ঢাকা, বুধবার 8 August 2018, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দীর্ঘ আঠারো বছরেও খুলনা মুক্তিযোদ্ধা কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়নি

খুলনা অফিস : মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। কমিটির সভাপতিসহ অধিকাংশ সদস্যই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত। এমনকি সভাপতি নিজেও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। অথচ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে করা একটি কলেজের শিক্ষকরা টিউশন নির্ভর। কেউ ইজিবাইক চালানোসহ দিনমজুরি করেও টিকে আছেন। কর্মচারী-আয়াদের কেউ কেউ গল্লামারী বাজারে শাক-পাতা বিক্রি করছেন। তার পরেও আশায় বুক বেঁধে আছেন খুলনার মুক্তিযোদ্ধা কলেজটি হয়ত একদিন এমপিওভুক্তি হবে। নিজেদের অর্থে কেনা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন কেএমপির হরিণটানা থানাধীন এবং বটিয়াঘাটা উপজেলার আওতাধীন এ কলেজটিতে শিক্ষার্থীও ভর্তি হতে চায়না শুধুমাত্র টিনসেডের একটি ভবন ছাড়া অন্য কিছু না থাকার কারণে। প্রতিষ্ঠার বিগত ১৮ বছর ধরেই কলেজটি একটি টিনসেডে পরিচালিত হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে ঘন বসতি হিসেবে গড়ে ওঠা ওই এলাকার একমাত্র এইচএসসি লেবেলের এই কলেজটির উন্নয়নে তাই সরকার প্রধানেরও সুদৃষ্টি কামনা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

মুক্তিযোদ্ধা কলেজ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয়  কমিটির তৎকালীন সভাপতি আবু মহম্মদ ফেরদৌসসহ উন্নয়ন কমিটির সদস্যবৃন্দ এবং কিছু মুক্তিযোদ্ধার চেষ্টায় এটি স্থাপিত হয়। কলেজ পরিচালনা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন আবু মহম্মদ ফেরদৌস। এছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বর্তমানে বাগেরহাট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ কামরুজ্জামান টুকু, উন্নয়ন কমিটির বর্তমান মহাসচিব শেখ আশরাফ উজ জামান, সাবেক সভাপতি এসএম দাউদ আলী, হায়দার গাজী সালাউদ্দিন রুনুসহ ১৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি দ্বারা কলেজটি পরিচালিত হয়। বর্তমানে কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খুলনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশীদ। 

বিগত ২০০৮ সাল থেকে তিনি কলেজের সভাপতি। কলেজের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নামের জন্যই তিনি কলেজটির উন্নয়নে আগ্রহী। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে এখন পর্যন্ত কিছু করা যাচ্ছে না। তাছাড়া স্থানীয় জনসাধারণও কলেজটির ব্যাপারে তেমন আগ্রহী নয়। তার পরেও তিনি চেষ্টা করছেন। এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করার পরই পরবর্তী চেষ্টা করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

কলেজের শিক্ষকরা শুরু থেকেই এখন পর্যন্ত বিনা বেতনেই ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই অবসর সময়ে টিউশনি অথবা অন্যান্য পেশার সাথে সম্পৃক্ত থেকে সংসার চালাচ্ছেন। এমনকি শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্যও শিক্ষকরা নিজেদের পকেট থেকে অর্থ খরচ করে শুধুমাত্র এমপিভুক্তির আশায় রয়েছেন। বর্তমানে কলেজে ১৭ জন শিক্ষক ও ছয়জন কর্মচারী রয়েছেন উল্লেখ করে কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ ফাতেমা খাতুন বলেন, চলতি বছর ফলাফল সন্তোষজনক না হলেও নানা প্রতিকূলতার মধ্যদিয়েও বিগত দিনে কোন কোন বছর শতভাগ পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয় এমন নজিরও রয়েছে। তিনি বলেন, কলেজের জন্য ১৬ শতক জমি শিক্ষকরা নিজেদের টাকায়ই কিনেছেন। এর বাইরেও কলেজের নামে রয়েছে দেড় একর জমি। কলেজের টিনসেড ভবন তৈরি, অন্যান্য উপকরণসহ আরও অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের আর্থিক অনুদান রয়েছে। বাইরের সহযোগিতার মধ্যে খুলনা জেলা পরিষদ থেকে বই কেনার জন্য এককালীন দুই লাখ টাকা এবং নগদ দু’লাখ টাকা দেয়া হয় বলেও তিনি জানান। এখন শুধুমাত্র একটি ভবন হলেই ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি আশানুরূপ হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এজন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে পত্র দেয়া হয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডি.ও লেটারসহ।

এ ব্যাপারে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর খুলনা জোনের সহকারী প্রকৌশলী শেখ আব্দুল মান্নান বলেন, কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন করাসহ যে কোন সহযোগিতার জন্য পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। সেটি না থাকলে পরবর্তী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ থাকলে সর্বোচ্চ দ্বিতল একটি ভবন করার সুযোগ রয়েছে।

কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির মহাসচিব শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ ও লালন করার উদ্দেশ্য নিয়েই ২০০১ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছরেও কলেজটি এমপিভুক্তি না হওয়া দু:খজনক। এজন্য অবশ্য তিনি একজন সাবেক অধ্যক্ষকে অনেকাংশে দায়ী করেন। ওই অধ্যক্ষের অদক্ষতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতিও এজন্য অনেকটা দায়ী বলেও তিনি মনে করেন।

অবশ্য এ প্রসঙ্গে অপর একটি সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কোন্দলের কারণেই কলেজটি বিগত কয়েক বছর ধরে কমিটি পাল্টা কমিটি দিয়ে চলছে। কমিটি নিয়ে বিরোধ উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বর্তমানে কলেজের সাবেক অধ্যক্ষসহ ১৬ জন শিক্ষক বাইরে অবস্থান করলেও তারাই এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করেছেন বলে একজন শিক্ষক জানিয়েছেন।

যদিও এ ব্যাপারে কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ ফাতেমা খাতুন বলেন, কলেজের আইএমএস ফরম, রিজার্ভ ও জেনারেল ফান্ড সবকিছুতেই অধ্যক্ষ হিসেবে তার নাম ও তার নিজস্ব মোবাইল নম্বর এবং সভাপতি হিসেবে শেখ হারুনুর রশীদের নাম রয়েছে। সুতরাং অন্য কারও আবেদন করার সুযোগই নেই। এ ধরনের অপপ্রচারের জন্য তিনি কাউকে বিভ্রান্ত না হওয়ারও আহ্বান জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ