ঢাকা, শনিবার 4 August 2018, ২০ শ্রাবণ ১৪২৫, ২১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পলাশীর পরে সিরাজ মাতা আমেনা বেগম পত্নী লুৎফুন্নেসা ও তাঁর বংশধরেরা

মো. জোবায়ের আলী জুয়েল : সিরাজউদ্দৌলার হত্যার পর (৩রা’ জুলাই ১৭৫৭ খ্রিঃ) মীরজাফর সিদ্ধান্ত দিলেন লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা যোহরা, সিরাজ মাতা আমেনা বেগম, খালা ঘষেটি বেগম এবং সিরাজের নানী সরফুন্নেসা সহ আরো অনেককে নির্বাসনে পাঠানো হবে ঢাকার জিনজিরায়। ১৭৫৮ খ্রিষ্টাব্দে নবাব পরিবারের এই সদস্যদের ঠাসাঠাসি করে তোলা হলো একখানা সাধারণ নৌকায় এবং পাঠানো হলো ঢাকার জিনজিরায়।
সিরাজউদ্দৌলা যখন মুশির্দাবাদে হত্যা হোন জেসারত খাঁ ছিলেন সে’সময় ঢাকার নায়েব-ই-নাজিম। নবাব আলীবর্দী খাঁর জামাতা নাওয়াজিস খাঁর ইন্তেকালের পরই জেসারত খাঁকে ঢাকার নায়েব- নাজিম করা হয়। জেসারত খাঁ জাতিগতভাবে ছিলেন ইরানী।
নবাব আলীবর্দী খাঁ তখন বাংলার এই অঞ্চলে বর্গী দমনে অতিশয় ব্যস্ত। একদিন অকস্মাৎ নবাব আলীবর্দী খাঁর নজরে পড়েন রোগাগ্রস্ত প্রবাসী জেসারত খাঁ। রাস্তার ধারে ক্ষুধা- ব্যাধির যন্ত্রণায় তিনি তখন কাতর। পথ দিয়ে যাবার সময় তার সুন্দর দেহ সৌষ্ঠব দৃষ্টি আকর্ষণ করে নবাব আলীবর্দী খাঁর। তিনি এগিয়ে যান তার কাছে। সব শুদ্ধ উঠিয়ে নেন ঘোড়ায়। প্রত্যাবর্তনের পথে নিয়ে যান মুশির্দাবাদে। ব্যবস্থা করেন উপযুক্ত চিকিৎসার। রাজবৈদ্যের সুচিকিৎসায় অচিরেই সুস্থ হয়ে ওঠেন যুবক জেসারত খাঁ। নবাব তাঁর বুদ্ধিমত্তায় হন মোহিত। দীক্ষা দেন তাঁকে রাজকার্যে। তারপর তাকে জামাতা নওয়াজিশ খাঁর সাথে পাঠিয়েছিলেন ঢাকায়। পরবর্তীকালে নিজগুণে ভূষিত হন নায়েব-ই-নাজিমের পদে। মীর জাফরের আমলেও অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি সেই পদে। কিন্তু অন্যায় আব্দার প্রতিপালনে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে কোপাদৃষ্টিতে পড়েন শাহজাদা মীরণের। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে মীরণ ইংরেজদের মনে আস্থা জন্মাতে পেরেছিলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি আরো ঘটিয়েছিলেন কয়েকটি ঘটনা। সামান্য কারণে এই দানব নৃশংসভাবে হত্যা করেছিলেন উচ্চপদস্থ দু’জন ইংরেজ বিদ্বেষী প্রভাবশালী সরকারি কর্মচারীকে। নিজহাতে তরবারির আঘাতে শিরñেদ করেছিলেন দু’জন পর্দানশীন হেরেম বাসিনীকে। সে সময় এ ধরণের ঘটনা হেরেমের অভ্যন্তরে ছিল অভাবিত। রাজধানীর সম্মানিত মানুষ তাই সঙ্গত কারণেই তার উপর হয়ে পড়েছিল বিরুপ। তার ভয়ে সর্বক্ষণ থাকতো তটস্থ।
অশিষ্ট, ক্ষমতাদর্পী, হৃদয়হীন মীরণ একে-একে তার সকল বিরোধীকে ধরাতল থেকে সরিয়ে দেবার জন্য তৈরি করেছিলেন তিনশত দেশপ্রেমিকের একটা দীর্ঘ তালিকা। চিরতরে নিষ্কন্টক হবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ক্ষমতার দম্ভে ধরাকে করেছিলেন সরাজ্ঞান। তালিকা অনুযায়ী দেশপ্রেমিকদের হত্যা করার আগেই তার কাছে পৌঁছে যায় ঢাকার খবর। তিনি দেরী না করে কড়া নির্দেশ পাঠান ঢাকার নায়েব-ই-নাজিম জেসারত খাঁর কাছে। ঢাকার জিনজিরায় আলীবর্দীর পরিবারকে সমূলে হত্যা করার জন্য নিষ্ঠুর আদেশ দেয়া হয় তাকে। কিন্তু আদেশ পালনে অক্ষমতা প্রকাশ করেন বাস্তববাদী প্রশাসক জেসারত খাঁ। তিনি মীরণ কে পত্র লিখেন বিনা কারণে এমন নির্মম নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সহায় সম্বলহীন কয়েকটি ভীত-সন্ত্রস্ত করুণাপ্রার্থী নারীকে আমি হত্যা করতে পারবোনা। তার কোনো প্রয়োজনও নেই। ঢাকার অধিবাসীরা এমন হৃদয়হীনতা বরদাস্ত করবেনা। কিছুতেই সহজভাবে মেনে নেবেনা সম্ভাবিত হত্যাকা-কে। আমিও রেহাই পাবোনা তাদের কবল থেকে। হত্যা করাই যদি একান্ত প্রয়োজন ছিল, তাহলে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথেই তাদের মারলেন না কেন? ঢাকা বাসীদের কাছে তাদের হত্যা করলে সেই হত্যাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। জেসারত খাঁর উপদেশপূর্ণ অস্বীকৃতিপত্র ক্ষমতাগর্বী মীরণের হৃদয়ে আগুন জ্বেলে দিয়েছিল। তিনি দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়িয়েছিলেন। পত্র বাহকের সামনে আস্ফালন করে বলেছিলেন ‘‘উপদেশ দেয়া হয়েছে আমাকে? অবমাননা করা হয়েছে আমার আদেশ? ঠিক আছে, আলীবর্দী খাঁর পরিবারকে হত্যা করার আগে আমি এই নিমকহারাম বেয়াদব লোকটাকে উচিত শিক্ষা দিবো। নিজ হাতে খতম করবো তাঁকে। পাটনা থেকে ফিরেই আমি তিনশ জনের সাথে আরো একজনকে যুক্ত করবো। নিজহাতে হত্যা করবো আমি। তারপর খতম করবো আলীবর্দী খাঁর বংশের জীবিত সকলকে।’’
আলীবর্দীর পরিবারকে হত্যা করার জন্য মীরণ বাছাই করেছিলেন তার একজন বিশ্বস্ত অনুচরকে। এই অনুচরের নাম আসফ আলী। আসফ আলী খানকে মীরণ বলেছিলেন তুমি ঢাকার জিনজিরায় গিয়ে সিরাজের পুরাতন হিতৈষীর মতো ব্যবহার করবে। তারপর সুযোগ বুঝে একদিন নৌকায় করে সবাইকে নিয়ে আসবে মুশির্দাবাদে। আলীবর্দী খাঁর রক্তের কাউকে আমি জ্যান্ত রাখতে চাইনে। কাল সাপ পুষে লাভ নেই। তারপর কী করবো? জিজ্ঞেস করেছিল মীরণের বিশ্বস্ত অনুচর আসফ আলী। রাগান্বিত হয়ে জবাব দিয়েছিলেন মীরণ- তুমি একটা গর্দভ। পরিবারটিকে সমূলে ধ্বংস করতে হলে কী করতে হবে, তাও বলে দিতে হবে আমাকে। ওদের বুড়িগঙ্গার বুকে সবাইকে নৌকায় তুলে নৌকাডুবি করে মারবে। শুধু খেয়াল রাখবে নেমকহারাম জেসারত খাঁ যেনো তোমার দুরভিসন্ধি ধরতে না পারে। যাও কোনো দ্বিধা নেই, দ্বন্দ্ব নেই। কাজ হাসিল করে রাজধানীতে ফিরে আসবে। তোমাকেই ঢাকার নায়েব-ই-নাজিম করবো। জীবিত কবর দেবো জেসারত খাঁকে। পাটনা থেকে ফিরেই একে একে খতম করবো সবাইকে। আগুন, ঋণ আর শত্রুর শেষ রাখতে নেই।
যথারীতি আসফ আলী সবান্ধব এসেছিল ঢাকায়। আতিথ্য গ্রহণ করেছিল জেসারত খাঁর প্রাসাদে। তাঁকে বলেছিল- শাহজাদা মীরণের মনোভাব পরিবর্তীত হয়েছে। তিনি সিরাজের পরিবারকে হত্যা করার পরিকল্পনা ত্যাগ করেছেন। জেসারত খাঁ আসফ আলীকে জিজ্ঞেস করলেন, মীরণকে কি অনুতপ্ত মনে হয়? শুধু অনুতপ্ত নয় দস্তুর মতো মর্মাহত। আসফ আলী খাঁ উত্তর দিলেন। পরদিন যথারীতি জেসারত খাঁ আসফ আলী কে নিয়ে গিয়েছিলেন জিনজিরায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আসফ আলী মন জয় করতে সক্ষম হন নবাব পরিবারের। আসফ আলী বিনীতভাবে বল্লেন- নবাব মীরজাফর আপনাদের রাজধানী শাহী মহলেই বসবাস করার সুযোগ দিতে চান। একটা বজরা পাঠিয়েছেন আপনাদের মুর্শিদাবাদ নেয়ার জন্য।
আসফ আলীকে বিশ্বাস করে গ্রীষ্মের এক সন্ধ্যায় আলীবর্দী পরিবারের সদস্যরা চড়ে বসেন সেই বজরায়। সবাই মিলে মোট ১২ জন নরনারী সাড়ম্বরে যাত্রা করেন মুশির্দাবাদের উদ্দেশ্যে। ১৭৫৭ সালের ৩রা’ জুলাই মীরণের আদেশে জল্লাদ মুহম্মদী বেগ নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বন্দী নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে। প্রায় তিন বছর পরে ১৭৬০ সালে ১২ জন আত্মীয়কে হত্যা করার জন্য মীরণের আরেক জল্লাদ আসফ আলী তাদের উঠিয়েছিলেন নৌকায়। ঢাকা নগরীর দৃষ্টির অগোচরে যেতে না যেতেই বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরী সঙ্গমস্থলে ঠিক মাঝনদীতে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক আসফ আলী নৌকার তলার খিলগুলো খুলে দেয়। খিল খোলার সাথে সাথে বজ্ বজ্ করে বুড়িগঙ্গার ঠান্ডা পানি প্রবল বেগে প্রবেশ করে নৌকার মধ্যে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই অবধারিত করুণ পরিণতি ঘটে অসহায় নিরীহ কয়েকটি নারীর জীবনে। তাদের আর্ত চিৎকারে আকাশ-বাতাস মথিত হয়। নৌকার মাঝির প্রাণেও দোলা লাগে। কিন্তু তার করার কিছুই ছিলনা।
প্রাণে বাঁচার জন্য তারা সবাই আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন চির অনুগত আসফ আলীর কাছে। বলেছিলেন প্রাণে মেরোনা আমাদের। আমরা মীর জাফরের কোন ক্ষতি করিনি। আসফ আলী খোদার দিকে তাকিয়ে তুমি নৌকার ছিদ্র বন্ধ করো। আমাদের কূলে নিয়ে যাও। কুটিল হেসে জবাব দিয়েছিলো আসফ আলী ‘‘খোদার কথা পরে ভাবা যাবে। এখন পালন করতে হবে আমার প্রভূ শাহজাদা মীরণের আদেশ। মরতে হবে আপনাদের। অন্যথায় আমার মৃত্যু অবধারিত। আমি বাঁচতে চাই।’’ সিরাজের মা আমেনা বেগম শেষ পর্যন্ত খোদার কাছে ফরিয়াদ করে বলেছিলেন ‘‘হে খোদা তুমিই অন্তর্যামী। এর উপযুক্ত বিচার করো। বিনা কারণে মীরণ আমাদের ডুবিয়ে মারলো, তুমি তাকে বিনা মেঘে বজ্্রপাতে মেরে ফেলো।’’
নদীর নীরবতা বিদীর্ণ করে ঢাকার অনতিদূরে বুড়িগঙ্গার বুকে সেই রাত্রিতে কয়েকটি মৃত্যু পথযাত্রী মহিয়সী মহিলার করুণ আর্তচিৎকার ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। কিন্তু নদীর তীরবর্তী অধিবাসীরা ঘুর্ণাক্ষরেও তা’ জানতে পারে নাই। তাই এগিয়ে আসেনি কেউ তাদের সাহায্যে। ধীরে ধীরে তলিয়ে গিয়েছিল মৃত্যু-তরীটি। একটা ঘটনাবহুল যুগের অবসান হয়েছিল সেই অন্ধকার রাতে ঢাকার বুড়িগঙ্গার বুকে। দুনিয়ার বুক থেকে চিরদিনের জন্য মুছে গিয়েছিল নবাব আলীবর্দী খাঁর স্মৃতিঘেরা ঐতিহাসিক পরিবারটির।
খোদার ন্যায় বিচারের নিমর্মতা থেকে ঘাতক মীরণও রেহাই পায়নি। এই মর্মান্তিক ঘটনার মাত্র কয়েকদিন পরে ১৭৬০ সালের ২’রা জুলাই পাটনার উপকণ্ঠে সেনা ছাউনির মধ্যে বিশ্রামরত মীরণের মাথায় হঠাৎ নির্মল-নির্মেঘ আকাশের বুক চিরে নিপতিত হয়েছিল এক কঠিন বজ্র। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হয়েছিল মীরণের। পোড়া বিকৃত লাশ মীরণের। মীরণের পিতা মীর জাফর তখনও বাংলার সিংহাসনে সমাসীন। তাকে দেখতে দেয়া হয় নাই মীরণের পোড়া বিকৃতি লাশ। সিরাজ মাতা আমেনা বেগমের অন্তিম অভিশাপ এভাবেই কার্যকর হয়েছিল।
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রিয়তমা পতœীর নাম ছিল লুৎফুন্নেসা। সিরাজ মহিয়ষী লুৎফুন্নেসা ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথমে তিনি ছিলেন সিরাজের মা’ আমিনা বেগমের একজন হিন্দু পরিচারিকা। তাঁকে ‘‘রাজ কুনোয়ার’’ বলে ডাকা হতো। তাঁর যৌবনদীপ্ত সৌন্দর্য এবং মধূর ব্যবহারে সিরাজ আকৃষ্ট হন। তাঁর অনুরোধে আমিনা বেগম ‘‘রাজ কুনোয়ার’’ কে পুত্রের সেবায় নিয়োজিত করেন। পরবর্তীতে সিরাজ তাঁকে বিয়ে করেন এবং তাঁর নামকরণ করেন লুৎফুন্নেসা বেগম।
সিরাজের প্রথম বিবাহ হয় ১৭৪৬ সালের আগস্ট মাসে ইরাজ খান নামক একজন অভিজাত ব্যক্তির কন্যা উমদাতুন্নিসার (বহু বেগম) সাথে। প্রথম স্ত্রীর গর্ভে সিরাজের কোন সন্তান ছিলনা।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রিয়তমা পতœীর নাম ছিল লুৎফুন্নেসা। তিনি ছিলেন সিরাজউদ্দৌলার দ্বিতীয় স্ত্রী।
নবাব আলীবর্দী খাঁ ব্যক্তিগত তত্বাবধানে রেখে নাতিকে (সিরাজকে) গড়ে তুলে ১৮ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন নিজের পরিবারের আশৈশব সুশিক্ষিত পরমাসুন্দরী লুৎফুন্নেসার সাথে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে বিপুল উৎসব আয়োজন করে। লুৎফুন্নেসা বেগম সিরাজের প্রথম সহচরে পরিণত হন। সিরাজের প্রথম স্ত্রী উমদাতুন্নেসা (বহু বেগম) সবসময় আনন্দ-বিলাসেই মগ্ন থাকতেন। পলাশী বিপর্যের পর সিরাজ একাকী পলায়নের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু লুৎফুন্নেসা তাঁকে সঙ্গী করার জন্য আকুল আবেদন জানান। সিরাজ তাঁর বিশ্বস্ত স্ত্রী লুৎফুন্নেসা, তাঁদের একমাত্র কন্যা যোহরা এবং একজন অনুগত খোজা সহ ১৭৫৭ সালের ২৪ জুন গভীর রাতে নিভৃতে মুশির্দাবাদ শহর ত্যাগ করেন।
হতভাগ্য সিরাজ পলায়ন করতে গিয়ে মীর জাফরের ভ্রাতা মীর দাউদের হাতে অচিরেই ধরা পড়েন রাজমহলে। মীর জাফরের জামাতা মীর কাসিম সেখানে গিয়ে তাঁকে ধরে নিয়ে আসেন মুশির্দাবাদে।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা গ্রেপ্তার হওয়ার পর মীর কাসিম লুকানো সোনা-দানার সন্ধান চেয়ে লুৎফুন্নেসার ওপর অমানবিক অত্যাচার করেন। এদিকে মীর জাফরের পুত্র মীরণের আদেশে মুহম্মদী বেগ ১৭৫৭ সালের ৩’রা জুলাই সিরাজকে নিমর্মভাবে হত্যা করেন এবং মীর জাফরের পুত্র মীরণের নির্দেশে তাঁর মৃতদেহ হাতির পিঠে করে সারা মুশির্দাবাদ নগরে অত্যন্ত অপমানজনক অবস্থায় প্রর্দশনের ব্যবস্থা করেন। নবাবের স্ত্রী, মা এবং অনেক আত্মীয়স্বজন তখন বন্দী ছিলেন। তাঁদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তারা আলীবর্দী খাঁর বিখ্যাত আম খেতে চান কিনা (মালদহের বিখ্যাত ফজলী আম)। অশ্রুসজল নয়নে ক্ষুধার্ত অবস্থায় তারা ইঙ্গিতে সম্মত দিয়েছিলেন। তারপর করুণার জীবন্ত ছবি ইংরেজ সরকারের আদেশ অনুযায়ী অর্ধভর্তি আমের বস্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছিল তাদের কাছে। নবাব পরিবারের সব মহিলার পক্ষ থেকে একজন বস্তার মুখ খুলতেই দেখতে পেলেন ভেতরে আম নেই বা অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্যও নেই। আছে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বীভৎস কাঁচা কাটা মাথা। নবাব যেনো তাঁর গর্ভধারীণী মায়ের সাথে শেষ দেখা করতে এসেছেন। নবাবের হতভাগী মা’ প্রিয় পুত্রের মুখের দিকে তাকাতেই অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
স্বামীর শাহাদতের পর সিরাজের তরুণী বিধবা স্ত্রী লুৎফুন্নেসা মীর জাফর ও মীরণের বিবাহ প্রস্তাব প্রত্যাখান করে সারাজীবন অর্থাৎ দীর্ঘদিন স্বামীর কবরে পবিত্র কোরআন শরীফ পাঠ করে সময় অতিবাহিত করেছেন। আসলে নবাব সিরাজের চরিত্রের ওপর লুৎফা বেগমের বিরাট প্রভাব পড়েছিল। উন্নত চরিত্র গুণাবলীর অধিকারীনি লুৎফা সারাজীবন সিরাজউদ্দৌলার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। নবাবের পতনের পর লুৎফুন্নেসা সীমাহীন কষ্টের মধ্যে দিন অতিবাহিত করেন।
লুৎফুন্নেসা খোশ বাগে সিরাজের কবরের পাশে একখানি কুড়ে ঘর তৈরী করে বাকী জীবনটা সেখানেই কাটিয়ে দেন। কতবড় বিদূষী ও মহীয়সী নারী হলে জীবনের সব লোভ ও আয়েশ পরিত্যাগ করে তিনি জীবনের বেশীরভাগ সময় প্রাণাধিক প্রিয় স্বামী সিরাজের ধ্যানে কাটিয়ে দেন। তিনি মাসিক যে মাসোহারা পেতেন তা’ দিয়ে প্রতিদিন কাঙ্গালীভোজের ব্যবস্থা করতেন। তিনি সূদীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে এভাবে স্বামীর সেবা করে ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ শে নভেম্বর পরলোক গমন করেন এবং মূর্শিদাবাদের খোশবাগে সিরাজের পদতলে তিনি সমাধিস্থত হন। লুৎফুন্নেসার একনিষ্ঠ প্রেম, ভালবাসা এবং ত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বকালে সমূজ্জল হয়ে থাকবে।
যাকে নিয়ে এ লেখা, পলাশীর ইতিহাসে তাঁর অস্তিত্বের উপস্থিতি কখনো দিপ্ত স্বরব হয়ে ওঠেনি। কিন্তু পলাশী কখনো তাঁকে পাশ কাটিয়েও যেতে পারেনি, তিনি এক নারী নাম তাঁর বেগম লুৎফুন্নেসা। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সহধর্মিনী। পলাশী ২৫৮ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তেমন সরবে আসতে পারেন নি দূর্ভাগা নারী লুৎফুন্নেসা। ইতিহাসে বার বার উপেক্ষিতা রয়ে গেছেন তিনি। সিরাজকে হত্যা করে নবাব হলো মীর জাফর। তাঁকে নবাব বানালেন ক্লাইভ। সিরাজউদ্দৌলার কনিষ্ঠ ভ্রাতা ১৫ বছরের মির্জা মেহেদীকে হত্যা করা হলো মীর জাফর ও মীরণের নির্দেশে। অন্ধকার কারাগারে প্রকোষ্ঠে হত্যা করা হলো নির্মমভাবে মির্জা মেহেদীকে (নিহত ১৭৫৭ খ্রি:)। কারাগারে পুরলেন সিরাজের মা’ আমেনা বেগম, নবাব আলীবর্দী খানের (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রিঃ) পতœী সরফুন্নেসা, নবাব সিরাজউদ্দৌলার অর্ধাঙ্গিনী লুৎফুন্নেসা ও তাঁর ৪ বছরের শিশু কন্যা উম্মে যোহরাকে। ঘষেটি বেগম কেও কারাগারে পুরলেন। আজকের ঢাকার গা’ ঘেষে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গার ওপারে জিনজিরার প্রাসাদে নির্বাসনে পাঠালেন। নামে প্রাসাদ। আদতে কয়েদখানারও অধম। সে কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
সিরাজউদ্দৌলার হত্যার পর (৩’রা জুলাই ১৭৫৭ খ্রিঃ) মীর জাফর সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা উম্মে যোহরা, শাশুড়ী সিরাজ মাতা আমেনা বেগম, খালা ঘষেটি বেগম এবং সিরাজের নানী সরফুন্নেসাকে নির্বাসনে পাঠানো হবে জিনজিরায়। ১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে নবাব পরিবারের এই সদস্যদের ঠাসাঠাসি করে তোলা হয়েছিল একখানা সাধারণ নৌকায় যা’ পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের খাওয়া দাওয়া বাবদ সে সময় সামান্য অর্থ আসতো অনিয়মিত। ফলে চরম দারিদ্রের মধ্যে দিনযাপন করতে হয়েছে তখন এসব পরিবারের নারীদের। ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে রেযা খাঁকে ঢাকার নায়েব সূবাদার করা হলো। তিনি নবাব পরিবারের এই নারীদের জন্য সামান্য ভাতা বরাদ্দ করেন। সাত সাতটি বছর পর ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারী মাসে ঢাকার জিনজিরার বন্দীখানা থেকে মুক্তি পেয়ে মুশির্দাবাদ এলেন লুৎফুন্নেসা, তাঁর কন্যা উম্মে যোহরা ও আলীবর্দী খাঁর পত্নী সরফুন্নেসা। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যার ভরণ পোষণের জন্য মাসিক ৬০০/- টাকা বরাদ্দ করেন।
ক্লাইভের নির্দেশে লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা উম্মে যোহরাকে মুশির্দাবাদে আনা হয়েছিল। ক্লাইভের এ নির্দেশের বিরুদ্ধে যাবার দূঃসাহস ছিলনা ‘‘ক্লাইভের গর্দভ মীর জাফরের’’। পাপিষ্ঠ মীর জাফর ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জানুয়ারী দূরারোগ্য কুষ্ঠ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
বিপর্যস্ত জীবনে- ব্যথা, বেদনা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা যেনো অনুষঙ্গ হয়ে গেলো লুৎফুন্নেসার জীবনে। মুর্শিদাবাদে আসার কয়েক বছর পর একদমই ভেঙ্গে পড়লেন লুৎফুন্নেসা। মেয়ের বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। কিন্তু ঠাট বাটে মেয়ের বিয়ে দেয়া আর হলোনা। নবাব সিরাজউদ্দৌলার একমাত্র বংশধর উম্মে যোহরার বিয়ে হয়েছিল ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সিরাজের ছোট ভাই ইকরাম-উদ-দৌলার একমাত্র পুত্র সন্তান মুরাদ-উদ-দৌলার সঙ্গে।
মুরাদ-উদ-দৌলার ঔরসে উম্মে যোহরার এক পুত্র ও চার কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। উম্মে যোহরার পুত্রের নাম মির্যা শমশির আলী খান। কন্যাদের নাম হলো শরফ-উন-নিসা, আসমৎ-উন-নিসা, সাকিনা বেগম, উম্মতুলা মেহদি বেগম। তবুওতো জীবন একরকম কাটছিল। এবার কিন্তু জীবন থমকে দাড়ালো। জামাই মুরাদ-উদ-দৌলা মারা গেলেন হঠাৎ। ঠিক সে সময়ে সামলে উঠতে না উঠতে এলো আরেকটি আঘাত ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে। বিধবা কন্যা উম্মে যোহরা তাকে ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে গেলেন। বিধবা কন্যার মৃত্যুতে এবার তিনি একদমই ভেঙ্গে পড়লেন। ৬০০/- টাকা মাসিক পাঁচ পাঁচটি পিতৃ-মাতৃহারা নাতি ও নাতনীকে নিয়ে জীবন যে চলছিল, তা’ নয়। কিন্তু একে একে চারজন বিবাহযোগ্য মেয়ের দেখা দিল সমস্যা। কোথায় টাকা পাবেন ? কে তাকে সাহায্য করবে ? উপায়ান্তর না’ দেখে ১৭৮৭ সালের মার্চ মাসে গভর্ণর জেনারেল লর্ড কর্ণওয়ালিশ এর কাছে ভাতার অংশ বাড়িয়ে দেয়ার জন্য আবেদন করলেন। আবেদনপত্রে বললেন- নবাব সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুতে এবং তাঁর যাবতীয় মালামাল ও সম্পদ লুণ্ঠিত হওয়ায় এবং আমি বার বার চরম নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছি। ঝড়, ঝঞ্ছা প্রবল তরঙ্গ বইয়ে দেয়া হয়েছে আমার ওপর। লুৎফুন্নেসার আবেদন নাকচ করে দিলেন লর্ড কর্ণওয়ালিশ। ঐ ভাতা বাদে মাসে আরো ৩০৫/= টাকা পেতেন কোরাণখানী, দান খয়রাত ও খোশবাগে আলীবর্দী খাঁ এবং সিরাজউদ্দৌলার সমাধী দেখ-ভালের জন্য। ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৩ শে নভেম্বর স্বামীর কবরের পাশে নামাজরত অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দূর্ভাগা এই নারীর শেষ শয্যা রচিত হলো স্বামীর কবরের পাশে। ইতিহাস এ পর্যন্ত এসে নিরব হয়ে গেছে, থেমে গেছে। এই দূর্ভাগা নারীর অসহায় এক নাতী ও চার নাতনীর আর কোনো খোঁজ খবর রাখেনি ইতিহাস।
ঢাকার জিনজিরার প্রাসাদ কয়েদখানার প্রতিটি ইটে মিশে থাকা লুৎফুন্নেসা, আমেনা বেগম, সরফুন্নেসা ও ঘষেটি বেগমের বুকভাঙ্গা দীর্ঘশ্বাস, আর্তনাদ ও গোঁঙ্গানির কান্নার আওয়াজ আজও শুনতে পাওয়া যায়। ইতিহাসের ছাত্র কান পাতলেই তা’ শুনতে পাবে। সেই ইতিহাস আমাদের পূর্বপুরুষের করুণ ইতিহাস। সেই ইতিহাস এক অব্যক্ত বেদনার ইতিহাস।
তাই আজ এতদিনে জেগে উঠেছে সিরাজউদ্দৌলার বংশধরদের ইতিহাস। ইতিহাস কখনোই থেমে থাকেনি।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে সিরাজউদ্দৌলার একমাত্র নাতি উম্মে যোহরার পুত্রের নাম মির্যা শমশির আলী খান। মির্যা শমশির আলী খানের একমাত্র পুত্র মির্যা লুৎফে আলী খান। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে লুৎফে আলীর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী হন একমাত্র কন্যা ফাতিমা বেগম। ফাতিমা বেগমের গর্ভে জন্ম নেয় ৩ কন্যা লতিফ-উন-নিসা, হাসমত আরা বেগম ও উলফ্-উন-নিসা। ফাতিমা বেগম মারা যান ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে। ফাতিমা বেগমের কন্যা হাসমত আরা বেগমের বিয়ে হয় বঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যার ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীতে নিযুক্ত দেওয়ান কূখ্যাত অত্যাচারী দেবী সিংহের (দেবী সিংহ রংপুর, দিনাজপুরের যুক্ত জেলার অর্থমন্ত্রি ছিলেন) পালনকর্তা মোহাম্মদ রেযা খানের ভাই আহাম্মদ খানের এক অধঃস্তন পুরুষ সৈয়দ আলী রেযার সঙ্গে। সৈয়দ আলী রেযা ও হাসমত আরা যথাক্রমে ১৮৯৭ ও ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। এই সৈয়দ আলী রেযার পুত্র সৈয়দ যাকি রেযা ও কন্যার নাম হলো তিলাত আরা বেগম। এই সৈয়দ যাকি রেজা মুর্শিদাবাদের সাব-রেজিষ্ট্রার ছিলেন।
সিরাজের কন্যা উম্মে যোহরা ও তাঁর স্বামী মুরাদ-উদ-দৌলার এক কন্যা সাকিনা বেগমের দুই জন কন্যা ছিলেন তারা হলেন খয়ের-উন-নিসা ও ফাতেমা বেগম। পরবর্তীতে খয়ের-উন-নিসার মেয়ে ছিলেন জীনা বেগম এবং ফাতেমা বেগমের এক ছেলে ছিল তাঁর নাম মোহাম্মদ আলী খাঁ। সৈয়দ যাকি রেযার পরিবারের দূগর্তির কথা ঢাকার নবাব স্যার সলিমূল্লাহর কর্ণগোচর হলে তিনি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন বাংলার গভর্ণর H.F.S. SAMMAN (আই.সি.এস) কে অনুরোধ করেছিলেন সৈয়দ যাকি রেযাকে একটি ভাল চাকরী দেয়ার জন্য। সৈয়দ যাকি রেযার ৪ পুত্র সৈয়দ গোলাম হায়দার, সৈয়দ মহসিন রেযা, সৈয়দ গোলাম আহম্মদ, সৈয়দ গোলাম মর্তুযা। সৈয়দ গোলাম আহম্মদের এক ছেলে সৈয়দ রেযা আলী এবং ২ কন্যারা হলেন খুরশিদা বেগম ও মুগরা বেগম। এরা দীর্ঘ সময় মুর্শিদাবাদে ছিলেন। এরা চলে আসেন ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। সৈয়দ গোলাম হায়দার, সৈয়দ মহসিন রেযা ও সৈয়দ গোলাম আহম্মদ বদলী হয়ে চলে যান যথাক্রমে করাচী, রাওয়াল পিন্ডি ও লাহোরে। সৈয়দ রেযা আলী থেকে যান খুলনা কাস্টমসে। সৈয়দ গোলাম মর্তুযা এসে যোগ দেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার অফিসে। “সাপ্তাহিক পলাশী” পত্রিকায় ১৪ আগষ্ট ১৯৯২ সংখ্যায় প্রকাশিত এক সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে (সম্পাদক ড. মুহম্মদ ফজলুল হক) “বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সপ্তম বংশধর গোলাম মর্তুযা ৮২ বছর বয়সে গত ১৯ জুলাই ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে বিকেল ৫টা বেজে ২৫ মিনিটে খুলনার মিউনিসিপ্যাল ট্যাংক রোডস্থ তাঁর নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে...........রাজেউন)। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র, কন্যা, নাতি নাতনী সহ অসংখ্য আত্মীয় স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁকে খুলনার টুটপাড়া গোরস্তানে ২০ জুলাই ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে দাফন করা হয়। সৈয়দ গোলাম মর্তুযা সাহেবের পুত্র সৈয়দ গোলাম মোস্তফা একজন ইঞ্জিনিয়ার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের। বর্তমানে আছেন ঢাকায়। অন্য পুত্র গোলাম মোহাম্মদ খুলনাতেই ব্যবসা করছেন। তাঁরা ২ জন হলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার অষ্টম বংশধর। সৈয়দ গোলাম মোস্তফার বড় ছেলে সৈয়দ গোলাম আব্বাস আরেব নবাব সিরাজউদ্দৌলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার্থে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি এখন সিরাজউদ্দৌলার নবম পরিবারের প্রজন্ম।
চিৎপুর খান্দানের বাইরে বিয়ে হয়েছিল সিরাজউদ্দৌলার একমাত্র মেয়ে (সিরাজউদ্দৌলার স্ত্রী লুৎফুন্নেসার একমাত্র গর্ভজাত কন্যা) উম্মে যোহরার একমাত্র পুত্র মির্যা শমশির আলী খানের দৌহিত্রী ফাতিমা বেগমের মেয়ে উলফ-উন-নিসার মুর্শিদাবাদের সুলতান আমীর মির্যার সাথে। তাদের ৫ পুত্র ও ৫ কন্যার একপুত্রের বংশধর আহমদ মির্যার ৩ পুত্রের নাম ওয়াজেদ মির্যা, ইশতিয়াক মির্যা ও ইমতিয়ায মির্যা। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর এরা সবাই খুলনাতেই আছেন। ছোটখাটো চাকরী করেছেন খুলনা কালেক্টরেটে। বর্তমানে তাঁরা সবাই অবসর জীবন যাপন করছেন।
বাংলাদেশ থেকে কোনো সরকারি সাহায্য বা ভাতা তাঁরা আজ অবধি পান নাই। এ এক ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। অকাল প্রয়াত, চরম নৃশংসতার শিকার বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বংশধরগণ আজও অবহেলিত, উপেক্ষিত। জাতির জন্য সত্যিই এ’ এক চরম বেদনাদায়ক ঘটনা।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো এই যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না।
তথ্যসুত্র :
১।     ইতিহাসের অন্তরালে : ফারুক মাহমুদ
২।     সিরাজউদ্দৌলা : অক্ষয় কুমার মৈত্র
৩।     মুর্শিদাবাদ কাহিনী : নিখিল নাথ রায়
৪।     আলীবর্দী এন্ড হিজ টাইমস : কে.কে দত্ত
৫।     বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস : আব্দুর রহীম
৬।    নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও বাংলার মসনদ : ড. মুহম্মদ ফজলুল হক
৭।    পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ : অধ্যাপক ড. রজতকান্ত রায়
৮।    ঢাকার ঐতিহাসিক ট্রাজেডি : আনিস সিদ্দিকী
লেখক : কলামিষ্ট, সাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও সরকারি কর্মকর্তা

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ