ঢাকা, রোববার 5 August 2018, ২১ শ্রাবণ ১৪২৫, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এবার রাতের বেলায়ও পরিবহণ বন্ধ করে দিল মালিকরা

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন রুটে দিনের বেলা আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধের পাশাপাশি এবার নাইট কোচ চলাচলও বন্ধ করে দিয়েছেন মালিকরা। তারা জানিয়েছেন নিরাপত্তা না থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে গতকাল ঢাকার রাস্তায় পরিবহণ না থাকায় ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েন পথচারীরা। এছাড়া ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে পরিবহণ শ্রমিকরা গণপরিবহণ চলতে বাধা দিয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ খান গতকাল জানান, সমিতি থেকে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। তবে মালিকরা ব্যক্তিগতভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বলেছে রাতের বেলাও বাস ছাড়বে না। ঢাকা ও আন্তঃজেলা রুটে বাস চলাচল কবে নাগাদ শুরু হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকছে ততদিন বাস চলবে না বলে মালিকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, গত রোববার (২৯ জুলাই) ঢাকার কুর্মিটোলায় বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার ঘটনায় রাস্তায় নেমেছে শিক্ষার্থীরা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে গণপরিবহণের লাইসেন্স, ড্রাইভিং লাইসেন্স যাচাই করছে শিক্ষার্থীরা। এরই জের ধরে ঢাকার রাস্তায় গত পাঁচদিন প্রায় বন্ধই ছিল গণপরিবহণ। ২ আগস্ট শুক্রবার থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন পরিবহণ শ্রমিকরা। এমনকি ঢাকা থেকে গত দুইদিনে দূরপাল্লা বা আন্তঃজেলা কোনো বাসও ছেড়ে যায়নি এবং ঢাকায়ও প্রবেশ করেনি। কিন্তু অনেক জেলায় শুক্রবার রাতেও নাইট কোচ ছাড়া হলেও নতুন সিদ্ধান্তের ফলে গতকাল শনিবার রাতে কোনো গাড়ি চলেনি।  পূর্বের ন্যায় অঘোষিত পরিবহণ ধর্মঘট- এর ফলে বিভিন্ন জায়গায় মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ছে।
এদিকে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকরা একদিকে যেমন গাড়ি চালাননি, অপরদিকে তারা গাড়ি চলাচলে বাধাও দিয়েছেন। রাজধানীর সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন স্থানে পরিবহণ শ্রমিকরাই সড়কে নেমে যান চলাচলে বাধা দেন। এমনকি বাস থেকে যাত্রীদের রাস্তায় নামিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
অপরদিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম গণমাধ্যমে জানান, ছাত্ররা ও শ্রমিকরা কেউ কারো মুখোমুখি নয়। ছাত্ররা আমাদেরই সন্তান। একইসঙ্গে শ্রমিকরাও আমাদের ভাই। প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে। নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত হলেই মালিকরা বাস চালানোর অনুমতি দেবে।
জানা গেছে, গতকাল যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা মোড়ে কোনো শিক্ষার্থী অবস্থান নিতে পারেনি। সেখানে ফ্লাইওভারের নিচে সকাল থেকেই পুলিশের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক পরিবহণ শ্রমিক অবস্থান নেন। এর মধ্যে পরিবহণ শ্রমিকরা কয়েক দফা কিছুটা এগিয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দেন।
গতকাল  বেলা ৩টা ১০ মিনিটের দিকে হঠাৎ করেই স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম অনু লোকজন নিয়ে হাজির হন। এ সময় শিক্ষার্থীরা দ্বিগবিদিক ছুটে পালিয়ে যান। কয়েকজন শিক্ষার্থী ওয়ার্ড কাউন্সিলরের লোকজনের হাতে ধরা পড়েন। এই অবস্থায় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ধরাপড়া শিক্ষার্থীদের বলেন,  তোমাদের সব দাবি মেনে নেয়ার পরও কেন তোমরা এখনও আন্দোলন করছ, গাড়ির কাগজপত্র চেক করছ? তোমরা এটা করিও না। ঘরে ফিরে যাও। আর রাস্তায় এসো না। পরে আরও বুঝিয়ে শিক্ষার্থীদের তিনি ছেড়ে দেন।
শনিবার সকাল থেকে নগরীর সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, গাবতলী, শ্যামলী ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকেও আন্তঃনগর কিংবা দূরপাল্লার কোনও পরিবহণ ছেড়ে যায়নি। নগরীতেও দূরপাল্লার কোনও পরিবহণ প্রবেশ করেনি। ফলে অনেকটা বিপাকে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। পরিবহণ মালিক ও শ্রমিকরা বলছেন, তারা চাইলেও রাস্তায় পরিবহণ নামাতে পারছেন না।
মহাখালী বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, আমাদের করার কিছু নেই। আমরা গাড়ি নামাতে পারছি না। শ্রমিকরা নিরাপদ মনে করছে না।  গতকাল সকাল থেকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও যাত্রাবাড়ী মোড়ে অবস্থান নিয়েছে শ্রমিকরা। সরকার দলের কিছু কর্মী ও সমর্থকও তাদের সঙ্গে ছিল বলে জানান স্থানীয়রা। এই এলাকায় শিক্ষার্থীরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের ধাওয়া দেন তারা। পাশাপাশি কোনও পরিবহণই ছাড়তে দিচ্ছেন না শ্রমিকরা।
এদিকে নগর জুড়ে গণপরিবহণ সংকট দেখা দেওয়ায় বিপাকে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। কোনও পরিবহণ না পেয়ে রিকশায় ও হেঁটে গন্তব্যে যান নগরবাসী। লক্ষ্মীপুর যাওয়ার জন্য সকালে যাত্রাবাড়ী আসেন মোজাম্মেল মিয়া। তিনি বলেন, মনে করেছিলাম অন্তত আজ থেকে হলেও আন্দোলন কিছুটা শিথিল হবে। কিন্তু আজও কোনও পরিবহণ নেই।
সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা ও নগর বাস টার্মিনালের বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, ‘শ্রমিকরা কাজে যাচ্ছে না। নিরাপত্তার জন্য তারা যানবাহন নামাচ্ছে না। তাই আমরা গাড়ি নামাচ্ছি না। দূরপাল্লার কোনও বাসও ছাড়েনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা গাড়ি নামাবো। শুক্রবার বিকালে মহাখালী বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, নিরাপত্তাহীনতায় শ্রমিক ও মালিকরা রাস্তায় বাস নামাচ্ছেন না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাস নামাবেন।
এদিকে, শনিবারও সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সড়কে আন্দোলনে নেমেছে শিক্ষার্থীরা। তারা চলাচলরত যানবাহনের কাগজপত্র চেক করছেন। পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে যানবাহন চালানোর জন্যও সহায়তা করছেন। এসময় কোনও বাস দেখা যায়নি।
ঢাকার বাইরেও শ্রমিকেরা সড়কে জড়ো হয়ে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন থামিয়ে চালকদের কাগজপত্র দেখেন। মৌলভীবাজার-চান্দগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কের জুড়ী উপজেলা সদরের জাঙ্গিরাই চত্বরে ৫০ থেকে ৬০ জন পরিবহণ শ্রমিক যানবাহন আটকে চালকের লাইসেন্স ও শ্রমিক কার্ড আছে কি না, তা দেখছেন। যেসব যানবাহনের উপযুক্ত কাগজপত্র নেই, সেগুলো সড়কের এক পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। উপজেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেন, আমরা কোনো ধর্মঘট করছি না। ড্রাইভারের লাইসেন্স ও শ্রমিক কার্ড দেখছি। কুলাউড়া থানার ওসি শামীম মুসা বলেন, অঘোষিত পরিবহণ ধর্মঘট চলছে। শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ