ঢাকা, শনিবার 4 August 2018, ২০ শ্রাবণ ১৪২৫, ২১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পরিবহণ সঙ্কটের সুযোগে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়

স্টাফ রিপোর্টার: নিরাপদ সড়কের দাবিতে সড়কে টানা পাঁচ দিন আন্দোলনের পর ছুটির দিন গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে রাজধানীতে গণপরিবহণের সঙ্কট চলছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ নয় বরং নিরাপদ সড়কের দাবিতে সড়কে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে ঢাকায় গণপরিবহণ সঙ্কটে মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে রিকসা সিএনজি ও রাইড শেয়ারিংয়ে চলাচলকারী মোটর সাইকেলের চালকরাও অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন। জরুরি প্রয়োজনে যারা বের হয়েছেন তাদের সিএনজি ও অটোরিকশা ও রিকশায় অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হচ্ছে বলে সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দৈনিক সংগ্রামের প্রতিবেদকরা দেখতে পেয়েছেন। পরিবহণ মালিকরা বলছেন, ভাংচুরের কারণে তারা বাস নামাননি। তবে এদিন সকাল ১১টা পর্যন্ত যাত্রাবাড়ির রায়েরবাগ ও আর হাতেগোনা কয়েকটি জায়গায় ছাড়া কোথাও শিক্ষার্থীদের সড়কে নামতে দেখা যায়নি। যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, রাইডাররা নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে অতিরিক্ত ভাড়া যেমন চাচ্ছেন। আবার ‘অফলাইন’ হয়ে চুক্তিতে যাতায়াতে দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া আদায় করছেন।
গত ২৯ জুলাই বাসচাপায় দুই কলেজছাত্রের মৃত্যুর পর সড়কে নেমে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। এর মধ্যে বেশ কিছু গাড়িও ভাংচুর হলে বাসের সংখ্যা কমে যায়। গত বৃহস্পতিবার কুড়িল থেকে উত্তরা এলাকা ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে; শুক্রবারও ঢাকার সড়কে গণপরিবহণ নেই বললেও চলে। গত বৃহস্পতিবার সকালে কুড়িল থেকে পাঠাও অ্যাপসে রাইডের অনুরোধ জানাতে গিয়ে দেখা যায়, মোটর বাইকের সংখ্যা খুবই কম। কুড়িল থেকে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকায় যাওয়ার জন্য অনুরোধ পাঠালেও কোনো রাইডারের সাড়া পাওয়া যায়নি।
গতকাল শুক্রবার সকালে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে কোনো বাসের দেখা না মিললেও হাতেগোনা কিছু অটোরিকশা এবং রিকশা চলছিল। ধানম-ি এলাকায় কোনো বাস চোখে পড়েনি। জিগাতলা বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষারত মোজাম্মেল হোসেন বলেন, পৌনে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মোহাম্মদপুর যাওয়ার কোনো বাস পাননি তিনি। গুলিস্তান যাওয়ার জন্য খামারবাড়ি মোড়ে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো বাস না পাওয়ার কথা জানান ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন। ক্ষোভের সুরে তিনি বলেন, “বাস তো নাই, দু’একটি সিএনজি পাওয়া গেলেও তিন-চারগুণ বেশি ভাড়া চাইছে, এভাবে আর চলে না। মেরুল বাড্ডা এলাকায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাস না পেয়ে সফটওয়্যার প্রকৌশলী সুজন মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আর রামপুরা ব্রিজ থেকে উত্তর বাড্ডায় আত্মীয়ের বাসায় যেতে আধঘণ্টা অপেক্ষা করেও বাস না পেয়ে হেঁটেই রওনা হন এনজিও কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম। গুলিস্তান থেকে নতুন বাজার রোডে চলাচলকারী বন্ধু পরিবহণের চালকের একজন সহকারী জানান, গাড়ি বের না করতে বৃহস্পতিবার রাতেই মালিকরা নিষেধ করে দিয়েছেন।
মতিঝিল-মোহাম্মদপুর রুটের মৈত্রী পরিবহনের মালিক মো. মজনু গতকাল শুক্রবার সকালে বলেন, “নিরাপত্তাজনিত কারণে এবং শিক্ষার্থীদের অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ি ফলে ঢাকায় সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। গত চার দিন ধরে তাদের কোনো বাস ঢাকার রাস্তায় চলছে না বলেও জানান তিনি। ঢাকার আন্তঃজেলা টার্মিনালগুলো থেকে দূরপাল্লার বাসও ছাড়ছে না। ইউনিক পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল হক বলেন, “নিরাপত্তা না থাকায় অঘোষিতভাবে বাস চলাচল বন্ধ আছে। ঢাকা থেকে সিলেট ও চট্টগ্রামের পথে ইউনিক পরিবহনের কোনো বাস চলছে না। এর মধ্যে যাত্রাবাড়িতে আড়তের সামনে পরিবহন শ্রমিকদের সড়কে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। তারা কোনো গাড়ি চলাচল করতে দিচ্ছেন না। এ বিষয়ে আব্দুল হক বলেন, “গাড়িবন্ধ থাকায় তারা যাত্রাবাড়ির সড়কে দাঁড়িয়ে আছে, এটা অবরোধ বা সে ধরনের কিছু না। এয়ারপোর্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পরিবহণ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. বাবুল শেখ বলেন, চালকরা আসছে না বলে বাস নামাতে পারছেন না তারা। ড্রাইভারদের অনেককেই মারধর করা  হয়েছে। তাদের টাকা পয়সা পর্যন্ত নিয়ে গেছে। এ কারণে তারা ভয়ে গাড়ি নামাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা তো এখন সড়কে নেই- জানানো হলে বাবুল বলেন, “প্রথমদিনই আমার ১৫টা গাড়ি ভেঙে দিয়েছে। হেডলাইট পর্যন্ত ভেঙে ফেলেছে। এ অবস্থায় পরিস্থিতি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত গাড়ি চালানো কঠিন। তারপরও আমি এখন আবদুল্লাহপুর যাচ্ছি। চালকদের খবর দিয়ে আনি। দেখি তারা কী বলে। গাড়ি বন্ধ থাকলে তো পথে বসতে হবে। প্রতিটা গাড়িতে প্রতিদিন দেড় হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়” বাস বন্ধ থাকলে নিজের সমস্যার কথাও বলেন এই মালিক।
 রাস্তায় বাস নেই, ভোগান্তিতে মানুষ: কুড়িল বিশ্ব রোড বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন রাইডারের কাছে কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, তারা ‘অফ লাইনে’ আছেন, অ্যাপে যাবেন না, চুক্তিতে যাবেন। অ্যাপে অনুরোধ পাঠিয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর একজন রাইডার যেতে রাজি হন। তবে উত্তরার কথা শুনে আড়াইশো টাকা দাবি করেন। রাজি না হলে ওই রাইডার অনুরোধ বাতিল করে দেন। অ্যাপে কুড়িল থেকে সোনারগাঁও জনপথ পর্যন্ত মোটর সাইকেলের সম্ভাব্য ভাড়া দেখাচ্ছিল ১৩১ টাকা। সড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রীদের সঙ্গে দরদাম করতে থাকা রাইডারদের একজন জানান, হাউজ বিল্ডিং গেলে কমপক্ষে দুইশো টাকা দিতে হবে। ভাড়া এত বেশি কেন জানতে চাইলে তার উত্তর, “দেড় লাখ টাকা দিয়া মোটর সাইকেল কিনছি। এই গ্যাঞ্জামের মধ্যে দিয়া যামু। মোটরসাইকেল আগুন পোড়াইয়া দিলে জরিমানা কেডা দিব। সারোয়ার আলম নামে এক যাত্রী কুড়িল থেকে টঙ্গী যেতে একজন রাইডারকে অনুরোধ করলে তিনি ৬০০ টাকা দাবি করেন। ওই রাইডার বলেন, “গতকাল আমি টঙ্গীতে ৮০০ টাকায় গেছি। এই অবরোধের মধ্যেও আমরা সার্ভিস দিচ্ছি, এজন্য বেশি ভাড়া নিতেই পারি! সারোয়ার বলেন, “আমরা কোন পর্যায়ে আছি দেখেন। এইখানে ভাড়া আসে দেড়শ থেকে সর্বোচ্চ ১৭০ টাকা। কিন্তু সাড়ে ছয়শ টাকা চাইছে। অথচ তারা অ্যাপের মাধ্যমে যাওয়ার কথা। খিলক্ষেত, বিমানবন্দরসহ উত্তরার বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে রাইডারকে একই আচরণ দেখা গেছে। এদিন রাইড শেয়ারিং অ্যাপে মোটর সাইকেল বা প্রাইভেটকার ডাকতেও সময় বেশি নিচ্ছে। অ্যাপে গাড়ি অনেক কম দেখাচ্ছে বলে জানান উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা এহতাসুর রহমান। এহতাসুর রহমান বলেন, “অন্য দিন অ্যাপ চালু করে রিকোয়েস্ট দিলেই কিছুক্ষণের মধ্যে একসেপ্ট হয়ে যায়। রাইডার কলও করে। কিন্তু আজ অনেকবার চেষ্টা করেও ঢুকতে পারছি না। গত বৃহস্পতিবার বিকালে আবদুল্লাহপুর থেকে কুড়িল বিশ্ব রোড পর্যন্ত অ্যাপে মোটর সাইকেল রাইডের অনুরোধ করেও একই অবস্থা দেখা গেছে। মিজানুর রহমান এক রাইডার অনুরোধ গ্রহণ করার পর ফোনে বাড়তি টাকা দাবি করেন। বাড়তি টাকা দিতে অপরাগ হলে তিনি মোবাইল সংযোগ কেটে দেন। আবদুল্লাহপুর খন্দকার সিএনজি পাম্পের সামনে থেকে মিরপুর যাওয়ার জন্য অ্যাপে বাইকের অনুরোধ পাঠিয়েছিলেন বায়িং হাউজের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন। না পেয়ে সেখানে অপেক্ষমাণ এক রাইডারকে যাওয়ার অনুরোধ করেন। সে রাইডার দ্বিগুণের বেশি ভাড়া চাইলে মামুন ক্ষেপে গিয়ে বলেন, “আগে সিএনজি চালাতেন সেই ভালো ছিল। রাইড শেয়ারিংয়ের বদনাম করতে কেন এসেছেন। আপনাদের আচরণ তো সিএনজি ওয়ালাদের চেয়ে খারাপ হয়ে গেছে। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া, অফলাইন করে রাখার বিষয়ে রাইড শেয়ারিং ইউজারদের ফেসবুক পাতায়ও অনেকে অভিযোগ করেছেন। মেহফুজ সরকারজি নামে একজন পাঠাওয়ের ইউজার গ্রুপে অভিযোগ করেন, “পাঠাও অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ার দিয়ে পপুলারিটি পেয়েছে। কিন্তু কিছু রাইডার সেগুলো মিসইউজ করছে। অ্যাপস ইউজ না করে সিএনজির মতো করে লোক ডেকে ডেকে নিচ্ছে। গতকাল মহাখালী থেকে উত্তরা ৪০০ টাকা, গুলশান থেকে মোহাম্মদপুর ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিয়েছে। ফারহান তানভীর শাওন নামে আরেকজন অভিযোগ করেন, “পাঠাও-উবার চালকরা অ্যাপ অফ করে রেখে যাত্রীদের জিম্মি করেছে। মন ইচ্ছেমতো ভাড়া চাচ্ছে। পুরনো কলুষিত পরিবহণ ব্যবস্থা ঠিক করতে আজকের এই আন্দোলন। নতুন পরিবহন ব্যবস্থা কলুষিত হওয়ার আগেই সচেতনতা দরকার। এ বিষয়ে কথা বলতে পাঠাওয়ের নির্বাহী কায়সার হাশেমির মোবাইলে কল দিয়ে তা বন্ধ পাওয়া গেছে। আরেক রাইড শেয়ারিং ‘ও ভাই’ এর সহকারী ব্যবস্থাপক (ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন)  শাফায়েত রেজা বলেন, “রাইড শেয়ারিং আইনেও এ বিষয়টি নিষেধ করা আছে। আমাদের কোনো রাইডারের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আসলে আমরা ব্যবস্থা নিই। এ অভিযোগ পেলে ওই রাইডারকে ব্লক করে দেব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ