ঢাকা, শুক্রবার 3 August 2018, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৫, ২০ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এখনো ব্যাংকগুলোতে সরকার নির্দেশিত সুদ হার কার্যকর হয়নি

স্টাফ রিপোর্টার: দেশের সব ব্যাংকগুলোতে নয়-ছয় সুদ হার এখনো কার্যকর হয়নি। ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে বা সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে গড়িমসি করছে ব্যাংকগুলো। এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ ব্যাংক সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনেনি। সরকারি খাতের চারটিসহ হাতে গোনা কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক কিছু ঋণের সুদ ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনলেও অন্য ব্যাংকগুলো তা করছে না। দেশে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে ঋণের সুদ হার কমানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। এর প্রেক্ষিতে আবারও সুদের হার কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, আগামী ৯ আগস্ট থেকে সব ব্যাংকে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। 

সূত্র জানায়, দেশে ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৩টি ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংকগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়েছে। তবে বিভিন্ন সেবার বিপরীতে আরোপিত চার্জসহ এই হার আরও বেশি হচ্ছে।

এদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ১৯টি ব্যাংক সুদের হার কমিয়েছে। সব ব্যাংকই বেশির ভাগ ঋণের ক্ষেত্রে এই হার ডাবল ডিজিটেই রেখেছে। কৃষি, মসলা ও নারী উদ্যোক্তা খাতে কিছু ঋণের সুদের হার তারা ৯ শতাংশে রেখেছে, যা আগে থেকেই ছিল। তারা শিল্প, চলতি মূলধনসহ কিছু খাতে ঋণের সুদের হার ১ থেকে ২ শতাংশ কমিয়েছে। কমানোর পরও এসব ঋণের সুদের হার ১০ থেকে ১৪ শতাংশে রয়েছে।

সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত সরকারি খাতের সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়েছে। এর মধ্যে তারা প্রায় সব ধরনের সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে এনেছে। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি, আল-আরাফাহ, সিটি, এনসিসি, পূবালী, উত্তরা, এক্সিম, এশিয়া, ব্র্যাক, ইস্টার্ন, প্রাইম, মধুমতিসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমিয়েছে। তবে তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই হার ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনেনি।

এর আগে জুন মাসে এক নির্দেশনায় জুলাই মাসের ১তারিখ থেকে সরকার ব্যাংকগুলোকে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ এবং আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশ করার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু তা এখনো  বেশিরভাগ ব্যাংকে কার্যকর হয়নি। আাবার কিছু ব্যাংক কার্যকর করলেও তা শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। বিভিন্ন চার্জ যোগ করে সুদের হার অনেক নেয়া হচ্ছে।  

বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখন পর্যন্ত যেসব ঋণের সুদের হার কমিয়েছে সেগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র কৃষি ঋণ, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ, রফতানি ঋণ ও মসলা চাষে ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের মধ্যে রেখেছে।  এগুলোর সুদ হার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেয়া। এর মধ্যে কৃষি ও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ ৯ শতাংশ, রফতানি ঋণ ৭ শতাংশ ও মসলা চাষের ঋণ ৪ শতাংশ সুদে দিতে হবে। ফলে ব্যাংকগুলো এসব খাতে কোনো সুদ কমায়নি।

শিল্প খাতের মেয়াদি ঋণ, চলতি মূলধন ঋণ, পণ্য আমদানি ঋণের সুদের হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রেখেছে। মাঝারি শিল্পে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র শিল্পে সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৬ শতাংশ, হাউজিং খাতে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। ভোক্তা ঋণের ১৩ থেকে ১৬ শতাংশ, রফতানিমুখী শিল্প স্থাপনে ১১ থেকে ১৪ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করেছে।

সুদের এই হার তারা ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার কথা জানায়। বিএবির সদস্য হচ্ছে ৩৭টি ব্যাংক। এর মধ্যে ওইদিন ২৬টি ব্যাংকের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা ওইদিন এই হার কমাতে নীতিগত সিদ্ধান্তও নিয়েছিল। কিন্তু এরপরও ঋণের সুদের হার কমে সিঙ্গেল ডিজিটে নামছে না।

উল্লেখ্য, বাজেট ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর এক সভায় তিনি ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য নির্দেশ দেন। এর আলোকে গত ২০ জুন বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভায় সব ঋণের সর্বোচ্চ সুদ হার ৯ শতাংশে এবং আমানতের সুদ হার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়।

এদিকে ঋণের সুদের হার কমাতে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের একাধিক সংস্থা থেকে প্রবল চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। কয়েকটি ব্যাংকের এমডিদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেও সুদের হার কমানোর বার্তা দেয়া হচ্ছে। তারপরেও তারা সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনছে না। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই তাদের প্রতিক্রিয়ায় জানান, শিল্পায়নের স্বার্থে ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা থাকলেও সরকারি ব্যাংক ছাড়া বানিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখনো তা কার্যকর করেনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংককের ‘কঠোর নজরদারি’ থাকা প্রয়োজন। এছাড়া ব্যাংকে খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাবের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে এফবিসিসিআই। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন যাবত এ দুর্বিসহ বোঝা সুদের হার এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে কাজ  করছে। খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরো জোরদার করা প্রয়োজন। এছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনতে সরকার ঘোষিত স্বাধীন ব্যাংক কমিশন দ্রুত গঠন করা প্রয়োজন। 

ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার এনইসি সম্মেলন কক্ষে দেশের ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আজ প্রধানমন্ত্রী আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ এবং ঋণে সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এটা আগামী ৯ আগস্ট থেকে সব ব্যাংকে কার্যকর করতে হবে। তবে কনজুমার লোন ও ক্রেডিট কার্ড লোনের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য হবে না।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে দেশের প্রায় অর্ধেক ব্যাংক আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ এবং ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকর করেছে। আজ সব ব্যাংককের চেয়ারম্যান ও এমডিরা আগামী ৯ আগস্টের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়ন করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ৬ ও ৯ শতাংশ বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতের ব্যাংকাররা কিছু সুবিধা চেয়েছিল- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের তো সুবিধা দেয়া হয়েছে। সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনার ভিত্তিতে দেশের অর্থনীতিতে শিল্পবান্ধব পরিবেশ, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান ও আমদানি-রফতানি বাণিজ্য আরও গতিশীল করতে মূলত এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গত ২০ জুন ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যানদের সংগঠন- বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। যা ১ জুলাই থেকে কার্যকরের কথা। তবে সেদিন ব্যাংক হলিডে থাকায় ২ জুলাই থেকে কয়েকটি ব্যাংক সেটি কার্যকর করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ