ঢাকা, শনিবার 4 August 2018, ২০ শ্রাবণ ১৪২৫, ২১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গরুর গোশত খাওয়া এখন বেশ বিপজ্জনক

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : আমার আত্মীয়স্বজনসহ অনেকের ধারণা এমন যে, কেউ গরুর গোশত খেলেই মুসলিম হয়ে যায়। আসলে এমন চিন্তাচেতনা অজ্ঞানতা ব্যতীত কিছু নয়। আবার গরুর গোশত কেউ না খেলে মুসলিম হয় না বা হতে পারে না, তাও সত্য নয়। অর্থাৎ মুসলিম হবার পূর্বশর্ত গরুখাওয়া নয়। গরুর গোশত খাওয়া বা না খাওয়ার সঙ্গে মুসলিম হওয়া-না হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।
সত্য বলতে কী, আমার বিশ্বাস বা বোধ পরিবর্তনের দীর্ঘ একদেড় বছর পেরিয়ে যাবার পরও গরুর গোশত আমি খেতাম না বা খেতে পারতাম না। তাই ওটা যেখানে থাকতো সেই জায়গা বা অনুষ্ঠান আমি সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে যেতাম। তাই আমার মুসলিম বন্ধুদের কেউ কেউ অনেকটা ভুলই বুঝতে শুরু করেন। এজন্য কোথাও কোথাও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় আমাকে কয়েকবার।
আমার আগের বিশ্বাসের কয়েক বন্ধু পরামর্শ দেন যে, যা হোক তুমি ওপথে গেছো তো গেছোই। কিন্তু ‘ওই জিনিসটা’ তুমি খেয়োটেয়ো না। আমি ওদের বলি কেন, ওটাতো আমার আর দেবতাটেবতা না। ছাগলবকরি যেমন ওটাও তেমন। খাশিপাঠা খেতে পারলে ওটাও আমার চলবে। এমন কথা শুনে ওদের কারুর কারুর চোখ চড়কগাছ হলেও আমার ওষুধ যথাস্থানে পড়ে বলেই মনে হয়। তবে মুখে বললেও কার্যত গরুর গোশত তখনও আমার সইছিল না শুধু অভ্যাসবশত। কিন্তু মনে মনে প্রস্তুতি নিতাম গরু আমাকে খেতেই হবে। নয়তো আমার নতুন বন্ধুরা ভাবতে পারে গরুকে এখনও আমি দেবতাই ভাবছি। যদ্দিন গরু খেয়ে হজম না করছি তদ্দিন নিজেকে মুসলিম বলে ভাবতে খারাপই মনে হচ্ছিল। তাই মনে মনে রেডি হচ্ছিলাম গরু আমি খাবোই।
গরু মানে গরুর গোশত মুসলিমরাই খান এমন নয়। পৃথিবীতে মুসলিম ছাড়াও আরও অনেক সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে গরুর গোশত প্রিয়খাদ্য। ইহুদিখৃস্টানরাতো খানই। আগের যুগে ভারতীয় হিন্দুরাও প্রায় গোগ্রাসে গোমাংস ভক্ষণ করেছেন এমন প্রমাণ রয়েছে ভারতীয় শাস্ত্রাদিতে। এমনকি গোমাংস না হলে তাদের অতিথি আপ্যায়ন পর্যন্ত হতো না। এজন্য অতিথিকে বলা হয় ‘গোঘœ‘ বা গোহন্তারক। শুধু প্রাচীন যুগে নয়। বর্তমান যুগেও কাশ্মিরী ও দক্ষিণ ভারতীয় ব্রাহ্মণদের প্রিয়খাবার গোমাংস। এখনও ভারতীয় ব্রাহ্মণরা বিদেশে গোমাংস রফতানি করে অঢেল রুপি উপার্জন করেন। বাংলাদেশেও গোমাংস রফতানি করতে তারা উদগ্রীব। শুধু সেখানে গোমাংসের প্রসেসিং নিয়ে আমাদের প্রশ্ন রয়েছে। সেটা গরুর গোশত হয়ে এদেশে রফতানি হবে নাকি গোমাংসই থাকবে তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কারণ শুধু গোশত হলেই মুসলিমরা খাবেন না। সেটা অবশ্যই হালাল উপায়ে প্রসেস হতে হবে। কারণ মুসলিমরা যা পান তাই খান না। খেতে তাদের নিষেধ রয়েছে।
গরুর গোশত সারা দুনিয়ায় প্রিয়খাবার। খুব পুষ্টিকর। উপাদেয়। সুঘ্রাণসমৃদ্ধ। এর স্বাদ যে একবার পায় সে আর ভোলে না। শুধু মানুষ নয়, মাংসাশী প্রাণি সিংহ-বাঘের কাছেও গরু খুব প্রিয়। বলবর্ধক। তবে মানুষের কারুর এলার্জিক প্রবণতা থাকলে গরুর গোশত এড়িয়ে চলা ভালো। কোলেস্টেরল প্রোব্লেম থাকলেও এ গোশত কম খাওয়া উচিত। যাদের হাই ব্লাডপ্রেসার আছে তাদেরও গরুর গোশত সমস্যা করতে পারে। আর যারা বেশি খেতে পছন্দ করেন, তাদের সমস্যা এমনিতেই হয়। অর্থাৎ বেশিবেশি কোনওকিছুই ভালো না। একথা সবার মনে রাখা উচিত। মুসলিমদেরতো বটেই।
একটা কথা সবাইকে বিশেষত মুসলিমদের স্মরণ রাখা খুব জরুরি। যে গরু হালাল উপায়ে জবাই করে প্রসেস করা হয় সেটা গোশত। আর যেটা অন্যভাবে মেরে বা হত্যা করে প্রসেস করা হয় সেটা আসলে গোশত নয় ‘মাংস’। মুসলিমরা পশুর মাংস খান না। গোশতই খান। এটা পরিভাষা হলেও মুসলিমদের মেনে চলা উচিত। মুসলিমদের ‘গোমাংস’ বলা অনুচিত। তবে যারা মুসলিম নন, তাদের সমস্যা নেই। অর্থাৎ যেসব হিন্দু বা খৃস্টান গরু খান, তারা গোমাংস বললে কারুর আপত্তি না থাকবারই কথা।
উল্লেখ্য, ভারতের অনেক হিন্দু গরুর মাংস খাবেন। মাংস প্রসেস করে রফতানিও করবেন। কিন্তু কোনও মুসলিমকে গরু জবাই করতে দেয়া হবে না। পালতেও বাধা দেয়া হবে। কোনও মুসলিম গরু নিয়ে বাজারহাটে গেলে তাকে ধরে মেরে ফেলবেন ‘গোমাতা’ রক্ষার নামে তা কোনও সভ্য মানুষ মেনে নিতে পারেন না। কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশটিতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমন ঘটনাই ঘটছে প্রায়শ। তবে এর প্রতিবাদও হচ্ছে। দোষীদের সাজাও দিচ্ছে দেশটির আদালত। জনগণও প্রতিবাদ করছে এমন অর্বাচীনতার। এর প্রতিবাদে কোথাও কোথাও গরুর গোশত উৎসব করে খাচ্ছেন অমুসলিমরা। আসামসহ অন্য কয়েক রাজ্যেও ঘটা করে গোমাংস ভক্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছেন হিন্দুসহ অমুসলিমরাই বলে খবর পাওয়া গেছে।
যাই হোক, ইসলামগ্রহণের বছরকাল যাবৎ গরুর গোশত অভ্যাসগত কারণে আমি খেতে পারিনি বলে বন্ধুদের কেউকেউ আমি রিয়েলি মুসলিম হয়েছি কিনা সন্দেহ করতেন। কেউকেউ বিরূপ মন্তব্য করতেও পিছপা হতেন না। দুয়েকজন জোরপূর্বক গরুর গোশত খাওয়াবার চেষ্টাও করেছেন। আবার প্রিয়বন্ধুদের মধ্যে কেউকেউ বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গেও ভেবেছেন। তবে আমি গরুর গোশত ঘৃণা করতাম এমন নয়। শুধু অভ্যাসবশত তা খেতে পারতাম না। এ বিষয়টা যেসব বন্ধু বিবেচনার সঙ্গে দেখেছেন তাদের মহানুভবতার জন্য আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। আর যারা জোর করে খাওয়াবার চেষ্টা করেছেন তাদের প্রতিও আমি বিদ্বেষ পোষণ করছি না। এখন আমার মনে হয় তারা ভালোই করেছিলেন। উল্লেখ্য, মরহুম আবুল হোসেন ভট্টাচার্যও ইসলামগ্রহণের পর বহুদিন গরুর গোশত খেতে পারেননি বলে আমাকে জানিয়েছিলেন।
প্রায় ত্রিশ বছর আগের কথা। গোপালগঞ্জ আলিয়া মাদরাসার বার্ষিক মাহফিলে আমি প্রধানবক্তা। সভাপতির আসনে ওই মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আবদুল হামিদ। ঘন্টা দু’আড়াই বক্তৃতা করলাম আমার ইসলামগ্রহণের বিবরণ দিয়ে। উপস্থিত সবাই সাগ্রহে শুনলেন। আমার কথা দূরে থেকে অনেক অমুসলিমও শুনছিলেন বলে আমাকে জানানো হয়।
মাহফিলশেষে প্রিন্সিপাল সাহেবের নেতৃত্বে খেতে বসেছি। সামনে গামলা ভর্তি বিফকারি মানে সেই গরুর গোশত। তবে এতো দিনে গরুর গোশত আমার প্রিয়খাদ্যে পরিণত। আমি গরুগোশতে অভ্যস্ত কিনা তা ভেবে স্বাভাবিকভাবে পরিবেশক ইতস্তত করছেন। প্রিন্সিপাল সাহেবও জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হচ্ছেন ওটা আমার চলে কিনা। আমি পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে আগবাড়িয়ে বললাম”
: হুজুর, ওয়াজে যেসব কথা বলেছি, সেগুলোর সব ঠিক ভাবা উচিত নয়। হাসতে হাসতে বললাম, এ গোশতের  সুঘ্রাণেইতো আমি আপনাদের দলে ভিড়লাম। এ খাওয়া ব্যতীত কালেমা পড়ে  লাভ কী? তাই বকেয়া মানে আগের যা বাকি ছিল তাসহ এখন আদায় করি। অতএব আমাকে গরুর গোশত ডবল ডবল দেবেন।
আমার কথা শুনে প্রিন্সিপাল আবদুল হামিদসহ খেতেবসা সবাই হো হো করে হেসে দিলেন। আমি আবার বললাম-
: গরুগোশত মানে ‘দেবতার মাংস’ ভক্ষণ ব্যতীত মুসলিম কেমনে হওয়া যায়, আমার জানা নেই। আবারও জোরে হাসলেন সবাই। বলতে দ্বিধা নেই, সেদিন গোপালগঞ্জে যখন বক্তৃতা করি তার অনেক আগেই আমি মোটামুটিভাবে গোখাদকে পরিণত। এখন কোনও উৎসবাদিতে খেতে বসলে যারা আমার বিষয় জানেন, তারা সাগ্রহে আমার দিকে তাকান আমি কী করি। কেউকেউ ঈর্ষাও করেন আমাকে গোখাদক হিসেবে দেখে। তবে এখন এটা বেশি খাওয়া আমার জন্য সুবিধেজনক নয় বলে ডাক্তার জানিয়েছেন। কারণ এলার্জিক প্রবণতা এবং হাইব্লাডপ্রেসার গরুখাদকদের জন্য সমস্যা করতে পারে। এছাড়া গরুর গোশত খেলেই কেউ মুসলিম হয় এমন ধারণা যাদের এখনও আছে তাদের সেটা পালটে নিতে হবে। কারণ এমন ধারণা আদৌ সঠিক নয়। মুসলিম হওয়া মানে বিরাট দায়িত্বশীলতা মাথায় নেয়া। পরিপূর্ণরূপে আল্লাহর কাছে বা কুরআনি বিধানের কাছে নিজেকে সোপর্দ করে দেয়া। আর গরুর গোশত কেবল মুসলিমরা খান না। ভারতীয় কোনও কোনও ব্রাহ্মণসহ আরও অনেকেই এটা তৃপ্তিসহকারে ভক্ষণ করেন। আমার এ কলামে এর ওপর বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছি। নেটে সার্চ দিয়ে দেখে নিতে পারেন। তবে খামারি ও পশুব্যবসায়ীরা স্টেরয়েড বা হরমোন খাইয়ে আজকাল যেভাবে মোটাতাজা ও দৃষ্টিনন্দন করে গরু হাটে তুলছেন সেগুলোর গোশত খাওয়া মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বেশ বিপজ্জনক। আর এ অবস্থা এক শ্রেণির অতি মুনাফাখোর মানুষের জন্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ