ঢাকা, রোববার 5 August 2018, ২১ শ্রাবণ ১৪২৫, ২২ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নাটোরে কৃষি জমি কমছে ফসল উৎপাদন হ্রাস

নাটোর সংবাদদাতা: নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলা জুড়ে পুকুরের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার। এর মধ্যে সব চেয়ে বেশি পুকুর খনন করা হয়েছে উপজেলার চাপিলা ইউনিয়নে। ওই ইউনিয়নে প্রায় ৫ হাজার পুকুর রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। এছাড়া ওই ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তথ্যমতে, ইউনিয়নের কৃষি জমির মোট আয়তন ৯৫ দশমিক ১২ একর। এ আয়তনের তিন শতাংশ কৃষি জমিই এখন পুকুরে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, পাঁচ বছর আগেও কৃষি জমিগুলোতে দিব্যি চাষাবাদ চলছিল। মহাজনের কাছ থেকে এলাকার দরিদ্র কৃষকরা জমি লিজ নিয়ে বছর জুড়ে ফসল উৎপাদনে ব্যস্ত সময় পার করতেন। তাতেই দিনাতিপাত হতো কৃষকদের। এখন ঠাঁয় পড়ে আছে সেসব জমি। তবে বদলেছে চিত্র, পরিবর্তন এসেছে জমির মালিকানায়। প্রান্তিক কৃষকদের পাঁচ বছর আগের ফসলি জমি এখন এলাকার প্রভাবশালীদের দখলে। সেসব জমিতে আর চাষাবাদ হয়না। আপাতদৃষ্টিতে যতদুর চোখ যায় মাটির উঁচু উঁচু পাড়।
এসব পাড় ঘেরা একটার পর একটা পুকুর। অবৈধভাবে পুকুর খননকৃত জমির তালিকায় শুধু যে কৃষকের ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে তা নয়, সরকারী খাস খতিয়ানের জমিও বাদ যাচ্ছেনা। তবুও প্রসাশন নিরব-নির্বীকার।
এ ব্যাপারে চাপিলা ইউপি চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন ভুট্ট বলেন, তার ইউনিয়নের মহারাজপুর, কান্দাইল, বৃ-চাপিলা, গযেন্দ্র চাপিলা, পম পাথুরিয়া, খিদির গরিলা, খিদির চাপিলা, বৃ-পাথুরিয়া, খামার পাথুরিয়া এলাকায় প্রায় ৫ হাজার পুকুর খনন করা হয়েছে। এসব পুকুরে বিষাক্ত খাদ্যে চাষ করা মাছ মরে গন্ধ ছড়াচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। সামান্য বৃষ্টিতে গ্রামের পাকা সড়ক, মেঠোপথ এমনকি ঘরবাড়ি ঢুবে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীসহ জন-জীবনে। অপরদিকে চাপিলা ইউনিয়ন বাসিন্দারা জানান, প্রসাশনের তৎপরতা না থাকায় পুকুর খনন বন্ধ হয়নি। চাপিলার প্রতিটি কৃষি জমিতেই তিনটি ফসল উৎপাদন হতো। বছর জুড়ে নানা ধরনের মওসুমি ফসল উৎপন্ন করতেন কৃষক। তাছাড়া পুকুরের মাটি বহনকারী ট্রাক্টরের যত্রতত্র চলাচলে গ্রামিণ সড়কগুলোও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সরেজমিনে উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, সরকারী আর ব্যাক্তি মালিকানা মিলে শত শত হেক্টর জমিতে পুকুর খনন করা হয়েছে। উপজেলার মশিন্দা ইউনিয়নের রানীগ্রাম বিলে সরকারের খাস জমি দখল করে পুকুর খনন করা হচ্ছে। পৌর সদরের দক্ষিণ নারিবাড়ি বিলে পানি চলাচলের কালভার্ট বন্ধ করে পুকুর খনন চলছে। ধারাবারিষা ইউনিয়নের সোনাবাজু উচ্চ বিদ্যালয় ঘেঁষে পুকুর খনন করা হয়েছে।
চাঁপিলা ইউনিয়নের সড়কগুলো ডুবে গেছে। জলাবদ্ধতা রয়েছে শত শত বিঘা জমি। সবমিলিয়ে উপজেলায় পুকুরের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজারের মতো। এছাড়া বিয়াঘাট ইউনিয়নের হাঁড়িভাঙ্গা বিলে খনন করা হয়েছে প্রায় ৫০টিরও বেশি পুকুর। এসব এলাকায় অদ্যবধি পুকুর খনন চলছে। যার ফলে ফসলি জমি নষ্ট হচ্ছে এবং কমেছে কৃষি উৎপাদন। গুরুদাসপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানান, পুকুর শুধু যে জনজীবন বিষিয়ে তুলছে তা নয়। পুকুরের কারনে মারাত্মক ফসলহানীর ঘটনা ঘটছে। বিগত পাঁচ বছরে গুরুদাসপুর উপজেলার বিলগুলোর প্রায় ৮শ হেক্টর ফসলি জমি কমেছে। ২০১১ সালে গুরুদাসপুর উপজেলায় ফসলি জমির পরিমান ছিল ১৬ হাজার ৬০৯ হেক্টর। ওই সালেই জমি কমেছে ৭০ হেক্টর, ২০১২ সালে ৮০ হেক্টর, ২০১৩ সালে ৯৫ হেক্টর, ২০১৪ সালে ১০৫ হেক্টর, ২০১৫ সালে ১২০ হেক্টর, ২০১৬ সালে ১৩০ হেক্টর, ২০১৭ সালে ১১৫ হেক্টর জমি কমেছে। কমে যাওয়া জমির শ্রেণি এখন পুকুর। অপরদিকে মৎস্য কর্মকর্তা কার্যালয়ের চলতি বছরের জরিপ অনুযায়ী গুরুদাসপুর উপজেলা জুড়ে বেসরকারী পুকুরের হিসাব দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৪৩৫টি। সরকারী রয়েছে ৩২টি। উপজেলা মৎস্য অফিসের চালানো ২০১৭ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে,- সেই সময় উপজেলায় বেসরকারী পুকুরের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৬৪৯টি। এসব পুকুরের জলায়তন ছিল ১ হাজার ৩৬৭ হেক্টর জমি। ওই জরিপের পর ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছরের শুরুর দিকে ৮৬টি পুকুর নতুন করে খনন করা হয়েছে। এরপর ২০১৮ সালে যেসব পুকুর খনন করা হয়েছে তার কোন হিসাব নেই। এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল করিম বলেন, ৩১২ একর আয়তনের হাঁড়িভাঙ্গা বিলটিতে বোরো ৫২০ মেট্রিকটন, রোপা আমন ১১২ মে.টন ও বোনা আমন ১৭৫ মে.টনসহ মোট ৮০৭ মে.টন ফসলি জমিতে আবাদ হয়ে থাকে। বর্ষাকালে বিলটি তলিয়ে গেলেও সেখানে বোনা আমন ও রোপা আমনের আবাদ হয় বছর জুড়ে। অথচ নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ওই বিলে নির্বিচারে ৫০টিরও বেশি পুকুর খনন করা হয়েছে। এতে আশঙ্কাজনক হারে কমছে ফসলি জমি। নিচু জমিগুলোতে সৃষ্টি হচ্ছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। পুকুর খননের কারণে উপজেলায় বিগত পাঁচ বছরে শত শত হেক্টর ফসলি জমি কমেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষকরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ