ঢাকা, রোববার 5 August 2018, ২১ শ্রাবণ ১৪২৫, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

জিগাতলা-ধানমন্ডিতে শিক্ষার্থীদের ওপর হেলমেটধারীদের হামলা গুলী

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানী ঢাকায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ধানমন্ডির কার্যালয়ের কর্মীদের সংঘর্ষ বাধার পর জিগাতলা এলাকা রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে এই সংঘর্ষ শুরুর পর রাত পর্যন্ত চলে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, জিগাতলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) গেটের সামনে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠি হাতে হামলা চালিয়েছে একদল যুবক। তারা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলীও ছুঁড়েছে। এই যুবকদের মাথায় হেলমেট ছিল। এ সময় দুই পক্ষকেই ইটপাটকেল ছুঁড়তে দেখা যায়। বেলা দুইটার দিকে এ ঘটনা ঘটে বলে তারা জানায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশও লাঠিচার্জ শুরু করে। একপর্যায়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদর দফতর থেকে বিজিবি সদস্যরা বেরিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সকাল থেকে ওই এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী সেখানে অবস্থান নেয়। বেলা দুইটার দিকে বিজিবি গেটের সামনে শত শত শিক্ষার্থীর একটি অংশের ওপর হঠাৎ করে হেলমেট পরা, লাঠি হাতে ২৫ থেকে ৩০ জনের একদল যুবক হামলা চালায়। ওই সময় বিজিবির সদস্যরা গেট থেকে সামনে এসে যুবকদের থামানোর চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থী ও হামলাকারীরা একে অপরের দিকে ইটপাটকেল ছোঁড়া শুরু করে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সময় সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের কোনো ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। বেলা সোয়া তিনটার দিকে সেখানে দায়িত্বপালনরত প্রথম আলোর প্রতিবেদকের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় হামলাকারী যুবকেরা।  অবশ্য আধা ঘণ্টা পর তারা ফোনটি ফেরত দিয়ে দেয়।
শিক্ষার্থীরা জানায়, সকালের দিকে তারা সীমান্ত স্কয়ারের একপাশে জড়ো হতে চাইলে সেখানে লাঠি হাতে ধাওয়া দেয় আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের কর্মীরা। ধাওয়ার খবরে আন্দোলনকারীরা অন্যান্য স্পট থেকে সীমান্ত স্কয়ারের সামনে জড়ো হয়।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠি হাতে একদল যুবকের হামলার ঘটনার পর থেকে থেমে থেমে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছে বলে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানা গেছে। ধানমন্ডি আওয়ামী লীগ কার্যালয় এলাকা থেকে জিগাতলা এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এ সময় শিক্ষার্থী-সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়।
গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে লাঠি হাতে একদল যুবককেও দেখা গেছে। ঘটনা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদর দফতরের কাছে হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায় বিজিবি সদস্যরাও।
স্থানীয়রা জানান, গতকাল শনিবার দুপুরের দিকে জিগাতলার বিজিবি গেটের সামনে হেলমেট পড়া যুবকরাই শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠি হাতে হামলা চালায়। তখন থেকে জিগাতলা, সাইন্সল্যাব ও ধানমন্ডি এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের সময় গুলীর শব্দও শুনেছেন বলে জানিয়েছেন তারা। এলাকার পরিস্থিতি এখনও থমথমে।
এর আগে সকাল থেকে জিগাতলা এলাকায় জড়ো হতে থাকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসংখ্য শিক্ষার্থী। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এরপরই ২০-২৫ জন হেলমেটধারী যুবক তাদের ওপর হামলা চালায়। শিক্ষার্থীরাও তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জাড়িয়ে পড়ে।
এক চা বিক্রেতা বলেন, “একদল আন্দোলনকারী ছাত্র পার্টি অফিসের দিকে আসতে থাকলে ঝামেলা বাধে। “ছাত্ররা হঠাৎ করে জিগাতলা মোড় থেকে আসতে থাকে। তখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বাধা দেয়। ছাত্ররা বাধা না মানলে বাক-বিতন্ডা হয়। ছাত্রছাত্রীরা শ্লোগান দিয়ে পার্টি অফিসের দিকে আগালে পার্টি অফিসের নেতাকর্মীরা ধাওয়া দেয়।”
আন্দোলনকারী একজনকে আওয়ামী লীগের এক কর্মী ধরে নিয়েছে বলে গুঞ্জন ছড়ানোর পর শিক্ষার্থীরা সেদিকে এগুচ্ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। ধাওয়ার মুখে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে সীমান্ত স্কয়ার এলাকায় অবস্থান নেয়। চার শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন বলেও এসময় ফেইসবুকে গুজব ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়। তারা এগোতে চাইলে হেলমেট পরা একদল যুবক তাদের ধাওয়া দেয়। তাদের ধাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ধানমন্ডি ২ নম্বর সড়কের স্টার রেস্তোরাঁর দিকে সরে যায়। বিকাল ৫টার দিকে আম্বালা হোটেলের সামনে থেকে স্টার কাবাবের দিকে থাকা শিক্ষার্থীদের দিকে ইট ছুঁড়তে দেখা যায় হেলমেট পরা ওই যুবকদের। তাদের মধ্যে একজনকে আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ফাঁকা গুলী ছুঁড়তে দেখা যায়। এসময় শিক্ষার্থীরা পাল্টা ঢিল ছুঁড়ছিল, তাদের কারও কারও হাতে লাঠিও দেখা গেছে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে ৬টার দিকে শিক্ষার্থীরা এগিয়ে বিজিবি ফটকের কাছে এই অবস্থান নেয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনেও নেতা-কর্মীরা অবস্থান নিয়ে আছে।
 সোয়া ৬টার দিকে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের দিক থেকে কয়েকজন যুবককে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের গুজবের বিষয়টি বোঝাচ্ছিলেন তারা।
রাস্তায় ইট-লাঠি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। স্টার রেস্তোরাঁর কাছেও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হচ্ছে। সেখানে সড়কে দুটি মোটর সাইকেল জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সায়েন্স ল্যাবরেটরির সামনে লাঠি হাতে ৪০/৫০ জন যুবক অবস্থান নিয়েছে। সেখানে পুলিশ থাকলেও তাদের কোনো তৎপরতা নেই।
জিগাতলায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর সংঘর্ষে রূপ নেয়া ঘটনায় জিগাতলা এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে ধানমন্ডি ২ নম্বর সড়কে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালের সামনের সড়কেও শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এ সংঘর্ষে প্রায় ৫০ জন আহত হয়ে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।
পপুলার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, আহত প্রায় ৫০ জনকে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের বেশিরভাগকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
গত ২৯ জুলাই দুপুরে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অদূরে বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের রেষারেষিতে রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। নিহত দুই শিক্ষার্থী হলো- দিয়া খানম মীম ও আব্দুল করিম। এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়।
এ ঘটনার প্রতিবাদে এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। এর মধ্যে বুধবার (১ আগস্ট) বিকেলে বাস মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়ার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বৃহস্পতিবার (২ আগস্ট) সারাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এরপরও বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে। শুক্রবার ছুটির দিনেও তারা রাস্তায় নামে। এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় বিভিন্ন যানবাহনের লাইসেন্স, ফিটনেস মেয়াদ ও চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করে।
এর মধ্যে নিহত দুই পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে সহায়তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও।
দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসের পরও শিক্ষার্থীরা শনিবার সপ্তম দিনের মধ্যে রাস্তায় নামে।
এদিকে, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের মধ্যে বৃহস্পতিবার (২ আগস্ট) থেকে বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন ও দূরপাল্লার যানবাহন। চালক-শ্রমিকরা বলছেন, সড়ক নিরাপদ না হলে তারা রাস্তায় গণপরিবহণ চালাবেন না।

আ. লীগ কার্যালয় ঘুরে শিক্ষার্থীরা বলল, গুজব শুনেছিল তারা
ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয় ঘুরে দেখে নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা জানালেন, তাদের কয়েকজনকে আটকে রাখা হয়েছে বলে গুজব শুনে বিভ্রান্ত হয়েছেন তারা। গতকাল শনিবার দুপুরে এই গুজব শুনে ধানমন্ডি আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ের দিকে শিক্ষার্থীরা এগোলে সংঘর্ষ বাঁধে, বিকাল পর্যন্ত চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।
এরপর সন্ধ্যার আগে আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে কয়েকজন এসে পুলিশের সঙ্গে পুরো কার্যালয় ঘুরে দেখে। তারপর আওয়ামী লীগের কার্যালয়েই সংবাদ সম্মেলন করেন ওই শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের একজন ঢাকা আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী কাজী আশিকুর রহমান তূর্য বলেন, “দুপুরে নামাজের পর হঠাৎ কিছু লোক এসে হঠাৎ বলে, আমাদের চারজন বোনকে আর কজন ছেলেকে আওয়ামী লীগ অফিসে আটকে রাখা হয়েছে। পরে আমাদের একটি অংশ আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে চলে আসে। “কিন্তু আমরা আওয়ামী লীগ অফিসে এসে দেখলাম, এমন কিছু ঘটেনি।”
 সেখান থেকে বেরিয়ে তূর্য আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, “আন্দোলনকারীদের মেরে ফেলা ও আটকে রাখার যে তথ্য আমরা পেয়েছিলাম, তা গুজব। আপনারা কেউ গুজবে কান দেবেন না।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ