ঢাকা, সোমবার 6 August 2018, ২২ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অঘোষিত পরিবহণ ধর্মঘটে বিচ্ছিন্ন ঢাকা

স্টাফ রিপোর্টার: বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগসহ নয় দফা দাবিতে  আন্দোলন আষ্টম দিনে অতিবাহিত। এই আন্দোলনকে নশ্যাত করতেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা  বাস-ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। তারা বলছেন,পরিবহনের হামলা বন্ধ না হলে তারা রাস্তায় পরিবহন নামাবে না। কিন্তু তারা কোন পরিবহন ধর্মঘটের ঘোষণা না দিলেও সারা দেশ থেকে রাজধানী ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা মামলা করলেও পরিবহন শ্রমিকদের এই অঘোষিত ধর্মঘটের জন্য কিছু বলছেন না। উল্টো পরিবহন শ্রমিক লীগের নেতারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করছেন।
আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই শুক্রবার থেকে রাজধানীতে মালিক-শ্রমিকরা বাস চালানো প্রায় বন্ধ করে দেয়। এতে ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় বাস আসাও প্রায় বন্ধ রয়েছে। ফলে সারা দেশ অচল হয়ে পড়ে। সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ঢাকা। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ে অসংখ্য মানুষ।
দুর্ভোগের শিকার সাধারণ মানুষ যাতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে সে কারণেই মালিক শ্রমিকরা অঘোষিতভাবে পরিবহন ধর্মঘট করছে বলে মনে করেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সড়ক আইনের সাজা কমাতে সেই পুরনো কৌশলই বেছে নেয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রভাবশালীরা জড়িত বলে তারা মনে করেন।
পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা একদিকে যেমন গাড়ি চালাননি, অপরদিকে তারা গাড়ি চলাচলে বাধাও দিয়েছেন। রাজধানীর সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন স্থানে পরিবহন শ্রমিকরাই সড়কে নেমে যান চলাচলে বাধা দেন। এমনকি বাস থেকে যাত্রীদের রাস্তায় নামিয়ে দেন। মূলত শিক্ষার্থীদের ভয়ে নয় পরিবহন শ্রমিক লীগের ভয়ে তারা রাস্তায় গাড়ি নামাতে রাজি হচ্ছে না।
পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গত কয়েকদিন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে তারা নিরাপত্তাহীনতায় বাস ও ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। এ ছাড়া আগামী সোমবার সড়ক পরিবহন আইন অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে উঠছে। খসড়া ওই আইনে বিভিন্ন অপরাধের সাজা নিয়ে ঘোর আপত্তি রয়েছে তাদের। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনও তারা কোনোভাবেই মানতে পারছেন না। তাই সড়কে নিরাপত্তা নেই এ অজুহাত দেখাচ্ছেন তারা। নিরাপত্তা ফিরে না আসা পর্যন্ত গণপরিবহন বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন পরিবহন মালিক শ্রমিক নেতারা।
এদিকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের অঘোষিত এ পরিবহন ধর্মঘটে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বাসের অভাবে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।
পরিবহন সংকটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দেশের আমদানি-রফতানি পণ্য আটকে গেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে শাকসবজি ও কাঁচা পণ্য নষ্ট হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীরা।
গাড়ি বন্ধ করে দাবি আদায়ে মালিক শ্রমিকদের কৌশল এবারই নতুন নয় বলে মনে করেন গণপরিবহন ও সড়ক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক। তিনি বলেন, গাড়ি বন্ধ করে অতীতে দাবি আদায় বা প্রেসার সৃষ্টি করা মালিক ও শ্রমিকদের পুরনো কৌশল। এবারও তারা একই কৌশল প্রয়োগ করছেন। এর মাধ্যমে তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করছে। এটা বড় অন্যায় ও প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন।
সরেজমিন দেখা গেছে, গতকাল রোববার রাজধানীর সড়কে বেসরকারি বাস নেই। মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে লাইন দিয়ে বাস রাখা হয়েছে। এ ছাড়া চিড়িয়াখানা, মিরপুর, আমিনবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় গাড়ি রেখে দেয়া হয়েছে।
এতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো একেবারেই ফাঁকা ছিল। রাস্তায় মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার এবং সিএনজি চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে তা সংখ্যায় খুবই কম। ফার্মগেট, মিরপুর, মহাখালী, পল্টনসহ প্রতিটি বাস স্টপেজে শত শত মানুষ বাসের জন্য অপেক্ষা করেছেন।
এদিকে পরিবহন সংকট কাজে লাগিয়ে অটোরিকশা চালকরা দ্বিগুণ-তিন গুণ পর্যন্ত বেশি ভাড়া আদায় করেছেন। বাড়তি ভাড়া নিয়েছেন রিকশা চালকরা।
 সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, প্রকাশ্য ধর্মঘটের ডাক না দিলেও শ্রমিকেরা প্রকাশ্যে গাড়ি চলাচলে বাধা দিচ্ছেন। মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীতে শ্রমিকরা পথে নেমে বাস ট্রাক চলাচলে বাধা দেন। মিরপুরে সড়কে অবস্থান নিয়ে শ্রমিকেরা বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেন। মিরপুর সাড়ে ১১-তে পরিস্থান পরিবহনের একটি গাড়ি থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেয় ১০-১২ জনের এক দল শ্রমিক।
 দেখা গেছে,নিরাপত্তার অজুহাতে ঢাকার কোন আন্তজেলার বাস টার্মিনাল থেকে দূর পাল্লার কোন বাসও ছেড়ে যায়নি। একই ভাবে ঢাকার বাহির থেকেও কোন যান প্রবেশ করতে দেখা যায়নি।
 রোববার সকাল ১০টায় কাজলা থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত পরিবহন মালিক শ্রমিকরা অবস্থান নেন। এ সময় উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় তারা জাবালে নূরের মালিক জেলে থাকার প্রতিবাদ জানান।
যাত্রাবাড়ী বাস মালিক সমিতির নেতা শিপন ও জনি জানান, কথায় কথায় সুশীল সমাজের লোকজন আমাদের মূর্খ বলেন। পরিবহন ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেক সুশিক্ষিত লোক রয়েছে। তাদের এ বক্তব্য মানতে আমরা নারাজ।
এ বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, বর্তমানে গাড়ি চালানোর মতো পরিস্থিতি নেই। মালিক ও চালকেরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। রাস্তায় নামলে আন্দোলনকারীরা মারধর করছে। তাই আন্দোলন না থামা পর্যন্ত গাড়ি চলবে না।
দুর্ভোগের শিকার যাত্রী জানান, তারা তো গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছে না এবং কাউকে বের হতেও দিচ্ছে না। ব্যক্তিগত চলাচলেও বাধা দিচ্ছে। প্রশাসন সব ধরনের আন্দোলন দমন করলেও পরিবহন শ্রমিকদের নৈরাজ্যের ব্যাপারে নীরব কেন? নাকি তারাও শ্রমিকদের সঙ্গে আমাদের দুর্ভোগে ফেলতে একজোট হয়েছে?
তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, দেশে পরিবহন শ্রমিকরা যে নৈরাজ্য চালাচ্ছে। তা আর মেনে নেয়া যাচ্ছে না। রোগী দেখতে আসছি নিজের গাড়ি নিয়ে, তবুও যেতে দিচ্ছে না। দেশ কি তাদের বাপের? প্রশাসন আজ কই প্রশ্ন মাহমুদের।
গতকাল রোববার সকাল থেকেই ঢাকার প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ি থেকে শুরু করে সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল পর্যন্ত বেশিরভাগ সড়কে শ্রমিকদের লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে দেখা যায়।
এখানে নেতৃন্দ দেন পরিবহন শ্রমিক নেতা কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবু। সকাল থেকে তারা লাঠি সোটা নিয়ে তারা এখানে অবস্থান নেন। এ সময় তারা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের বিরুদ্ধে নানা মিছিল দিয়ে থাকেন।
প্রসঙ্গত গত ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজিব ও দিয়া খানম মিম নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয় ১৫ জন। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। তারা গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সার্টিফিকেট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কিনা, তা পরীক্ষা করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ