ঢাকা, বৃহস্পতিবার 9 August 2018, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কারাগারে ছয় মাস পূর্ণ করলেন খালেদা জিয়া

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: কথিত দুর্নীতি মামলায় কারাগারে ছয় মাস পূর্ণ করলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সাজা হওয়ায় তিনি কারাগারে রয়েছেন। সরকার খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কঠোর। তাইতো মূল মামলায় জামিন হলেও অন্যান্য হাস্যকর মামলায় তাকে জামিন দেয়া হচ্ছে না। কারাগারে বেগম জিয়া প্রায়শ অসুস্থ থাকেন। তার ব্যক্তিগত ডাক্তার এমনকি সরকার গঠিত মেডিকেল টিম বেগম জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রিপোর্ট দিলেও সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না। বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার দাবি জানানো হচ্ছে। কিন্তু সরকার তাদের অবস্থানে অনঢ়। সরকারি হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসা করানো যাবে না। অথচ ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ অনেক মন্ত্রীই এক এগারোর অবৈধ সরকারের সময়ে কারাগারে থেকেও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। মাঝেমাঝে পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের কারাগারে সাক্ষাতের অনুমতি দেয়া হয়। তার মুক্তির দাবিতে বিএনপি, ২০ দলীয় জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ করে খালেদা জিযাকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না। রাজপথে দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমেই কেবল তাকে মুক্ত করা যাবে।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিশেষ নিম্ন আদালতের রায়ে পাঁচ বছর কারাদ-ের মুখোমুখি হন খালেদা জিয়া। গত মে মাসে আপিল বিভাগের আদেশে তার জামিন হলেও  ২০১৪ ও ২০১৫ সালে দায়ের করা অন্যান্য মামলায় তিনি গ্রেফতার আছেন। বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের দায়িত্বশীলরা বলছেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া তাদের দল ও জোট অনেকটাই অভিভাবকহীন। প্রিয় মানুষকে দূরে রেখে তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। তবে নেতাকর্মীরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আগামী দিনে সংঘবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবেন এবং নির্বাচনে অংশ নেবেন। তারা বলছেন, বেগম জিয়াকে ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হবে না এমনকি হতেও দেয়া হবে না।
বিএনপি চেয়ারপার্সনের অনুপস্থিতিতে তার গুলশান-২ এর রাজনৈতিক কার্যালয়ের কর্মকা- ঠিকঠাক মতোই চলছে। নিচ তলায় নিয়মিত অফিস করছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কনফারেন্স রুমেও নিয়মিত  বৈঠক, সাংবাদিক সম্মেলন হচ্ছে।  ২০ দলীয় জোটের সিনিয়র নেতাদের বৈঠক সেখানেই হচ্ছে। এমনকি দলীয় কাজে কার্যালয়ে আসা নেতাকর্মীরা এই কক্ষে বসেই বিশ্রাম নেন বা সাক্ষাৎদাতার জন্য অপেক্ষা করেন। দ্বিতীয় তলায়  বৈঠককক্ষে সিনিয়র নেতাদের মিটিংগুলো নিয়মিত হচ্ছে। যদিও সিঁড়ি বেয়ে উঠে বামপাশের কক্ষটি তালাবদ্ধ রয়েছে। এই কক্ষেই অফিস করতেন খালেদা জিয়া।
 চেয়ারপার্সনের মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, ম্যাডাম গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে এই কক্ষটি খোলা হয়নি। দলীয় প্রধানের অনুপস্থিতিতে কার্যালয়ের আগের সেই উচ্ছ্বাস নেই। যদিও শায়রুল কবির খানের আশাবাদ ‘দ্রুতই খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন। আবারও রাজনৈতিকভাবে ব্যস্ত হবেন তিনি। কার্যালয় হবে মুখরিত।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, প্রিয় ও নির্ভরযোগ্য মানুষটিকে ছাড়া যেভাবে চলে, বিএনপিও তেমন আছে। তিনি আমাদের পরিবারের প্রধান। এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। তার সমান রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বিরল। যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও নেতাকর্মীদের স্নেহ, ভালোবাসা ও সবকিছু মিলিয়ে তিনি অবিস্মরণীয় মানুষ। তিনি বলেন, তিয়াত্তর বছর বয়স্ক একজন মানুষ, যিনি অসুস্থ। তাকে মিথ্যে অভিযোগে দীর্ঘদিন কারাগারে রেখে সরকারের কী লাভ হয়েছে, জানি না। যে মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, সে মামলায় জামিন পেয়েও কারাভোগ করছেন। আমি তো মনে করি, এতে সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি।
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতির প্রভাব পড়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটেও। নানা সময়ে নানা ধরনের শঙ্কা, ভাঙনের সংকট ঘুরে বেড়িয়েছে জোটের এ দল থেকে ও দলে। এরপরও ঐক্যে ফাটল ধরেনি। যদিও জোটের ব্যানারে কোনও কর্মসূচিই দিতে পারেনি বিএনপি-জোট। কোনও কোনও শরিক দলের নেতার অভিযোগ বিএনপিই পরিকল্পিতভাবে জোটের ব্যানারে কর্মসূচি দেয়নি। জোটের নেতারা সেসব কর্মসূচিতে শরিক হলেও প্রশ্ন ওঠছে, আগামী ঈদুল আজহার আগে জোটনেত্রীর মুক্তি হবে তো, নাকি ঈদুল ফিতরের মতো পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারেই থাকতে হচ্ছে তাকে? তবে কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তিনি তো (খালেদা জিয়া) জেলখানায় বহাল তবিয়তে আছেন। আয়েশ করে পায়েস খান।’ 
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, খালেদা জিয়ার বিকল্প কেউ নেই। যখন বৈঠকে বসি, প্রত্যেকটা মুহূর্তে ভাবি, যে তার মতো কেউ নেই। একটি ঠুনকো মামলা দিয়ে তাকে রাজনীতি থেকে বাইরে রাখা হচ্ছে। আর কর্মসূচি চলছে। সময় মতো তিনি বেরোবেন, তাকে নিয়েই আমরা নির্বাচনে যাবো।
বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে আরও গতি আনা প্রয়োজন। সর্বশেষ ৩ ও ৪ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত তৃণমূলের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনায় ছিল। আগামীতে আরও কর্যকর কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তাবের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর বিএনপিকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একইসঙ্গে খালেদা জিয়ার মুক্তির বাইরে অন্য কোনও উদ্দেশ্য না রাখার পরামর্শ আসে। যদিও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই আলোচনা শুরু হয়েছে, যে খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে সরকার শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করার উদ্যোগ নিলে সে নির্বাচনে বিএনপিও অংশ নেবে। এক্ষেত্রে লন্ডনে থাকা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশের অপেক্ষা করছেন দলীয় নীতিনির্ধারকরা।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা তো আশা করি, তিনি ঈদের আগে মুক্তি পাবেন এবং তার নেতৃত্বেই আগামী দিনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সংগ্রাম করবে ২০ দলীয় জোট।
ছাত্রদলের সহসভাপতি এজমল হোসেন পাইলট মনে করেন, চেয়ারপার্সনের মুক্তি আন্দোলন আরও বেগবান করতে হবে। এক্ষেত্রে ছাত্রদলকে আরও সক্রিয় হতে হবে। বিএনপির নেতৃত্বকে আরও সুনির্দিষ্ট হতে হবে।’ তার ভাষ্য, ‘বেগম জিয়াকে ছাড়া আমাদের দেশে কোনও নির্বাচন হবে না। মিথ্যে মামলায় তাকে গ্রেফতার করে জনগণের মুক্তির লক্ষ্য থেকে তাকে বিচ্যুৎ করা যাবে না। ছাত্রদলের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ক সহসম্পাদক ডালিয়া রহমান বলেন, জনগণের নেত্রীকে জনগণই মুক্ত করবেন। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা প্রস্তুত আছে তার মুক্তি আন্দোলন তরান্বিত করতে।
ঢাবির সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের পর্যবেক্ষণ, খালেদা জিয়া গ্রেফতার হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির নতুন ধারা তৈরি হয়েছে। জাতি আগামীতে এর দীক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।
খালেদা জিয়া এ নিয়ে পাঁচবার কারাবন্দি হয়েছেন। ১৯৮২ সালের ৩ জানয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেবার পর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর তিনি গ্রেফতার হন। এরপর ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর গ্রেফতার হন। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর ৩ তারিখে দুর্নীতির অভিযোগে ছেলেসহ গ্রেফতার হন। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি হাইকোর্টের নির্দেশে মুক্তিলাভ করেন। সর্বশেষ গত ৮ ফেব্রুয়ারি জেলে গেছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য মনে করছেন, কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে খালেদা জিয়ার মুক্তি অনিশ্চিত। মামলাগুলো ‘রাজনৈতিকভাবে’ হ্যান্ডেল হওয়ার অভিযোগ এনে দলটির  কর্মসূচি দিতে হবে। এক্ষেত্রে সাফল্য না এলে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিতে হতে পারে বিএনপিকে। যদিও বিষয়টি এখনই সামনে আনতে চাইছেন না নীতিনির্ধারকরা। দুজন সদস্যের আগাম ধারণা, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই নির্বাচনে যেতে হবে বিএনপিকে, এর বিকল্প নেই।
এদিকে, খালেদা জিয়ার মামলার আইনজীবীদের নিয়েও প্রশ্ন আছে দলে। অনেকে বলছেন, আইনজীবীদের ব্যর্থতার কারণেই দলীয় প্রধানের মুক্তি বিলম্বিত হচ্ছে। দেশের আইনজীবীদের পাশাপাশি তারেক রহমানের পরামর্শে ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইলকে নিয়োগ করা হলেও ফলাফল শূন্য। ভারতে আসার কথা থাকলেও দেশটিতে পা রাখা মাত্র ফিরিয়ে দেওয়া হয় কার্লাইলকে। দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচার বিভাগের ওপর সরকারের রাজনৈতিক প্রভাব আছে। সে কারণে তার মুক্তির বিষয়টি দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে গুলশান-২ এ ৭৯ নাম্বার রোডে বাসভবন ‘ফিরোজা’ এখন নীরব ও সুনসান। তার নিরাপত্তারক্ষী সিএসএফ এর কর্মীরা ছাড়া বাড়িটিতে আর কারও আনাগোনা নেই। নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনও উপস্থিতিও। নেতাকর্মীসহ দেশবাসীর আশা, খুব শীঘ্রই খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ