ঢাকা, শনিবার 4 August 2018, ২০ শ্রাবণ ১৪২৫, ২১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

যেখানে সেখানে কলেজ শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার কারণ

আবুল হাসান/খনরঞ্জন রায় : পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিষয় এবং এমপ্লয়মেন্ট প্যাটার্ন স্টাডি ও রিসার্চ পেপারে প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যেসব দেশে ডিপ্লোমা জনশক্তি যত বেশি, সেসব দেশের মাথাপিছু আয় ততো বেশি। উদাহরণ হিসেবে জাপান ও জার্মানে ৫৮%, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪৭% এবং তাদের মাথাপিছু আয় যথাক্রমে ৩৭৮২৮, ৩৬৬৪৫ ও ৩১৪১০ মার্কিন ডলার। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে মধ্যমস্তরে ডিপ্লোমা জনশক্তির হার ২.৮% এবং মাথাপিছু আয় ১৫০০ মার্কিন ডলারেরও কম। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় মধ্যমস্তরের কারিগরি জনশক্তি বেশি নিয়োগ করে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে।
সুষম আয়বণ্টন নিশ্চিত না করে দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের দেশের শ্রমিকরা যদি ডিপ্লোমা প্রাপ্ত হতো বিদেশে যাওয়া কর্মীরা যদি শিক্ষায় আরো শিক্ষিত হতো, তাহলে দেশের মোট আয় আরো অনেক বাড়ত। শিক্ষাই যদি অবহেলিত হয়, শিক্ষার নামে তামাশা আর হেলাফেলা হয়, তাহলে দেশের কাক্সিক্ষত আয় ও উন্নয়ন শুধু বাধাগ্রস্ত হবে না, একসময়ে নিম্নমুখী হয়ে যাবে; এটাও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে। বিষয়টি জাতীয় স্বার্থে অতিগুরুত্বপূর্ণ। পরিতাপের বিষয় কর্মের  হাতছানি দেয়া গুরুত্বপূর্ণ ডিপ্লোমা শিক্ষার মান উন্নয়ন চলে হরিলুট।
এই শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি হয়ে ডিটেইল প্রজেক্ট পরিকল্পনা (ডিপিপি) অনুযায়ী খাতভিত্তিক বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করা হয় না। যে খাতে অর্থ কম তাতে যন্ত্রপাতি কেনা ও অবকাঠামো নির্মাণের নামে বেশি খরচ করা হয়। জনবল নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ খাতে বেশি বরাদ্দ থাকলেও খরচ করা হয় কম। প্রকল্প বাস্তবায়নেও ব্যাপক শিথিলতা থাকে। এ অবস্থায় প্রকল্প ব্যয় ৬৫ শতাংশ কমানো হয়। তারপরও লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এভাবে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা এবং কোটি কোটি টাকা লুটপাটের কারণে ডিপ্লোমা শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এনিয়ে দেশের খ্যাতিমান জাতীয় দৈনিকসমূহে তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট হরহামেশায় প্রকাশ হয়ে থাকে।
কর্মসংস্থানকে লাগসই ও অধিক শিল্প-সম্পর্কিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় 'স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট' নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে কারিগরি অধিদফতর। সুইডিস ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন অনুদানে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ সহায়তা ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে এ প্রকল্পে ৪৬০ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। এর মধ্যে সরকারের বিনিয়োগ ৭৩ কোটি ৬০ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০০৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত। পরবর্তীতে ব্যয় অপরিবর্তিত রেখে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়। দ্বিতীয় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এ সময় প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে ১৬২ কোটি ৬৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১৫৪ কোটি ৫৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা।
প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশোধিত বাজেটের মোট অর্থের ৯৫ শতাংশ শেষ পর্যন্ত ব্যয় করা হয়। তবে পিসিআর কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী বাস্তব (প্রথম বাজেটের) অগ্রগতি ৩০ দশমিক ৮৫ ভাগ সবচেয়ে দুর্নীতি হয়েছে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে। এ খতে ডিপিপি অনুযায়ী ২২ কোটি ৬২ লাখ ১৩ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ২০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বরাদ্দের ৯২ ভাগ খরচ দেখানো হয়েছে। ৩ হাজার ৯৩৩টি সেট যন্ত্রপাতি ক্রয়ের কথা থাকলেও ক্রয় করা হয়েছে ৭ হাজর ৯৫৮ সেট।
ব্যয়ের হিসাবে শতকরা হার ২৩২ ভাগ। নির্মাণকাজে ৬৩ কোটি ৩৪ লাখ ২ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ৫৭ কোটি ৭৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বরাদ্দের শতকরা ৯২ দশমিক ২৭ ভাগ অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে। তবে ১১ হাজার ৬৫ বর্গমিটার অবকাঠামো নির্মাণ করার কথা থাকলেও নির্মাণ করা হয়েছে ২১ হাজার ৮৬৯ বর্গমিটার। শতকরা হিসাবে ব্যয়ের হার ১৮৮ ভাগ। দুর্নীতির জন্যই এ বাড়তি নির্মাণকাজ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আসবাবপত্র ক্রয়ে ২ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে খরচ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৭৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। বিষয়গুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে খতিয়ে দেখার জন্য প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পে অর্থ সাহায্য কমানোর কারণে প্রকল্প ব্যয় কমেছে। ফলে প্রকল্পের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বরাদ্দকৃত সব অর্থ খরচ না হওয়া এবং প্রকল্পের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার জন্য প্রকল্প, কর্মকর্তাদের অদক্ষতাকে দায়ী করা হয়েছে। যন্ত্রপাতি ক্রয়ে বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যয় না বাড়লেও সংখ্যা বৃদ্ধি, নির্মাণকাজে বাজেটের চেয়ে আর্থিক মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এসব বিষয়ে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। প্রকল্প ২০১৫ সালের জুন মাসে শেষ হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে আইএমইডিতে প্রকল্পের পিপিআর জমা দেয়ার কথা। কিন্তু ১ বছর ৪ মাস পরে জমা দেয়া হয়েছে। এই নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে। এনিয়ে চিঠি চালাচালিতে বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ।
‘শিক্ষা ও দুর্নীতি' দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত শব্দ। শিক্ষাই মানুষকে আলোর পথ দেখায়। মানুষ সেই ছোটকাল থেকে শিক্ষা লাভ করে নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করতে থাকে। যারা এই শিক্ষার সাথে জড়িত, যাদেরকে মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে অভিহিত করা হয়, যাদের জাতির বিবেক হিসেবে গণ্য করা হয় সেই ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান কারিগরি শিক্ষা বোর্ড নিয়ে সমাজে মুখরোচক আলোচনা বেশ জনপ্রিয়। এসব কারণে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হতে আগ্রহী হয় না। শিক্ষা ও দুর্নীতি এই দুটি শব্দকে বার বার চিহ্নিত করে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা যথেষ্ট হতাশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে ডিপ্লোমা শিক্ষার ক্ষেত্রে যা হয়েছে তা অগ্রহণযোগ্য ও ক্ষমার অযোগ্য। অন্য যে বিষয়ে যা-ই হোক, গুরুত্বপূর্ণ তারুণ্যের কর্মসংস্থান নির্ভর ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ে হেলাফেলা ও সীমাহীন অসংগতি কোনোভাবেই মার্জনীয় নয়।
ডিপ্লোমা শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। যে কোনো সমাজ এবং দেশকে সমৃদ্ধির দ্বারে পৌঁছে দিতে এই শিক্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর এই শিক্ষা যেন কোনো মুনাফার হাতিয়ার হয়ে উঠতে না পারে সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের বলতে ইচ্ছে করে যে, বাণিজ্য আর স্বার্থবাদী রাজনীতির থাবা থেকে বের করে ডিপ্লোমা শিক্ষাচিন্তা গবেষকদের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার বিকল্প নেই। সমুদ্রে জাহাজ বিপদে পড়লে এসওএস সিগনাল পাঠায়। এই সিগনাল ধরে ছুটে যায় উদ্ধারকর্মীরা। উদ্ধার পায় যাত্রী আর নাবিক। কিন্তু আমাদের ডিপ্লোমা শিক্ষার প্রসারের বিপন্ন দশায় বুনোমোষ তাড়ানো আমাদের মতো অনেকেই লিখে, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস করে ক্রমাগত এসওএস পাঠিয়ে যাচ্ছি সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাবানদের কাছে।
বদলে যাচ্ছে সময়। দিন বদলের পালায় প্রতিদিনই পরিবর্তন ঘটছে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার কর্মকৌশলের। আমাদেরও কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে ডিপ্লোমা শিক্ষা কার্যক্রম পৃথক করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভাগভিত্তিক ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠার চিন্তা করতে হবে। প্রতিষ্ঠিত বোর্ডসমূহের বাস্তবমুখী কর্মকৌশলের মাধ্যমে তরুণদের যথাযথ কর্মসংস্থান শিক্ষা নিশ্চিত করে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব। সেই প্রত্যাশায় তাকিয়ে আছে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ