ঢাকা, বুধবার 8 August 2018, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৫ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চালকদের শাস্তির আইন

শিক্ষার্থীদের দুর্বার আন্দোলনের মুখে সরকার অবশেষে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের লক্ষ্যে প্রণীত একটি আইন পাস করেছে। গত সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত সাপ্তাহিক বৈঠকে ‘সড়ক পরিবহণ আইনÑ২০১৮’ শিরোনামে পাস করা আইনটিতে বেপরোয়াভাবে বাস চালিয়ে মানুষকে নিহত বা আহত করলে সে অপরাধের জন্য চালককে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আইনে ‘সর্বোচ্চ’ শাস্তির তথা মৃত্যুদন্ডের বিধানও রয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে আবার ফাঁক রেখে বলা হয়েছে, যদি সে দুর্ঘটনা ‘ইচ্ছাকৃত’ হয়। অর্থাৎ যদি কোনো চালক ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ কাউকে হত্যা করে তাহলেই তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা যাবে। উল্লেখ্য, বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো এবং মানুষ হত্যার দায়ে বিভিন্ন শাস্তির বিধান সংবলিত একটি আইনের খসড়া গত বছরের মার্চ মাসে মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটিকে চূড়ান্ত করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে তৎপর হতে দেখা যায়নি। অবস্থায় পরিবর্তন ঘটেছে ২৯ জুলাই কুর্মিটোলায় দু’জন ছাত্রছাত্রীর মৃত্যুর প্রতিবাদে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দেয়ার পরই মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনের খসড়া পেশ করা হয়। সোমবারের বৈঠকে আইনটিকে চূড়ান্তও করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী আইন তৈরির কথা প্রচার করা হলেও বাস্তবে কোনো মানুষই সন্তুষ্ট হতে পারেননি। আইনটিকে সকলে বরং চালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত বলে অভিযোগ করেছেন। এর কারণ, শিক্ষার্থীদের উপস্থাপিত নয় দফার প্রথম দাবিতেই দুর্ঘটনার মাধ্যমে হত্যার জন্য চালকের মৃত্যুদন্ডের বিধান করার কথা বলা হয়েছিল। অন্যদিকে বিধান করা হয়েছে মাত্র পাঁচ বছরের কারাদন্ড দেয়ার। বলা হয়েছে, মৃত্যুদন্ডের বিধান প্রযোজ্য হবে শুধু সেই সব ক্ষেত্রে, যেগুলোতে চালক ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ কাউকে হত্যা করবে। প্রশ্ন উঠেছে, কোনো দুর্ঘটনা ‘ইচ্ছাকৃত’ কি না তা কিভাবে প্রমাণ করা যাবে? কারণ, আমাদের দেশে ওকালতির মারপ্যাঁচ বলে একটি বহুবার প্রমাণিত প্রবাদবাক্য রয়েছে। নিজের মক্কেল চালককে বাঁচানোর জন্য আইনজীবীরা অবশ্যই প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীসহ নানা ধরনের তথ্য-প্রমাণ চেয়ে বসবেন। একযোগে চলবে পুলিশকে ঘুষ দেয়াসহ টাকা ছড়ানোর এবং সাক্ষীদের ভয়-ভীতি দেখানোর তৎপরতা। এসব কারণে খুব কম ক্ষেত্রেই ‘ইচ্ছাকৃত’ হত্যার অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব হবে । সুতরাং ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ কাউকে হত্যা করলেও আইনের ফাঁক গলিয়ে পার পেয়ে যাবে ঘাতক চালকরা।
মৃত্যুদন্ডের বিধান না থাকার কারণে শুধু নয়, সার্বিক মূল্যায়নেও নতুন আইনটিকে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য মোটেও ফলপ্রসূ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে না। সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ এ কথাও বলেছেন, মাত্র পাঁচ বছরের কারাদন্ড সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় চালকরা বরং ক্রমাগত আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে। যার ফলে প্রতিরোধ দূরে থাকুক সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। সড়ক-মহাসড়কেও মানুষের হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকবে।
আমরাও সোমবার পাস করা আইনটিকে সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যু এবং সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট মনে করি না। তাছাড়া আইনের পাশাপাশি বেশি দরকার দুর্ঘটনার বিভিন্ন কারণকে নির্মূল করা। কারণ, পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনার জন্য দায়ী আসলে বাস চালকরা। তারা ট্রাফিক আইনকে তো তোয়াক্কা করেই না, মানুষের জীবনের ব্যাপারেও তাদের কোনো মায়া বা দায়দায়িত্ব থাকে না। এজন্যই যখন-তখন এবং যেখানে-সেখানে দুর্ঘটনা ঘটছে। মানুষ মারা যাচ্ছে এবং পঙ্গুত্ব বরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। বিষয়টিকে অবশ্যই হাল্কাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। কারণ, দেশে গাড়ির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। সুতরাং দুর্ঘটনা কমানোর জন্য বেশি জোর দিতে হবে যানবাহন ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে। এর শুরু হতে হবে বিআরটিএ থেকে, যেখানে ঘুষের বিনিময়ে ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল করার অনুমতি এবং গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে আসে চালকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি। গাড়ি শুধু চালাতে পারলে চলবে না, অতিরিক্ত গতিতে চালানো, ওভারটেকিং করা, পেছনের গাড়িকে সাইড না দেয়া, ট্রাফিক সিগনাল না মানা, চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা এবং ধারণক্ষমতার চাইতে বেশি যাত্রী ও মালামাল ওঠানোর মতো বিভিন্ন কারণ রয়েছে, যেগুলোর জন্য দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এসব বিষয়ে চালকদের বোঝানোর পাশাপাশি যথেষ্ট সময় নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া দরকার। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে তো বটেই এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিসি সব মিলিয়ে মাত্র ১০-১২ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দিয়েই লাইসেন্সের জন্য চালকদের বিআরটিএর কাছে পাঠাচ্ছে। বিআরটিএ-ও যাকে-তাকে লাইসেন্স দিচ্ছে। লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে দালালের মাধ্যমে এবং ঘুষের বিনিময়েও। এভাবে কোনোরকমে গাড়ি চালানো শিখে যারা দেশের সড়কপথে নেমে আসছে তাদের কারণেই ঘটছে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা।
আমরা মনে করি, এমন অবস্থা কোনোক্রমেই চলতে পারে না। চালকদের বোঝানো দরকার, শুধু চালাতে পারাটাই যোগ্যতা প্রমাণ করে না। বড়কথা হচ্ছে আইন মেনে এবং কারো যেন কোনো রকম ক্ষতি না হয় সেসব দিকে লক্ষ্য রেখে অতি সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালানো। ‘সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি’ কথাটা প্রায় সব গাড়িতেই কেন লেখা থাকে তার কারণও চালকদের বুঝিয়ে দেয়া দরকার। সামনের গাড়িকে ওভারটেক করার ব্যাপারেও তাদের সতর্ক করতে হবে। চালকদের একথাও বোঝাতে হবে যে, তার নিজের স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের মতো অন্যদের জীবনেরও সমান মূল্য রয়েছে। তাকে মানুষ হত্যার লাইসেন্স দেয়া হয়নি।
ট্রেড ইউনিয়নের নামে চালকদের যারা প্রশ্রয় দিয়ে চলেছেন তাদেরও উচিত মানুষের জীবনের মূল্য নিয়ে চিন্তা করা এবং জীবন বাঁচানোর জন্য সচেষ্ট হওয়া। প্রসঙ্গক্রমে পুলিশের দায়িত্ব সম্পর্কেও বলা দরকার। ঘুষ খেয়ে ছেড়ে দেয়া ধরনের পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ স্মরণ করিয়ে দেয়ার পরিবর্তে বলতে হয়, কর্তব্যের প্রতি পুলিশ যদি একটু আন্তরিক হয় তাহলেই দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সেটাই এখন সময়ের দাবি। আমরা আশা করতে চাই, কেবলই আইনের দিকে না তাকিয়ে থেকে সংশ্লিষ্ট সকলেই নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে সততার সঙ্গে তৎপর হয়ে উঠবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ