ঢাকা, সোমবার 6 August 2018, ২২ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ ও হেলমেটধারীদের হামলা ॥ মিছিলে মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাস

# পুলিশের সামনে ধরে ধরে সাংবাদিকদের পেটাল হেলমেট পরা যুবকরা
# উত্তরায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করতে গিয়ে পিটুনি খেল ছাত্রলীগ
স্টাফ রিপোর্টার : নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্নস্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বেধেছে। এ সময় পুলিশের সামনেই লাঠি, কিরিচসহ দেশীয় অস্ত্র হাতে হেলমেট পরে ছাত্রদের ওপর হামলা চালায় একদল যুবক। দিনের সব চেয়ে বড় ঘটনা ঘটেছে ঝিগাতলা-ধানমন্ডিতে। গতকাল রোববার দুপুর থেকে দফায় দফায় এই সংঘর্ষ চলার মধ্যে হেলমেট পরা একদল যুবক লাঠি ও কিরিচ নিয়ে হামলা চালায় কর্তব্যরত সাংবাদিকদের ওপর। সংঘর্ষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে; তাদের পাশেই পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে দেখা গেছে।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সপ্তম দিন শনিবার ঝিগাতলায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বেধেছিল ধানমন্ডির আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে থাকা কর্মীদের। তখন হেলমেট পরা একদল যুবক হামলা চালিয়েছিল শিক্ষার্থীদের ওপর।
গতকাল রোববার দুপুরে শাহবাগে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে ধানমন্ডির দিকে মিছিল নিয়ে গেলে পুলিশের বাধা পায়, তারপরই বেধে যায় সংঘর্ষ। এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের; তারা বলছে, আগের দিন হামলায় আহত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানাতে ঝিগাতলায় যাচ্ছিলেন তারা।
তবে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার সাংবাদিকদের বলেন, এই শিক্ষার্থীদের শাহবাগ থেকে মিছিল নিয়ে যেতে বাধা দেওয়া হয়নি। “কিন্তু তারা ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের দিকে এগোতে চাইলে তাদের বারণ করা হয়েছিল; কিন্তু তারা শোনেনি, এজন্য কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে।”
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ধানমন্ডি দুই নম্বর সড়কে পুলিশ আটকে দেওয়ার পরপরই  শুরু হয় সংঘর্ষ; এসময় পুলিশ মুহুর্মুহু কাঁদানো গ্যাস ছুড়তে থাকে, তাদের সাঁজোয়া যানগুলোও ছিল সচল। কাঁদানো গ্যাসের জবাবে শিক্ষার্থীরাও ইট ছুড়তে থাকে। ঘণ্টা দুয়েক ধরে উভয় পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে দুই নম্বর সড়কে। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ এক নম্বর সড়কেও ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে মধ্যে দুপুর ২টার দিকে কর্তব্যরত সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয় হেলমেট পরা একদল যুবক। তাদের হাতে ছিল কিরিচ, লাঠিসোঁটা। এপির আলোকচিত্র সাংবাদিক এ এম আহাদসহ কয়েকজন সাংবাদিককে মারধর করে তারা। ভাংচুর হয় তাদের ক্যামেরা। সেখানে নাগরিক টেলিভিশনের গাড়িও ভাংচুর হয়। এ সময় পুলিশ থাকলেও তারা আটকায়নি এই যুবকদের।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ কর্মকর্তা মারুফ বলেন, “তারা তো পুলিশের ওপর হামলা চালায়নি। আর তারা কারা, আমরা তাদের চিনি না।”
সকালে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় একদল যুবককে মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দিতে দেখা গিয়েছিল।  তখন পরিস্থিতি ছিল শান্ত, শিক্ষার্থীদের অবস্থানও ছিল না সেখানে।
এদিকে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী পরীবাগ থেকে শাহবাগের দিকে অবস্থানের জন্য যেতে চাইলে পুলিশ কাঁদানো গ্যাস ছোড়ে। ওই শিক্ষার্থীরা তখন ব্যাংক এশিয়ার পাশের গলিতে ঢুকে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের এক সপ্তাহের আন্দোলনের মধ্যে নাশকতাকারীরা ঢুকেছে দাবি করে গতকাল রোববার বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ সমর্থকরাও সড়কে অবস্থান নিয়েছে।
রামপুরায় বেলা পৌনে ১টার দিকে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি অবস্থান নেয় একদল যুবক। মেরুল বাড্ডা থেকে রামপুরা ব্রিজের দিকে লাঠিসোঁটা নিয়ে এগোতে থাকে তারা। রামপুরা ব্রিজের কাছে তখন ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইমপেরিয়াল কলেজ, খিলগাঁও ওমেন্স স্কুল ও কলেজসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সড়কে অবস্থান করছিল। ওই যুবকদের দেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এসময় স্টেট ইউনিভার্সিটির সামনের গাছ ও দোকান ভেঙে লাঠি ও বাঁশ নিয়ে শিক্ষার্থীরাও অবস্থান নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রামপুরা সেতুর উপর পুলিশ অবস্থান নেয়।
রামপুরা থানার ওসি প্রলয় কুমার সাহা বলেন, “শিক্ষার্থীদের একজন আহত হয়েছে এমন গুজবে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। গতকাল চারজন নিহত হওয়ার গুজবের কথাও বলছে তারা। আমরা তাদের লাঠিসোঁটা ফেলে রাস্তার এক প্রান্তে অবস্থান নিতে বলেছি।” শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “কেউ মারা যায়নি, যদি কেউ নিহত হয়ে থাকে, তাহলে আমি নিজের পোশাক খুলে তোমাদের সাথে অবস্থান নেব।”
রামপুরায় ইউনিফর্ম ও আইডি কার্ড ছাড়া কিছু তরুণকে এ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন গাড়ি ঘুরিয়ে দিতে দেখা গেছে। তারা রিকশা থেকেও যাত্রীদের নামিয়ে দিচ্ছিল।

ধানমন্ডিতে দু ঘণ্টার ‘ঝড়ে’ আহত অর্ধশত 
আগের দিনের উত্তাপ সকালে গিয়ে টের পাওয়া যায়নি। ধানমন্ডির ঝিগাতলা মোড়ে গতকাল রোববার সকাল ১১টার দিকে কিছু পুলিশ নির্মাণাধীন নতুন একটি ভবনে বসে ছিলেন। পরনে কেবলই ইউনিফর্ম। সামনে ভেস্ট, লেগগার্ড আর হেলমেট রাখা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে শনিবারের মতো উত্তাপ না থাকায় অনেকটাই অলস সময় পার করছিলেন তারা। সড়কে গাড়ি চলাচল অন্যান্য দিনের মতোই কম। বেলা একটার দিকে হঠাৎই বদলে যায় চিত্র।
এ সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে আরও পুলিশ এসে অবস্থান নেয়। উল্টো দিকে তাকালে দেখা যায় বিজিবি ৪ নম্বর গেটের দিক থেকে বিশাল একটি মিছিল এগোচ্ছে। হঠাৎই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে পুলিশ ও সরকার দলীয়দের দুই ঘণ্টার পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, মারপিট, টিয়ার সেল নিক্ষেপের ঘটনায় ধানমন্ডি থেকে সায়েন্স ল্যাব হয়ে বাটা সিগন্যাল পর্যন্ত এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। মুহূর্তে বদলে যাওয়া ধানমন্ডি এলাকায় আহত হয় অর্ধশত ছাত্র, সাংবাদিক। আহতরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
নিরাপদ সড়কের দাবির আন্দোলনে গতকাল বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী শাহবাগ থেকে মিছিল নিয়ে ঝিগাতলামুখী হয়। এদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল। তাঁদের সঙ্গে ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীও কিছু ছিল। মিছিল থেকে ‘ভুয়া ভুয়া’ শ্লোগান দেওয়া হয়। দুপুর ১টার সময়ে মিছিলটি ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ডের মোড় পর্যন্ত এলে পুলিশ কাঁদানো গ্যাস ছোড়ে। সাঁজোয়া যান নিয়ে ধাওয়া করে শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীরা যে যার মতো ছুটতে থাকে। কেউ কেউ লেকের মধ্যে ঝাঁপ দেয়। পুলিশ সেখানে গিয়েও তাঁদের লাঠিপেটা করে। ঢাকার ঝিগাতলায় বিজিবি গেট এলাকায় গতকাল রোববার হামলার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ধাওয়া খেয়ে অনেক শিক্ষার্থী ঝিগাতলার ইবনে সিনা হাসপাতালের গলির দিয়ে বিভিন্ন বাসার নিচে আশ্রয় নেয় ও লেক পাড়ের দিকে চলে যায়। সেখান থেকে সাংবাদিকেরা অনেককে বের করে নিয়ে আসেন। তখন এক শিক্ষার্থী সাংবাদিকদের বলেন, মিছিল নিয়ে তাঁরা ঝিগাতলা মোড় থেকে ইউ টার্ন নিয়ে আবার ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাঁদের ওপর চড়াও হয়। লেক পাড়ের দিকে যাঁরা আশ্রয় নিতে যান সেখানে ছাত্রলীগ তাঁদের মারধর করে ধাওয়া দেয়। ঝিগাতলায় লাঠিপেটা ও ধাওয়ার পরে ধানমন্ডির বিভিন্ন গলিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করা হয়। ধানমন্ডি ১ নম্বর থেকে মাথায় হেলমেট, মুখে কাপড়, হাতে রড, রাম দা ও লাঠিসোঁটাসহ একদল যুবক পুলিশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিতে থাকে।
বেলা দু’টার সময় সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজনকে পেটায় একদল যুবক। শিক্ষার্থী ও সন্দেহজনক কাউকে পেলেই তারা হামলা চালায়। এ সময় পুলিশ পদচারী সেতুর নিচে দাঁড়িয়ে থাকে।
সোয়া দু’টার দিকে ধানমন্ডি ২ নম্বরে মিরপুর সড়কে দাঁড়িয়ে পুলিশের রমনা জোনের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার সাংবাদিকদের বলেছেন, মিছিলকারীরা ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে যাচ্ছিল। তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তারা শোনেনি। তিনি বলেন, সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। লাঠি ও রাম দা হাতে নিয়ে যুবকদের নিবৃত্ত না করা ও সাংবাদিকদের মারধর করার সময়ে পুলিশের নীরব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, পুলিশ বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল।
বেলা আড়াইটার দিকে পুলিশ ও যুবকদের দল এলিফ্যান্ট রোডের দিকে এগোয়। সেখানে মাল্টিপ্ল্যান সিটির সামনে পুলিশ আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দেয় এবং আবারও কাঁদানো গ্যাস ছোড়ে।
ধানমন্ডি এলাকা থেকে এলিফ্যান্ট রোড পুরোটাই তখন হেলমেট পরিহিত ও হাতে রড, লাঠি, রাম দাসহ থাকা যুবকদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তারা ধাওয়াও দিতে থাকে। তারা ‘জয় বাংলা’ ও শিবিরকে উদ্দেশ্য করে শ্লোগান দিতে থাকে। পৌনে ৩টার দিকে বাটা সিগন্যাল থেকে বা দিকে হাতিরপুল যাওয়ার সড়কে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের আওয়াজ পাওয়া যায়। ৩টার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়।
বেলা ১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত এ হামলা ও ধাওয়ার ঘটনায় আশপাশের সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শাটার টেনে বন্ধ করে দেয়। আতঙ্কে অনেকেই বিভিন্ন বাসা ও দোকানে আশ্রয় নেয়।
হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আটজন শিক্ষার্থী আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। আহতরা জানান, আরও অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া প্রথম আলোর প্রতিবেদক ও এপির ফটো সাংবাদিকসহ চারজন সাংবাদিককে পেটানো হয়েছে।

আহত ৮ জন ঢাকা মেডিকেলে
ঝিগাতলায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, পুলিশের কাঁদানো গ্যাসের শেল ও লাঠিপেটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আটজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। গতকাল বেলা একটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরে দুইটার দিকে তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তাঁরা সেখানেই চিকিৎসাধীন।
আহত শিক্ষার্থীরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নুসরাত জাহান (২১), সুস্মিতা রয়েল লিসা (২৩), মারুফ (২২), তুষার (২৪), শিমন্তী (২৬); বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকিন (২৩), ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের এনামুল হক (২৪) ও তামিম (২৩)।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘কারও আঘাতই তেমন গুরুতর নয়। আমরা তাঁদের চিকিৎসা দিচ্ছি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. বাচ্চু মিয়া এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আহত লোকজনের মধ্যে এনামুলের মাথায় আঘাত আছে। এ ছাড়া সবার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লেগেছে।

ওটি বোমা ছিল না
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে গতকাল শিক্ষার্থীদের মিছিলে প্রবেশ করা এক যুবকের (২১) পকেটে থাকা বোমাসদৃশ বস্তু নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা যুবকটিকে ধরে মার দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে মিরপুরের কমার্স কলেজের সামনে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকে। স্থানীয় নারী সংসদ সদস্যসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এসে তাদের মিছিল না করার এবং ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে পুলিশও তাদের অনুরোধ করে। তবে শিক্ষার্থীরা তাদের কথা না শুনে মিছিল চালিয়ে যেতে থাকে।
বেলা তিনটার দিকে বিভিন্ন কলেজের পাঁচ শর মতো শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে আসে। এ সময় সেখানে থাকা পুলিশ তাদের সেখানে অবস্থান না নেওয়ার জন্য চেষ্টা করে। একপর্যায়ে সেখানে আগে থেকে থাকা ছাত্রলীগের কর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান। এতে শিক্ষার্থীরা চলে গিয়ে আবারও মিছিল নিয়ে আসে। তখন তাদের মিছিলে রোমান নামের যুবকটি প্রবেশ করেন। তাঁর পকেট দেখে শিক্ষার্থীদের সন্দেহ হলে তারা তাঁকে মারপিট করে। এতে রোমান অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে শিক্ষার্থীরা তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। কিছুক্ষণ পর তাঁর জ্ঞান ফিরে এলে তিনি তাঁর নাম বলেন। এরপর তাঁর পকেটে রাখা কৌটাটি বের করে পুলিশ। দেখা যায়, সেটি একটি আঠার কৌটা।
এরপর পুলিশ রোমানকে চিকিৎসার জন্য আল হেলাল হাসপাতালে পাঠায়। পরে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

ধরে ধরে সাংবাদিকদের পেটাল হেলমেট পরা যুবকরা
ধানমন্ডিতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় কর্তব্যরত সাংবাদিকদের ধরে ধরে পিটিয়েছে হেলমেট পরা একদল যুবক। গতকাল রোববার দুপুরে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, ধানমন্ডি ১ নম্বর ও ২ নম্বর সড়কে বেশ কয়েকজন আলোকচিত্র সাংবাদিক আহত হন। চাপাতি, রড, লাঠি হাতে এই যুবকদের তৎপরতার সময় পুলিশ সামনে থাকলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি; তবে ওই সময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দিকে কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ছিল পুলিশ। এক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে শনিবার জিগাতলায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এরপর গতকাল রোববার সকালে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় শান্ত থাকলেও মোটর সাইকেল নিয়ে একদল যুবকের মহড়া দেখা যাচ্ছিল।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে নাশকতার চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ তুলে এদিনে সকালে মিরপুরসহ কয়েকটি এলাকায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নিয়েছিল।
দুপুরে শাহবাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী অবস্থান নেয়। সাড়ে ১২টার পর তারা মিছিল নিয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি হয়ে রওনা হয় ধানমন্ডির দিকে। ধানমন্ডি দুই নম্বর সড়কে পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষ বেঁধে যায়।
শিক্ষার্থী ও পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলার মধ্যে দেড়টার দিকে সেখানে হেলমেট পরা যুবকদের তৎপরতা দেখা যায়। কারও হাতে কিরিচ, কারও হাতে রড, কারও হাতে লাঠি।
সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে ওভার ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে এক তরুণ রাস্তায় বিক্ষোভের ছবি তুলছিলেন। নিচে থাকা যুবকরা ওই তরুণের দিকে ইট ছোড়া শুরু করে।
ইটের মুখে ওই তরুণ নিচে নেমে এলে বেধড়ক পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয় তাকে, ছিনিয়ে নেওয়া হয় তার ক্যামেরা।
এরপর সাংবাদিক বিশেষ করে আলোকচিত্রীদের ওপর চড়াও হয় এই যুবকরা, যা ঘটে পুলিশের সামনেই। যারাই ক্যামেরা বা মোবাইলে ছবি তুলতে যাচ্ছিল, তাদের ওপরই হামলা চালায় তারা।
ধানমন্ডি ১ নম্বর সড়কে এপি’র ফটো সাংবাদিক এ এম আহাদকে ধরে ফেলে তারা; কয়েকজন মিলে রড দিয়ে বেধড়ক পেটায় তারা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ল্যাব এইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হেলমেটধারীদের ধাওয়ায় সাংবাদিকরা দুইভাগ ভাগ হয়ে যায়। একটি অংশ ধানমন্ডি দুই নাম্বার সড়কে স্টার রেস্তোরাঁর দিকে চলে যায় এবং অন্য অংশটি ল্যাব এইডের দিকে ডা.রেফাত উল্লাহ হ্যাপি অর্কিড প্লাজার সামনের মোড়ে অবস্থান নেয়।
দুই দিকেই সাংবাদিক ধাওয়া করে ইট ছুড়ছিল এই যুবকের দল। এসময় এক নারী সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোকচিত্রী মাহমুদুজ্জামান অভি, প্রথম আলোর আহমেদ দীপ্ত, চ্যানেল আইয়ের সামিয়া রহমান, বণিক বার্তার পলাশ সিকদার, বিডি মর্নিং’র আবু সুফিয়ান, জনকণ্ঠের জাওয়াদ ও  পাঠশালার রাহাত হামলার শিকার হন। তাদের কেউ কেউ ল্যাব এইড হাসপাতালে, কেউ পপুলার হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক নুরুজ্জামান লাবুর দিকে হঠাৎ করে কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র হাতে তেড়ে এলে তিনি মোবাইল ফোন দ্রুত ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নেন। তারা তাকে ছবি না তুলতে সাবধান করে দেয় ওই যুবকরা। লাবু বলেন, একজন নারী চিকিৎসক রিকশায় করে যাওয়ার সময় মোবাইল বের করে ছবি তুললে ওই যুবকেরা ফোনটি কেড়ে নিয়ে তাকে  নাজেহাল করেন।
এদিকে ধাওয়া খেয়ে হ্যাপি অর্কিড প্লাজার মোড়ে এসে আশ্রয় নেওয়া সাংবাদিকদের উপর ফের হামলা চালাতে আসে ওই যুবকরা। সেখানে কিছুক্ষণ মহড়া দিয়ে আবার ধানমন্ডি দুই নম্বরের দিকে ফিরে যায় তারা। সাংবাদিকদের পাশাপাশি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরাও এই যুবকদের হামলার শিকার হন।
কিছুক্ষণ পর ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ কমিশনার মারুফ হোসেন সরদারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল আসে হ্যাপি অর্কিড প্লাজার সামনে, যিনি ওই এলাকাতেই ছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জানান, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনার বিষয়ে কেউ তাদের কাছে অভিযোগ করেননি।
কিরিচ, রড হাতে হামলাকারী এই যুবকরা কারা- জানতে চাইলে তিনি (মারুফ) বলেন, “আমি কোনো অস্ত্র দেখিনি। আর কোনো সাংবাদিক আমার কাছে কমপ্লেইন করেনি।”
শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল ছোড়া হলেও এই যুবকদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ ছিল না কেন-প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এখানে ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন দিকে চলে গেছে, কারা কোন দিকে, এখানে আমরাও বিভ্রান্ত হয়ে গেছি, যারা আমাদের দিকে ঢিল মেরেছে, শুধু তাদেরকেই ছত্রভঙ্গ করেছি।”
এদিন বিক্ষোভের মধ্যে ঢাকার উত্তরা ও বনানীতেও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকদের উপর চড়াও হয়েছিল। ছবি তুলতে কিংবা ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলেওই বাধা দিচ্ছিল তারা।

উত্তরায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করতে গিয়ে পিটুনি খেল ছাত্রলীগ
উত্তরা হাউস বিল্ডিং চত্বরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার চেষ্টা করে পিটুনি খেতে হয়েছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের। গতকাল রোববার দুপরে এই ঘটনা ঘটে। বেলা ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা উত্তরায় হাউজবিল্ডিং এলাকার সড়কে অবস্থান নেয়। এতে বিমানন্দর সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
প্রাথমিকভাবে ছাত্রলীগের হামলায় আন্দোলনকারীর পিছু হটলেও পরে শিক্ষার্থীরা একজোট হয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের পাল্টা ধাওয়া করে। তারা দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে কয়েকজনকে ধরে বেধড়ক পিটুনি দেন শিক্ষার্থীরা।এসময় আহত হন ছাত্রলীগের তুরাগ থানার সভাপতি শফিকুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান। তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া ছাত্রলীগ নেতাদের ফেলে যাওয়া তিনটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়।

ফার্মগেটে ছাত্রদের ওপর হামলা
গ্রীনরোড এলাকায় এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত একদল শিক্ষার্থীদের মিছিলে অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গ্রীনরোড ক্যাম্পাস থেকে ফার্মগেট মোড়ে মিছিল নিয়ে যাবার সময় এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। 
এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে ফার্মগেট চার রাস্তার মোড়ের দিকে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে হেলমেট পড়া একদল যুবক লাঠি নিয়ে তাদের উপর হামলা করে। হামলায় শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ে। এ সময় হামলাকারীরা বিশ্ববিদ্যালয় ভবনে হামলা চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাচ ভাঙচুর করে। ১০-১৫ মিনিট এ হামলা চলে। পরে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ