ঢাকা, রোববার 5 August 2018, ২১ শ্রাবণ ১৪২৫, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ

চৌগাছার আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ঘর নির্মাণের আগেই ধ্বসে পড়েছে

চৌগাছা (যশোর) সংবাদদাতা : যশোরের চৌগাছায় প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে দেয়া আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ‘যার জমি আছে ঘর নাই, তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ’ কর্মসূচির ঘর নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হওয়ার আগেই ধ্বসে পড়েছে। উপজেলার স্বরূপদাহ ইউনিয়নের দেবালয় গ্রামের শুকুর আলীর ঘর নির্মাণ এখনো সমাপ্ত না হলেও তা গত কয়েক দিনের বর্ষণে ধ্বসে পড়েছে। এদিকে ঘর পাওয়ার জন্য ভুক্তভোগী শুকুর আলী, তার সহোদর ইউনূস আলী ও গ্রামের সামাদের নিকট থেকে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা করে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে ওয়ার্ড মেম্বার আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে।
কোনো টাকা নেয়ার কথা না থাকলেও ৩ ট্রলি করে স্থানীয় বালু কিনিয়েছে ঘরের মেঝে ভরাট করার জন্য এবং ঘরের ভিতের ড্যাডো রং করার জন্যও টাকা নেয়া হয়েছে দাবি করে শুকুর আলীর স্ত্রী বলেন, আগে তো ভাঙা ঘর ছিল এক প্রকার ছিলাম। আমাদের এই ঘর তো এখন ভেঙে আমাদের গায়ের ওপর পড়বে। এ তো আমাদের জন্য মরণ ফাঁদ হয়ে দাড়িয়েছে। তিনি বলেন আমরা গরিব মানুষ দিনে একশত টাকা মজুরিতে কামলা খাটি। আমাদের কাছ থেকে এভাবে টাকা নিয়েই যদি ঘর দেয়া হয়, তাহলে দেয়ার দরকার কি ছিল? তিনি আরো বলেন আমাদের বলা হয়েছে ১০ হাজার টাকা করে না দিলে ঘর হবেনা। এই টাকা উপজেলায় দিতে হবে। পরে ঋণ করে ১০ হাজার টাকা করে দেয়ার পর আমাদের ঘর দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন প্রায় দেড় মাস ধরে নির্মাণ কাজ করলেও এখনো সমাপ্ত করে দেয়া হচ্ছে না। গত বৃহস্পতিবার ধ্বসে পড়া ওই ঘরের ছবি তুলতে গেলে উপজেলা পরিষদের কর্মচারী ভেবে সাংবাদিকদের দিকে তেড়ে আসেন এক বৃদ্ধ। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিলে কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি বলেন আমাদের এত কষ্টের টাকা নিয়েই যদি ঘর দেয়া হয়, তাহলে দেয়ার দরকার ছিল কি?
তবে এ বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর থেকে ঘুষ নেয়ার ঘটনার সংবাদ দৈনিক প্রতিদিনের কথায় প্রকাশ পাওয়ায় এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৪ জুলাই উপজেলা পরিষদের মাসিক উন্নয়ন সমন্বয় সভায় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা এসএম হাবিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর থেকে প্রতিটিতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ তোলেন চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেনের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে সে সভায় উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে বাক-বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়েন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেন। এক পর্যায়ে তিনি সভাকক্ষ ছেড়ে বেরিয়েও যান। সেদিন উপজেলা চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের বলেন তিনি যে ঘরপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে নিয়েছেন তার প্রমাণ আমার কাছে আছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় “যার জমি আছে ঘর নাই, তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ” কর্মসূচিতে যশোরের চৌগাছা উপজেলায় মোট ৫৫০ টি ঘর দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৪০৭ ব্যক্তির তালিকা প্রকল্প পরিচালক বরাবর পাঠান চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। সেখান থেকে ২৭ মে ২০১৮ প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব) আবুল কালাম শামসুদ্দিন স্বাক্ষরিত পত্রে ২৫০ ব্যক্তির তালিকা অনুমোদন করা হয় এবং আড়াইকোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। পরে দ্বিতীয় পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরো ৩০০ ব্যক্তির নামের তালিকা প্রকল্প পরিচালক বরাবর পাঠান। গত ৪ জুন ২০১৮ প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব) আবুল কালাম শামসুদ্দিন স্বাক্ষরিত পত্রে ৩০০ ব্যক্তির তালিকা অনুমোদন করা হয় এবং তিন কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে যারা কেবলমাত্র ইউএনওকে বিভিন্ন মাধ্যম মারফত টাকা দিয়েছেন তাদের নামের তালিকা’ই কেবল অনুমোদন করিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেন। উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম হাবিবুর রহমানসহ জনপ্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেন এই প্রকল্প থেকে এক কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন।
এ বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা এসএম হাবিবুর রহমান বলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে দেয়া অতি দরিদ্রদের জন্য বরাদ্ধকৃত প্রতিটি ঘর থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে নিয়েছেন যার আমার কাছে প্রমাণ আছে। ৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্পে’র শ্রমিকদের হাজিরা থেকে উৎকোচ নিতে না পেরে অধিক পরিমাণ শ্রমিকের হাজিরা কর্তন করছেন। আগেও তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার-দফাদারদের মাসিক বেতন না দিয়ে তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। নিয়মানুযায়ী উপজেলা পরিষদের সকল কাজ উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে করার কথা থাকলেও তিনি একাই সব সিদ্ধান্ত নিতে চান। মঙ্গলবারের মাসিক উন্নয়ন সমন্বয় সভায় এ বিষয়ে বলতেই তিনি আমিসহ জনপ্রতিনিধিদের সাথে অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করেছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম হাবিবুর রহমানের দাবি এই বিষয়টি ২৪ জুলাইয়ের মাসিক উন্নয়ন সমন্বয় সভায় তুলে ধরা এবং পরিষদের কাজে আইনানুযায়ী চেয়ারম্যানের সাথে সমন্বয় করতে বলাতেই ইউএনও তাকে ‘স্টুপিড’ বলে গালি দিয়ে বলেন ‘ওর সাথে কিসের মিটিং করবে?’সহ বাজে মন্তব্য করতে করতে সভাকক্ষ ছেড়ে যান। তিনি বলেন এর আগে অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন প্রকল্প (৪০ দিনের) থেকে ৫ শতাংশ টাকা কমিশন দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে তিনি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিসকে ২০ শতাংশ টাকা নেয়ার অনুমতি দেন এই উপজেলা নির্বাহী অফিসার। চৌগাছা উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের আহব্বায়ক দেবাশীষ মিশ্র জয় বলেন মূলতঃ নির্বাহী অফিসারের নানা অনিয়ম সামনে আসায় তিনি বেসামাল হয়ে পড়েছেন। তিনি কর্মসৃজন থেকে ৫% টাকা, প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে উপজেলায় যে ৫৫০টি বাড়ি প্রদান করা হয়েছে সেখান থেকে প্রতিটির জন্য ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে উৎকোচ নিয়েছেন। এমনকি কারা এসকল ঘর পেয়েছেন সে তালিকাও তিনি কাউকে দিচ্ছেন না। এগুলো নিজের কব্জায় করে রেখেছেন। এসব বিষয় প্রতিবাদ করাতেই তিনি ক্ষেপেছেন। জয় বলেন নির্বাহী অফিসার পরিষদের কোনো কাজেই উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানের সাথে সমন্বয় করেন না। এসব বিষয় তুলে ধরাতেই তিনি মঙ্গলবার সভা ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন এবং অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেছেন।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রতিনিধি জানান, যারা টাকা দিয়েছে, তাদের নামেই বাড়ি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বঞ্চিত অনেকে আমাদের কাছে অভিযোগ দিচ্ছে। কিন্তু আমরা (জনপ্রতিনিধিরা) তাদের জন্য কিছুই করতে পারছি না। তিনি আরো বলেন, কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজেই, তার কিছু লোক দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। এতে সরকারের বদনাম হচ্ছে।
যদিও ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইবাদত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে উপকারভোগীর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। কাজ বাস্তবায়ন করছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি। কমিটির সদস্যরা হলেন- সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান। আগামী এক মাসের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আশাবাদী তিনি।
সাংবাদিকেদের কাছে তিনি জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগের বিষয়টিও অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমি তো কারো কাছ থেকে টাকা নিই নি। কারো কাছে চাইও নি। যদি কেউ আমার নামে টাকা তোলে, তারা বাটপাড়। কেউ টাকা চাইলে আমাকে জানাবেন। তিনি আরো বলেন, চেয়ারম্যানদের মাধ্যমেই মূলত উপকারভোগীর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের পাঠানো প্রস্তাবিত তালিকা উপজেলায় পাঠানো হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এরপর চৌগাছা উপজেলার ৫৫১টি বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কাজও শুরু হয়েছে। যারা বাড়ি পাননি, তারা পর্যায়ক্রমে পাবেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেমন সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের আড়াইশ’ ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৫৭টি বাড়ি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ