ঢাকা, মঙ্গলবার 7 August 2018, ২৩ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৪ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাষ্ট্রের ঢোক

-হাবিবা

ড্রাইভার গাড়ী স্টার্ট দাও। কুইক। মন্ত্রী সাহেব আসছেন।
ড্রাইভার দাড়ায়ে সিগারেট টানছিল তাই হকচকিয়ে উঠলো পুলিশ অফিসারের কথা শুনে। সিটে বসে একটু কাচুমাচু করে বললো-
স্যার, হারামীর পোলাগুলাতো ঐ রাস্তা বন্ধ কইরা রাখচে। বলে একটু ঢোক গিললো। কান পেতে রইলো কোনো ধমক খাওয়ার জন্য।
অফিসার যথাযথই ধমকে বললো-ছেলেরা রাস্তা বন্ধ রাখচে তো কি হইচে?? মগের মুল্লুক তো না। দেশ কি তাদের বাপের টাকায় কেনা?? দেশ কিনা নিলাম আমরা।শয়ে শয়ে কোটি টাকা পাচার কইরা, দালালি কইরা, চুরি ডাকাতি কত কি কইরা দেশটা কিনলাম আমরা আর আলগা পিরিত দেহায় কেডা?? তুই তোর মত চালাবি।
দ্বিতীয় ঢোক গিলে ড্রাইবার বললো-হ আইচ্চা ছের।
মন্ত্রি হামুস ধামুস করে আসলো, গাড়ীর সিটে গিয়ে বসলো। আর গাড়ী স্টার্ট নিলো।
রাস্তার চারধারে ছাত্রদের আনাগোনা দেখে মন্ত্রীর মুখখানি কখনো গম্ভীর আবার কখনো বাঁকা হাসি দিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় অফিসার বললো-স্যার, সামনেই একটা জটলা দেখা যাচ্ছে, গাড়ি থামাতে ইশারা করছে।
মন্ত্রী-কি?? পিষিয়ে যাও। এরা জানেনা এ গাড়ি করে কে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের কাজে বাধা দিলে তাদেরকে জামায়াত শিবির, রাজাকার, রাষ্ট্রবিরোধী বলে ঢুকানো হবে তা এরা আজো বুঝেনি? অফিসার, আমি বলছি একশন নাও এদের বিরুদ্ধে।
ড্রাইভারের কানে হঠাৎ একটি ঢোকের আওয়াজ গেল। ভাবলো-নাহ, আমিতো আজ সারাদিনই ঢোক দিয়ে যাচ্ছি, আমার ঢোকের আওয়াজতো এমন নয়? তার মানি আমি দেইনি, কে দিলো? পেছনে ফিরে দেখলো অফিসারের ঢোকের আওয়াজ, তার মুখটা যেন শন্ডামার্কা দেহের তুলনায় চুনোপুটি হয়ে গেছে। মন্ত্রীদের ড্রাইভার হওয়ার এই এক সুবিধা। সুযোগমত বড় বড় রাঘব বোয়ালদের চিমসে মুখ দেখা যায়। যা দেখে ড্রাইভারের পৈশাচিক আনন্দ উতলিয়ে উঠে।
অফিসার কাচুমাচু স্বরে বললো-স্যার, আমি চাইলেই তা করতে পারি কিন্তু আপনার জনপ্রিয়তা কমে যাবে স্যার। এরাতো সব কালা বোবা হয়ে গেছে, কেউ আপনার কথা শুনতে চাইবেনা। শুনচি আমাদের আরো কিছু মন্ত্রি মহোদয়কে এরা রাস্তায় পেয়ে নাকের ডগায় ঝুলিয়েছে।আর মিডিয়া গুলাও আমাদের গোলামী,থুক্কু,আনুগত্য করতে ভুইল্যা গেচে। শিবির জামাত নাকি তাবিজ তুমার, হাইজ্যাকিং এসব কাজে নেমে গেচে স্যার, একেবারে আন্ডারগ্রাউন্ড এটেক।
আরেকটি ঢোকের আওয়াজ শুনা গেল। ড্রাইভার এবার পুর্বেরটির সাথে, নিজেরটির সাথে মিলালো। নাহ, এবারটি মনে হয় মন্ত্রী সাহেবের। উফ যদি চুতা দিয়া পিচনে চাইতে পারতাম, আরেকটু সাহস হইলে সেলফিডাও তুলতাম। মনে মনে পৈশাচিত আনন্দ। অপরদিকে অফিসারও সে ঢোকের আওয়াজ শুনলো আর মনে মনে পৈশাচিক আনন্দের চারা রোপন করলো যদিও ড্রাইভারের চারাটি গাছ হয়ে যাওয়ার জোগাড় এতক্ষনে।
হঠাৎ ড্রাইভার ছাত্রদের চাপে গাড়ী থামাতে বাধ্য হল। শংকিত ও বিব্রত  মন্ত্রী জিগ্যেস করলো-ড্রাইভার, লাইসেন্স পেপার এনেছো?
ড্রাইভার বললো-স্যার, লাইসেন্স পেপারই দেয়া হয় নাই, আনবো কি?
এইবার ড্রাইভার, অফিসার,মন্ত্রী সাহেবের একসাথে একটি বিকট ঢোকের আওয়াজ শুনা গেল। লাভ হল কেউ কারোটা চিনতে পারলোনা। হঠাৎ মন্ত্রী সাহেব হুংকার ছেড়ে সমস্ত দোষ, পাপ ড্রাইভার আর অফিসারের মাথার ওপর ঝাড়তে লাগলেন। বললেন-
- তোমাদের মত চালক আর অফিসারের কারণে আজ রাষ্ট্রক্ষমতা হারাতে বসেছি আমরা।
- হতচ্ছাড়া ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চাগুলা থুক্কু ছাত্রগুলা আমাদের আজ তোমাদের জন্য গরুর মত গলায় দড়ি দিয়া নাচাচ্ছে।
- আজ হাসলেও দোষ, কানলেও দোষ, কিছু বললেই দোষ কেন এ অবস্থা আমাদের।
(মন্ত্রী সাহেব এগুলা বলতে যেয়ে যেন কেঁদেই দিলেন)
ফিল্মের নায়কদের মত বলেই যাচ্ছেন-
- শুধু তোমাদের জন্য আজ রাতে ঘুমাতে পারিনা। ঘুমালেই চোখের সামনে ছাত্রদের বিদ্রুপী হাসি দেখি আর তাদের পেছনে যেন জামায়ত শিবিরের জানোয়ারগুলা চকচকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায়। উফ সহ্য করা যায়না।
- তোমাদের জন্য টিভি চ্যানেলের চামচাগুলা চোখ ঠেসে ধরে জেরা করে, আজকাল তাদেরও জামাত-শিবিরের সাথে আতাত করছে বলে মনে হয়।
- তোমাদের জন্য, হ্যা তোমাদের জন্যই আজ.....
হঠাৎ গাড়ী ভাঙা শুরু হয় কারন এতক্ষণেও গাড়ি থেকে কেউ কোন সাড়া দেয়নি। ছাত্ররা লাইসেন্স চাচ্ছে। আর ভেতরে মন্ত্রী দুইজন রাষ্ট্রীয় গোলাম বনাম বান্দরের লেজ বেঁধে চলছেন।
অবশেষে পরিনাম-
বিশ্বকাপ ফুটবলের মত গোল সাইজের গাল দুটি দুদিকে টেনে হাসার যথাসাধ্য কসরত করে, দু’হাত জোড় করে প্রনামের ভঙ্গিতে গাড়ী থেকে মোটা ঠ্যাঙ বের করে নামলো মন্ত্রী।
হঠাৎ উপস্থিত দু’তিনটি  ছাত্রকে জালে মাছ ধরার মত দুহাতে বুকের মাঝে শক্ত করে গুজালো। আর বলতে লাগলো-
আমি  সে কোথা থেকে এযুগের কচি কচি সালাম, রফিকদের দেখার জন্য ছুটে এসেছি।
বক্তৃতা দেয়ার ভান করে বললো-
আজ আমি দ্বিতীয় ৫২ দেখলাম, দ্বিতীয় ৭১ দেখলাম। দ্বিতীয়.....
হঠাৎ কথা থামিয়ে দিয়ে ছাত্ররা বললো- গাড়ীর লাইসেন্স আছে?
মন্ত্রীর মুখে সহসাই একগাদা মানুষের সামনে বৃষ্টির পিছল পানিতে আছড়ে পড়লে মুখের যেরকম লুক হয় সেই লুকটি ভেসে ওঠলো। মন্ত্রী খেয়াল করলো এতক্ষণ আবেগঝরা ভাষণে এদের ভাবাবেগ যথা পুর্বং তথা পরং রয়ে গেল। একেকটি যেন ভাবলেশহীন রোবট।
বুকের মাঝে গুজিয়ে রাখা ছাত্র দু-তিনটাকে এবার সে কোল থেকে সামনে দাড় করিয়ে দেখল -ওমা, এরাও একই ভাবলেশহীন রোবট। রোবটগুলো চেচিয়ে বলতে লাগলো-মন্ত্রী সাহেব, আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দাও। নয়তো গদি ছাড়ো, রাষ্ট্র ছাড়ো। আমরা ছাত্ররা দেশ এর চেয়ে ঢের ভালো চালাতে পারবো। তোমরা না হয় আমাদের হয়ে স্কুলে ভর্তি হও। তোমরা আবার মানুষ হও। আমরাই যথেষ্ট তোমাদের মানুষ করতে, তোমাদের মানবিকতা, দেশ চালনা আজ আমরাই শেখাবো। এমন দেশ গড়ে তুলবো যেখানে সবাই ন্যায় বিচার পাবে, হোক সে সাধারণ, হোক সে আস্তিক নাস্তিক, হোক সে জামায়াত শিবির, হোক সে ছাত্র কিংবা বৃদ্ধ, ধনী কিংবা গরীব হোক যেকোনো ধর্মের। সবাই আইন মেনে চলবে সে রাষ্ট্রে। হোক সে প্রধানমন্ত্রী, হোক মন্ত্রী মিনিস্টার, হোক সে বাস ড্রাইভার, হোক পথচারী হোক যেকোন মানুষ। হ্যাঁ আমরা আগামীর রাষ্ট্র গড়বো মানুষ দিয়ে, মানবিকতা দিয়ে, বিভেদ দিয়ে নয়। আমরা আগামী গড়বো মানবিকতা, নৈতিকতার, ন্যায় বিচারের, সমতার, সকল ধর্মের, সকল শ্রেনীর যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে।
রাজি আছেন মন্ত্রী সাহেব?
গাড়ির ভেতরে লেজ গুটিয়ে থাকা ড্রাইভার আর অফিসার এবার ঢোক ছেড়ে দিয়ে গাঢ় নিশ্বাস ফেলে বললো-
রাজী, আলবৎ রাজী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ