ঢাকা, শুক্রবার 10 August 2018, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অস্পষ্ট স্বপ্ন

তাসনীম মাহমুদ : বুনো ঘাসগুলোর লকলকে ডগা আর পাতার ভরাট দেখে মনে হচ্ছে ঘাসগুলো অক্টোপাসের মত জড়িয়ে চুষে খাচ্ছে; কবরটির মধ্যে চির ঘুমে বিভোর জারিয়ানের হাড্ডি - মজ্জা-শ্বাসটুকুও । কি অদ্ভূত এই সৃষ্টি জগত! আজ যাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরে হয়তো কালই তাকে বুনো লতা -ঘাসের খাবার করে ছুড়ে ফেলে বন-জঙ্গলে।

 জুন-জুলাই এর মাস। প্রকৃতি যেন বৃষ্টির ছায়ায় হাজার বছরের চাপা কষ্ট এ সময়ে কান্নার ছলে প্রকাশ করে থাকে। তেমনি একটা রাত । বিদ্যুৎহীন গ্রামের চাপা অন্ধকারে কালো মেঘ সেলেটের মত চেপে ধরেছে পৃথিবীকে। ঝড়-বাতাস আর বৃষ্টির ঝাপটার সাথে তাল মিলিয়ে শোকে-ক্লান্তিতে মূহ্যমান আত্মীয়-স্বজন ঘুময়ে পড়েছে। শুধু নাহিয়ানের চোখে ঘুম নেই। কফিনের মাথার কাছে মাথা রেখে শুয়ে আছে সে। আতর-লোবানের গন্ধ নাহিয়ানের বুকে যে ঝড় তুলেছে , সে ঝড় যেন আটলান্টিকের তলদেশ থেকে উঠে এসে পুরো পৃথিবীকেই তছনছ করে দিয়ে এই রাতকে করে তুলবে মৃত । কয়েক ফোঁটা নিরলস অশ্রু গড়িয়ে ভিজিয়ে গেল নাহিয়ানের চিবুক। চোখ মুছতে মুছতে ওর মনে পড়ে গেল চিত্রা পাড়ের সেই শীতের সন্ধ্যার কথা। জারিয়ান কবিতা রচনা করতো বলে ওর আব্বু ওকে অনেক দিন বকাঝকা করেছেন। উনি নাকি বলতেন, “কবিদের জীবন দুঃখ কষ্টের হয় । ওদেরকে না খেয়ে মরতে হয় । আবেগ -অনুভূতি-প্রেম ওদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় ।” সেদিন সন্ধ্যায় চিত্রা বুকের প্রফুল¬ জলের মত টলমলে চোখে জারিয়ান এ কথাগুলো বলছিল নাহিয়ানকে। ও বলেছিল, “জানিস নাহিয়ান আব্বু কখনোই আমার ইচ্ছা -অনিচ্ছা,পছন্দ-অপছন্দের দাম দেন না। আমি যখন এলাকার ছেলেদের সাথে মসজিদে যাই -পাঠাগারে যাই, আব্বু তখন আম্মুকে বকাঝকা করে বলেন, ওর এখন এসব করার দরকার কি? মসজিদে -পাঠাগারে-যাওয়ার নাম করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর পড়াশুনায় ফাঁকি দেওয়াই ওর মতলব! আমি কি কিছু বুঝিনা? নাহিয়ান তুই তো জানিস আমার আব্বুর অনেক টাকা! টাকা ছাড়া ব্যবসা ছাড়া আব্বু আর কিছুই বোঝেন না। আমাকে বলেন , লেখাপড়া শেষ করে অস্ট্রেলিয়া থেকে ব্যবসায়ের উপর দুই বছরের কোর্স করে দেশে এসে বড় ব্যবসা শুরু করতে। কিন্তু দোস্ত, আমার ওসব ভালো লাগেনা। সেদিন আব্বুর এ কথার প্রতিবাদ করে ছিলাম বলে রাতে আমাকে খেতে দিতে আম্মুকে বারন করেছিলেন । পরের পুরো একটা দিন আমাকে তালাবদ্ধ রুমে আটকিয়ে রেখেছিলেন।

 

        কথা বলতে বলতে জারিয়ানের চোখ পড়ে বাঁধের নিচে পলিথিন দিয়ে ঘেরা ছোট ছোট কয়েকটি ঘরের দিকে। নদী পাড়ের ঐ ঘরগুলোতে তখন খড়-কুটো দিয়ে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা চলছে। আগুন ঘিরে বস্ত্রহীন দুটো-তিনটে শিশু খেলা করছে। কুয়াশার সাথে মিলিয়ে যাওয়া ধুমায়িত আলোর দিকে এগিয়ে গেল ওরা দুইজন। পরিচিত হলো সাফিনার সাথে। দারিদ্র্যের ভারে নূজ্য হলেও যৌবনে আভিজাত্যের ছাপ সাফিনার চেহারায় স্পষ্ট। জারিয়ানের অল্প কয়েকটি কথায় আপ্লুত হয়ে সিন্দুকের তালা খুলে ধন-দৌলত বের করার মত একটু একটু করে অতীত,বর্তমান সব বলে ফেলল সাফিনা বেগম। অবশ্য চিত্রা পাড়ের এ বস্তিতে ‘সাফিনাবুয়া ’ নামেই সবাই তাকে চেনে। পাঁচ বছরে তিনটে ছেলে সন্তান জন্ম দিয়ে তার স্বামী ইহলোক ত্যাগ করেছে। জাগা-জমি যা ছিল রাক্ষুসী নদী সব গিলে খেয়েছে। তারপরো ছেলে তিনটাকে অবলম্বন করে নিজ বাড়ীতে থাকতে পারেনি সাফিনা। অপরাধ তার যৌবন বেশবাস-পরিপাটি। অবশেষে যক্ষ্যের ধন তিনটাকে বুকে চেপে এই বস্তি ঘরে। বস্তির লোকগুলো অনেক ভালো । “গরীবের ঘরে গরীবের একমুঠো ভাত না জুটলেও মান -ইজ্জত রক্ষা পায়“।

      ছেলে তিনটে যদি কোনদিন মানুষ হয় এই তার ভরসা! কিন্তুু সাফিনা দিনদিন আর পারেনা। খাবার জুটাতেই কষ্ট হয় তার ; পরিধানের একটু কাপড় জোগাবে কিভাবে? জারিয়ান বিব্রত বোধ করতে থাকে। কুয়াশা ঘন হতে থাকে; অন্ধকারও হাত -পা ছড়াতে থাকে। ফিরে আসতে আসতে জারিয়ান দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে নাহিয়ানকে জিজ্ঞাসা করে, “বলতো দোস্ত আমাদের সবুজ ঘেরা ছোট এ দেশটিতে কবে শান্তি ফিরে আসবে”? নাহিয়ান উত্তরে বলেছিল,“যেদিন কেউ কারো পছন্দ-অপছন্দে হস্তক্ষেপ করবে না সেদিন ।”জারিয়ান তাচ্ছিল্যে হেসে বলে“নারে দোস্ত! ঐ দেখ , ঐ শিশু গুলোকে ! যেদিন ওদের মত এদেশের সকল অবহেলিত শিশুর পরনে কাপড় থাকবে, ওদের পেটে খাবার থাকবে, স্কুলে যেয়ে পড়ালেখা করে সৎ চরিত্রবান মানুষ হবে সেদিন এদেশে শান্তি আসবে। দেখ নাহিয়ান, আমার আব্বুর তো পাঁচ তলা বিল্ডিং এর বাড়ী; এই বাড়ীর একটা অংশে যদি একটা স্কুল খুলে ওদের মত ছেলে মেয়েদের পড়ার সুযোগ করে দিতে পারতাম।” সেদিন জারিয়ান ওদের কষ্টে কেঁদেছিল । নাহিয়ানের আজ আরো মনে পড়ে Ñ বস্তির ঐ তিনটে ছেলের খাবার পোশাক আর পড়ালেখার খরচ জারিয়ান হাত খরচের টাকা বাচিয়ে এবং গোপনে টিউশুনি করে যোগান দিত।

 পাঁচতলা বিল্ডিং এর একটা অংশে স্কুল করার বদলে সেই স্বপ্নকে বুকে নিয়ে এ বিল্ডিং থেকে পড়ে যেয়ে জারিয়ানের মাথাটা থেঁতলে ’ও’ মারা গেল। হায় নাহিয়ানের দম বন্ধ হয়ে আসছে । চিৎকার করে রাতের ঝড়-বৃষ্টি থামিয়ে জারিয়ানের আব্বুকে ডেকে বলতে ইচ্ছা করছে-“ চাচা! আপনার জারিয়ানের কথা মনে করুন। ও-তো কখনো বড়দের অশ্রদ্ধা করতো না। নামাজ পড়তো পাঠাগারে যেতো, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করতে বলতো, ভাল ভাল উপদেশ দিতো! আর ওর কবিতা-গল্পের ডায়েরিটা খুুলে দেখেন, বঞ্চিত -বাস্তুহারা মানুষগুলোর কথা ওর লেখার ভেতর কিভাবে ফুটে উঠতো। আপনি টাকা ব্যবসা-বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু বোঝেন না। বুঝতে চান না- ‘প্রকৃতির নির্মল চরিত্র মানুষকে সত্যিকারের মানুষ করে তোলে“! অথচ; সকাল হলেই আপনার জারিয়ানকে কাঁদামাটির ম্যাড়মেড়ে সাড়ে তিন হাত জায়গাতে বুনো ঘাসের সঙ্গে সঙ্গী করে দেবেন। আজ কোথায় আপনার দাম্ভিক ব্যবসা,অর্থ -কড়ি, বিলাসিতা?”

কিন্তু নাহিয়ান কিছুই বলতে পারে না। আকাশের বুক থেকে কখনো কোন একটি তারা খসে পড়লে আকাশ যেমনকিছুই বলতে পারে না ঠিক তেমনি নাহিয়ানের চিৎকার দীর্ঘশ্বাস হয়ে অন্ধকারে ঝড়-বৃষ্টির সাথে মিলিয়ে গেল বুনো লতার মধ্যে। 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ