ঢাকা, রোববার 5 August 2018, ২১ শ্রাবণ ১৪২৫, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

এবাদতের মূল হল নামাজ

ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ : নামাজ হল আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ। মহান প্রভূ আল্লাহর সাথে বান্দাহর যে গভীর সম্পর্ক তার প্রকাশ হয় নামাজ দ্বারা। মহান আল্লাহর কর্তৃত্বের কাছে প্রকাশ্যে মাথা নত করার নাম নামাজ। এই নামাজে দলবদ্ধ বা একাকী আল্লাহর সামনে কিয়াম, রুকু, সিজদা করে একমাত্র আল্লাহর স্থায়ী গোলামীর চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। অন্য কোন এবাদত এভাবে দেহ, মনের বাস্তব অবনতি হয় না। নামাজ হল বাস্তবভাবে একেবারে আল্লাহর সন্নিকটে পৌছে যাওয়া। নামাজ হল এবাদতের মূল ভিত্তি। মুসলমান হল সে যে ইসলাম মেনে নেয়। আল্লাহর অনুগত বান্দার নাম হল মুসলমান। কালেমা তাইয়্যেবা লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্। এর মানে হল আল্লাহ ব্যতীত আর কোন প্রভূ নেই, হযরত মুহাম্মদ (সা:) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। এই বিশ্বাসের ভিত্তিে মুসলমানের সৃষ্টি। মুসলমানের প্রথম ছবক হল এই কালেমা। ইহাকে প্রধান শপথ নামা বলা হয়। এরপর হল নামাজ, রোজা হজ্জ্ব ও যাকাত। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে নামাজ হল মূল ভিত্তি। আল্লাহর সাথে বান্দাহর সম্পর্কের সর্বোত্তম মাধ্যম হল নামায। আল্লাহকে স্মরণ করার সুন্দরতম মাধ্যম হল নামাজ। কালেমার ঘোষণা দিয়ে মানুষ স্বীকার করে নেয় যে তার প্রভূ হলেন একমাত্র আল্লাহ তায়লা। মহান আল্লাহর ঘোষণা হল ওয়ামা খালাকতুল জিন্না ওয়াল ইনসা ইল্লা লিইয়্যাবুদু। অর্থাৎ আমি জি¦ন ও মানুষ জাতিকে সৃষ্টি করেছি কেবলমাত্র আমার এবাদত করার জন্য (আল জাযিয়া-৫৬)। প্রভু আল্লাহর সানে বান্দার যে সম্পর্ক তার মাধ্যম হল নামাজ। নামাজে বান্দাহ তার প্রভুর সাথে কথা বলে। মহান প্রভু আল্লাহর সাথে বান্দার সাক্ষাতের নাম হল নামায।
প্রতিদিন এই নামাজের মাধ্যমে বান্দাহ তার প্রভুর সিজদা করে প্রমান করে যে সে তার প্রভু আল্লাহর কাছেই শুধু আত্ম সমর্পন করেছে। সে এক আল্লাহ ব্যতীত আর কারো আনুগত্য করে না। কারো কাছে হাত পাতে না। সে কারো মুখাপেক্ষী নয়। কুরআন পাকের সূরা বাকারার ৪৩ আয়াতে আল্লাহ বলেন- আকিমুস সালাত ওয়াআতুস যাকাতা ওয়ার কাউ মায়ার রাক্বেবিন। অর্থাৎ তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা কর, যাকাত প্রদান কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।” কুরআনের বিভিন্ন সূরাতে এভাবে আল্লাহ ৮২ বার হুকুম দিয়েছেন-সালাত প্রতিষ্ঠা কর এবং যাকাত ব্যবস্থা চালু কর। সূরা বাকারার ১৫৩ আয়াতে আল্লাহ বলেন, “হে মুমীমগণ তোমরা ধৈর্য্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর।” সূরা বাকারার ২৩৮ আয়াতে আল্লাহ বলেন “তোমরা সালাতের ব্যাপারে যত্মবান হও। বিশেষ করে মধ্যবর্তী সালাতের প্রতি এবং মহান আল্লাহর সামনে বিনীত ভাবে দ-ায়মান হও। সূরা কাওছারে আল্লাহ বলেন-তোমরা সালাত আদায় কর ও কুরবানী দাও। সূরা মাউনে আল্লাহ বলেন-অতএব দূর্ভোগ সেসব সালাত আদায়কারীদের যারা নিজেদের সালাতের ব্যাপারে উদাসীন। সূরা আনকাবুতের ৪৫ আয়াতে আল্লাহ বলেন নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে যাবতীয় অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে।” এভাবেই কুরআনের পাতায় পাতায় সালাতের গুরুত্ব তুলে ধরে মহান আল্লাহ অসংখ্য আয়াত নাজিল করেছেন।
 আদম (আ:) থেকে শুরু করে সমস্ত নবী রাসূলগণ সালাত আদায় করেছেন এবং তাদের অনুসারীরাও সালাতের মাধ্যমেই আল্লাহর দাসত্ব করেছেন। রাসূল (স.) বলেছেন মুসলমান ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্য হল সালাত।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) এর বর্ণনা তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “আমানতদারি যার নেই তার ঈমান নেই। যার পবিত্রতা নেই তার সালাত নেই। যার সালাত নেই তার দ্বীনও নেই। দ্বীনের মধ্যে সালাতের স্থান শরীরের মধ্যে মাথার স্থানের সমতুল্য।”
সালাত আরবী শব্দ। বাংলায় আমরা নামাজ বলি। সালাতের সুপ্রসিদ্ধ ৪টি শাব্দিক অর্থ রয়েছে। তা হলো-১। ইবাদাত বা প্রার্থনা ২। অনুগ্রহ  ৩। পবিত্রতা ৪। ক্ষমা প্রার্থনা।
সালাত এমন একটি সুনির্দিষ্ট ইবাদত যা নির্দিষ্ট সময়ে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর সামনে দাড়িয়ে তারই কালাম পাঠ করে আদায় করা হয়। রাসূলের করীম (সা:) বলেন-সালাত হচ্ছে মুমিনের মিরাজ।
রাসূল (সা:) আরো বলেন- তুমি যখন সালাতে দাড়াও তখন ভাববে যেন তুমি আল্লাহকে দেখছো আর আল্লাহ তোমাকে দেখছেন। তুমি আল্লাহকে না দেখলেও আল্লাহ তোমাকে দেখছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই।
 দেহ ও মনের পবিত্রতাসহ তাকবিরে তাহরিমা সহকারে বান্দাহ তার প্রভূর সামনে নামাজে দাড়িয়ে যায়। কিয়াম, রুকু, সিজদা, তাশাহুদ করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে তৎপর। সে যখন সূরা ফাতেহা পড়ে তখন প্রতিটি আয়াত পাঠ শেষে আল্লাহ তাকে জবাব দেন। নামাজীর দিকে আল্লাহ ততক্ষন তাকিয়ে থাকেন যতক্ষণ সে একনিষ্ঠ ভাবে একধ্যানে এক মনে সিজদার দিকে তাকিয়ে এবাদতে সক্রিয় থাকে। তার দৃষ্টি অন্যদিকে নিলে বা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নাড়া চাড়া করলে আল্লাহ তার দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। বান্দাহ যখন তাশাহুদে বসে আতাহিয়্যাতু পড়ে তখন সে আল্লাহকে, রাসূলকে, নিজেকে ও অন্যান্য নামাজীদেরকে সালাম দেয়, দোয়া করে কল্যাণ কামনায় লিপ্ত থাকে। সে যখন সিজদায় যায় তখন একে বারে আল্লাহর সন্নিকটে পৌছে যায়।
এ সঠিক ভাগ্য শুধু নামাজীর। নামাজীর জন্যই নির্ধারিত চরিত্র হল সেরা। সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহকে সিজদা করে। আল্লাহর পদতলে নিজের শিরনত করে দিয়ে আল্লাহর অনুগত বান্দাহর বাস্তব প্রমান দিয়ে থাকে। সে ঘোষণা দেয়, “নিশ্চয়ই আমার নামাজ আমার কুরবানী আমার জীবন আমার মৃত্যু সবই বিশ্ব জাহানের রবের জন্য।” (সূরা আনআম-১৬২) বিশ্বনবী (সা:) এই নামাজের গুরুত্ব দিয়ে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব ও এশায় মসজিদের মিনার থেকে উচ্চস্বরে আযানের ব্যবস্থা করেছেন। জামায়াতবদ্ধ হয়ে ইমামের মাধ্যমে ফরজ নামাজ আদায় করেছেন। নামাজ আদায় করতে তাগিদ দিয়ে অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন। যে নামাজ পরিত্যাগ করে সে দ্বীনকে ধ্বংস করে।
তিনি বলেছেন, “আযান শুনে যারা নামাজের জামায়াতে শরীক হয় না আমার ইচ্ছা হয় তাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেই। না দিবার কারণ সেখানে অবস্থানরত বৃদ্ধ ও শিশুরা।” তিনি আরো বলেন, “আযান শুনে ইচ্ছাকৃত যারা জামায়াতে শরীক হয় না তাদের নামাজ হয় না। মহানবী (সা:) নামাজের গুরুত্ব এতোই দিতেন। যে তার শেষ নি:শাস ত্যাগ করার পূর্বে শেষ যে বাক্য ছিল, তা ছিল সালাত, সালাত। এই সালাত বা নামাজ দ্বারাই বান্দাহ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করে। যার নামাজ কবুল হয়ে যায় তার দুনিয়া আখেরাত সফল হয়ে যায়। নামাজী নামাজ আদায় করে আল্লাহর ভয়ে। আল্লাহর ভয়েই সে নামাজের আগে পরে যা করে সবকিছুতেই আল্লাহর কাছে জবাবদিহীতার অনুভূতি আনে। তাই নামাজীদের চরিত্রে কোন কলংক থাকে না। আপনা আপনি নামাজীরা সর্বোত্তম চরিত্রবান হয়ে যায়। এরা হয়ে উঠে সোনার মানুষ। এসব সোনার মানুষ দিয়ে গড়ে উঠা সমাজই সেরা সমাজ। এসব নামাজীদের দ্বারা গঠিত সমাজ বা রাষ্ট্রে কোন অশান্তি থাকে না। সে খানে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হতে থাকে অনবরত। এটাই দুনিয়ার জান্নাত। পরকালের জান্নাত হবে তাদের দ্বারাই। হাশরের প্রথম যে প্রশ্ন হবে তা হলো এই নামাজ। যারা নামাজের পরীক্ষায় পাশ করবে তাদের জান্নাত অবধারিত হয়ে যাবে।
নামাজ কি ভাবে ফরজ
১। সূরা তাহা ১৪ আয়াতে আল্লাহ বলেন:- “আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। কাজেই আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরনার্থে নামায কায়িম কর।”
২। সূলা হজ্জ্বের ৭৭ আয়াতে আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ তোমরা রুকু কর, সিজদা কর অর্থাৎ নামায কায়িম কর এবং আল্লাহর ইবাদত কর ও সৎ কাজ কর তাহলে নাজাত পাবে।
৩। যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক নামায ছেড়ে দিল, সে প্রকাশ্যে কুফুরী করল। (তাবারানী)
৪। নামায সর্বাপেক্ষা উত্তম আমল এবং বেহেস্তের চাবি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ