ঢাকা, শুক্রবার 10 August 2018, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কবি আল মাহমুদকে যেমন দেখেছি

মুহম্মদ মতিউর রহমান : (গত সংখ্যার পর)  ‘‘এগুলো বললাম বাইরের দিক। এবার তার সাহিত্য নিয়ে দু’টি কথা বলছি। নানা বিষয়ে তার উৎসাহ। চর্যাপদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে তিনি উৎসাহ বোধ করেছেন, লিখেছেন। দূরে থেকেও তিনি সঠিক মন্তব্য করতে পারেন আধুনিক সাহিত্য সম্বদ্ধে। এটি হচেছ তাঁর অনুসন্ধিৎসূ মনের পরিচয়। আমি মনে করি, ফররুখ আহমদের সাথে পরিচিত হয়ে খুব কম বই লিখেছেন লেখকরা। ফররুখ আহমদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে আমি অনেক আগে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম। আমি অবশ্য এখন লজ্জিত যে, সে ক্ষোভ প্রকাশ করা আমার উচিৎ ছিলনা। কিন্তু তখন ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলাম। ফররুখ আহমদকে আমি বন্ধুহীন দেখেছি। এতে আমার খুব দুঃখ হচ্ছিল। কিন্তু এক সময় তাঁর অনেক বন্ধু ছিল। আমার এ ক্ষোভ প্রকাশ সঠিক ছিলনা। কিন্তু তখন আমার ক্ষোভ প্রকাশ অসঙ্গত হয়েছে বলে মনে করি নাই। আমি ফররুখ আহমদের কাব্যে মুগ্ধ ছিলাম। ফররুখ আহমদ জানতেন। তাঁর একটা সুদূর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, এই ছেলেগুলো একদিন সঠিক পথে ফিরে আসবে। সে জন্য তিনি বেছে বেছে আদর করতেন। আমাকে বিশেষ করে আদর করতেন। টেলিফোন করে বলতেন, আমি ‘কাবিন’ শব্দটা কবিতায় ব্যবহার করতে পারব কি-না। আমি অমুক শব্দটা যেন কবিতায় ব্যবহার করি। তিনি আমাদের জন্য দোয়াও করতেন। এজন্য আমরা ফররুখ ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ। আমরা সঠিক পথে ফিরে এসেছি। এখন একটা কিছু ধরতে তো হবে। একটা খড়কুটো হলেও। আমরা কি জিনিষ ধরবো? আধুনিক সাহিত্যে আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত কি? ইসলামী সাহিত্যে আধুনিক সাহিত্যে সেই খড়কুটো ফররুখ আহমদ এবং ফররুখ আহমদকে নিংড়ে আমরা দেখেছি যে, ফররুখ অনেক বড় কবি। আমি শুধু কবি নই, আন্তর্জাতিক সাহিত্যের পাঠক। আমাকে হেলাফেলা করা যায় কবি হিসেবে। কিন্তু পাঠক হিসাবে আমাকে হেলাফেলা করা, এই ঢাকা শহরে অসম্ভব। এ কারণে আমি আমার সেই পাঠ নিয়ে বলছি। ফররুখ আহমদ আমাদের কালের শ্রেষ্ঠ কবি। 

‘‘মতিউর রহমান যে বইটি লিখেছেন, ‘ফররুখ প্রতিভা’ এটি একটি মূল্যবান বই। তিনি ফররুখ আহমদের অত্যন্ত অন্তরঙ্গ এবং ভক্ত ছিলেনÑএ বইটি তার প্রমাণ। আমি মনে করি, ফররুখ আহমদের উপর যারা //জবভবৎবহপব// দেবেন বা গবেষণা করবেন, এ বইটি তাঁদের অত্যন্ত সহায়ক হবে। সেই লোকই সাহায্য করতে পারে, যে নিজে বড় প-িত। মতিউর রহমান নিজে বড় প-িত বলেই বেশ স্বাভাবিকভাবে এ বইটি লিখেছেন। 

‘‘আর একটা কথা হল, মতি ভাই থাকেন প্রবাসে। এটা আমি তাঁকে অনুরোধ করছি। সমকালীন সাহিত্যে প্রবাস হল, একটা পটভূমি। পোলিশ সাহিত্যিকদের মত অনেকেই প্রবাস যাপন করেই নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়াও পূর্ব ইউরোপের যে কয়জন গত বিশ বছরের মধ্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাঁরা সবাই প্রবাসী ছিলেন। আমি মনে করি, মতি ভাই আপনি প্রবাসে যে জীবনের মধ্যে দীর্ঘদিন আছেন, তারও কিছু আভাস আপনার সাহিত্যের মধ্যে আসা দরকার। এছাড়া ওখানকার ভাষার তরুণ সাহিত্যিকদের রচনা আমাদের ভাষায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আপনি ছাড়া আর কে নেবে? মতি ভাইয়ের আরও কিছু মূল্যবান ধর্মীয় বিষয়বস্তু নিয়ে রচিত বই যেগুলো আমি পড়িনি। আমি এখন মনে করি, আমার কিছু মৌলিক বিষয় নিয়ে বইপত্র লেখা উচিৎ। কারণ মৌলবাদী বলে গাল খাচ্ছি। আমার তাই দ্বিধাহীন, স্পষ্ট মৌলিক বিশ্বাসের বই থাকা উচিৎ। আমাদের যে সাত জন বিশ্বকবিÑমাওলানা রুমি থেকে হাফিজ পর্যন্ত-তাঁরা কাজ করেছেন মৌলিক ইসলামী কাজ-স্পষ্ট একদম নাক বরাবর। মতি ভাই আমাদের অগ্রবর্তী-অগ্রজ লেখক, আদর্শের ধ্বজাধারী, বন্ধু-সাহিত্যিক, চমৎকার মানুষ, শিক্ষক, সংগঠক হিসেবে আমাদেরকে যা দান করেছেন তা তুলনাহীন। বাংলা সাহিত্য পরিষদ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, সমস্ত লেখক বা আমাদেরকেই সম্মানীত করেছেন। আমি দারুণ গৌরববোধ করছি। তাদেরকে জানাই ধন্যবাদ।’’

১৯৯৭ সনে জানুয়ারী মাসে আমি প্রবাস-জীবন সমাপ্ত করে ঢাকায় ফিরে আসি। তারপর ঢাকা-ভিত্তিক বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ শুরু করি। প্রথমত ‘বাংলা সাহিত্য পরিষদে’র লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সাথে আমার মিল থাকায় আমি সে প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হই। দ্বিতীয়ত ১৯৭২সনে প্রতিষ্ঠিত ‘স্বদেশ সংস্কৃতি সংসদে’র আমি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলাম। ঢাকায় ফিরে আসার পর আমাকে পুনরায় সে প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। এছাড়া, ১৯৯৮ সনে আমি ‘ফররুখ একাডেমী’ (পরবর্তীতে রেজিস্ট্রিকৃত নামÑ ‘ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন’) প্রতিষ্ঠা করি। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে আল মাহমুদের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা সুদৃঢ় হয়। 

২০০৯ সনে আল মাহমুদের জীবনে এক গভীর বিপর্যয় ঘটে। তাঁর জীবন সঙ্গিনীর মৃত্যু প্রৌঢ় আল মাহমুদকে বিধ্বস্ত করে দেয়। সারা জীবন যার একান্ত আদর-যতেœ, স্নেহ-মমতায় তাঁর জীবন কেটেছে, তার বিচ্ছেদ-বেদনা কবির জীবনকে এলোমেলো করে দিয়ে গেছে। তিনি এখন বয়সের ভারে ন্যূব্জ, নানা রোগে আক্রান্তÑ এ অবস্থায় একান্ত ঘনিষ্ঠ জনের বিদায় তাঁকে নিদারুণ মর্মাহত ও শোক-বিহ্বল করেছে। আমি তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম, তাঁকে সান্ত¡না দেয়ার উদ্দেশ্যে। সেদিন আল মাহমুদের অনেক ঘনিষ্ঠ জন, ভক্ত-অনুরক্ত-শুভাকাক্সক্ষীই তাঁর গুলশানের বাড়িতে ভীড় জমিয়েছিলো। গুলশানের সে শোকাচ্ছন্ন গৃহে নিঃসঙ্গ আল মাহমুদ তাঁর সৃষ্টিকর্মে আগের মত উৎসাহ-উদ্যম কি আর কখনো ফিরে পাবেন?

আমি আল মাহমুদের একজন গুণমুগ্ধ পাঠক। তাঁর বন্ধুত্ব এবং একান্ত সান্নিধ্যের স্মৃতি আমার মনে সর্বদা আনন্দের শিহরণ জাগায়।

(সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ