ঢাকা, শুক্রবার 3 August 2018, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ২০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সড়কে লাশের স্তূপ, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ : প্রশাসন নির্বিকার!

এস.এম আব্দুল্লাহ ফাহাদ জাকির : মৃত্যুর ফাঁদের অপর নাম ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা। সর্বত্রই চলছে বিশৃঙ্খলার মহোৎসব। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। পরিবহন শ্রমিকদের বেপরোয়া ক্ষিপ্রগতি আশংকাজনক। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও নিয়ন্ত্রণহীন গতি, লাগামহীন ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অব্যবস্থাপনা । অসম প্রতিযোগিতায় নেমে ”আগে যাব, বেশি পাব” অর্থনৈতিক এই লাভ-লোকসানের হিসেব কষে সংকীর্ণ ও খানাখন্দময় সড়ক পাড়ি দিতে গিয়ে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় হাজারো মানুষ। এই তো গত কয়েকদিন আগে ফুটপাতে শিক্ষার্থীদের উপরে উঠে গেল এক লক্কর-ঝক্কর বাস। নিমিষেই প্রাণ হারাল দুই শিক্ষার্থী। সেই শোকে মুহ্যমান সহপাঠী রাস্তায় নামল নিরাপদ সড়ক চাই দাবিতে । সেখানেও তুলারাম কলেজের এক শিক্ষার্থীকে ট্রাকের তলায় পিষ্ট করে দ্রুত পালাল এক নরপিশাচ।  মানুষের মৃত্যুর বিভীষিকা কি চলতে থাকবে? 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে চালকের বেপরোয়া লোভী মনোভাব ও নিয়ন্ত্রণহীন গতি। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে জানা যায়, কেবল গত ঈদে ঘরে ফেরাকে কেন্দ্র করে ১৩ দিনের ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪০৫ আর আহত হয়েছে ২ হাজার ৮৫৯ জন। আর গত তিন বছরে ঈদুল ফিতরে ৬০৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৮০৩ জন। ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৯৭ জন। আর আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ১৯৩ জন।  পুলিশের পাঁচ বছরের হিসাব অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর গড়ে ২ হাজার ২৮০ জনের মৃত্যু হয়। বিশ্বস্বাস্থ্যসংস্থার মতে, সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১৩ তম। চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম তাদের অবস্থা আমাদের উপরে। কিন্তু দেশগুলোতে যানবাহনের সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। অথচ এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা  অনেক বেশি। 

সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হলো সংকীর্ণ রাস্তা, রোড ডিভাইডার না থাকা, ফিটনেস বিহীন গাড়ি, তরুণ চালকদের আধিক্য, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন মদ্যপ চালক, অস্বচ্ছ ড্রাইভিং লাইসেন্স পক্রিয়া, অমনোযোগিতা, সিট বেল্ট না বাঁধা, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, অদূরদশির্তা। অসম প্রতিযোগিতা, দুর্বল স্পিডবেকার, বেপরোয়া গতি, প্রাইভেটকার, মোটর সাইকেল, সিএনজিসহ তিন চাকার যানবাহন প্রবল বৃদ্ধি, ক্ষুদ্রযানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, বিধিলঙ্ঘন করে ওভারলোডিং ও ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য, দীর্ঘক্ষণ বিরামহীন গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও বেহাল সড়ক, বেপরোয়া গতি, ফুটপাত দখল, লুকিং গ্লাস ব্যবহার না করা, ছোট-বড়, ধীরগতি ও অতি গতি এবং অযান্ত্রিক গাড়ি, যত্রতত্র পার্কিং, তদসংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের দায়িত্বহীনতা, খামখেয়ালিপনা, ঘুষ, দুর্নীতি, ট্রাফিক পুলিশের অপেশাদারিত্ব, প্রকৃত দোষীদের শা¯িরÍ আওতায় না আনাসহ বিবিধ কারণে রাস্তার বেহাল দশা আর সড়ক দুর্ঘটনার পরিমাণ দিনকে দিন দীর্ঘতর হচ্ছে। 

এ মরণ ফাঁদ রোধ করতে হলে উপযুুক্ত কারণগুলো চিহ্নিত করে আশু সমাধান করাসহ , ছোট গাড়ি কমানো, পাবলিক যানবাহন বৃদ্ধি, ফুটপাত দখলমুক্ত করণ, লেন বৃদ্ধি, স্বচ্ছ ড্রাইভিং লাইসেন্স পদ্ধতি, অল্প দক্ষ বা অদক্ষ চালকের অনুমতি প্রদান না করা, গতিসীমা রোধ, তরুণ চালকদের নিষেধাজ্ঞা, ঘুষ-দুর্নীতিকে না বলে ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল বন্ধসহ সঠিক পথে পরিচালনা করতে সকল আইন তৈরী ও যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ট্রাফিক পুলিশের পেশাদারিত্ব এবং প্রকৃত দোষীদের শা¯িরÍ আওতায় নিয়ে আসলে দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব। 

পরিশেষে বলতে চাই, আমরা যে জাতি হিসেবে চূড়ান্ত পর্যায়ের বিশৃঙ্খল তা প্রতিটি কর্মকান্ডে প্রমাণিত। সবার আগে আমাদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আমরা যতদিন না শৃংখলিত ও সচেতন হব ততদিন সড়ক দুর্ঘটনা রোধ দুঃসাধ্য। তাই সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিরোধে মন-মানসিকতার পরিবর্তন পরিবর্তনের পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের সচেতন হতে হবে, আর চালকদের বেপরোয়া ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ত্যাগ করে মানবিক হতে হবে।

নতুবা একদিকে চলে যাবে মানুষের প্রাণ, অপরদিকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গাড়ির মালিক। নষ্ট হবে দেশের সম্পদ।

জনসংখ্যা আধিক্যতার ঠুনকো অজুহাতে আমাদের ব্যর্থতাকে ঢাকার চেষ্টা না করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভাবতে হবে আগামী প্রজন্মের কথা। প্রয়োজনে বিকেন্দ্রীয়করণ করে হলেও তা করতে হবে এবং সমান সুযোগ রাখতে হবে নগর, মহানগরসহ দূরবর্তী স্থানে।  নতুবা নড়কে পরিণত হবে আমার সোনার বাংলা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ