ঢাকা, বৃহস্পতিবার 9 August 2018, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাশরাফির পরবর্তী প্রজন্ম কতটা প্রস্তুত

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : ২০০১ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর সবসময়ই নিজের সেরাটা মেলে দলে টিকতে চেয়েছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। ২০০৯ সালে প্রথমবার জাতীয় দলের অধিনায়ক হওয়ার পর ইনজুরির কারণে নেতৃত্বটা সেভাবে উপভোগ করতে পারেননি নড়াইল এক্সপ্রেস। ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার যখন জাতীয় দলের কাপ্তানী হাতে পান তখন থেকেই নতুন এক মাশরাফিকে দেখতে পান ক্রিকেটবোদ্ধারা। মাশরাফির দলে থাকা মানেই আলাদারকম থাকবে দল। খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিয়ে অন্তহীন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছেন ম্যাশ। এখন শুধমাত্র ওয়ানডে খেললেও মাশরাফি যেন অনন্য এক নামে পরিণত হয়েছেন। যার প্রমাণ আরো একবার পেল বাংলাদেশ। কিন্তু এই মাশরাফিকে কি খুব বেশিদিন পাওয়া যাবে? তার পরবর্তী প্রজন্ম কতটুকু তৈরি তার জায়গা নিতে? এসব প্রশ্ন এখন ক্রিকেটপাড়ায় ঘুড়পাক খাচ্ছে। মাশরাফি বিন মুর্তজার হাত ধরে আরেকটি সিরিজ জিতল বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ বাংলাদেশ জিতে নিল ২-১ ব্যবধানে। সিরিজের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ জয় পেয়েছিল ৪৮ রানে। দ্বিতীয় ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জয় পায় ৩ রানে। সিরিজের শেষ ম্যাচে ১৮ রানে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। সিরিজ জেতা ম্যাচ শেষে টাইগার দলপতি মাশরাফি বিন মুর্তজা বলেন, ‘ক্রিকেট এখন মাঠের মতোই মাঠের বাইরেও খেলা। এটি একটি মানসিক খেলা। আমরা এর আগের ম্যাচে হেরেছিলাম। কিন্তু আমি মনে করি, শেষদিন ছেলেরা পেশাগত খেলাটা খেলেছে। ছেলেরা ফর্মে আছে। তামিম-সাকিব-মুশফিক অসাধারণ খেলেছে। এখন জুনিয়রদের ভালো খেলতে হবে ও দায়িত্ব নিতে হবে। টোয়েন্টি-২০ সিরিজে দল ভাল খেলবে বলেই আমার প্রত্যাশা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলের বিপক্ষে খেলাটা সহজ হবে না।’ ওয়ানডে সিরিজে সিনিয়র ক্রিকেটাররা অসাধারণ খেলেছে। তামিম ইকবাল দুইটি সেঞ্চুরি ও একটি হাফ সেঞ্চুরি করেছেন। মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ একটি হাফ সেঞ্চুরি করেছেন। মুশফিকুর রহিম একটি হাফ সেঞ্চুরি করেছেন। তিন ম্যাচে সাকিব আল হাসানের রান যথাক্রমে ৯৭, ৫৬ ও ৩৭। তিন ম্যাচে মাশরাফি বিন মুর্তজা সাতটি উইকেট নিয়েছেন। সিরিজের শেষ ম্যাচে ২৫ বলে ৩৬ রান করেন টাইগার অধিনায়ক। সেই অপূর্ণতা ঘোচালেন এই মাশরাফি। ২০০৯ সালে অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর মাশরাফি বিন মুর্তজার প্রথম সফর ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজে। সেবার দল সিরিজ জিতলেও মাশরাফি মাঠে থাকতে পারেননি হঠাৎ পাওয়া চোটে। কিন্তু এবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েই দলকে ওয়ানডে সিরিজ জিতিয়েছেন মাশরাফি। নয় বছর আগের সেই অতৃপ্তিটিই কি ঘোচালেন বাংলাদেশের ওয়ানডে দলপতি! তাঁর হাঁটুর চোট নিয়েই আস্ত একখানা বই লিখে ফেলা যায়! কিন্তু আলাদা করে বললে হাঁটুর সেই চোটটা মাশরাফি বিন মুর্তজাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। সেই চোটে যে তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারেরই অকালমৃত্যু ঘটেছে! এতক্ষণে নিশ্চয়ই পরিষ্কার, মাশরাফির কোন চোটের কথা বলা হচ্ছে। ২০০৯ সাল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর। বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হিসেবে সেটি ছিল তাঁর প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট। প্রথম টেস্টের তৃতীয় দিনে হাঁটুতে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লেন মাশরাফি। এরপর ইতিহাস সৃষ্টিকারী সিরিজটা হয়ে থাকল সাকিবময়। সফরের বাকিটা পথ সাকিবের নেতৃত্বে টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ধবলধোলাই করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মাশরাফি হয়ে রইলেন এক আক্ষেপের নাম। সেই চোটের পর মাশরাফির আর টেস্ট খেলা হয়নি। যে ম্যাচে তিনি চোট পেয়েছিলেন, সেটিকে বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ে রূপান্তরিত করেছিলেন সাকিব। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে তাই একটা হৃদয়ঘটিত লেনাদেনা ছিল মাশরাফির। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম সফরে ভাগ্য তাঁকে ছিটকে ফেলেছিল চোটের অজুহাতে। ৯ বছর পর সেই মাশরাফিই ওয়েস্ট ইন্ডিজে ওয়ানডে সিরিজ জিতলেন অধিনায়ক হিসেবে! দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তো ছিলই। সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে নিজের একটি ভাবনা দিয়েই ঘুরিয়ে দিয়েছেন ম্যাচের দৃশ্যপট। তাতে মাশরাফির টেস্ট খেলতে না পারার আক্ষেপ অবশ্য এতটুকু ঘুচবে না। কিন্তু একটা অপূর্ণতা তো কাটল। নেতৃত্বভার পেলেও প্রথম দফায় তিনি নিজে মাঠে থেকে দলের জয়ে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি। শুধু প্রথম টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে ৬.৩ ওভারের সেই স্পেলটুকু বাদে। কিন্তু এবার নেতৃত্বের সঙ্গে ব্যাটে-বলে সব জায়গাতেই ভূমিকা রেখে দলকে ওয়ানডে সিরিজ জেতালেন মাশরাফি। ওই ওয়ানডে সিরিজে মাশরাফির উইকেটসংখ্যাই কিন্তু সর্বোচ্চ (৩ ম্যাচে ৭ উইকেট)। সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে তাঁর ২৫ বলে ৩৬ রানের ‘ক্যামিও’ ইনিংসটাও ভুলে গেলে চলবে না। ২০০৭ বিশ্বকাপ খেলতে ওয়েস্ট ইন্ডিজে যাওয়া হলেও মাশরাফি তখন অধিনায়ক ছিলেন না। আর ২০০৯ সালের পাঁচ বছর পর আরও একবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়েছিলেন মাশরাফি। ২০১৪ সালে সেই সফরে দলের অধিনায়ক ছিলেন মুশফিকুর রহিম। ওয়ানডে সিরিজের তিন ম্যাচেই খেলেছিলেন মাশরাফি। কিন্তু সেই সিরিজের পাশাপাশি টেস্ট সিরিজেও হেরেছিল বাংলাদেশ। এতে মুশফিককে ওয়ানডে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে ফেরানো হয় মাশরাফিকে। এই চার বছরে ওয়ানডে সংস্করণে বাংলাদেশ সমীহ জাগানিয়া দল হয়ে ওঠার পেছনে মাশরাফির নেতৃত্বগুণের বড় অবদান আছে। এবার যেমন এই সফরে টেস্ট সিরিজে যে দলটা তেমন প্রতিদ্বন্ধিতাই গড়ে তুলতে পারেনি, সেই দলকেই নেতৃত্ব দিয়ে ওয়ানডে সিরিজ জেতালেন মাশরাফি। তাই বলা চলে মাশরাফি যেন এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন। টেস্ট সিরিজ হেরে দলের আত্মবিশ্বাস যখন তলানিতে, সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করলেন তিনি। নিজে দারুণ বল করে নেতৃত্ব দিলেন সামনে থেকে, আর বাংলাদেশকে এনে দিলেন নয় বছর পর এশিয়ার বাইরে প্রথম সিরিজ জয়ের স্বাদ। তবে এমন একটা জয়ের পরও মাশরাফি বলছেন, আরো অনেক কিছু উন্নতির জায়গা আছে তাদের। ম্যাচ শেষে সংবাদ মাধ্যমে মাশরাফি বলেন, এই সিরিজ জেতাটা আমাদের জন্য খুব দরকার ছিল। বিশেষ করে এশিয়া কাপের আগে আমাদের জন্য ভালো হল। তবে যেটা আমি আগেও বলেছি, কিছু জায়গায় এখনো উন্নতি করতে হবে। সিরিজ জেতা মানেই তো সব না। অনেক জায়গায় এখনো উন্নতির সুযোগ রয়েছে। অনেক উন্নতি করতে হবে। তবে সামনের দিনগুলোর জন্য নিজেদের খেলার আরো উন্নতি ঘটানোই এখন মাশরাফির ধ্যান-জ্ঞান। তিনি মনে করেন, শেষ ম্যাচে দেখেন রুবেল ঠিক দলের প্রয়োজনমাফিক কাজটা করতে পেরেছে। এভাবে আমরা ছোট ছোট উন্নতি করছি। আরো কিছু উন্নতির জায়গা আছে। সবমিলিয়ে আমি বলবো যে এই জয়টা আমাদের জন্য খুব ভাল হল আর কি। তবে কথা শেষে মাশরাফির কথায় এটা স্পষ্ট যে দলকে টেস্ট ও টি টোয়েন্টিতেও ভালো একটা জায়গায় দেখতে চান তিনি। সেই ছবিটা হয়তো এখনও চোখে ভাসে বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেটপ্রেমীর। শাহাদাত হোসেন রাজীব আর জুনায়েদ সিদ্দিকীর কাঁধে ভর দিয়ে মাঠ ছেড়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা, তাও আবার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ২০০৯ সালে কিংসটাউন টেস্টের তৃতীয় দিনের ঘটনা সেটি।
হাঁটুতে চোট পেয়ে সেই যে মাঠ ছাড়লেন মাশরাফি, এরপর আর ফেরা হয়নি টেস্ট ক্রিকেটে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাই মাশরাফির জন্য এক দুঃসহ স্মৃতির নাম, যেখানে মৃত্যু হয়েছিল তার টেস্ট স্বপ্নের। নয় বছর পর, আবারও বাংলাদেশের অধিনায়ক হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে আরেকটি সিরিজ খেলতে নেমেছিলেন মাশরাফি। সাদা পোশাকে নয়, রঙিন পোশাকে। এবার আর নিয়তি তাকে খালি হাতে ফেরায়নি, সঙ্গী হয়নি কোনো দুঃসহ স্মৃতি। বরং বাংলাদেশের বিমানে ওঠার আগে এবার তার সঙ্গী হচ্ছে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ২-১ ব্যবধানের জয়। তার নেতৃত্বেই নয় বছর পর দেশের বাইরে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। তবে তার ভবিষ্যত হিসেবে কে কে আসতে পারেন সেই বিষয়টি এখনো পরিস্কার হচ্ছেনা। আরো একজন মাশরাফির যে খুব বেশি প্রয়োজন বাংলাদেশের ক্রিকেটে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ