভাবকসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষও শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের সহযোগিতা করেছেন। সব মিলিয়েই গতকালের রাজধানী অন্য রকম মহানগরীতে পরিণত হয়েছিল।

ওদিকে  ঘটনাপ্রবাহে অনেক বিচিত্র ও বিস্ময়কর তথ্যও জানাজানি হয়েছে। যেমন বেশ কয়েকজন পুলিশ অফিসারকে পাওয়া গেছে, যাদের গাড়ি ও মোটর সাইকেলের কোনো লাইসেন্স ছিল না। পুলিশ বহনকারী বেশ কয়েকটি গাড়িরও ছিল একই অবস্থা। এসব গাড়ি যাদের দিয়ে চালানো হচ্ছিল, একদিকে তাদের কারোই ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না, অন্যদিকে তারা ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক।  ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনই প্রতিদিন আইন লংঘন করে চলেছেন। সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ছিল ধরা পড়ে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের আচরণ। তাদের কেউ শিক্ষার্থীদের মুখে ও মাথায় হাত দিয়ে আদর করছিলেন। কেউ কেউ আবার সম্বোধন করছিলেন বাবা-সোনা ও ছোট ভাই বলে। অথচ পুলিশের এই লোকজনই স্কুল কলেজের শিশু-কিশোরদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে। বুটপায়ে লাথি মেরেছে। মেয়েদের পর্যন্ত রক্তাক্ত করে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। তখন তাদের মনে হয়নি যে, এদের মতো কিংবা এদের চাইতেও কম বয়সী ভাই-বোন বা সন্তান পুলিশদেরও রয়েছে! তাদের অবশ্য ভাগ্য ভালোই ছিল। কারণ, সর্বাত্মক উসকানি সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের কেউই আইন লংঘনকারী পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি। তারা বরং বুঝিয়ে দিয়েছে, সুশিক্ষা কাকে বলে এবং সত্যিই সুশিক্ষা থাকলে পুলিশ এতটা নিষ্ঠুরতা দেখাতে পারতো না। 

একই কথা ক্ষমতাসীনদের সম্পর্কেও বলাবলি করছেন সাধারণ মানুষ। কারণ, কেউই এমন অভিযোগ করেনি যে, শাজাহান খানের মতো কোনো মন্ত্রী সরাসরি ছাত্রছাত্রীর হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী। প্রতিবাদ ও আপত্তির কারণ সৃষ্টি করা হয়েছে ভারতের সঙ্গে তুলনা করে এবং ব্যঙ্গাত্মক হাসি দিয়ে তামাশা ও উপহাস করার কারণে। সেটা না করে ওই মন্ত্রী যদি সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করতেন এবং ঘাতক চালকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিতেন তাহলেই কিন্তু পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারতো না। অন্যদিকে ব্যঙ্গ-তামাশা ও উপহাস করার মাধ্যমে বাস্তবে চরম উসকানি দেয়া হয়েছে। 

এসব কারণেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রাজধানীর পাশাপাশি দেশের সকল অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে সততার সঙ্গে পরিস্থিতিকে শান্ত করার চেষ্টা চালানোর পরিবর্তে ক্ষমতাসীনরা নিয়েছেন চাতুরিপূর্ণ কৌশল। এ কৌশলের অংশ হিসেবেই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের অনুপ্রবেশকারীদের ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের হাতে এমন অশ্লীল ভাষায় লেখা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার দেখা যাচ্ছেÑ যেগুলো কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় পর্যন্ত আসতে পারে না। বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে বাজে ধারণা তৈরি করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। ওদিকে নিহত দুই শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে ২০ লাখ করে টাকা দেয়ার ঘোষণাকেও শিক্ষার্থীদের জীবনের মূল্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মূল্য মাত্রই ২০ লাখ টাকা কিভাবে হতে পারে? সরকার শিক্ষার্থীদের পেশ করা নয় দফা দাবি মেনে নিয়েছে বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তাকেও বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন না কেউ। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও কোটা সংস্কার আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। কারণ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও বিষয়টিকে নিয়ে আজও পর্যন্ত পানি কেবল ঘোলাই করা হচ্ছে। এর মধ্যে আজ রাজপথে ছাত্রদের উপর ছাত্রলীগ-যুবলীগ-পুলিশের হয়েছে বলে জানা গেল।

আমরা মনে করে, কিশোর-কিশোরী ছাত্রদের আন্দোলনকে উস্কে না দিয়ে সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে শিক্ষার্থীদের নয় দফার ব্যাপারে সুস্পষ্ট অবস্থান নেয়া।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ