ঢাকা, সোমবার 6 August 2018, ২২ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৩ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পোশাক শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ১০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব টিআইবি’র

গতকাল রোববার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সিপিডির উদ্যোগে আয়োজিত সংলাপে উপস্থিত অতিথিদের একাংশ -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: সন্তান আছে তৈরি পোশাকশিল্পের এমন শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরি ১০ হাজার ২৮ টাকা করার প্রস্তাব করেছে সিপিডি। আর যাদের সন্তান নেই, এমন শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরি ৯ হাজার ২২৮ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘মিনিমাম ওয়েজ এন্ড লাইভলিহুড কন্ডিশনস অব আরএমজি ওয়ার্কার্স’ শীর্ষক সংলাপে এই প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। গতকাল রোববার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে এর আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, সিপিডি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. রেহমান সোবহান, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এবং পোশাক মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
অনুষ্ঠানে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন। তিনি ষষ্ঠ গ্রেডের শ্রমিকদের জন্য ১০ হাজার ২৮ টাকা মজুরির প্রস্তাব করেন। দ্বিতীয় গ্রেডের জন্য ১৫ হাজার ৩৩৮ টাকা এবং প্রথম গ্রেডের জন্য মোট বেতন আলোচনা সাপেক্ষে নির্ধারণ করার প্রস্তাব দেন। তবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত শ্রমিকনেতারা এই প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।
প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন (আইএলও) সব সময় ডাবল স্ট্যাডার্ট (দ্বৈতনীতি)। সব মাতব্বরি শুধু আমাদের বেলায়। বায়ারদের তারা কিছুই বলতে পারে না। সেফটি নিয়ে শুধু কথা বলে, দাম বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বললে পিছিয়ে যায়। এটা হওয়া উচিৎ নয়।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, জীবনযাপনের ব্যয়ের নিরিখে শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ করা নিয়ে চিরকালই বিবাদ হবে। আজ থেকে ৫৫ বছর আগেও এ নিয়ে মালিক-শ্রমিকের দ্বন্দ্ব হয়েছে এবং এখনো তা চলছে। দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন না এলে ধারণা করি, আমার নাতি-নাতনিরাও এই বিবাদ দেখবে। মজুরি নির্ধারণের এই পদ্ধতিকে পশু অ্যাপ্রোচ আখ্যা দেওয়া যায়। কিন্তু শ্রমিকেরা তো মানুষ, তাঁদের যেহেতু মন আছে, সেহেতু তাঁদেরও উৎসাহের দরকার আছে। মজুরি নির্ধারণে এই দিকটি বিবেচনা করা দরকার।
 অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, শ্রমিকেরা যেহেতু মানুষ, সেহেতু অর্থনীতিতে বা কর্মক্ষেত্রে তাঁরা কীভাবে সম্পৃক্ত থাকেন এবং কত মজুরি পান, তার সঙ্গে উৎসাহিত হওয়ার সম্পর্ক আছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মজুরি নিয়ে আলোচনায় বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে। পোশাক শ্রমিকরাই মূল চালিকাশক্তি। সে কারণে শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণের সময় বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে, অন্যথায় এই ঝগড়া চিরস্থায়ী হবে।
তিনি আরও বলেন, পোশাক শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নে মালিকদের একার দায় দিলে হবে না। এখানে বায়ারদেরও দায় আছে। একটি পোশাক পাঁচ ডলারে কিনে বায়াররা ২০ ডলারে বিক্রি করে। মাঝের এই ১৫ ডলার যায় কই। সেটাও আলোচনা করতে কবে। তাদেরকেও দায় নিতে হবে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের বাস্তবভিত্তিক বেতনের ব্যবস্থা করতেই হবে। তারও তো মানুষ।
 মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বিদ্যমান মজুরি কাঠামোর গ্রেড ৭ বিলুপ্ত করে নতুন মজুরি কাঠামোতে গ্রেড ৬ এর ন্যূনতম মজুরি ১০ হাজার ২৮ টাকা করা যেতে পারে।
বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করে সিপিডির গবেষক গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অঞ্চলভেদে পোশাক শ্রমিকদের ব্যয়ে তারতম্য রয়েছে। ঢাকার বাইরে গাজীপুরে জীবনযাত্রার ব্যয় সবচেয়ে বেশি। আর ঢাকার ভেতরেও ব্যয়ের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। তাই মিরপুর আর তেজগাঁওয়ের শ্রমিকের বেতন এক হওয়া ঠিক নয়। শুধুমাত্র বাড়ি ভাড়াই সবচেয়ে বড় ব্যয় নয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যেও বড় ব্যয় হচ্ছে।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ৮৬ শতাংশ শ্রমিক এখনও টয়লেট শেয়ার করেন। ৮৫ শতাংশ শ্রমিক রান্নাঘর শেয়ার করেন। ৪০ শতাংশ শ্রমিকের ঘরে কোনো টেবিল নেই। ৪৪ শতাংশ শ্রমিকের ঘরে চেয়ার নেই। মাত্র ৫ শতাংশ শ্রমিক বেতন পান মোবাইল বা ব্যাংকিং চ্যানেলে।
সিপিডির তুলে ধরা ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাবের শ্রমিকনেতা জলি তালুকদার বলেন, এটি বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি আরও বলেন, আমরা চারজনের পরিবার হিসাব করে দুই বছর আগে ১৬ হাজার টাকা মজুরির প্রস্তাব করেছিলাম, কিন্তু এখন সেটাও যথেষ্ট নয়, বর্তমান বাজারের নিরিখে তা হবে ৩২ হাজার টাকা। আর বিজিএমইএর সভাপতি মজুরি বোর্ডে যে প্রস্তাব করেছেন, তা অবিশ্বাস্য রকম কম। আমাদের বিশ্বাস, প্রগতিশীল মালিকেরা তাঁর প্রস্তাবের সঙ্গে একমত নন।
শ্রমিকনেতা মন্টু ঘোষ বলেন, শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা আরও বাড়াতে হলে তাঁর স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে। শ্রমিক এলাকায় সন্ধ্যার সময় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক অঞ্চলের বাড়ির মালিকেরা ইচ্ছামতো ভাড়া নির্ধারণ করেন। তাই শ্রমিকদের মজুরি বাড়লেও লাভ হবে না, অতিরিক্ত মজুরি বাড়ির মালিকের পকেটে যাবে। সে জন্য তিনি আইন অনুযায়ী এলাকাভেদে বাড়ি নির্ধারণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সিদ্দিকুর রহমান বলেন, মালিকদের সামর্থ্যের কথা মনে রাখতে হবে। এমন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে, যেন মালিকের সক্ষমতা ও শ্রমিকের ন্যায়তা দুটাই হয়।
আলোচনায় শ্রমিক প্রতিনিধি রুহুল আমিন বলেন, ১৬ হাজার টাকার দাবি নিয়েই আমাদের আরও বেশি কথা বলা উচিত। সাত মাসে মজুরি বোর্ডের মাত্র তিনটি বৈঠক হয়েছে, এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আরেক শ্রমিক নেতা বাবুল আক্তার বলেন, শ্রমিকরা ১৬ হাজার টাকার মজুরির দাবিতেই রয়েছে। কিন্তু মজুরি বোর্ডে যিনি শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে শ্রমিক নেতা নন। মজুরি বোর্ডে কি সিদ্ধান্ত হবে না হবে, তা জানি না। আমরা কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপই কামনা করবো।
বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, সিপিডির পক্ষে পোশাক শ্রমিকদের মজুরির সুপারিশ করা অযৌক্তিক। কেননা মজুরি নিয়ে প্রস্তাবনা দেয়া সিপিডির কাজ নয়। মজুরি বোর্ডে এ আলোচনা চলমান রয়েছে। দুই পক্ষ আলোচনা করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ