ঢাকা, শুক্রবার 3 August 2018, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ২০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজপথে ছাত্ররাই শেখাচ্ছে আইন !

মিয়া হোসেন: সরকারের মন্ত্রী, বড় আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিক সবাইকেই রাজপথে আইন শেখাচ্ছে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা মন্ত্রীকে উল্টো পথে আসায় ‘আইন সবার জন্য সমান’ এই পাঠ দিয়ে সোজা পথে যেতে বাধ্য করছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় গাড়ী থেকে মন্ত্রীকে নেমে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। যে সার্জেন্ট রাস্তায় ট্রাফিক আইন অমান্য করায় মামলা দিতো, আজ তারা এই ছাত্রদের কাছে আইন অমান্য করায় লজ্জা পেল। স্বীকার করতে বাধ্য হলো আইন সবার জন্য সমান। এমন কী তাদের আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া মিডিয়ার গাড়ীও কাগজপত্র না থাকায় আটকে দিয়েছে তারা। কোমলমতি এই শিক্ষার্থীরা নিজেদের দু’জন সহপাঠীর মৃত্যুতে গোটা জাতিকে আইন মানতে আহবান জানাচ্ছে। তারা চায় ন্যায় বিচার। তাদের স্লোগান ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। গত ক’দিনে তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, দেশের আইন ও ন্যায় বিচারের বাস্তব চিত্র।

গতকাল বৃহস্পতিবার, বন্ধ স্কুল, বন্ধ কলেজ। সারা শহরে চলছে অঘোষিত অবরোধ। পথে নেমে গেছে কিশোর বয়সীরা। হালকা পাতলা গড়ন, যেন বাতাসে হেলে যায় কিন্তু কী দৃঢ় তাদের চলাফেরা! দারুণ প্রত্যয়ে তারা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে।

এ এক অন্য আন্দোলন, অন্য তাদের ভাষা, অন্য তাদের প্রত্যয়। কেউ বলে না, জ্বালিয়ে দাও পুড়িয়ে দাও, কেউ বলে না, কালো হাত গুঁড়িয়ে দাও। ওদের ভাষা খুব সরল, সহজ, ডব ডধহঃ ঔঁংঃরপব (আমরা ন্যায় বিচার চাই)।

এ শহর হাজারও আন্দোলনের সাক্ষী। আন্দোলন হলে গাড়ি ভাঙ্গা হয়, মানুষ মরে, মানুষ পোড়ে। এ যেন কেমন আন্দোলন, কেউ দেখেনি এমন আন্দোলন, যেখানে শুধু ন্যায় মানে ন্যায়, অন্যায় মানে অন্যায়। আন্দোলন চলছে কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স, রোগী, শিশু বৃদ্ধকে কেউ বাধছে না। উল্টো এগিয়ে দিচ্ছে কয়েক পথ।

দারুণ শক্তিশালী তাদের ভাষা, তারা প্লেকার্ডে লিখেছে, “৪৭ বছরের পুরানো রাষ্ট্রের মেরামতের কাজ চলছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।”

ভয় পাওয়া কাকে বলে -এটা এখনো জানে না এই কিশোররা। প্রধানমন্ত্রীকে বলছে, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ছাত্রদের আপাতত রাস্তা সামলাতে দিন, মন্ত্রী পুলিশদের স্কুলে পাঠান শিক্ষিত করতে।”

বিচারপতি, তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে সেই জনতা। যার কাছে লাইসেন্স নেই তার কপালেই লিখে দাও, সবাইকে জানিয়ে দাও -এ অন্যায়, এ গাড়ির মালিক অপরাধী।

ওরা পথে নেমে এসেছে “১৯৫২তে ভাষার জন্য, ২০১৮তে নিরাপদে বাঁচার জন্য।” বাঁচার অধিকার না পাওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাবে না ওরা। শুধু যে কিশোররা মাঠে নেমেছে তা নয়, মাঠে নেমেছে তাদের মায়েরাও। তারাও এই যুদ্ধে যোগান দিচ্ছেন শক্তি, খাবার।

এই পঁচে যাওয়া শহরের সমস্যায় টিকে থাকার সমাধান বের হতে পারে শুধু নতুনদের মাথা থেকে, এই যে একটা ইমার্জেন্সি লেন, যেটা সব সময় খালি থাকার কথা। জ্যামের শহরের জ্যামে আটকে মরতে পারে না একটা প্রাণ। এই সমাধান বের করতেও পথে নামতে হলো কিশোরদের।

গতকাল বৃহস্পতিবার অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবায় ব্যবহারের জন্য রাজধানীর রাস্তায় ‘জরুরী লেন’ বানিয়ে দেখাল ছাত্ররা। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব ও ফার্মগেইট এলাকায় বিরল এ দৃশ্যের দেখা মেলে। দুপুর দেড়টার দিকে যানবাহনের চাপ বাড়লে স্বপ্রণোদিত হয়ে সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে থাকা শিক্ষার্থীরা গাড়িগুলো চলাচলের জন্য লেইন তৈরি করে দেয়। পাশাপাশি একটি ‘জরুরী লেন’ও তৈরি করে শিক্ষার্থীরা। ওই লেইনে অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবায় ব্যবহারের গাড়িগুলো চলাচল করতে থাকে।

এর আগে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চলাচল এবং অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের জরুরি সেবায় ব্যবহারের জন্য রাজধানীর সড়কে আলাদা লেনের প্রস্তাব করেছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চালু থাকা এ ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল চলতি বছরের শুরুতে।

পরে ‘ঢাকার রাস্তায় ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেন’ এমন একটি খবর সংবাদমাধ্যম হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ওঠে আলোচনা সমালোচনার ঝড়। নানামহল থেকে প্রতিবাদও আসে। প্রস্তাবটি ছিলো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের। যেটি অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে। সেখান থেকে এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে পাঠানো হয় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষে (ডিটিসিএ)। এরমধ্যে ডিটিসিএ সিদ্ধান্ত নেয় তারা এই প্রস্তাবের বাস্তব ভিত্তি দেখছেন না। প্রস্তাবটি নাকচ করা হবে।

ওই সময়ে আলাদা লেনের প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অসাংবিধানিক এবং গণবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছিলেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, এই ধরনের প্রস্তাব কোন অবস্থাতেই অনুমোদনযোগ্য নয়। কেউ মত দিয়েছিলেন, যদি হয়, তাহলে বুঝতে হবে আমরা পিছনের দিকে যাচ্ছি। প্রস্তাবকে সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, বৈষম্যমূলক ও ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহারের সামিল বলেও মত প্রকাশ করেছিলেন তারা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ