ঢাকা, শুক্রবার 10 August 2018, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আতিক হেলাল এক হাস্যোজ্জ্বল কবি

শাহিদ উল ইসলাম : "হাসতে দ্যাখো, গাইতে দ্যাখো, অনেক কথায় মুখর আমায় দ্যাখো, দ্যাখো না কেউ হাসি শেষে নিরবতা। শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর গানের সাথে সুর মিলিয়ে" সদা হাসিমুখ মাখা, এক উজ্জ্বল কবি প্রাণ আতিক হেলাল যখন এমন একটি উক্তি উচ্চারণ করেন, তখন স্বাভাবিক কারণেই  ভাবনার রাজ্য একটু হোঁচট খায়, থমকে দাঁড়ায়। কেন এহেন নিরবতা? হাজারো প্রশ্নে জর্জরিত হয় মন। খুব জানতে ইচ্ছে করে নিরবতার কারণ। প্রশ্ন জাগে মনে, আমরা মধ্যবিত্ত মানুষগুলো কতটুকু ভালো আছি! আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থা ভালো থাকার পক্ষেই বা কতটুকু সহায়? যেখানে দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বশ্বাস গতিতে ঘোড়ার মতো দৌড়ায়, আর আমাদের সীমাবদ্ধ বেতনে সংসার চালাই বা কিভাবে? আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, নাভিশ্বাস উঠে, তাইতো কবি আতিক হেলাল নিজেকে শ্রমিকের কাতারে দাঁড় করিয়ে বলে উঠেন "আমি শ্রমিক" ছড়াটিতে এভাবে; আমি মধ্যবিত্ত শ্রমিক / সীমাবদ্ধ মাইনা / বোনাস- ক্রিমেন্ট পাই না / কোরমা পোলাও খাই না / সাহায্য তাও চাই না। সত্য উচ্চারণ, এটিই মধ্যবিত্তের মন-মানসিকতা; এটিই আমাদের অহংকার। আতিক হেলাল একজন সত্যসন্ধানী কবি, ছড়াকার। কল্পনার কোন ভাবাবেগের ফসল দিয়ে তিনি তার সাহিত্য সাধনার গোলা ভরেন নি। সত্যকে তির্যক বা সরাসরি উপস্থাপন করেছেন মাত্র, যেখানে নেই কোন ভনিতা বা নেই কোন কল্পনার ভাবাবেগ। তার লেখা "আমি পারি না" ছড়াটিতে এই সত্য ভাবাবেগের কথা ফুটে উঠেছে এভাবে; "আমি কিছুই লিখতে পারি না / মিথ্যা শব্দ / মিথ্যা বাক্য / মিথ্যা গল্প / মিথ্যার বেসাতি / অলিক ঐশ্বর্য কারি না।" আমাদের মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর বিপদের যেন শেষ নেই; প্রতি বছর জুন এলেই বাজেট, আর বাজেট মানে নিত্য নতুন কর বৃদ্ধি এ যেন মরার উপর খাড়ার ঘা। তাই কবি এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে "মরার বাজেট" ছড়াটিতে লিখেছেন; " যে পাবলিকে সব দিয়ে যায় / উপরি আবার ভ্যাটও / তাহার উপরেই বোলিং চলে / চালানো হয় ব্যাটও / শেয়ার বাজার, ব্যাংক লুটেরা / বাইরে থাকেন ধরার / আম জনতাই খাচ্ছে ধরা / তারাই যোগ্য মরার।" শুধু এই সন্ত্রাস এর বিরুদ্ধেই কবি লেখেননি; লিখেছেন পারিবারিক দায়িত্ববোধ এর কথাও। "বাবা ও ছেলের গল্প" ছড়াটিতে আমরা সে ঘ্রাণ খুঁজে পাই। এখানে কবি একজন পিতার কথা বলেছেন, কিভাবে একজন পিতা নিজের সুখ সাচ্ছন্দ বিসর্জন দিয়ে গড়ে তোলেন পুত্রকে মানুষরুপে, পাশাপাশি পুত্র বাবার প্রতি যে অবহেলা দেখায় তারই চিত্র যেন ফুটে উঠেছে এই ছড়াটিতে; "কত রিচ ফুড, মিষ্টি ও কলা / অঢেল স্বেচ্ছাচার / বাবা আজ বুড়ো, খাওয়া দূরে থাক / পথ্য জোটে না তার।" কবি আতিক হেলাল এর আরো একটি উক্তি " ছড়া ঘুম পাড়াতেও পারে, ঘুম ভাঙাতেও পারে।" তার এই উক্তির সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় তার "জাগলে তুমি" ছড়াটিতে। এ ছড়াটি যেন কবিতা হয়ে উঠতে চায়, আশু এক বিপ্লবের কথাই যেন বলে যায়; তোমারও ঘুমন্ত মন / জাগলো / ও দেহে প্রাণের কাঁপন / লাগলো / এ মাটিতে বিপ্লবও জাগবে / প্রেমহীন জান্তবও ভাগবে।" তিনি তার লেখনীতে সত্যকে সরাসরিভাবে ও সার্থকভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। এ তো গেল তাঁর লেখনীর যৎসামান্য আলোচনার প্রয়াস মাত্র। এবার ব্যাক্তি আতিক হেলাল এর দিকে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। তিনি একাধারে কবি, ছড়াকার, সম্পাদক ও সাংবাদিক। ১৯৬৯ এর ১৭ জুনে তার জন্ম। পিতা মরহুম হাফিজুর রহমান মাতা রাজিয়া খাতুন। চার ভাই দু-বোনের মাঝে তিনি দ্বিতীয়। দুই জমজ কন্যা সন্তানের পিতা তিনি। স্ত্রী দুলারী রহমান একটি বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। লেখালেখির সূচনা ১৯৮৬, সেই যে শুরু আজ অবধি চলছে। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫। তার প্রথম প্রকাশিত ছড়ার বই "মশকরা" প্রকাশ  পায় ১৯৯৬ তে, প্রকাশ করেন বাংলা একাডেমী। ২০০৬ এ "ভুত" নামে তার আরো একটি ছড়াগ্রন্থ প্রকাশ পায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমী থেকে এবং তার কবিতার বই " হৃদয় ঘটিত" প্রকাশ পায় ২০১১। সদা হাস্যোজ্জল এক প্রাণ, আলোকিত- সাদা মনের এক মানুষ, আমাদের অতি পরিচিত এই কবি আজ অসুস্থ। তার হার্টের বাল্ব রিপ্লেস করতে হবে। আমরা চাই তার কলম চলুক, তার মুখে হাসি লেগে থাকুক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ