ঢাকা, বুধবার 8 August 2018, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কলকাতার যেখানে হিন্দু-মুসলিম-ইহুদী-খ্রিস্টান আর লোকায়ত ধর্ম মিলেছে এক পথে

৭ আগস্ট, আল জাজিরা : কলকাতার এক চেনাজানা পথ ব্রেবোর্ন রোড। সেই পথে যেমন হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মন্দির-মসজিদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে খ্রিস্টান-ইহুদিদের গির্জা-সিনাগগ। অগ্নি উপাসনা, জৈন ধর্ম, ইসলামের শিয়া কিংবা সুফি মতবাদ আর জরাথ্রুস্ট কিংবা চীনা লোকায়ত ধর্মের উপাসনালয়ও মিলেছে একই সেই পথে। উপনিবেশের যুগের বাণিজ্যকেন্দ্রিক উৎস থেকে ‘বহু ধর্মীয় পার্লামেন্ট’ হয়ে ওঠা এই অঞ্চলে ছাপ লেগে আছে পারস্য-পর্তুগীজ-আর্মেনীয়-চীনা সংস্কৃতির। স্থানিক সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে তা পেয়েছে সম্মিলনের এক স্বতন্ত্র মাত্রা। মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতার মতো বৈরিতা নয়, ইহুদি আর মুসলিমরা এখানে সম্মিলিত পারস্পরিকতার বোধে। সবমিলে ব্রেবোর্ন রোডের ওই প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক বহুধর্মীয় ইতিহাস আর সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় ঐকতানের গল্প তুলে এনেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম। পুরানা কলকাতায় এক হলুদ রংয়ের ভবনের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেই একটি কক্ষ; এর পেছন দিকে সোনা দিয়ে ছোট্ট একটি মূর্তিকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। চীনা লোকায়ত বিশ্বাস মতে কৃপার দেবী কুয়ান ইন; এটি তারই প্রতিমা। চীনা লোকায়ত ধর্মে অত্যন্ত পূজনীয় দেবী তিনি। সাদা রংয়ের তাজা ফুলের মালা তার গলায়। ভারতীয় রীতি অনুযায়ী শ্রদ্ধা প্রদর্শনের নিদর্শন এটি। কলকাতার চীনা কমিটির সদস্য মাইকেল হো বলেন ‘ভারতে যা পাবেন, তা আপনারা চীনে পাবেন না। পুরনো দিনের মতো করেই আমরা এখানে ধর্ম চর্চা করি। সঙ্গে রয়েছে খানিকটা ভারতীয় ঐতিহ্যের মিশ্রণ।’

চীনা মন্দিরের একেবারে নিচের তলায় রয়েছে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। মাইকেল হো সেখানকার নিত্যদিনের পরিদর্শক। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করেন, কলকাতা থেকে প্রকাশিত চীনা ভাষার পত্রিকা পড়েন। এখনকার এই ছাপা পত্রিকা একসময় ছিল হস্তলিপির। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কলকাতায় লাখো চীনা অভিবাসীর বসবাস। এদেরই একজন মাইকেল হো। তার বাবা শেফের কাজ করার জন্য নৌকায় করে চীন থেকে ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ব্রেবোর্ন রোডের চায়নাটাউন পরিণত হয়েছে এশিয়ার বড় শহরগুলোর একটিতে। সেখানে বসবাসকারী অনেক বিদেশির মধ্যে চীনারাও রয়েছে। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের যুগে এর পরিচিতি ছিল ‘ধূসর শহর’ হিসেবে। তখন ইউরোপীয়দের বসবাসের এলাকা  হোয়াইট সিটি’ আর ভারতীয়দের বসবাসের এলাকা ‘ব্ল্যাক সিটি’র মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে ছিল শহরটি। পার্শ্ববর্তী এলাকাটি বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় একে পরিণত করা হয়েছিল ‘বহু-ধর্মীয়’ অঞ্চলে।  সেকারণে সেখানকার মানুষ একে ধর্মের পার্লামেন্ট বলে ডাকে।’ আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, সাংবাদিক ও ঐতিহ্যবিষয়ক লেখক দীপাঞ্জন ঘোষ।পুরনো চায়নাটাউনে রয়েছে জৈন ও হিন্দু মন্দির। রয়েছে মসজিদ, সুফি মাজার আর তিনটি ইহুদি সিনাগগ। দুইটি বৌদ্ধ মন্দির, একটি জরথ্রুস্ট অগ্নি মন্দির, একটি পর্তুগিজ ও একটি আর্মেনীয় গীর্জা, শিয়াদের জমায়েতের একটি এলাকা ও অনেকগুলো তাওবাদী মন্দিরও রয়েছে সেখানে। উপাসনালয়গুলোর অবস্থান পরস্পরের বেশ কাছাকাছি। একটি থেকে আরেকটি হাঁটা দূরত্বে। ‘কলকাতায় শিখ গুরুদুয়ারাও রয়েছে। ভারতের প্রথম হরেকৃষ্ণ মন্দির ও একটি গ্রিক গীর্জা রয়েছে সেখানে। শহরে কোন গ্রীকের বসবাস না থাকায় সেটিকে বর্তমানে ধর্মান্তরিত ভারতীয়রা ব্যবহার করে থাকে।’  আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন লেখক ও শিক্ষাবিদ জায়েল সিলিমান।কলকাতার ইহুদি কমিউনিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য জায়েল সিলিমান। তিনি বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে কলকাতা সবসময় বহু সংস্কৃতির পীঠস্থান। নানাভাবেই তার অভিপ্রকাশ ঘটে। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ঘনিষ্ঠ সখ্যতা, এলাকা আর স্কুল ভাগাভাগি করে নেওয়া, একে অপরের বাড়িতে খাবার ভাগাভাগি করাটা এখানে ঐতিহ্য। এই সম্মিলনের বোধ কলকাতাকে সব দিক থেকে সমৃদ্ধ করেছে।’বহিঃবিশ্ব থেকে ভারতে সর্বপ্রথম আবির্ভূত ধর্মীয় বিশ্বাসের অন্যতম ইহুদি মতবাদ। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ শতকে ভারতে এর আবির্ভাব। তবে কলকাতায় এর আগমন ঘটেছিল বেশ পরে। ১৭৯৮ সালে আলেপ্পান ইহুদি শালম আহারন ওবাইদা কোহেন শহরটিতে যাওয়ার পর ইহুদি ধর্মমতের আবির্ভাব হয় সেখানে। তিনি লক্ষ্ণৌর নবাবের দরবারের জহুরি নিয়োজিত হয়েছিলেন। পরে তার দেখাদেখি ইরাক ও সিরিয়া থেকেও ইহুদিরা কলকাতায় আসে। ‘কলকাতার ইহুদিরা জানতো কিভাবে মিথষ্ক্রিয়া করতে হয়ে, মানিয়ে নিতে হয়। তারা সবসময় যাতায়াতের মধ্যে থাকতো। তারা সাংহাই যেত, করাচি যেত, রেঙ্গুন যেত, বোম্বে যেত।’ বলেন সিলিমান।কলকাতায় পাঁচটি সিনাগগ নির্মিত হয়েছিল, যার তিনটি এখনও বর্তমান। সিনাগগগুলোর মধ্যে সবথেকে বড়টি মাঘেন ডেভিড। সেখানে রয়েছে বিবর্ণ কাঁচের জানালা ও ফুল খচিত স্তম্ভ। এগুলো প্যারিস থেকে কিনে আনা হয়েছিল। প্রজন্ম পরম্পরায় তিনটি সিনাগগের সবগুলোরই তত্ত্বাবধান করছেন মুসলিমরা। ভাইকে নিয়ে বেথ এল সিনাগগের দেখাশোনা করেন সিরাজ খান। তাদের বাড়ি পাশ্ববর্তী রাজ্য উড়িষ্যায়। সিনাগগের পেছনের দিকের কক্ষগুলোতে ঘুমান তারা। মাঝে মাঝে বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে আসেন। সিরাজ খান বলেন, ‘আমরা তিন প্রজন্ম ধরে এখানে আছি। আমাদের বাবা সারাজীবন এ সিনাগগে কাজ করে এ শীতেই অবসরে গেছেন।’ সিনাগগে প্রবেশের সময় সিরাজ খান তার মাথায় একটি সাদা রংয়ের কিপ্পা (ইহুদিদের মাথায় ব্যবহারের টুপি) পরে নেন। সিনাগগে আসা সব দর্শনার্থীদেরও তিনি এভাবেই দেখতে চান।ইন্ডিয়া’স জিউরির শিক্ষাবিদ নাভরাস জে. আফ্রিদি আল-জাজিরাকে জানান, ‘এখানে ইহুদি ও মুসলিমদের মধ্যকার সম্পর্ক সবসময়ই ভালো। মধ্যপ্রাচ্যের মতো এখানে কোনও রাজনৈতিক ইস্যু নেই। আর মনে রাখবেন, আরব বিশ্বের চেয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের সংখ্যা অনেক বেশি।’সিনাগগ থেকে সামান্য দূরত্বে নাখোদা মসজিদের অবস্থান। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকে এর সামনের রাস্তাটি। বিক্রেতারা সেখানে আতর, জায়নামাজ ও স্ন্যাকস বিক্রি করে থাকে। তাজমহলের কাছে মোঘল সম্রাট আকবরের সমাধির আদলে এটি তৈরি করা হয়েছে। গান্ধীর বড় ছেলে হলিলালের সভাপতিত্বে একসময় এখানে হিন্দু-মুসলিম যৌথ শান্তি বৈঠক হয়েছিল।কেবল প্রার্থনার নয়, এগুলো মানুষের অবকাশ যাপনেরও স্থান। নাখোদা মসজিদের মেঝেতে মানুষ অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে। পুরনো অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে অবস্থিত মিয়ানমার বৌদ্ধ মন্দিরের ভিক্ষু সেখানেও দর্শনার্থীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন। চায়নাটাউনের গী হিং মন্দিরে মানুষকে পুরনো খেলা মাঝং খেলতে দেখা যায়। খেলোয়াড়দের একজন আল জাজিরাকে বলেন, ‘আপনি একজনকে ধোঁকা দিতে পারেন, ঠিক আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সবচেয়ে ভালো উপায়ে কিভাবে ধোঁকা দেওয়া যায়।’কলকাতার সবচেয়ে পুরনো গির্জাটি নির্মিত হয়েছে পারস্যের আর্মেনীয়দের হাতে। রবিবার সকালে যখন গাড়িগুলো শান্ত থাকে তখন গির্জার বাইরে থেকে ‘আর্মেনিয়ান কলেজের’ গায়কদলের কণ্ঠ  ভেসে আসে। স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমান সমন্বয়ক আরমিন মাকারিয়ান আল-জাজিরাকে জানান, ‘বিশ্বের যেকোনও আর্মেনীয় শিশু এ স্কুলে আসতে পারে। শিক্ষা নিতে পারে বিনা খরচে। এখানে আর্মেনিয়া, ইরান ও ইরাকের শিক্ষার্থীরা আছে। এ বছর রাশিয়া থেকেও তিন বোন এসেছে পড়তে। গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর অনেকে বাড়িতে ফিরে যায়। আমার মতো কেউ কেউ আবার থেকে যায়। কলকাতার এই স্কুলটিই এখন আমার বাড়ি।’স্কুলের ৯০ শিক্ষার্থীসহ বর্তমানে কলকাতায় দেড়শো জনের মতো আর্মেনীয় আছে। একসময় যেখানে ৫ হাজার ইহুদির বসবাস ছিল। এখন রয়েছেন মাত্র ২০ জন। তবে এখানে কয়েকশো জরথ্রুস্ট পার্সিও রয়েছে। ১৭ শতকের শুরুতে তারা কলকাতায় এসেছিল। এখানকার চীনা সম্প্রদায় আকারে আরও বড়। প্রায় ৪ হাজার মানুষ। কিন্তু আগের হিসাবের চেয়ে এখন সে সংখ্যা আরও কম। আর্থিক কারণে অনেকে এলাকা ছেড়েছে। কলকাতায় কাজের সুযোগ খুব কম। সেকারণে মানুষকে শহর ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। সিলিমান দুই কাজই করেছিলেন। একবার শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, আবার ফিরে এসে স্থায়ী হয়েছেন। লেখক ও শিক্ষাবিদ জায়েল সিলিমান জানান, ‘আমি বিদেশে থাকি এবং আমার একটি আমেরিকান পাসপোর্ট আছে। এটি ভ্রমণের জন্য ভালো। তবে আমার বাড়ি এখানে। আমি ভারতকে ভালোবাসি।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ