ঢাকা, রোববার 5 August 2018, ২১ শ্রাবণ ১৪২৫, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রআন-সুন্নাহর আলোকে বজ্রপাত ও করণীয়

মোঃ মোশারফ হোসেন : বজ্রপাতের সাথে ছোট-বড় আমরা সবাই পরিচিত। আমাদের দেশে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়ে থাকে। বিপজ্জনক এ প্রাকৃতিক দুর্যোগকে আমরা সবাই ভয় পাই। আমাদের দেশে প্রতি বছর শত শত মানুষ এ বজ্রপাতের আঘাতে মারা যায়। বিশেষ করে এ বছর বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা তিন হাজারেরও অধিক; সূত্র দৈনিক ডেসটিনি, এপ্রিল ১৮। আর বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে বজ্রপাতের সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ দেশ। কিন্তু অনেক সতর্কতা ও বৈজ্ঞানিক উপায় অবলম্বন করেও বজ্রপাত থেকে বাঁচার কোন স্থায়ী সমাধান মানব জাতি আজ অবধি বের করতে পারেনি। এমনকি পূর্ব সংকেতও দিতে পারেনা আধুনিক বিজ্ঞান। এ ব্যাপারে ইসলামে রয়েছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ,করণীয় ও বাঁচার উপায়। বজ্রপাতের পরিচিতিঃ বজ্র বাংলা শব্দটির আরবি প্রতিশব্দ হল রা’দ ও স্বয়িকাহ; ইংরেজিতে বলা হয় Bolt, Lightning I Thunder ইত্যাদি। পবিত্র কুরআনের ১৩ নং সুরার নামকরণও করা হয়েছে রা’দ তথা বজ্রপাত নামে। রা’দ শব্দটি ফেরেস্তার নাম বুঝাতেও কুরআন ও হাদিসে ব্যবহৃত হয়েছে। পরিভাষায় বিকট শব্দসহ যে বিদ্যুতাগ্নি পতিত হয় তাকে বজ্রপাত বলে। হাদিসে বজ্র সম্পর্কে এভাবে বলা হয়েছে — হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইহুদিরা একবার নবী করিম (স) এর নিকট এসে বলল: হে আবুল কাশেম! (রাসুল (স) এর উপনাম) আমাদেরকে বজ্রপাত সম্পর্কে সংবাদ দেন উহা কী? তিনি বললেন উহা ফেরেস্তা রা’দ। যাকে মেঘের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাঁর কাছে একটি আগুনের কাপড় খন্ড রয়েছে যা দিয়ে সে মেঘমালাকে আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী চালনা করেন। অতঃপর তারা আবার জিজ্ঞাসা করল,আমরা যে বিকট শব্দ শুনি সেটা কী? তিনি বললেন: ওটা হল ফেরেস্তা কর্তৃক মেঘমালাকে আদিষ্ট স্থানে স্বশব্দে হাকিয়ে নেয়া। তারা বলল, আপনি সত্যই বলেছেন; তিরমিযি- ৩১১৭,আহমদ - ২৪৮৩। রাসুল (স) আরো বলেন, রা’দ নামের একজন ফেরেস্তা রয়েছে যিনি মেঘমালাকে হাকিয়ে নেয়।
আর বিকট শব্দ মূলত ঐ ফেরেস্তার যিকিরের শব্দ। বজ্রপাতের ক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়; আমরা বজ্রপাতের সময় তিনটি বিষয় লক্ষ্য করে থাকিঃ- ১। বিদ্যুৎ চমক,২। বিকট শব্দ,৩। বৈদ্যুতিক আগুন। ১। বিদ্যুৎ চমকঃ ঝড়-বৃষ্টির সময় মেঘ খন্ডের ঘর্ষণের ফলে আমরা যে বিদ্যুৎ চমক দেখি যা স্বাভাবিক থেকে ভয়ঙ্কর রুপেও দেখা যায়- কুরআনে এটাকে বারকুন্ বা বিদ্যুৎ বলা হয়েছে। এটা নিছক বিদ্যুৎ চমক নয় বরং এক ধরণের ভীতি প্রদর্শন। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ”তিনিই তোমাদের বিদ্যুৎ দেখান ভয়ের জন্য এবং আশার জন্য এবং উক্ষিত করেন ঘণমেঘমালা”। সুরা রা’দ আয়াত- ১২। এ বিদ্যুৎ চমক দ্বারা আল্লাহ তায়ালা চোখের জ্যোতি পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারেন। যার সমর্থন রয়েছে সুরা বাকারার ২০ নং আয়াতে। ২। বিকট শব্দঃ যা মূলত বজ্রধ্বনি। এটা এমন এক বজ্রধ্বনি যা শুধু ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্যই নয় বরং পাপের শাস্তি দেয়ার জন্যও আসে। মহান আল্লাহ তায়ালা পূর্বের অনেক জাতিকে বজ্রধ্বনির মাধ্যমে  শাস্তি দিয়েছেন; তার মধ্যে আ’দ ও সামুদ জাতি উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া ইহুদীরা যখন মূসা (আ) এর নিকট আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখার অন্যায় আবেদন করেছিল তখনও মহান আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে বজ্রধ্বনির সাহায্যে শাস্তি দিয়েছিলেন। যার বর্ণনা এসেছে সুরা বাকারার ৫৫, সুরা নিসার ১৫৩ এবং সুরা যারিয়াতের ৪৪ নং আয়াত সমূহে। ৩। বৈদ্যুতিক আগুন পতিত হওয়াঃ পবিত্র কুরআনে এটাকেই রা’দ বা বজ্রধ্বনি বলা হয়েছে যা শাস্তি স্বরুপ কোন সৃষ্টির উপর নিক্ষেপ করা হয়। বিজ্ঞানের দৃিষ্টতে ধণাত্মক ও ঋণাত্মক আধানের সংযোগের ফলে বজ্রসৃষ্টি হলেও তা কোথায় নিক্ষিপ্ত হবে সেটা নির্ভর করে মহান আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার উপর। এ প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ”তাঁর ভয়ে প্রশংসা পাঠ করে বজ্র (ফেরেস্তা) ও ফেরেস্তাগণ। তিনি বজ্রপাত করেন, অতঃপর যাকে ইচ্ছা তাকে তা দ্বারা আঘাত করেন; তথাপি তারা (কাফের-মুশরিক্রা) আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে! অথচ তিনি মহাশক্তিশালী।” সুরা রা’দ আয়াত- ১৩। বজ্রপাত কেন হয়ঃ বজ্রপাত বিষয়ক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটি মূলত বস্তুগত আর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পরিবর্তনশীল। কিন্তু ইসলামের বিষয় হল অকাট্য ও অপরিবর্তনশীল। আমরা যেগুলোকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলি যেমন ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প ইত্যাদি এগুলো মূলত আল্লাহর সেনাবাহিনী। এ সেনাবাহিনীকে মহান আল্লাহ তায়ালা পাপের শাস্তি দেয়ার জন্য কোন জনপদের উপর নামিয়ে দেন। পূর্বের অনেক জাতিকে নির্মূল করা হয়েছে এ রকম  প্রাকৃতিক দুর্যোগ নামের সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ”হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ কর যখন শত্রু বাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল। অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে ঝড়বায়ু এবং সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম, যাদেরকে তোমরা দেখতে পাওনা; তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখেন”। সুরা আহযাব আয়াত ৯। মূলত মানুষের পাপের জন্যই অধিকাংশ দুর্যোগ বা বিপর্যয় আসে। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ”স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান যাতে তারা ফিরে আসে ”। সুরা রুম আয়াত ৪১। করণীয়ঃ যেহেতু বজ্রপাত আল্লাহ প্রদত্ত এক প্রকার শাস্তি তা থেকে বেঁচে থাকতে হলে একমাত্র ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
নিম্নে নির্দেশনাগুলো উল্লেখ করা হল -
১। আলাপচারিতা, গল্প বা মোবাইলে কথা বলা বন্ধ রাখা। এ ব্যাপারে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ির (রা) হতে বর্ণিত; তিনি যখন বজ্রধ্বনি শুনতেন কথা বলা বন্ধ করে দিতেন। অতঃপর তিনি দোয়াটি পড়তেন ”সুবহানাল্লাযি ইয়ু সাব্বির্হু রা’দু বিহাম্দিহি ওয়াল মালাইকাতু মিন খি-ফাতিহি”। মুয়াত্বা মালেক-৫৬. ২। যিকির করাঃ হযরত ইবনু আব্বাস (রা) যখন বজ্রধ্বনি শুনতেন তখন তিনি বলতেন,” সুব্হানাল্লাযি সাব্বাহ্তা লাহু”। এর ফযিলতে তিনি বলেন, নিশ্চয়ই যে এটা পড়ে তাকে বজ্রপাতের মালিক এমন ভাবে রক্ষা করেন যেভাবে রাখাল তার বকরি রক্ষা করে”। বুখারী,কিতাবুল আদাব ৭২২। এ নির্দেশনায় রাসুল (স) বলেন, ”যে ব্যক্তি (বজ্রপাতের সময়) আল্লাহর যিকির করে তাকে বজ্রপাত ধরতে পারেনা” ইবনু কাছির। ৩। দোয়া করাঃ হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, নবী (স) যখন বজ্রধ্বনি শুনতেন তখন তিনি নিন্মোক্ত দোয়াটি পড়তেনঃ ”সুবহানা মাইয়্যু সাব্বির্হু রা’দু বিহাম্দিহি ওয়াল মালাইকাতু মিন খি-ফাতিহি ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদির”। তিনি আরো বলেন, যদি এ দোয়া পড়ার পর কারো উপর বজ্রপাত ঘটে তার ক্ষতিপূরণ দেয়া আমার উপর দায়িত্ব। কুরতুবী। এ অর্থে কিছুটা শাব্দিক পরিবর্তনে একই দোয়া বিভিন্ন হাদিসে এসেছে। অন্য একটি হাদিসে এসেছে এভাবে - হযরত সালিম (র) তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন,যখনই নবী করিম (স) বজ্রধ্বনি শুনতেন তখন তিনি বলতেন, ” হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আপনার ক্রোধ দ্বারা হত্যা করবেন না এবং আপনার শাস্তির মাধ্যমে আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না; তার আগেই আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন”। তিরমিযি- ৩৪৫০ এবং বুখারী-৭২১। ৪। আল্লাহর অবাধ্য না হওয়াঃ  যেহেতু বজ্রাঘাত কার উপর পতিত হবে তা নির্ভর করে মহান আল্লাহর ইচ্ছার উপর তাই আমাদের উচিত আল্লাহর অবাধ্য না হওয়া মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (স) পূর্ণ আনুগত্য  করা।
পরিশেষে বলা যায় আসমানী এ আগুন অভিশাপ থেকে বাঁচতে মানবীয় বুদ্ধিভিত্তিক উপায় নয় বরং একমাত্র মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (স) পূর্ণ আনুগত্য আমাদেরকে শুধু বজ্র্রপাত নয় সব ধরণের বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সব ধরণের  বিপদ থেকে হেফাযত করুন, আমিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ