ঢাকা, রোববার 5 August 2018, ২১ শ্রাবণ ১৪২৫, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশের ওপর পাক আর্মির ক্র্যাক ডাউন ইমরান মানতে পারেননি

পাকিস্তানের নির্বাচনে ইমরান খানের পিটিআইয়ের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে আন্তর্জাতিক আমেরিকা এবং ভারতের উদ্বেগ এবং উৎকন্ঠা দারুণভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশেও ঐ পরাশক্তি এবং আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তির ক্যাম্প ফলোয়ার শক্তিগুলোও তাদের প্রভুদের দেখাদেখি নির্বাচনের আগে থেকেই ইমরান খানের বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করেছিল। নির্বাচনের পর ঐ বিষোদগার আরো জোরদার হয়েছে। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন ইমরানের বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। তিনি তখন আন্ডার নাইন্টিন ক্রিকেট খেলছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে তখনও তিনি একটি বাক্যও উচ্চারণ করেননি এবং আজও এই ৪৭ বছর ধরেও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো কটাক্ষ করেননি।
একটু পেছনে তাকালে দেখা যাবে যে, ইমরান খান বরং ’৭০-এর নির্বাচনের পর বিজয়ী দল আওয়ামী লীগ তথা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা না দেয়ার জন্য সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান এবং পিপিপির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর প্রচেষ্টাকে দায়ী করেন এবং সেই প্রচেষ্টাকে চক্রান্ত বলে অভিহিত করেন। এটার প্রমাণ পাওয়া যায় তারই লেখা বহুল পঠিত একটি পুস্তক থেকে। পুস্তকটির নাম ‘Pakistan: A personal History’।
বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১১ সালে। এই বইটির এক স্থানে ইমরান যা লিখেছেন তার হুবহু বাংলা অনুবাদ নি¤œরূপঃ “১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়। এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তান ভিত্তিক দল। তাদের প্রধান দাবি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত শাসন। পশ্চিম পাকিস্তানে বিজয়ী হয়েছিলো পাকিস্তান পিপলস পার্টি বা পিপিপি। নির্বাচনের পর পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেন।” তার পুস্তকে বর্ণিত আলোচ্য অংশটির পর কারো মনে আর সন্দেহ থাকা উচিত নয় যে ঐ তরুণ বয়সেও ইমরান ইনসাফ চেয়েছিলেন এবং শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে ছিলেন।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তথা আজকের বাংলাদেশে সেই সময় অর্থাৎ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর যে অকথ্য জুলুম ও নির্যাতন চলেছিল সে ব্যাপারেও ইমরান খান কোনো রাখ ঢাক করে কথা বলেননি। তার আলোচ্য পুস্তকের এক স্থানে তিনি এ সম্পর্কে বলেছেন, “পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানকে তাদের ভোটের ফলাফলকে অসন্মান করতে দেখে বিদ্রোহ করে। প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর প্রধান ইয়াহিয়া খান ভিন্নমত পোষণকারীদের অর্থাৎ বিজয়ী আওয়ামী লীগকে দমন করার জন্য সেনা পাঠান। সেনারা যখন পূর্ব পাকিস্তানে পৌঁছায় তখন ভুট্টো ঢাকা থেকে করাচিতে ফিরে এসে উচ্ছ্বসিতভাবে ঘোষণা করেন, “পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে”। কিন্তু এই সামরিক অভিযানের ফলে এক ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয় যেখানে হাজারে হাজারে বেসামরিক লোক মারা যায় এবং লাখে লাখে মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় গ্রহণ করে।”
সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে যে মিলিটারি ক্র্যাক ডাউন হয় সে সম্পর্কে পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ অবগত ছিলেন না। কারণ ঐ খবরটি তাদের কাছে ব্ল্যাক আউট করা হয়। এ ব্যাপারে ইমরান খান লিখছেন, “আমি সেনা অভিযানের আগে পশ্চিম পাকিস্তানের আন্ডার ১৯ ক্রিকেট দলের সদস্য হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা শেষ বিমানের যাত্রী ছিলাম। আমরা যখন পূর্ব পাকিস্তান দলের সাথে খেলছিলাম তখন আমরা আমাদের প্রতি তাঁদের শত্রুতার উত্তাপ টের পাচ্ছিলাম। এটা যে শুধু ঢাকা স্টেডিয়ামের দর্শকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়, আমাদের প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও একই আচরণ ছিল। পূর্ব পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক আশরাফুল হক, যিনি পরবর্তীতে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হন, তিনি সেদিন রাতেই ডিনারে বলেছিলেন, কেন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এখানে জনমত এতো প্রবল। তিনি বলেছিলেন, তার মতো অনেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে চাইতেন, যদি তাঁদের প্রাপ্য অধিকার দেয়া হতো। তবে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত শাসনের দাবির প্রতি কর্ণপাত না করায় সেই দাবি এখন স্বাধীনতার শক্তিশালী সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছে। আমি এটা শুনে বজ্রাহত হলাম। পশ্চিম পাকিস্তানের মিডিয়া সেন্সরশিপের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের অনুভূতি সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না।”
॥দুই॥
এর পর ইমরান খান তার বইয়ে লিখেছেন, “পশ্চিম পাকিস্তান এরপরে একের পর এক মারাত্মক ভুল করে ভারতকে তার পূর্ণ সুবিধা নেয়ার সুযোগ করে দেয়। ভারত বাঙ্গালীদের সমর্থনে সেনা পাঠায়। পাকিস্তান দ্রুতই পরাজিত হয়। আর ভারত ৯০ হাজার যুদ্ধবন্দীকে তাদের দেশে নিয়ে যায়। আমাদের দেশ দুইভাগে ভাগ হয়ে যায় এবং পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়। এর কিছুদিন পরে আমার আবার আশরাফুল হকের সাথে দেখা হলে যে পরিমাণে বেসামরিক বাঙালি সামরিক অভিযানে নিহত হয় বলে তার কাছে জানলাম, আমি তাতে বজ্রাহত হলাম। দুই তরফেই যেই সংখ্যার কথা বলা হয়েছে তা নিশ্চিত করা দুরূহ কিন্তু এটা খুবই সম্ভব যে কয়েক মাস ধরে চলা গৃহযুদ্ধের কারণে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে এবং নিরাপত্তার কারণে লাখে লাখে মানুষ ভারতে পালিয়ে গেছে।”
অতপর ইমরান খান লিখেছেন,“আমি এর আগে আমার সমসাময়িক ভারতীয় আর ইংরেজ বন্ধুদের সাথে এই বলে তর্ক করেছিলাম যে এটা পাকিস্তাানি সেনাদের বিরুদ্ধে একটা প্রোপাগান্ডা। কিন্তু আশরাফুলের ভাষ্য শোনার পরে আমি শপথ নিয়েছি আর কখনো নিজ নাগরিকের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান নিয়ে আমার সরকারের প্রচারে আস্থা রাখবো না।”
বাংলাদেশ সম্পর্কে ইমরান খানের মনোভাব এমন ইতিবাচক হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে বৈরী প্রচারণার কারণ হলো একটাই। আর সেটি হলো আগের হাল যেদিকে যায়, পিছের হালও সেই দিকেই যায়। ইমরান ভারত সম্পর্কে মারাত্মক নেতিবাচক কথা এখনো বলেননি। তিনি এও বলেছেন যে, তিনি ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নতি চান। এজন্য ভারত যদি এক পা এগিয়ে আসে তাহলে পাকিস্তান দুই পা এগিয়ে যাবে। তার পরেও ভারতে কেন তার বিরুদ্ধে বৈরী প্রচারণা চালানো হচ্ছে সেটি তার বোধগম্য নয়। নির্বাচনী বিজয়ের পর অনুষ্ঠিত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সন্মেলনে ইমরান খান বলেন, “দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত-পাকিস্তানের উচিত পারস্পরিক সম্পর্ক ভাল করা। দুই দেশের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে এক আদর্শ পরিবেশ। সব সময়েই তিনি ভারতের সম্পর্ক ভাল রাখতে চেয়েছেন কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া তাকে ভিলেন করেছে বারবার। যার সদুত্তর তার কাছে নেই। তবুও তিনি দুই দেশের  মধ্যে সুসম্পর্ক দেখতে চেয়েছেন।”
নির্বাচনী প্রচারণার সময় যখন বোঝা যাচ্ছিল যে, ইমরানের দল জয়লাভ করবে তখন থেকে এবং নির্বাচনের পর ইমরানের জয়লাভে সবচেয়ে বেশি গাত্রদাহ হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। এর কারণও আছে। ২০০১ সালে আমেরিকা যখন আফগানিস্তান আক্রমণ করে তখন ইমরান খানই সম্ভবত একমাত্র নেতা যিনি এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তখন পাকিস্তানের সামরিক শাসক ছিলেন জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। আমেরিকা পাকিস্তানের নিকট দাবি করে যে, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযানে পাকিস্তানকে শামিল হতে হবে। মার্কিন হামলার শুরুতে পাকিস্তান এই হামলায় আমেরিকার পক্ষে থাকার ইচ্ছুক ছিল না। পাকিস্তানের অনাগ্রহ বুঝতে পেরে তখন ইসলামাবাদে আসেন মার্কিন উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী রিচার্ড আরমিটেজ। তিনি পাকিস্তানকে স্পষ্ট বলেন যে, এই অভিযানে পাকিস্তানের নিরপেক্ষ থাকার কোনো সুযোগ নাই। পাকিস্তানকে হয় আমেরিকার পক্ষে না হয় আফগানিস্তানের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। মার্কিন উপ -পররাষ্ট্র মন্ত্রী পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, যদি পাকিস্তান আফগানিস্তানের পক্ষ নেয় তাহলে রিচার্ড আরমিটেজের ভাষায় Pakistan will be bombed to stone age অর্থাৎ পাকিস্তান যদি আফগানিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করে তাহলে তার ওপর এত বিপুল বোমা বর্ষণ করা হবে যার ফলে পাকিস্তানকে প্রস্তর যুগে ফিরে যেতে হবে। আমেরিকার এই ভয়াবহ হুমকির মুখে পাকিস্তান সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যানারে আমেরিকার পক্ষাবলম্বন করতে বাধ্য হয়। তখন পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বিরোধিতা করেন ইমরান খান। এই বিরোধিতার কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
॥তিন॥
একটি দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন ইমরান খান। তিনি যেসব ওয়াদা করে জয়লাভ করেছেন সেই সব ওয়াদাই তার জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হলো পররাষ্ট্র নীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ক্রমবর্ধমান বিরোধ, আফগানিস্তানে চলমান যুদ্ধ, ভারতের সাথে বিরোধ এবং চীনের সাথে সম্পর্ক নিয়েই মূলত পাকিস্তানের নতুন সরকারকে পররাষ্ট্রনীতি নির্ণয় করতে হবে। ২০০১ সালের ৯/১১ ঘটনার পর পাক-মার্কিন জোট গড়ে ওঠে। দেশ দু’টির মধ্যে এতদিন ধরে টিকে থাকা শক্তিশালী সম্পর্ক এখন প্রায় ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, আমেরিকা নিজের স্বার্থে পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে অথবা ভেঙ্গে ফেলতেও কার্পণ্য করবে না। এব্যাপারে তার সাগরেদ হলো ভারত। পাকিস্তানকে ধ্বংস করার ধারাবাহিক চক্রান্ত হিসাবে ২০১১ সালের মে মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা অ্যাবোটাবাদে ওসামা বিন লাদেনের বাড়িতে আক্রমণ করে। তারা সেখানে ওসামাকে হত্যা করে এবং তার লাশ একটি বিমানে উঠিয়ে সেখান থেকে চলে যায়। অতপর বিমান থেকে ওসামার লাশ আরব সাগরের অথৈ নীল জলরাশিতে নিক্ষেপ করে। এভাবেই ওসামা বিন লাদেনের সলিল সমাধি হয়। একই বছরের শেষের দিকে পাকিস্তানি সীমান্ত চৌকিতে মার্কিন বিমান হামলায় এক ডজনেরও বেশি পাকিস্তানি সেনা নিহত হওয়ার পর থেকেই দেশ দু’টির মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। এই ঘটনার পর থেকেই দেশ দু’টি কৌশলগত মিত্র থেকে ‘দেনা পাওনার’ মিত্রে পরিণত হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের সময়ই পাকিস্তানের জন্য সামরিক ও বেসামরিক সাহায্যের পরিমাণ কমিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এই বছরের প্রথম দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার দক্ষিণ এশীয় নীতি ঘোষণা করার পর সামরিক সহায়তা স্থগিত করা হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়। পূর্বসূরীদের ন্যায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষা না করে দেশটির কাছ থেকে নিঃশর্ত সহযোগিতা দাবি করে।
ওয়াশিংটনের সামরিক সহযোগিতা কেবল পাকিস্তানি সীমান্ত সংলগ্ন তালেবান যোদ্ধাদের ওপর ব্যবহার করার জন্য প্রদান করা হয় এবং এই কাজের হেরফের হলেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে ‘সন্ত্রাসীদের স্বর্গ রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। নিশ্চিতভাবেই এই ধরনের দ্রুত পরিবর্তন কখনোই সফল হতে পারে না। আর তাই তালেবান বিদ্রোহীদের ব্যাপারে কঠোর হতে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে পাকিস্তাানের ওপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সময়ে গত কয়েক বছর ধরেই ইসলামাবাদ আঞ্চলিক পরাশক্তি চীনের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।
আগের সরকারগুলোর মতো নতুন সরকারের জন্যও আফগানিস্তান সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থাকবে। সম্প্রতি দেশ দু’টির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা আবারো শুরু হওয়ায় কাবুল ও ইসলামাবাদের সামনে আবারো পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ এসেছে। ইমরান খানও বুঝতে পেরেছেন যে, আফগানিস্তান নিয়েই আমেরিকা তার অখন্ডতা বিনষ্টের চেষ্টা করবে। সেজন্য সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ইমরান খান পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে আফগানিস্তানকে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি দিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। ইমরান খান তার নির্বাচন পূব ভাষণসমূহে অনেকবার ওয়াদা করেছেন যে, তিনি মদীনা শরিফের আদলে পাকিস্তানকে গড়ে তুলবেন। এছাড়া তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন যে, তার নেতা হলেন দুইজন। একজন হযরত মোহাম্মদ (সাঃ), আর একজন কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
ইসলামের প্রতি এই ধরনের কমিটমেন্ট করার ফলে দেশের জঙ্গি গোষ্ঠী তার প্রতি অনেক নরম বলে পত্র পত্রিকায় রিপোর্ট আসছে।
প্রকৃতপক্ষে ইসলামাবাদের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নয়াদিল্লির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং বেইজিংয়ের সাথে বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা করা। পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক গত কয়েক বছর ধরে শুধুই শীতল হয়েছে এবং কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পেয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ নয়াদিল্লির সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে যিনি যত কথাই বলুন না কেন, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান যতদিন না হচ্ছে ততদিন ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না। ভারত তার অধিকৃত কাশ্মীরকে তার দখলে রাখবে, আর সেটা পাকিস্তান কোনো দিনও মেনে নেবে না। সুতরাং ইমরান হোন আর যিনিই হোন, কাশ্মীরের বিনিময়ে ভারত পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিক করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। ধারণা করা হচ্ছে যে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এবং সেনাবাহিনীর সমর্থন থাকায় ইমরান খান পাকিস্তান ভাঙার ভারত ও মার্কিন চক্রান্ত প্রতিরোধে সক্ষম হবেন এবং এক নয়া পাকিস্তান গঠনে তার নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
॥চার॥
অন্য দিকে চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। চীন-পাকিস্তান জোট এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি এবং ভারতের সাথে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে ইসলামাবাদ ক্রমেই চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চীনকে পাকিস্তান নিজেদের ‘সব মওসুমের বন্ধু’ বলে আখ্যায়িত করেছে। তা ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কোন্নয়নও চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক মজবুত হওয়ার আরেকটি কারণ। এসব কারণ ছাড়াও অন্যান্য আরো ভূ-রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি জটিল পরিস্থিতিতে জড়িয়ে গেছে। তাই নতুন সরকার শপথ নেয়ার পর পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ ও মেনে চলাই তাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে।
Email: asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ