ঢাকা, বৃহস্পতিবার 9 August 2018, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নড়িয়ায় পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে নিখোঁজদের সন্ধান মেলেনি ॥ স্বজনদের আহাজারি

নিখোঁজ নাসির হাওলাদারের স্ত্রী শিরিন বেগম তার স্বামীর কথা জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পরেন -শরীয়তপুর

শরীয়তপুর সংবাদদাতা : শরীয়তপুরের নড়িয়ায় ভয়াবহ পদ্মার ভাঙনে নিখোঁজদের গত দুই দিনেও কোনো সন্ধান মিলেনি ৯ জনের। নিখোঁজদের স্বজনরা পদ্মার বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করছেন। প্রচণ্ড স্রোতের কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল। তবে নৌকা ও ট্রলার যোগে সন্ধান কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নিখোঁজদের স্বজনেরা পদ্মাপাড়ে নিখোঁজদের পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। নিখোঁজ স্বজনদের আহাজারিতে পদ্মার পাড়ের বাতাশ ভারী হয়ে উঠছে। ঘটনার পর মঙ্গলবার বিকাল থেকেই হাজার হাজার উৎসুক জনতা নড়িয়ার সাধুর বাজার এলাকায় ভীর জমাচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামিম প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিখোঁজ স্বজনদের ১০ হাজার করে টাকা প্রদান করেছেন। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর বরাদ দিয়ে বলেন, শরীয়তপুরের জাজিরা-নড়িয়া এলাকার পদ্মার ভাঙনরোধে যা করণীয় তাই করবেন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা পদ্মার ভাঙনরোধে গত ২ জানুয়ারি পদ্মার দক্ষিণ তীর রক্ষা বাধ নির্মাণের জন্য ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে তা একনেকের বৈঠকে পাস করেন। এ প্রকল্পের কাজ আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু হবে বলে পদ্মার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্বাস দেন তিনি। এ ছাড়াও এনামুল হক শামিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং পদ্মার ভাঙনে হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নেন।
 এ সময় উপস্থিত ছিলেন শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের, নড়িয়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা ইয়াসমিন, নড়িয়া পৌর মেয়র শহিদুল ইসলাম বাবু, জেলা পরিষদের সদস্য এনায়েত উল্যাহ মুন্সী ও আলমগীর হোসেন, উপজেলা মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান নাজমা মোস্তফা, কেদারপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হাফেজ সানাউল্যাহ, সাবেক চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন দেওয়ান, সখিপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হুমায়ুন কবির মোল্যা, সাধারণ সম্পাদক মানিক সরকার, কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক জহির সিকদার প্রমুখ।
সরেজমিন জানা যায়, শরীয়তপুরের নড়িয়ায় সাধুর বাজার লঞ্চঘাট এলাকায় মঙ্গলবার দুপুর ২ টার দিকে কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করে কয়েকটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানসহ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা অন্তত ৩৫ থেকে ৪০জন পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। এদের মধ্যে তাৎক্ষণিক স্থানীয় লোকজন গত মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ২০জনকে উদ্ধার করে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এ ঘটনায় গতকাল বুধবার পর্যন্ত ৯ জন নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছেন নড়িয়া থানার ওসি মোঃ আসলাম উদ্দিন। পদ্মার ভাঙনে নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন নড়িয়ার চাকধ গ্রামের নাসির উদ্দিন হাওলাদার, কেদারপুর গ্রামের নাসির উদ্দিন বয়াতী, মোক্তারের চর এলাকার মোশারফ চোকদার, আব্দুর রশিদ হাওলাদার, বরিশাল জেলার বাসিন্দা আইটেল মোবাইল কোম্পানীর এরিয়া ম্যানেজার আল আমিন, কেদারপুর গ্রামের শাহজাহান বেপারী, মজিবুর রহমান ছৈয়াল, নড়িয়া পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের জামাল ছৈয়াল ও স্থানীয় চা দোকান্দার গুবি দাস। ঘটনার পর থেকে এলাকার বাড়িঘর ও লোকজনকে নিরাপদ স্থানে এবং নদীর তীরবর্তী স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পদ্মা নদীর পাড় থেকে ৩শ গজের মধ্যে জন সাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে লাল পতাকা টানিয়ে দেয়া হয়েছে। এদিকে পদ্মার ভাঙনের তীব্রতা আরো বেড়েই চলছে। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছে পদ্মা পাড়ের মানুষ। তারা ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে দিনরাত পরিশ্রম করছে। সরকারের কাছে দ্রুত ভাঙন রোধের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।
নিখোঁজ নাসির হাওলাদারের স্ত্রী সিরিন বেগম বলেন, আমার স্বামী কাঠ মিস্ত্রির কাজ করে। ঘটনার সময় ওই খানে কাজ করতে ছিল। আমাদের ধারণা আমার স্বামী আর বেচে নেই। ঘটনার পর থেকে আমরা নদীর বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করে কোনো সন্ধান পাইনি। আমরা লাশটা পেলেও শেষ দেখাটা দেখতে পেতাম। আমার ৫ বছরের এক মাত্র মেয়ে তানহা তার বাবাকে শেষ বারের মত দেখতে পেতো।
নিখোঁজ শাহজাহান বেপারীর মেয়ে শাহনাজ বেগম বলেন, মঙ্গলবার দুপুরে হঠাৎ করেই পদ্মার ভাঙন বেড়ে যায়। এ সময় সাধুরবাজার লঞ্চঘাট বিলীন হয়ে যায়। আমার বাবা একজন রিক্সা চালক সে দোকানপাট সরানোর কাজে সহায়তা করতে এসে নিখোঁজ হয়ে যায়। তার কোনো সন্ধান পাইনি। আমার একটি বোন ও একটি ভাই প্রতিবন্ধী। আমরা কি করে ওদের নিয়ে বাচবো।
পিরোজপুরের রুহুল আমিন বলেন, আমার ভাই শেখ আল আমিন হাসান আইটিএল মোবাইল কোম্পানীর লেস এক্সিকিউটিভ। সে এ এলাকায় মার্কেট ভিজিটে এসে ভাঙন দেখতে যায়। এ সময় হঠাৎ মাটি দেবে গেলে পানির স্রোতে হারিয়ে যায়। তার কোনো সন্ধান পাইনি।
ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক নিয়াজ আহমেদ বলেন, লঞ্চঘাট এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার পর থেকেই উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। নদীতে প্রচণ্ড স্রোতের কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। তবে নৌযান নিয়ে আমাদের ফায়ার সার্ভিসের ২টি ডুবুরীদল নদীর বিভিন্নস্থানে তল্লাসী চালিয়ে যাচ্ছে।
নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ আসলাম উদ্দিন বলেন, ঘটনার পর থেকেই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ আইনসৃংখলা রক্ষার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াছমিন বলেন, ভাঙনে মাটি ধ্বসের ঘটনায় ৯ ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছে। তাদের সন্ধানের জন্য ফায়ার সার্ভিসের লোকজন কাজ করছে। আহত ২০জনকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ৩শ গজের মধ্যে সাধারণ লোকজনের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পদ্মার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ৬শ জনের মধ্যে ৫কেজি চাল, ১কেজি করে ডাল, তেল, চিড়া, মুড়ি ও চিনি বিতরণের জন্য এলাকার জনপ্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ