ঢাকা, বৃহস্পতিবার 9 August 2018, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৬ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর বোল্ট!

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : অতিমানব, অপরাজেয়, অপ্রতিরোধ্য। শব্দগুলো বারবার ব্যবহৃত হয়েছে উসাইন বোল্টের বর্ণনায়। জ্যামাইকার এই কিংবদন্তিকে বলা হয় ইতিহাসের দ্রুততম মানব। ২০১৭ সালে অবসর নেওয়ার আগে যতগুলো দৌড়ের প্রতিযোগিতায় তিনি অংশ নিয়েছেন, সব ক্ষেত্রে শেষ দৃশ্যটা যেন অনুমেয়ই ছিল! ছুটবেন, জিতবেন, উৎসব করবেন! চারবার ওয়ার্ল্ড স্পোর্টসম্যান অব দ্য ইয়ার নির্বাচিত হয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের দেওয়া সেরা পুরুষ অ্যাথলেটের পুরস্কারটা নিজের করে নিয়েছেন ছয়বার। বহু রেকর্ড তার সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
বিশ্বের এক নাম্বার গতির রাজা হিসেবেই যার পরিচিতি সর্বত্র। অলিম্পেেিক ৮বার স্বর্ণপদক জিতেছেন এই গতির রাজা। আবারো তিনি সিরিয়াস। তবে ক্ষেত্রটা ভিন্ন। দৌড়ের এই মহাতারকা নাম লিখাতে চান ফুটবলে। বলছি ট্র্যাক এ্যান্ড ফিল্ডকে বিদায় বলে দেয়া উসাইন বোল্ট এর কথা। ৩১ বছর বয়সী জ্যামাইকান স্প্রিন্টার পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। এ বিষয়ে অলিম্পিকে ৮ স্বর্ণপদক জয়ী বোল্ট বলেন, ‘আমি সত্যিই চেষ্টা করতে চাই এবং পেশাদার হতে চাই। খেলতে চাই সর্বোচ্চ পর্যায়ে। শীর্ষ ক্লাবের হয়ে এবং বিশ্বের সেরা লীগে খেলাটাই আমার মূল লক্ষ্য।’
দীর্ঘদিন ধরেই ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখে এসেছেন বোল্ট। এবার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষা। গত বছর বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ খেলে এ্যাথলেটিক্স থেকে বিদায় নেয়ার পর থেকে আরও জোরালোভাবে মনোযোগী হন ফুটবলে।
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বেশ কয়েক মাস আগে জার্মান বুন্দেসলিগার জায়ান্ট ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের সঙ্গে অনুশীলনও করেন পৃথিবীর ইতিহাসের দ্রুততম মানব। মারিও গোটজে এবং উইলিয়ান ভাইগলের সঙ্গে যখন মাঠে প্রবেশ করেন, উচ্ছ্বসিত দর্শকেরা গলা ফাটিয়েছেন তার নামে। কেউ কেউ মাঠে নিয়ে এসেছিলেন জ্যামাইকান পতাকাও। দুই দলে ভাগ হয়ে খেলার সময় বোল্ট যখন একজনকে কাটিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে গেলেন সামনে, দর্শকরা তখন আনন্দে-উদ্বেলিত! পরে হেডে যখন একটা গোলও করলেন, সেই উল্লাস তখন ‘গর্জন’ হয়ে গেল প্রায়। ফুটবলে কী করবেন বোল্ট, সেটি পরের কথা। কিন্তু ‘ফুটবলার বোল্টের প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ-বিমোহিত দর্শকরা।
পেশাদার কোন দলের সঙ্গে অবশ্য এটাই প্রথম অনুশীলন নয় বোল্টের। গত জানুয়ারিতেই দক্ষিণ আফ্রিকার দল মামেলোডি সানডাউনসের সঙ্গে অনুশীলন করেছেন তিনি। তবে লম্বা একটা সময় ধরে ডর্টমুন্ডের সঙ্গে অনুশীলন করবেন বোল্ট। ফুটবলার হওয়ার মতো যোগ্যতা তার আছে কি না, সেটি দেখে নেবেন ডর্টমুন্ডের এই অনুশীলনে। তবে প্রথমদিনের অনুশীলন শেষে নিজেকে ১০ থেকে ৭ মার্কস দিলেন জ্যামাইকান স্প্রিন্টার। এ বিষয়ে অনুশীলনের শেষে বোল্ট তার অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘সর্বোপরি আমি নিজেকে দশ থেকে সাত দিতে চাই।’ কোথায় খেলবেন বোল্ট? এমন প্রশ্নও উঠছে এখন? জ্যামাইকান স্ট্রাইকার জানান, ‘আমি উইংয়ে খেলতেই পছন্দ করি খুব। তবে এখন যেহেতু আমি আনফিট তাই চেষ্টা করব ওপরে (স্ট্রাইকার হিসেবে) উঠেই খেলতে।’
ডর্টমুন্ডের সঙ্গে বোল্টকে অনুশীলনের সুযোগটা করে দিয়েছে পুমা। জার্মানির এই ক্রীড়া সরঞ্জামাদি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জ্যামাইকান স্প্রিন্টারের পাশাপাশি ডর্টমুন্ডেরও পৃষ্ঠপোষক। বুন্দেসলিগার দলটির একজন সদস্য ক্লাবে যেসব সুযোগ-সুবিধা পান, বোল্টও সে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। ডর্টমুন্ডের বিক্রয় ও বিপণন পরিচালক কারস্টেন ক্রেমার জানিয়েছেন, ‘আমরা ভাল আয়োজক হতে চাই।
তার যতœ নেয়ার চেষ্টা থাকবে আমাদের। যাতে তিনি বুঝতে পারেন, ডর্টমুন্ড একটা ক্লাবের চেয়েও বেশি কিছু।’ এটাও জানিয়ে রাখা ভাল যে, ডর্টমুন্ডের সঙ্গে অনুশীলন করলেও ফুটবলে বোল্টের প্রিয় দল কিন্তু ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। যে ক্লাবের হয়ে খেলার ইচ্ছাটা আগেই জানিয়ে রেখেছেন তিনি। ওল্ডট্রাফোর্ডের দলটির বর্তমান কোচ জোশে মরিনহোর দলের হয়ে পরশু বাসেলে ম্যারাডোনার দলের বিপক্ষে একটি প্রদর্শনী ম্যাচও খেলেছেন গতির দানব। আগামী ১০ জুন ইউনাইটেডের মাঠ ওল্ডট্র্যাফোর্ডে একটি চ্যারিটি ম্যাচ খেলার জন্য সকার এইডের সঙ্গে চুক্তিও করেছেন।
যেভাবে সেরা অ্যাথলেটের পুরস্কার তুলে নিতেন সেভাবেই ফুটবলেও সাফল্য চার তিনি। তার কাছে সাফল্যের সূত্রগুলোর অন্যতম হচ্ছে কিছু পেতে হলে কিছু ছাড়তে হয়। শুরুর দিকে আমি একাগ্রতা হারাতে চাইনি। তাই বাইরে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে বাসায় বসে নিজেকে সময় দেওয়াই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। যখন আপনি আপনার সবটুকু ঢেলে দিয়ে নিজেকে তৈরি করবেন, তখন সন্ধ্যায় একটু বিশ্রাম আপনার প্রাপ্য। ‘আমি বাসায় থাকব। তোমরা যাও।’ বন্ধুদের এ কথা বলা কঠিন। তবু বন্ধুরা যখন ক্লাবে যেত, আমি থাকতাম বাসায়।
আপনাকেও এই কাজটি করতে হবে। যদিও যখন কোনো প্রতিযোগিতা থাকত না, আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারতাম না। ওদের সঙ্গে চলে যেতাম। কিন্তু এখন বুঝি, দিন শেষে ডিজের বাজনা আমার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাত। আমি কখনোই হেরে যেতে চাই না; স্বভাবতই আমার মনোভাব খুব প্রতিযোগিতামূলক। একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদ হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় ভয়, এমনকি দৌড়ানোর সময়ও আমার একটি মাত্র ভয়ই কাজ করে। আর তা হলো হেরে যাওয়ার ভয়। এই ভয়টা সব সময়ই থাকবে। আর এই ভয়টা কাটানোর একমাত্র উপায় হলো অন্য যে কারও চাইতে কঠোর প্রশিক্ষণ, পরিশ্রম ও একাগ্রতা।
বোল্ট জানালেন, আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমার ‘রোল মডেল’ ছিলেন মাইকেল জনসন এবং ডন কোয়ারি। জনসন ছিলেন বিশ্বসেরা দৌড়বিদ, বিশেষ করে ২০০ মিটার দৌড়ে (আমার প্রিয় ইভেন্ট)। আর কোয়ারি ইতিহাসে জ্যামাইকার সেরা স্প্রিন্টারদের মধ্যে একজন। আমি তাঁদের মতো হতে চেয়েছিলাম। এখনো এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, আমি যাদের মতো হতে চাই। এই মুহূর্তে আমার পছন্দের মানুষ হলেন কেভিন ডুরান্ট।
তিনি একজন বাস্কেটবল খেলোয়াড়। ওকলাহোমা শহরে থান্ডারের হয়ে খেলেন। কেভিন একজন ভালো নেতা। তিনি খুব শক্তিশালী এবং খুব দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি যা-ই করেন না কেন, যদি ক্লান্ত হন বা আহতও হন, সেই অবস্থাতেও কখনো হাল ছাড়েন না। নিজেদের সেরাটা দেওয়ার জন্য তিনি তাঁর দলের সদস্যদের অনুপ্রাণিত করেন এবং চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন।
আপনি যত ভালোই হন না কেন, নিশ্চয়ই আরও ভালো হওয়ার সুযোগ আছে। দৌড়ের ক্ষেত্রে যেমন শুরুটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি বেশ লম্বা (৬ ফুট ৫ ইঞ্চি) বলে দৌড়ানোটা আমার জন্য যত সহজ, শুরু করা ততটাই কঠিন। উচ্চতা বেশি বলে আমি লম্বা লম্বা পা ফেলতে পারি, এটা আমার জন্য খুব ভালো দিক। কিন্তু বেশি উচ্চতা দৌড় শুরুর জন্য ভালো নয়। শুরুটা করতে একটু সময় লেগে যায়। একটা ভালো শুরু রপ্ত করতে আমার অনেক সময় লেগেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা আপনাকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগাবে।
আজকাল আমি আমার তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী খুঁজে পাই না। কেউ কেউ অবশ্য খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। মনে আছে, কলেজের প্রথম বর্ষে একটি ছেলে আমাকে টক্কর দিয়েছিল। পরের বছর আমি আমার জীবনের সেরা পরিশ্রমটুকু করেছিলাম। এবার এই দৌড়বিদেও নতুন অধ্যায় শুরু হবে। মাঠের রাজা বোল্ট এবার নিজের ঝলকানি দেখাবেন ফুটবলে এমনটিই দেখার অপেক্ষায় সবাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ