ঢাকা, শুক্রবার 10 August 2018, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মহা প্রয়াণে রবীন্দ্রনাথ

মোঃ জোবায়ের আলী জুয়েল : ২৫ জুলাই অসুস্থ রবী ঠাকুরকে শান্তি নিকেতন থেকে কলকাতায় আনা হলো। কিন্তু সেখানেও তাঁর অসুখের বিশেষ উন্নতি না’ হওয়ায় খ্যতিমান চিকিৎসকগণ স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, অপারেশন করলে কবি আরোগ্য লাভ করবেন। ১৯৪০ সালে কালিঙ্পঙে অসুস্থ হওয়ার জের চলে ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট অবধি। ইতিমধ্যে কোন পদ্ধতিতে চিকিৎসা হবে, তা’ নিয়ে বিতর্ক চলছে। স্থির কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। ফলে রোগের উপশম দূরে থাক রবীন্দ্রনাথের শরীর খারাপের দিকেই যাচ্ছিল। সে’ সময় কবি কন্যা মীরা দেবী, রাণী মহলান বিশকে এক চিঠিতে বলেছিলেন, “এলোপ্যাথি, কবিরাজী, বায়োকেমিক তিনটি চিকিৎসাই একত্রে চলছে। কিন্তু কবির সুস্থ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। প্রস্রাবের সময় অসহ্য যন্ত্রণা, প্রস্রাব ঠিক পরিমাণে হচ্ছেনা। তদূপরি জ্বর, মাথায় যন্ত্রণা, বুকে ব্যাথা। কবিরাজ দক্ষিণারঞ্জন রায়, কবিরাজ বিমলানন্দ তর্কতীর্থ, ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, ডাঃ নীলরতন সরকার, ডাঃ রামচন্দ্র অধিকারী, ডাঃ সত্যেন্দ্রনাথ রায়, ডাঃ জিতেন্দ্রনাথ দত্ত, ডাঃ ইন্দুভূষণ বসু, রবীন্দ্রনাথের সে’ সময় চিকিৎসক ছিলেন। বিখ্যাত শল্য চিকিৎসক ডাঃ ললিত ব্যানার্জি রবীন্দ্রনাথের অপারেশন করেছিলেন। খ্যাতিমান চিকিৎসকগণের পরামর্শ অনুযায়ী ৩০ জুলাই কবির দেহে অস্ত্রপচার করা হয়। ১৯৪১ সালের ৩০ জুলাই সকাল ৯ টায় অপারেশন টেবিলে যাবার আগেও কবিতা লিখেছেন। কিন্তু তাঁর শেষ রচনা সংশোধন করার সুযোগ দিলেন না ডাক্তার ও আত্মীয়-স্বজনেরা। তাঁর অনিচ্ছায় অপারেশন করিয়ে মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছেন ঘনিষ্ঠজনেরা। তলপেটের একটা জায়গা ফুটো করে ইউরিন বেরোনোর রাস্তা করে দেয়া হয়। ডাক্তারী শাস্ত্রে যাকে বলা যায় পিউবিক সিস্টোস্কপি। লোকাল অ্যানাস্থশিয়া দিতে রবীন্দ্রনাথকে পঁচিশ মিনিট সময় লেগেছিল। রবীন্দ্রনাথ সব টের পেলেন। ভীষণ যন্ত্রণা সহ্য করলেন চোখ বুঁজে। ৩ আগষ্ট থেকে অবস্থার অবনতি হলো। ৫ আগষ্ট থেকে কবির দেহ ক্রমেই অবশ হতে লাগলো এবং তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। কবির জীবনী শক্তি ক্রমেই কমে আসতে লাগলো। ৭ আগষ্ট সকাল থেকে তাঁকে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছিল। চিকিৎসকগণ সবাই হতাশাব্যঞ্জক কথা বলতে লাগলেন। তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের বিলম্ব নেই। সমগ্র কলকাতা থম্থম্ েগুমোট ঝড়ের পূর্বাভাষ।

প্রথমত: রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন অস্ত্রোপচারের বদলে তাঁর কবিরাজী চিকিৎসা হোক। কবিরাজ বিমলানন্দ তর্কতীর্থের চিকিৎসায় তিনি ফলও পাচ্ছিলেন। কিন্তু বার বার দোনামনা করে শেষ-মেষ ঠেলে দেয়া হয় ছুরিকাঁচি, কাটাকাটির টেবিলে। দ্বিতীয়ত: সেকালের সবচেয়ে বড় ডাক্তার নীলরতন সরকার চান নাই অপারেশন হোক। তবু ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের জবরদস্তিতে নীলরতন সরকারকে সরে যেতে হয়। তৃতীয়ত: কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষমতা। চতুর্থত: অপারেশনের ব্যবস্থা কোন ভাল হাসপাতালে বা নার্সিং হোমে না’ করে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ীর বারান্দায় করে চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয়া হয়েছে। উপযুক্ত প্রতিষেধক ব্যবস্থা না’ নেওয়ায় সেপটিক হয়ে তিনি মারা যান। পঞ্চমত: অ্যানাস্থেশিয়ার ভাল ব্যবস্থা না হওয়ায় রবীন্দ্রনাথকে অপারেশনের সব যন্ত্রণা সজ্ঞানে সহ্য করতে হয়। ষষ্ঠত: অপারেশনের পর কোনো ট্রেনিং প্রাপ্ত নার্স না রেখে ঘনিষ্ঠজনদের উপর সেবার ভার দেয়া রবীন্দ্রনাথের সাংঘাতিক ক্ষতির কারণ হয়েছে।

কলকাতার আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা দলে দলে কবি গৃহে উপস্থিত হতে লাগলো। এরপর দূপুর ১২ টা ১৫ মিনিটে ধীরে ধীরে কবিগুরু জাগতিক সব মায়া কাটিয়ে মহাপ্রস্থান করলেন অনন্তলোকে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তাঁর লাশ যখন কলকাতার জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়ীতে অবস্থান করছিল তখন উচ্ছৃঙ্খল শত শত জনসাধারণ তাঁর লাশের কাছে এসে তাঁর মুখের দাড়ি ও মাথার সমস্ত চুল তুলে ছিঁড়ে ফেলেন নিজ সংগ্রহে রাখার জন্য। কী নিদারুণ বিভৎস সে দৃশ্য। বিশাল জনতাকে কোনোভাবেই সে সময় নিবৃত করা যায় নাই। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের লাশ যখন শ্মশানে দাহ করা হয়, বলা বাহুল্য তাঁর মুখ ছিল বিকৃত ও তাঁর দাড়ি ও মাথায় ছিল না অবশিষ্ট একটিও চুল। (তথ্যসুত্র: জমিদার রবীন্দ্রনাথ, লেখক- ড. অমিতাভ চৌধুরী, কলকাতা।)

ঐদিন কলকাতার সব স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত, দোকানপাট সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেলো। শবযাত্রার সময় কলকাতা রেডিওতে প্রচার হবার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ লক্ষ লোক শবযাত্রায় অংশগ্রহণের জন্য জোড়াসাঁকোর অভিমুখে দলে দলে রওনা হলো। অশ্রুসজল সকলের চোখ সে সময়। বিদ্রোহী কবি নজরুলও সে সময় কবিতা লিখলেন ‘রবি হারা’। কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি সে কবিতা তৎক্ষণাৎ পাঠ করলেন। গান লিখলেন ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত কবিরে’। নিজেই গাইলেন। 

শান্তি নিকতনে কেউ শোকের গান গাচ্ছেন, মালা গাথছেন, মন্ত্র পড়ছেন, শেষ শয্যা সাজাচ্ছেন, মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যাওয়া খাট বানাচ্ছেন, কেউবা বসে বসে কাঁদছেন। বেলা ১-৩০ মিঃ রাস্তাগুলি এত জনাকীর্ণ হয়ে পড়লো যে, ট্রাম, বাস ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল একেবারেই বন্ধ হয়ে গেলো। এ দৃশ্য যিনি দেখেন নাই, তিনি কল্পনাও করতে পারবেন না। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরেও তাঁর জ্যোতির্ময় দেহের কোন পরিবর্তন হয় নাই। বিরাট শোভাযাত্রা বেলা ৩ টায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ী থেকে বের হয়ে চিৎপুর রোড, চিত্তরঞ্জন এভিনিউ, কলুটোলা ষ্ট্রীট, কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, বটকৃষ্ণপাল এভিনিউ হয়ে নিমতলা শ্মশান ঘাটে পৌছেঁ ছিল। এরকম শোভাযাত্রা ইতিপূর্বে আর কেউই দেখে নাই।

শুধু ঠাকুর বাড়ীতে এত ফুলের সমারোহ ঘটেছিল যে, তা’ বহন করতে হলে গোটা পাঁচেক ট্রাকের প্রয়োজন হতো। শোভাযাত্রার রাস্তার দূ’ধারে সমস্ত পথ ফুলে ফুলে ছাওয়া ছিল। রাস্তার দূ’ধারে বাড়ীর সমস্ত ছাদগুলোতেও বিপুল লোকের সমারহ এবং সেখানে থেকেও পুষ্প বৃষ্টি হচ্ছিল।

শোভাযাত্রা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলের সামনে এলে ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আজিজুল হক, ড. শ্যামাপ্রসাদ মূখোপাধ্যায় প্রমূখ নেতৃবৃন্দ শবাধারে ফুল দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কবিকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন।

সন্ধ্যা ৬.৩০ মিঃ শোভাযাত্রা নিমতলা শ্মশান ঘাটে পৌছায় এবং বিশেষভাবে নির্মিত চিতায় রবীঠাকুরকে ভস্মীভূত করা হয়। রবীন্দ্রনাথের একমাত্র পুত্র রথীন্দ্রনাথ শারীরিক অসুস্থ থাকার কারণে কবিগুরুর মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (ভারতীয় সর্বপ্রথম আই,সি,এস ১৮৬৪ খ্রিঃ) পৌত্র সূবীরেন্দ্র নাথ ঠাকুর কবির মুখাগ্নি করেছিলেন। 

রূপে রসে সৃষ্টিকর্মে ৮০ বছরের পরিপূর্ণ জীবন তাঁর ইথার তরঙ্গে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কবির ভাষায়-

সম্মুখে শান্তি পারাবার

ভাসাও তরণী হে কর্ণধার

তুমি হবে চিরসাথী।

 

তথ্যসুত্রঃ

১। রবীন্দ্র জীবনের শেষ প্রহর: অমিয় চক্রবর্ত্তী

২। জমিদার রবীন্দ্রনাথ: ড. অমিতাভ চৌধুরী

৩। ঠাকুরবাড়ীর অন্দরমহল: চিত্রা দেব

৪। প্রথম আলো (প্রথম ও দ্বিতীয় খ-- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ