ঢাকা, বৃহস্পতিবার 9 August 2018, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তি দাবি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের

স্টাফ রিপোর্টার : নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকালে আটক শিক্ষার্থীদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা। এর উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী জানালেন, কাউকে মুক্তি দেওয়ার অধিকার তাদের নেই।
গতকাল বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সাথে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃপক্ষের মতবিনিময় সভায় তারা এ দাবি জানান। প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, আমরা কাউকে মুক্তি দেওয়ার অধিকার রাখি না। ছাত্ররা যদি প্রকৃত অর্থেই অপরাধ করেন, আইন লঙ্ঘন করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে কেউ যদি নিরপরাধ হয়, তা প্রমাণিত হলে সে মুক্তি পাবে।
এই মতবিনিময় সভায় দেশের ১০৩ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য এবং কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের অনুপস্থিতিতে প্রো-ভিসি, রেজিস্ট্রাররা উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ওয়াল্ড ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর আবদুল মান্নান চৌধুরী, নর্দান ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন, নর্থ সাউথ ইউনিভাসির্টির ভিসি প্রফেসর আতিকুল ইসলাম, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আবদুল মান্নান, সোনারগাও বিশ^বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ভিসি আল আমিন মোল্লা, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ইয়াসমিন আরা লেখা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হাসান, সেক্রেটারি বেনজির আহমদ, টাইম্স ইউনিভার্সিটি, ফরিদপুর এর চেয়ারম্যান শরীফ এম আফজাল প্রমুখ।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, যখন স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা  তাদের ন্যায়্য দাবী পূরণ হওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফিরে গেছে, তখন কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এব্যাপরে সচেতন ছিলেন না। এসব শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে আমরা উদ্বিগ্ন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের ৯টি দাবীই মেনে নিয়েছেন। কিছু দাবী ইতোমধ্যে পূরণ হয়েছে। কিছু বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে আধুনিক যুগের উপযোগী দক্ষতা দিতে চাই। তাদেরকে ভাল শিক্ষা দিয়ে ভাল মানুষ তৈরি করতে চাই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকারীদের উদ্যোক্তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে ব্যবসার কোন সুযোগ নেই। দেশের কল্যাণে জাতি গঠনে তারা কাজ করছেন। আপনারা উচ্চ শিক্ষার সুযোগ করে দিচ্ছেন। সরকার এজন্যই এতগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। কিন্ত সবারই জবাবদিহিতা রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ছাত্রদের বুঝিয়ে ভাল পথে রাখবার দায়িত্ব শিক্ষকদের। শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে রাখবার দায়িত্ব তারা পালন করবেন। কারো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহৃত না হওয়ার জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আরো সচেতন হবে। যেকোন ধরনের নেতিবাচক কর্মকান্ডে শিক্ষার্থীরা যাতে সম্পৃক্ত হতে না পারে, সে ব্যাপারে শিক্ষকদের ভূমিকা রাখতে হবে।  
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আন্দোলন যৌক্তিক ছিল। আমরা তাদের এ দাবির সমর্থন করি। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের যেসব সমস্যা তা তারা চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে। যৌক্তিক বলেই প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি মেনে নিয়েছেন। বর্তমানে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নতুন সড়ক আইন করা হয়েছে। তাই আর ছাত্রদের রাস্তায় থাকার কোনও অবকাশ নেই। তিনি বলেন, আমরা স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রধানদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেছি। এরপর আর তারা রাস্তায় না নামলেও এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামছেন। তৃতীয় পক্ষ উসকে দিয়েছে, সুবিধা নিতে চাইছে। তাই আন্দোলনের ভয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখবেন না। এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসেন বলেন, সঠিক তথ্যের মাধ্যমে প্রতিবাদ করা দরকার, মিথ্যা গুজবে বিচার বিশ্লেষণ না করে প্রতিবাদ কারা উচিৎ নয়। কোনও শিক্ষার্থী যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটিকে গুরুত্ব দিতে আমি পুলিশ প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। এ বিষয়ে আমরাও সজাগ রয়েছি।
আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবি জানিয়ে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির ভিসি আব্দুল মান্নান চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীরা যাই করেছে তাদের সাধারণ ক্ষমা করা উচিত। কারণ, পরিস্থিতি কোনও না কোনও কারণেই তো সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া নতুন করে কোনও ইস্যু তৈরি করে, সেই সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না। এ ইস্যুতে পুলিশে আটক সব শিক্ষার্থীর মুক্তির ব্যবস্থা করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানান তিনি।
প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আব্দুল হান্নান চৌধুরী বলেন, আমরা জানতে পেরেছি আগের কোনও অজ্ঞাত মামলায় আটক শিক্ষার্থীদের ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই, যা হবার হয়েছে, যেহেতু এখন পরিস্থিতি শান্ত, ফলে শিক্ষার্থীদের নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হোক।
নর্দান ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের প্রতিবাদকে অন্যায় বলবো না। তারা যে জন্য আন্দোলন করেছে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা বেপরোয়া গাড়ী চালায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, এটা শোকের মাস। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সামনে রেখে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।
উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ইয়াসমিন আরা লেখা বলেন, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা না বুঝেই আন্দোলনে যুক্ত হয়। শিক্ষকরা যদি শিক্ষার্থীদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় এবং তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন তবে শিক্ষার্থীরা আর আন্দোলনে যুক্ত হয় না। তাই তিনি শিক্ষকদের তৎপর থাকার পরার্মশ দেন।
টাইম্স ইউনিভার্সিটি, ফরিদপুর এর চেয়ারম্যান শরীফ এম আফজাল বলেন, আমাদের বিশ^বিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে আমাদের বিশ^বিদ্যালয় পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাদের কমিটম্যান্ট রয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হাসান বলেন, ৬ আগস্ট বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটেছে তা অনেক জটিল ছিল, তার মাধ্যমে আমরা শিখেছি। বিভিন্নভাবে আমরা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমি সার্বক্ষণিক খোঁজ নিয়েছি, পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছি, ছাত্রদের শান্ত করার চেষ্টা করেছি। সম্মলিতভাবে কাজ করলে সুবিধা পাওয়া যায়। তাই যেকোনও সমস্যাতে অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দিয়েছি।
উল্লেখ্য, গত ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে এমইএস বাসস্ট্যান্ডে জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের চালকের রেষারেষিতে এক বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। আহত হয় আরও ১০-১৫ শিক্ষার্থী। ঘটনার দিনই নিহত দিয়া খানম মিমের বাবা জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। মামলা নং ৩৩ (৭) ১৮। এই দুর্ঘটনার দিন থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করে কলেজটির শিক্ষার্থীরা। এরপর ৯ দফা দাবিতে টানা নয়দিন রাজপথে আন্দোলনে ছিল দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী।
গত সোমবার আফতাব নগরে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বহিরাগতদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়টি দুদিন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অপরদিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ও এক দিনের জন্য বন্ধ দেয় কর্তৃপক্ষ। গত শনি ও রোববার তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা চালানো হয়। এই আন্দোলনের সংবাদ ও ছবি সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন সাংবাদিকরা। ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতায় ১৬টি থানায় মোট ২৯টি মামলা করা হয়েছে।
পুলিশের ওপর হামলা, কাজে বাধা দেয়া ও ভাঙচুরের পৃথক দুই মামলায় গত মঙ্গলবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেফতার ২২ ছাত্রের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে দুইদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ