ঢাকা, শুক্রবার 10 August 2018, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ২৭ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

চলিতেছে সার্কাস : রাষ্ট্রের মেরামতে শিশু-শিক্ষার্থীরা

এম. কে. দোলন বিশ্বাস : আজকের নিবন্ধটির শিরোনামের প্রথমাংশ একটি নাটকের নাম। দ্বিতীয়াংশটি দেশের করুণ হালাবস্থার বর্তমান আশাজাগানিয়া উত্তোরণ। নিবন্ধের শিরোনাম বিষয়ে একটু জেনে নেওয়া অত্যাবশ্যক। নাট্যকার মাসুদ সেজান রচিত জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘চলিতেছে সার্কাস’। এক ঘণ্টা দৈর্ঘের ধারাবাহিক এ নাটকটি বেসরকারি টেলিভিশন বাংলাভিশনে প্রতি সপ্তাহে রবি ও সোমবার রাত ৯টা ০৫মিনিটে প্রচারিত হতো। নাটকটিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ড. ইনামুল হক, মোশাররফ করিম, মৌটুসী বিশ্বাস, শামীমা নাজনীন, মুনিরা মিঠু, রোবেনা রেজা জুঁই, তারিক স্বপন, আব্দুল্লাহ রানা, সাজ্জাদ রেজা, মুকুল সিরাজ, রিফাত চৌধুরী, সফিক খান দিলু, সমাপ্তি মাসুক, আল আমিন সবুজ, স্নিগ্ধা মুমিন প্রমুখ।

সমাজের চলমান নানান অসঙ্গতি ও অনিয়মকে নাটকের গল্পে স্যাটায়ার ফর্মে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যঙ্গ বিদ্রুপের মাধ্যমে কাউকে সমালোচনা করা।  যেখানে হাস্যরসের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা কারো কোনো রচনাকে আচ্ছামত ধোলাই দেয়া হয়।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সার্কাস এখন আর টিকিট কেটে প্যান্ডেলে বসে উপভোগ করার বিষয় নয়। বরং বলা যায়, আমাদের চারপাশেই নানাবিধ সার্কাস চলছে। আমরা শুধু দেখছি তা-ই নয়, নিজেরাও কখন যে সঙ সেজে নানা ভঙে সার্কাসের ভেতরে সহসাই ঢুকে যাচ্ছি, যা টের পাওয়া বড়ই মুসকিল। এই সার্বিক চিত্রটিই একটি পরিবার ও তার আশপাশের কয়েকজন মানুষকে নিয়ে তুলে ধরেন ‘চলিতেছে সার্কাস’ নাটকের নির্মাতা ‘এইম ইন লাইফ’, ‘পাটিগণিত’, ‘পুতুল খেলা’, ‘লংমার্চ’, ‘রেড সিগন্যাল’ প্রভৃতি নাটকগুলো পরিচালনা করে দর্শকমহলে আলোচনায় আসা জনাব মাসুদ সেজান। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিজীবনের অদ্ভুত সব প্রবণতা নিয়ে স্যাটায়ারধর্মী মজার ঘটনাবলিই মূলত নাটকটির গল্প।

প্রচারের শুরু থেকেই নাটকটি দর্শকপ্রিয়তা পায়। শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনায় ২০১৭ সালের ২ এপ্রিল ২০৮তম পর্ব প্রচারের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয় ওই ধারাবাহিক নাটকটির পরিসমাপ্তি ঘটে। 

আজকের নিবন্ধের প্রারম্ভে একটি নাটকের প্রতিপাদ্যকে আলোকপাত করা হল এই কারণে যে, ২০৮তম পর্ব প্রচারের মধ্য দিয়ে পরিচালক ‘চলিতেছে সার্কাস’ নাটকটির পরিসমাপ্তি ঘটালেও আমাদের চার পাশে এখনও প্রতিনিয়ত ‘সার্কাস’ চলছে তো অবিরাম চলছেই। যেমন ‘অমুক ভাইয়ের চরিত্র, ফুলের মতো পবিত্র’, ‘অমুক ভাই চায় না, জনগণ ছাড়ে না’, ‘অমুক ভাইয়ের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’, অমুক ভাই এগিয়ে যাও, আমরা আছি তোমার সাথে’, ‘অমুক ভাইয়ের ভয় নাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই’, ‘অমুক দলের সরকার, বারবার দরকার’, এরকম বাহারি-রকমারি নানা রঙের স্লোগানে রাষ্ট্রের পরিচালনায় প্রজ্ঞাবানেরা থাকলেও শেষঅবধি এগিয়ে যাওয়া বাহারি স্লোগান ভেদ করে উন্নয়নের চ্যাবনপ্রাসের ডিজিটাল বাংলা নামক রাষ্ট্রের মেরামতে এগিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে দেশের শিশু-শিক্ষার্থীরা।

এ যেনো চরম বিস্ময়কর। অভূত অভাবনীয়। এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! শুধু বাংলাদেশ কেনো? পৃথিবীর ইতিহাসে কখনো কী এমন ঘটনা ঘটার নজির রয়েছে? সড়ক ব্যবস্থাপনায় হাজার-হাজার নিষ্পাপ, নির্দলীয়, কোমলমতি শিশু-শিক্ষার্থী রাজপথে। তাদের বুক যেনো বাংলাদেশের হৃদয়। মুখে নিত্যনতুন স্লোগান। 

উই ওয়ান্ট জাস্টিস। ইনসাফের দাবি নিয়ে ওরা রাজপথে। সবচেয়ে বড় কথা ওরা কথার ফুলঝুরিতে নয়। বরং বাস্তবে বিশ্বাসী। ওরা বাঙালি জাতির ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে। বড়দের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই রাষ্ট্র, সমাজে কীভাবে রক্ষকের নামে ভক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করা হচ্ছে। কীভাবে রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ‘অনিয়ম-দুর্নীতি’ ছেঁকে বসেছে। অথবা কীভাবে রাষ্ট্র, সমাজে পচন ধরেছে। ওরা দেখিয়ে দিয়েছে ওদের যতো ‘অদেখা’। আমরা হয়তো এ রাষ্ট্রের ধারক বাহকের অভিনয় সম্পর্কে জানতাম। কিন্তু অতটা কখনোই জানা সম্ভব হয়নি। অক্ষমদের ঘাড়ে আইন চাপিয়ে দিয়ে এই রাষ্ট্রের ক্ষমতাবানরা যেনো আইনের ঊর্ধ্বে। রাস্তায় গাড়ি চালাতে ওদের কোনো লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না। এমনকি আইন মানার প্রয়োজন হয় না যেনো কোনো কিছুতেই। 

সম্ভবত প্রথম একটি শিশুর দীপ্ত উচ্চারণ ফেসবুকে ভাইরাল হয়। লাইসেন্স আছে। না, নেই। তাহলে এই গাড়ি যাবে না। এরপর শুরু হয়েছে নতুন স্বাধীনতার ৪৭ বছরে এই নয়া সংস্কৃতি। ওইসব কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরাই সড়ক ব্যবস্থাপনায় এখন নিয়ন্ত্রণ করছে এগিয়ে যাওয়ার দাবিদার বাংলার রাজপথ।  

শুরুটা হয়েছে গত ২৯ জুলাই মর্মন্তুদ দুটি মৃত্যুকে ঘিরে। এদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর কুর্মিটোলায় বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে শহীদ রমিজ উদ্দীন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী দিয়া খানম মীম ও দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র আবদুল করিম। এ সময় আহত হয়েছে আরও ১২ জন। 

অবশ্য এটা বাংলাদেশে কোনো নতুন ঘটনা নয়। বরাবরই বাসচালকরা বেপরোয়া। ক্ষমতাবানদের বিশাল ছায়ায় তারা প্রফুল্ল। বলতে গেলে, যেনো মাফিয়াতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে পুরো পরিবহণ সেক্টর। এবারের ভিলেন জাবালে নূর পরিবহণের মালিকানায়ও রয়েছে ক্ষমতাতন্ত্রের স্পষ্ট সংযোগ। দুই বন্ধুর নিষ্ঠুর মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ, বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে রাজধানীস্থ শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা। রাজপথে নেমে আসে তারা। এরই মধ্যে শাজাহান খান নামে ক্ষমতাবান নৌপরিবহণ মন্ত্রীর বক্র হাসি আন্দোলনকারীদের আরো ক্ষুব্ধ করে তোলে। তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান মন্ত্রীর নিষ্ঠুরতার অভিনয় দেখে। একে একে আন্দোলনে যোগ দেয় সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষার্থী। পরিস্থিতি সামাল দিতে নানাবিধ কূট-কৌশল আর উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। শাসক দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, এ আন্দোলনে স্বার্থান্বেষী বিরোধী মহল ইন্ধন যোগাচ্ছে। আন্দোলনে যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে বলেও সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্যও বারবার বলা হচ্ছে।  

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অবস্থা বেগতিক দেখে গত ২ আগস্ট দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এ দিন ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে। রাজধানী শহর ছিল অচল। জেলায় জেলায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অবরোধে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে। তবে তারা তা মেনে নিয়েছেন হাসি মুখেই। এ আন্দোলনের পরিণতি যাই হোক না কেনো, এই শিশুরা এরই মধ্যে রচনা করেছে ‘নতুন ইতিহাস’। তাদের কিছু কিছু দাবি আর স্লোগান নতুন চিন্তা আর নতুন এক বাংলাদেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাস্তা বন্ধ, রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত। এই প্ল্যাকার্ড জন্ম দিয়েছে বিপুল আলোচনার। জনপ্রতিনিধিদের সপ্তাহে অন্তত তিন দিন গণপরিবহণে যাতায়াত করতে হবে- এ দাবি বড়রা তোলার হিম্মত না পেলেও এই শিশুরা-কিশোররা সে সাহস দেখিয়ে দিয়েছে।

অপরদিকে শিক্ষার্থীরা ফেসবুক ব্যবহার করে আন্দোলনের প্রচার চালায় মর্মে পুলিশের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সামাল দিতে ফোর-জি ও থ্রি-জি ইন্টারনেট সেবা বন্ধের সুপারিশ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এক আদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের ফোর-জি ও থ্রি-জি সেবা ২৪ ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে দেয় সরকার।

এতেও কিন্তু শিক্ষার্থীদের উত্তাঙ্গ ঢেউ  কমেনি, বরং আরো বেড়েছে। এদিকে অবরোধ-বিক্ষোভে অচল ঢাকা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলা শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ হয়েছে সারা দেশে। টানা কর্মসূচি চলার মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই দূরপাল্লার বাস বন্ধ করে দিয়েছেন পরিবহণ মালিকরা। তারা বাস বন্ধে নিরাপত্তার কথা বললেও শিক্ষার্থীরা মহাসড়কে দূরপাল্লার কোনো বাসে হামলা করেছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। 

প্রথম বারের মতো শিক্ষার্থীরা সড়কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পুরো রাজধানীতে বিভিন্ন সড়কের মোড়ে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কাজ করে। তারা নিজেদের মতো করে যানবাহনকে সারিবদ্ধভাবে লেন ধরে চলতে বাধ্য করে। এমনকি রিকশা চালকদেরও সারিবদ্ধ হয়ে চলতে দেখা যায়। মোড়ে মোড়ে সব ধরনের যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করে শিক্ষার্থীরা। গাড়ি চালনায় লেন অনুসরণের নির্দেশনাও দেয় তারা।

আন্দোলনের পঞ্চম দিনে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেও গাড়ির কাগজপত্র না থাকায় আটকে দেয় শিক্ষার্থীরা। লাইসেন্সবিহীন চালকদের আটকে রেখে ট্রাফিক সার্জেন্টদের কাছে সোপর্দ করেন। লক্ষ্য করা গেছে, তল্লাশিকালে অনেক বড় বড় রথী-মহারথী গাড়ির কাগজ দেখাতে সমর্থ হননি। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, যারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করবেন সেই পুলিশেরও গাড়ির কাগজ নেই, চালকের লাইসেন্সও নেই।

অবরোধে আসা শিক্ষার্থীরা এ সময় নানা স্লোগান দিতে থাকে। ‘রাস্তা বন্ধ রাষ্ট্রের মেরামত চলছে’, ‘সড়ক কেনো মৃত্যু ফাঁদ’, ‘বিচার চাই-বিচার চাই ছাত্র হত্যার বিচার চাই’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনিরা কেনো বাহিরে’, ‘আমার বোন কবরে, খুনিরা কেনো বাহিরে’, ‘পুলিশ-ছাত্র ভাই ভাই, ছাত্র হত্যার বিচার চাই’, ‘ছাত্র-সাংবাদিক ভাই ভাই, নিরাপদ সড়ক চাই’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘উই মাস্ট গেট জাস্টিস’, ‘এবার তোরা মানুষ হ’, ‘শিক্ষকের হাতে বেত নাই, পুলিশের কেনো মার খাই’- এসব স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত ছিল। 

অনেকের হাতে ছিল ব্যানার। সেখানে লেখা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’, ‘মাগো তোমার ছেলে রাজপথে, দাবি শুধু ৯টি’, ‘আমাদের ৯ দফা দাবি মানতে হবে’। পুরো সময়টিতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানান। কিন্তু শিক্ষার্থীরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এ সময় ছাত্রদের কয়েকজন হ্যান্ড মাইকে কোনো ধরনের যানবাহন ভাঙচুর না করার আহহ্বান জানান। তারা বলেন, তাদের আন্দোলন নিরাপদ সড়কের জন্য, যারা বেপরোয়াভাবে বাস চালিয়ে শিক্ষার্থীদের পিষ্ট করেছে তাদের বিচারের জন্য। কেউ যেনো কোনো গাড়ি ভাঙচুর না করে। আর যদি কারো ড্রাইভিং লাইসেন্স বা গাড়ির কাগজপত্র না থাকে তাহলে তাকেও যেনো কোনো আঘাত না করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়।

শিক্ষার্থীরা সড়কের মোড়ে মোড়ে অবস্থান নিয়ে যানবাহনের কাগজপত্র ও চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখেন। কেউ কেউ সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক কন্ট্রোলও করেছেন। চালকদের লাইসেন্স সঙ্গে নিয়ে সাবধানে গাড়ি চালানোর জন্য শিক্ষার্থীরা তাগাদা দিয়েছেন। 

যাদের কাছে বৈধ লাইসেন্স ছিল তাদের বেলায় কোনো সমস্যা হয়নি। তবে যাদের কাছে লাইসেন্স ছিল না তাদেরকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। কাউকে ঘণ্টাখানেক সময় আটকে রাখা হয়। আবার অনেককে সার্জেন্ট ডেকে এনে মামলা নিয়ে যেতে হয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে পুলিশ সদস্যদের বহনকারী ভ্যান, বিজিবির পণ্য বহনকারী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গাড়িকে। 

যানবাহনকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে শিক্ষার্থীদের চেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ। পরিবহণ না থাকায় রাজধানীতে লাখ লাখ মানুষ হেঁটে, রিকশায় বা বিকল্প যানে দুর্ভোগ সঙ্গী করে চলাচল করলেও এতটুকু বিরক্তি ছিল না কারও। সাধারণ মানুষ বলছেন দুর্ভোগ সহ্য করে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরলে এটি হবে দেশের জন্য একটি বড় অর্জন। এদিকে শিক্ষার্থীদের তল্লাশিতে সরকারি যানবাহনের কাগজপত্র ও লাইসেন্স না থাকার বিষয় ধরা পড়া এবং তা ব্যাপক হারে প্রচার হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে গাড়িতে প্েরয়াজনীয় কাগজপত্র রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়। 

এদিকে সরকারের তরফে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নেয়া হয়েছে। রাস্তা ছেড়ে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকেও একই ধরনের আহ্বান জানানো হয়েছে। 

দাবি পূরণের লক্ষ্যে রাজপথ না ছাড়ার অপরাধে শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়। এতে বাদ যায়নি গণমাধ্যকর্মীরাও। করা হয় গ্রেফতার। আন্দোলন না থামার দোষ দেওয়া হয় বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের।  

বস্তুত বিশ্বজুড়ে একটি যন্ত্রের অবিরাম চলার ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর তা কোনো দিনই বন্ধ হয়নি। যন্ত্রের নাম ‘ষড়যন্ত্র’। শাসকেরা এ যন্ত্র খুঁজতে খুবই ভালোবাসেন। কখনো তা সত্য হয়, কখনো মিথ্যা। শিশু-কিশোরদের অভাবনীয় এ আন্দোলন ঘিরেও কিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার হয়েছে। তার সত্য-মিথ্যা হয়তো কোনো দিন জানা যাবে অথবা নাও জানা যেতে পারে। কিন্তু এই সত্য সম্ভবত, কেউ অস্বীকার করবেন না; এই আন্দোলনের প্রায় শতভাগ মুখই নিষ্পাপ। তাদের আমরা ভাবতাম ফেসবুক প্রজন্ম। কিন্তু তারা দেখিয়েছে অসীম সাহস, তারা ত্যাগ স্বীকার করতে জানে। পচনধরা সমাজের পতন ঠেকানোর এক ঐতিহাসিক শক্তি তাদের মধ্যে রয়েছে। মন্ত্রী, সচিব, রাজনীতিবিদ, পুলিশ, সাংবাদিক সমাজের প্রভাবশালী একটি বড় অংশ যেকোনো আইনের তোয়াক্কা করেন না। আইনি ব্যবস্থা যে এখানে বহুলাংশে ভেঙে পড়েছে এই শিশুরা আমাদের সেদিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তাদের কোনো নেতা নেই, নেই কোনো দল। অবিচল তারা, তারা নিষ্কম্প। তারাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। এই রাষ্ট্রের মেরামত আসলেই জরুরি। আসুন, ওদের কথা শুনি। ওদের কাঁধে কাঁধ রেখে নিজের ‘ভুল’ ভাঙ্গতে আর পাপমুক্ত করতে পথ খুঁজি। সরল পথে চলি। 

আমরা বলতে চাই, শিক্ষার্থীদের সড়ক ব্যবস্থাপনার কাজটি অন্তত সাধুবাদের। এটা ওদের করার কথা নয়। আমাদের সচেতন হওয়াটা আমাদেরই দায়িত্ব। বিশেষ করে রাজধানী থেকে সপ্তাহে অন্তত একদিন শিক্ষার্থীদের দিয়ে শুরু করা যেতে পারে সড়ক ব্যবস্থপনার কাজ। পরবর্তীতে এটাকে ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে। এভাবে তাদের আন্দোলনকে কাজে লাগানো যেতে পারে। মোদ্দা কথা, সবাইকে আইনের আওতায় আসতে হবে। আইন সবার জন্য সমান। এ কথা শুধু নামকাওয়াস্তে কিতাবে লিপিবদ্ধ থাকলেই চলবে না। বরং আইন সবাইকে মানতে হবে। এমনটাই কাম্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ